Sonali Basu

Drama

3  

Sonali Basu

Drama

চোরা স্রোত

চোরা স্রোত

5 mins
836


সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বাণী দেখল একজন পুরুষ দু হাতে দুটো সুটকেস নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে তার পেছনে একটা মুটে যার মাথায় সাংসারিক জিনিসপত্রের বস্তা তার পেছন পেছন একটা বৌ। বাণী একটু পাশে সরে দাঁড়ালো আর ওরা উঠে গেলো। উঠে যেতে যেতে চোখাচোখি হল স্বামীটির সাথে তারপর স্ত্রীটির সাথেও। বৌটির মুখে হাল্কা হাসি দেখে ও প্রত্যুত্তরে হাসল। উত্তর কলকাতার এক তস্য গলির এক তস্য পুরনো বাড়িতে বাণী এসে উঠেছে তা প্রায় সপ্তাহ ঘুরতে চলল। দিল্লী মুম্বাই চেন্নাইয়ের মতো জায়গায় ঘুরে চাকরি করে কলকাতার ভালো অঞ্চলে বদলি হয়েও ওখানকার কোন ভাড়া ফ্ল্যাটে না উঠে ও এখানে উঠেছে ইচ্ছে করে। যাদবপুরেই ওদের বিশাল ফ্ল্যাট কেনা আছে কিন্তু সেখানে ও উঠবে না, তাই এখানে। শুভম জানে না ওর এই সিদ্ধান্তের কথা আর জানানোরও কোন প্রয়োজন বোধ করেনি বাণী। রাজা, ওর ছেলে অবশ্য জানে সবটুকু আর ও আসতেও চেয়েছিল কিন্তু বাণী বলেছে ঠাকুমা ঠাকুরদার দায়িত্ব এখন থেকে ওর ওপর তাই তাদের দায়িত্ব যেন ও ছেড়ে না আসে। রাজা থেকে গেছে গড়িয়ার বাড়িতে।


এখানে আসার পর পুরনো সিমটাও মোবাইল থেকে খুলে রেখেছে ও, নতুন একটা কিনে চালাচ্ছে। কারণটা আর কিছুই না পুরনো সিমের ভেতর দিয়ে শুভমের অপমানজনক কথাবার্তা যে কোন সময় ওর কানের ওপর আছড়ে পড়তে পারে। অনেক হয়েছে আর না। এখানে যথেষ্ট স্বস্তিতে আছে ও। সিঁড়ি দিয়ে নেমে ও অটো ধরলো তারপর চলল ওর কর্মস্থলের দিকে। ও সেকটার ফাইভের এক নামী কোম্পানিতে এইচ আর ম্যানেজার। শুভমকে ওর ধন্যবাদ দেওয়া উচিত, ওর প্রতিবারের ব্যঙ্গক্তি বক্রোক্তি ওকে আজ এই পদে উঠে আসতে সাহায্য করেছে বটে। শুভমের সাথে ওর বিয়েটা আর পাঁচটা মেয়ের মতোই রবিবারের কাগজে পাত্র চাই কলাম দেখে পাওয়া পাত্রর সাথে যোগাযোগ করে। বিয়ের সময় শুভম কলেজের পড়া ইতি করে কলকাতার এক কারখানায় সেলস ম্যানেজারের কাজ করতো। তবে ওর বাবা তখনও ডানলপ কারখানায় উচুপদের আধিকারিক ছিলেন। তাই বড়লোকি চালও ভালোই ছিল ওদের। যখন তারা মেয়ে দেখতে আসেন বর্ধমানে তখন ওদের হাবভাবেই তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো। গ্রামের মেয়েকে শহরের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে মেয়ে আর তার আত্মীয়দের মানটা বাড়াচ্ছেন অনেকটা সেরকম ভাব আর কি। মেয়ের বাবাদের মেয়ে বিয়ে দিতে গেলে ছেলেপক্ষের সামনে মাথা নিচু করতে হয়। মেয়ে পড়াশোনায় সমান সমান হলেও ছেলের কদর বেশী হয়। আর ওর জন্য এতো ভালো সম্বন্ধ পাওয়া গেছে সেখানে বাবা গদগদ হয়ে কি করবে ভেবেই পেলে না।


শুভমের সাথেই ওর বিয়ে হয়ে গেলো। বাণী এলো তার বড়লোক শ্বশুরবাড়িতে। বৈভবের ছড়াছড়ি। অহংকারি শ্বশুর স্বামীর মাঝে শুধুই শ্বাশুড়িই মাটির মানুষ। তিনি কিন্তু গরীব ঘরের মেয়ে নন বরং বনেদি এককালে জমিদার বাড়ির মেয়ে। কিন্তু তাঁর মিষ্টি স্বভাব আর ভালো ব্যবহারের জন্য শ্বাশুড়ির সাথেই খুব তাড়াতাড়ি ভাব হয়ে গেলো ওর। তিনিই ওকে বাড়ির হাবভাব বোঝানোর ছলে জানালেন এ বাড়ির পুরুষরা একটু বেশিই উন্নাসিক। বোঝালেন যদি ও মানিয়ে নিতে পাড়ে তাহলে সমস্যায় পড়তে হবে না। নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে তখন, খুব চেষ্টা করে গেছে ওদের ধাত বুঝে চলার।


কিন্তু শুভমের স্বভাবেই ছিল ওকে হেয় করা। বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমায় নিয়ে গেলো থাইল্যান্ড। বলল “কোনদিন তো দেখনি, দেখো কীভাবে ঘুরতে হয়। আমাদের তো ইন্ডিয়ার প্রায় সব জায়গা ঘোরা হয়ে গেছে। তোমরা বেড়াতে গেছো কোথাও আজ পর্যন্ত” খারাপ লেগেছিল নতুন স্বামীর মুখে ও কথা শুনে তবে মেনে নিয়েছিলো। ফিরে আসার পর ওকে রান্নার ক্লাসে ভর্তি করলো শুভম। কারণ একদিন বিকেলের জলখাবার তৈরি করেছিলো বাণী শ্বাশুড়ির কথায় কিন্তু খেয়ে ওদের কারোরই ভালো লাগেনি। শুভম তো বলেই দিলো এসব নাকি মুখে তোলার মতোই নয়। তাই রান্না শেখা, দেশি বিদেশী পদ। কিন্তু ও রান্না আর কতটুকু করতো কারণ রাঁধুনি ছিল। এরপর ওর পড়াশোনার দৌড় কতদুর সেটা পরীক্ষা করতে বসলো ও। মুখে একটাই কথা “কি যে পড়াশোনা করেছো, সাধারণ মানের গ্র্যাজুয়েট একটা চাকরিও জোটাতে পারবে না”

এই কথার উত্তরে ওর কি করা উচিত ভাবতে ভাবতেই ছেলে চলে এলো কোলে। তারপর আর কোন কথায় মন দেওয়ার সময় থাকলো না ওর হাতে। একটা পুতুল পেলো যেন ও মনের মতো তাকে নিয়েই সারা দিন রাত কেটে যায়। সেই পুতুল একটু একটু করে বড় হয়ে উঠলো কিন্তু যতই চেষ্টা করা যাক না কেন আলাদা তৈরি করতে কিন্তু রাজার মধ্যে শুভমের ছায়া প্রকট হয়ে উঠতে লাগলো ধীরে ধীরে। ছেলে বড় হয়ে উঠতেই শুভম আবার পুরনো প্রসঙ্গ তুলল। বাণীর মনে জেদ চেপে গেলো। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো ও। শুরু করলো এখানে ওখানে চাকরির পরীক্ষা দেওয়া। চেষ্টা ছিল তাই পেয়েও গেছে। তারপর এক অফিস থেকে আরেক অফিস বর্ধিত মাইনে আর পদ নিয়ে।

ওদিকে শুভমের উন্নতি আটকে ছিল তা নয়। প্রচুর মাইনে পায় তাছাড়া কোম্পানি থেকে বিশাল ফ্ল্যাট গাড়ি সব দিয়েছে মুম্বাইতে। কিন্তু ইদানিং তার মুখে একটাই কথা আমি সংসারের দায়িত্ব নিতে পারবো না, তোমরা নিজেদের খরচ নিজেরাই চালাও। শ্বশুর শ্বাশুড়িমার জন্য খরচ ও কোনদিনই করেনি কারণ শ্বশুরমশায়ের মোটা টাকা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স আছে। তাহলে শুধু স্ত্রী আর ছেলের ভরণপোষণের টাকা দিচ্ছিলো সে। এবার শুভম চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলো “নিজে তো রোজগার করার অহংকার দেখাও কিন্তু শুধু খাওয়ার জন্যই খরচ করতে হয়, আছো তো আমাদেরই বাড়িতে। বাড়ি ভাড়া করে থাকতে বুঝতাম এলেমটা”


নিজের স্ত্রীকে কেউ এ কথাও বলতে পারে ধারণায় ছিল না বাণীর। ও অবাক হয়ে গেলো শুভমের কথার ধরণ দেখে, এ কি ওকে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ট্রেনিং নাকি ইচ্ছাকৃত অপমান? বাণী ভাড়া বাড়িতে উঠে আসে। শ্বশুর বাড়িতে সব জানিয়েই আসে যাতে পরে ওকে কেউ দোষারোপ না করতে পারে।

অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায় ওর। তারপর রান্না খাওয়া দাওয়া করে শুতে শুতে রাত আরও গভীর হয়। তবু আনন্দে আছে ও। কিন্তু এখনো পর্যন্ত আসেপাশের ভাড়াটিয়াদের সাথে হাসি বিনিময় হলেও সেরকম আলাপ হয়ে ওঠেনি বাণীর। তবে ওর পরেপরেই আসা নতুন বৌটার সাথে আলাপ হয়েছে একটু। ওর নাম পাখি।

আজ অফিস ফেরত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে শোনে নতুন যে ভাড়াটিয়া এসেছে তাদের বন্ধ দরজার ওপার থেকে তুমুল চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে। কিন্তু এক তরফা। ব্যাপার কি কে জানে?


পরেরদিন অফিস যাওয়ার আগে ছাদে উঠেছে বাণী কাপড় মেলতে দেখে পাখি ছাদে কাপড় মেলছে। ওকে দেখে বাণী জিজ্ঞেস করে “আজ এতো সকাল সকাল ছাদে। কোথাও যাচ্ছ নাকি?”

পাখি উত্তর দেয় “হ্যাঁ গো। কি বলবো দিদি কাল ও নেশা করে মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে এসেছে। কি না কেউ আমার সম্পর্কে কু মন্তব্য করেছিলো। কি দরকার ছিল কান দেওয়ার। এখন ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতে হবে পট্টিটা পালটিয়ে দেওয়ার জন্য। তারপর আবার কাজে ছুটতে হবে। আসি দিদি নাহলে দেরী হয়ে যাবে”

বাণীর মনে পড়লো পাখি একটা ছোট গেঞ্জির কারখানায় কাজ করে বটে। ওর মনে একটাই কথা উঠলো পাখি তার স্বামীর সাথে মিলে সংসার তরীকে জীবন নদীর মধ্যে দিয়ে সুন্দর বেয়ে নিয়ে চলেছে। একজন আরেকজনকে ভালোবাসে ভরসা করে তাই এই জোরটা আছে ওদের মধ্যে। কিন্তু ওর? সংসার তরীকে তো ও শুভমের সাথে সুন্দরভাবে চালিয়ে নিতে চেয়েছিল কিন্তু অহঙ্কারের ফুটো দিয়ে অপমানের চোরা স্রোত ঢুকে সব ডুবিয়ে দিলো।                


Rate this content
Log in