Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Debdutta Banerjee

Drama


3  

Debdutta Banerjee

Drama


হারিয়ে খুঁজি যারে

হারিয়ে খুঁজি যারে

6 mins 1.5K 6 mins 1.5K

ল‍্যান্সডাউনের পাইন গাছে ছাওয়া ঢালু পথ বেয়ে নিচে নামতে নামতে থমকে দাঁড়ায় অমর্ত‍্য, সামনের ঐ বড় গাছটার মোটা গুড়ির পাশে সরে যায় মেয়েটা, গত দু দিন ধরেই অমর্ত‍্য লক্ষ‍্য করেছে মেয়েটা ওকে সবসময় লুকিয়ে দেখে। সেদিন লেকচারের পরে হল থেকে বার হওয়ার সময় অমর্ত‍্য দেখেছিল মেয়েটাকে, চোখ দুটো যেন বড্ড চেনা, ফর্সা, এক মাথা লম্বা চুল পিঠময় ছড়ানো, কেমন যেন এক কেয়ারলেস বিউটি। 

গত পনেরো বছর অমর্ত‍্য নিজের রিসার্চ আর পড়া নিয়ে এত ব‍্যস্ত ছিল যে কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখেনি। আজ অমর্ত‍্য সফলতার শীর্ষে,  ম‍্যানেজমেন্টের বিভিন্ন বিষয়ের

উপর লেকচার দিতে ছুটে বেড়ায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। কাজ ছাড়া ও কিছুই বোঝে না। ল‍্যান্সডাউনের এই কলেজেও ও এসেছে একটা সেমিনারে। পৃথিবী বিখ‍্যাত সব বড় বড় রিসার্চ স্কলার আর বিশেষজ্ঞরা এসেছেন এই সেমিনারে। দু দিনের সেমিনার কাল শেষ হয়েছে। অমর্ত‍্য আরো দুটো দিন পাহাড়ের গায়ে এই নির্জনতায় কাটাতে এখানেই থেকে গেছে। টানা পনেরো বছর সব কিছু ভুলে পরিবারকে ভুলে একভাবে নিজের কাজ নিয়েই মেতেছিল অমর্ত‍্য। আজকাল মাঝে মাঝে বড্ড ক্লান্ত লাগে। এই পাহাড়ি পাকদণ্ডি পথ আর পাইন বনের ছায়ায় কি যেন খুঁজে ফেরে অর্ধ শতাব্দি পেরিয়ে আসা অমর্ত‍্য । কিন্তু এই মেয়েটার কৌতূহল ওকে চিন্তিত করে তোলে , সেমিনারের দিন মেয়েটা কলেজ ইউনিফর্মে ছিল।কত বয়স হবে, কুড়ি !! বাইশ!! 

একটু ছোট্ট সম্ভাবনা মনের কোনে উঁকি দিলেও অমর্ত‍্য ভাবে তা কি করে সম্ভব!! তারা তো অষ্ট্রেলিয়ায়।

সেন্ট মেরি চার্চের বাইরে আবার মেয়েটিকে দেখে অমর্ত‍্য ওর সামনে গিয়ে সরাসরি ইংরেজিতে প্রশ্ন করে -''তুমি কি আমায় কিছু বলতে চাও? আমায় ফলো করছো কেন ?''

কিন্তু মেয়েটা দু পাশে মাথা নেড়ে তাড়াতাড়ি চলে যায়। অবাক হয়ে অমর্ত‍্য তাকিয়ে থাকে ওর গমন পথের দিকে।

-''ডঃ সেনগুপ্তা, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? কেমন লাগছে আমাদের এই ছোট্ট টাউন? '' সেন্ট জোনস কলেজের প্রধান অধ‍্যক্ষ ডঃ ডিমেলো এগিয়ে আসেন। রবিবারের প্রার্থনা সভায় যোগ দিতে চার্চে এসেছিলেন উনি। 


-''খুব সুন্দর.... তাই তো দু দিনের আমন্ত্রনে এসে আটকে গেছি। ফিরতে মন চাইছে না আর। ''

-''সত‍্যিই আমাদের এই ল‍্যান্সডাউনের মায়ায় কিছু লোক আটকা পড়ে। আমায় দেখুন কুড়ি বছর হয়ে গেল এখানে। '' ডঃ ডিমেলো কথা বলতে বলতে এগিয়ে যান। 

-''চলুন, টিপেনটপ ঘুরে আসা যাক। আপনার কি এই প্রথম এখানে? '' 

উত্তর দিতে গিয়েও থেমে যায় অমর্ত‍্য। কুয়াশার মত একটা চাদর সরে যায় মাঝে মাঝে। মনে পড়ে কলেজের কিছু স্মৃতি। একটা ছোট এক্সকারসনে একদল কলেজ পড়ুয়া এসেছে ল‍্যান্সডাউন ঘুরতে। পাইন বনের ফাঁকে কিছু খুনসুটি, লেকের জলে বোটিং, তারকেশ্বর মন্দিরে হেঁটে ওঠা.... টুকরো টুকরো দৃশ‍্য।

-'' কোয়েনা কে আপনি চেনেন ? আলাপ আছে ?'' টিফেনটপের নিচে বড় ঝাঁঁকড়া দেওদার গাছের নিচে মেয়েটাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেছিল অমর্ত‍্য। তাই দেখে ডঃ ডিমেলো প্রশ্ন করেন।

-''কে কোয়েনা? ...'' চমকে ওঠে অমর্ত‍্য।

-''ঐ যে মেয়েটি আপনাকে লক্ষ‍্য করছে? আপনি চার্চের সামনে কথা বলছিলেন।''

শরীরটা হঠাৎ খারাপ লাগতে শুরু করে অমর্ত‍্য। ছেড়া ছেড়া কয়েকটা ছবি জোড়া লাগতে থাকে, স্লাইড শোয়ের মত কিছু দৃশ‍্য.... একটা মেয়ের আদো আদো ডাক, বাবিয়া...। কোর্টের বারান্দায় কাঁদতে কাঁঁদতে ছুটছে একটা মেয়ে। পিছনে দৌড়ে আসছে তার মা। কোলে তুলে নিল মেয়েকে।জাজ সাহেব বলছে মেয়ের কাস্টডি মায়ের। বাবা মাসে একবার দেখতে পাবে শুধু। 

বুকের মধ‍্যে একটা চাপচাপ ব‍্যাথা। চারপাশটা দুলছে। ঐ তো মেয়েটা... দূর থেকে দেখছে অমর্ত‍্যকে। সবটাই ধোঁয়াসা। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অমর্ত‍্য। 


******


-''গুডমর্নিং ডঃ সেনগুপ্তা। এখন কেমন লাগছে ? ডঃ বলেছেন আপনি এখন বেশ সুস্থ। একটা ছোট্ট আ্যটাক এসেছিল....'' ডঃ ডিমেলোর কথা গুলো যেন বেশ দূর থেকে ভেসে আসছে। এটা একটা হাসপাতালের কেবিন এটা অমর্ত‍্য বুঝতে পারে। বেশ কিছু যন্ত্রপাতি লাগানো শরীরে। মাথাটা বেশ ভার। 

একটা চেনা মুখের খোঁজে চারপাশে চোখ বুলায় অমর্ত‍্য। কিন্তু হতাশ হয়। 

-'' কি হয়েছিল আমার ?'' খুব আস্তে প্রশ্নটা করে ও ডঃ ডিমেলোকে।

-''অত‍্যাধিক ট্রেসের থেকে এমন হয়। কাজের চাপ। কোয়েনা আর আমি সাথে সাথে আপনাকে এই আর্মি হাসপাতালে এনেছিলাম। এখন আপনি বিপদের বাইরে।তবে বিশ্রাম নিতে হবে। ''

-''কোয়েনা ....সে কোথায়?''

-''আরে কাল সারাক্ষণ এখানেই ছিল। আজ ডাক্তার যখন বলল বিপদ কেটে গেছে ও চলে গেলো। ও নাকি আপনার আত্মীয় হয় !!''

ডঃ ডিমেলো বললেন।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় অমর্ত‍্য। আত্মীয় !! তাই কি এত চেনা লাগছিল !!

-''আমাদের কলেজের স্কলার স্টুডেন্ট কোয়েনা। ওর কথাই তো বলছিলাম। ''

-''কোথায় ও ? একবার দেখা করতে চাই। '' উত্তেজনায় উঠে বসতে চায় অমর্ত‍্য। 

-''এই চিঠিটা আপনাকে দিয়ে গেছে। কি একটা দরকারে ওকে নাকি আজকেই বাড়ি যেতে হবে। তাই চলে গেলো একটু আগে। ''

একটা সাদা খাম বাড়িয়ে ধরে ডঃ ডিমেলো। 

চিঠিটা নিতে গিয়ে হাতটা কেঁপে ওঠে অমর্ত‍্যর। ডঃ ডিমেলো বেরিয়ে যেতেই কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলে ফেলে অমর্ত‍্য।


......


জানি না আজ আপনাকে কি বলে ডাকবো।কারন আজ আপনার একটাই পরিচয়, একজন বিখ‍্যাত প্রফেসার ডঃ অমর্ত‍্য সেনগুপ্ত। সত‍্যি আপনি বিখ‍্যাত!!

আমি সেই বিখ‍্যাত লোকটার ভেতর একজন চেনা লোকের ছবি খুঁজেছিলাম। যে লোকটা ছিল আমির ভীষণ প্রিয়। হারিয়ে গেছিল আমি যখন ছয় বছরের তখন। যে লোকটাকে আমি বাবিয়া বলে ডাকতাম, আমাদের দিল্লির গ্ৰেটাল কৈলাসের বাড়ি, সেই ফুল বাগান। ছোট্ট দোলনা, বাবিয়া আর আমি। তারপর একটা ঝড় এলো। সব কেমন বদলে গেলো। রোজ রাতে মায়ের সাথে বাবিয়ার ঝগড়ায় আমার ঘুম ভেঙ্গে যেত। রোজ সকালে উঠে দেখতাম এক থমথমে পরিবেশ। তারপর সেই কালো সাদা পোশাকের লোকগুলো বোঝাল আমি নাকি মায়ের একার মেয়ে। কোর্টে দাঁড়িয়ে বলতে হবে আমি মায়ের সঙ্গে থাকতে চাই। বাবিয়া বোঝালো আমায় বলতে হবে আমি বাবিয়ার মেয়ে। সব কেমন গুলিয়ে গেলো। আমি তো দুজনকেই ভালোবাসতাম। কিন্তু মায়ের কাছে একা কি করে থাকবো!! আবার মা বলল যদি মায়ের সঙ্গে না থাকি মা মরে যাবে। একদিন সেই বড় লাল বাড়িটায় কালো পোশাকের সেই লোকটা কি সব বলল। সব কেমন বদলে গেল। আমার বাবিয়া চলে গেল। কত কাঁদলাম, তারপর আমি মায়ের সাথে চলে গেলাম অস্ট্রেলিয়া। প্রথম দু একবার বাবিয়া ফোন করেছিল, তারপর আর খোঁজ নেয়নি। মা ও আবার ব‍্যস্ত হয়ে গেল নিজের কাজে। আমার জন‍্য সময় নেই। স্কুল থেকে ফিরে কত কাঁদতাম একা একা। কত চিঠি লিখেছি দিল্লির ঠিকানায়। বাবিয়া আসেনি। কত ফোন করেছি, নম্বর নাকি ভুল। একটা ছোট্ট মেয়ে তার বাবিয়াকে যত ভাবে পারে খুঁজেছে। সাবালক হয়েই দেশে ফিরেছি। ততদিনে জেনেছি ডঃ অমর্ত‍্য সেনগুপ্ত বিদেশে চলে গেছেন। তিনি এক বিখ‍্যাত প্রফেসার। আমার কথা কি তার মনে পড়ে !!

বাবিয়ার বিষয় নিয়েই পড়তে এসেছিলাম। অবশেষে আপনি এলেন এই কলেজে। অনেক আশা ছিল আপনি আমায় চিনে নেবেন । কিন্তু সামনে থেকে দেখে বুঝলাম আপনার এখন একটাই পরিচয়। অতীতের সেই চেনা লোকটাকে খুঁজে পাইনি। হয়তো ভুল ভাবতাম, আপনাদের দুজনের ব‍্যস্ত জীবনে আমার কোনো স্থান কখনোই ছিল না। মা বলত আপনি কাজ পাগল, সংসারে সময় দিতেন না। আমার কোনো খোঁজ করেননি কখনো। মা তো অষ্ট্রেলিয়া গিয়ে নিজের নতুন জীবন শুরু করেছিল। আমার জন‍্য সময় ছিল না আর। আপনাদের একটাই প্রশ্ন করবো - কী দরকার ছিল আমায় পৃথিবীতে আনার? কেন একটা শিশুর জীবন নিয়ে জুয়া খেললেন আপনারা ? 

অবশ‍্য প্রশ্ন করবো কাকে? আমার বাবিয়াকে তো খুঁজেই পেলাম না। 


এক হতভাগ‍্য সন্তান


চোখটা ঝাপসা হয়ে ওঠে। চিঠির অক্ষর গুলো ভিজতে থাকে। কোর্ট সেদিন মেয়ের মাকে মেয়ের দায়িত্ব দিয়েছিল। আর অলকা ফোন করলেও মেয়েকে দিত না। প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী অলকা মেয়ে নিয়ে অষ্ট্রেলিয়া চলে গেছিল ডিভোর্সের পরেই। এনগেজমেন্ট রিং দু টো শুধু পড়ে ছিল ড্রয়ারে ওদের একসময়ের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে।

আস্তে আস্তে অমর্ত‍্য কাজের মধ‍্যে ডুবে গেছিল। মেয়েকে ভুলতে রিসার্চের মধ‍্যে ঢুকে গেছিল পুরোপুরি। সত‍্যিই মেয়ের খোঁজ আর করেনি। এত বছর পর মেয়েটাকে চিনতেও পারেনি এক হতভাগ‍্য বাবা। এর বোধহয় কোনো ক্ষমা নেই। 

অলকাকেও তো একদিন ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল সে। অথচ একটা সময় অলকাকেই অসহ‍্য লাগত। কেরিয়ার সচেতন অলকার সাথে ইগোর লড়াই শুধু তাদের দুজনের জীবনটা তছনছ করেনি, একটা ছয় বছরের শিশুর জীবন ও শেষ করে দিয়েছিল। এবার প্রাশচিত্তর সময় এসেছে।

ডঃ ডিমেলো কি দিতে পারবে কোয়েনার ঠিকানা? ফোনটা তুলে নেয় এক হতভাগ‍্য বাবা। এবার মেয়েকে খুঁজে বের করবেই সে। আর ভুলে থাকলে চলবে না।


Rate this content
Log in

More bengali story from Debdutta Banerjee

Similar bengali story from Drama