Debdutta Banerjee

Drama


3  

Debdutta Banerjee

Drama


বৃষ্টিস্নাত ভালবাসা

বৃষ্টিস্নাত ভালবাসা

5 mins 1.8K 5 mins 1.8K

একভাবে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। আজ দুদিন সূর্যের মুখ দেখে নি কেউ। চারপাশ জলে থৈ থৈ। ঝিলিকের আজ মন ভালো নেই। আজ যে অভ্রর জন্মদিন। দুপুরে পার্কষ্ট্রিটের একটা বড় রেস্তরায় আজ ও বন্ধুদের পার্টি দিচ্ছে। এমনি দিনে পার্কষ্ট্রিট যাওয়া কোনো ব‍্যাপার না। কিন্তু আজ এই জলবন্দী শহরে গাড়ি চলছেই না । মেট্রো ও বন্ধ। ঝিলিকের মাসের শেষে হাতে মাত্র তিনশো টাকা পরে আছে। এই টাকাটা আজ খরচ করে ফেললে হয়তো মাসের শেষ কটা দিন কলেজ থেকে ফেরাটা অনিশ্চিত হয়ে যাবে। কিন্তু অভ্রর জন্মদিনে সে তো খালি হাতে যেতে পারে না। এদিকে ট‍্যাক্সিতেও যাওয়ার সামর্থ‍্য নেই। এই বানভাসি শহরে আজ বাসও চলছে না। বারান্দায় এসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল ঝিলিক।


পাশের বাড়ির রোদ্দুর ওকে দেখেই ডাকে -" এই ঝিলিক, একটা নতুন কবিতা লিখেছি বৃষ্টির উপর। শুনবি ? চলে আয়।"


রোদ্দুর ওর ছোটবেলার সাথী। সেই ছোট থেকেই একসাথে বড় হয়েছে। এক কলেজেই পড়ে। ওর সব কবিতার একমাত্র শ্রোতা ঝিলিক। দুজনের এই বন্ধুত্বে হঠাৎ করে এই তিনমাস একটু দুরত্ব এসেছে। ফাইন‍্যাল ইয়ারের অভ্র যবে থেকে ঝিলিকের জীবনে এসেছে তবে থেকে ঝিলিকের সময় গুলো অভ্রর সাথেই কাটছে। রোদ্দুর সব জানে। অভ্র বড়লোকের ছেলে। পড়াশোনায় ভাল। দেখতেও দারুণ। ঝিলিকের মতো সুন্দরী মেয়েকেই ওর পাশে মানায়, এটা রোদ্দুর বোঝে।


আজ বহুদিন পর ঝিলিককে একা দেখে খুব ইচ্ছা করে কবিতা শোনাতে।


-" না রে, আজ হবে না। একটু বের হতে হবে। " ঝিলিক ঘরে ঢুকে যায়।


অনেক বেছে গতবার পূজার হালকা আকাশি চুরিদারটাই পরে। রোদ্দুর পছন্দ করে দিয়েছিল । সবাই বলে এটা পরলে ওকে দারুন লাগে। মনটা একটু খুঁতখুঁত করছিল এই জল কাদায় এতো ভালো ড্রেসটা পরতে। কিন্তু বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষ্মণ নেই। ওদিকে বারোটা বাজে। রেডি হয়ে বেরিয়ে আসে ঝিলিক। মা একটু কিন্তু কিন্তু করছিল।একটা রিক্সা শেষে চল্লিশ টাকায় বাস ষ্ট‍্যান্ড পৌঁছে দেয়। রাগ হচ্ছিল খুব। বৃষ্টি না থাকলে হেঁঁটে আসতে পারতো। অবশেষে একটা বাস পায় সে। দশ টাকায় পৌঁছে যায় মল্লিক বাজার , কিন্তু এ বার হাঁটতেই হবে। জল বাঁচিয়ে । বেরবার মুখে রোদ্দুর ওর দিদির রেন কোটটা দিয়েছিল। আপাতত ওটাই ভরসা। হাতে আড়াই শো টাকা আর কটা খুচরো পয়সা। কি কিনবে ভেবেই পায় না ঝিলিক। একটা বড় শো পিসের দোকানে ঢোকে‌ । কিন্তু ঐ টাকায় কিছুই নেই। মনটা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। একবার মনে হয় সে বড়ই বেমানান আজ অভ্রর পাশে। সবাই ওর আর অভ্রর রিলেশনটা জানে। আজ যে সবকটা চোখ ওদের উপর আবদ্ধ হবে।


সামনেই একটা ফুলের দোকান। বুদ্ধি করে একটা বোকে কিনতে ঢোকে ঝিলিক। কিন্তু পার্কষ্ট্রিটের এ সব দোকানে ঐ কটা টাকায় যে কিছুই হয় না সেটা ও আজ বুঝলো। তবে বৃষ্টির জন‍্য কাষ্টমার কম বলেই হয়তো দোকানের ছেলেটা কিছুটা করুণা করেই ওকে সব চেয়ে ছোট বোকেটা দিয়ে দিলো। সবুজ পাতার ফাঁকে ছটা গোলাপ দিয়ে একটা হৃদয়। ঝিলিক পুরো আরাইশো টাকা দিয়ে ওটাই নিলো। অভ্রকেই না হয় বলবে আজ বাড়ি পৌঁছে দিতে!!


হোটেলের সামনে এসে বর্ষাতি টা খুলতেই হলো বিপত্তি। পার্কিং এর একটা গাড়ি বিচ্ছিরি ভাবে কাঁদাজল ছিটিয়ে দিয়ে চলে গেলো।টাল সামলাতে না পেরে ঝিলিক উল্টে পড়লো ফুটপাতে। আকাশ নীল চুড়িদারে কালো ছিটছিট কাঁদা জলের দাগ। অর্ধ ভেজা ঝিলিক তবু কাচের দরজা ঠেলে ঢোকে রেস্তরায়। ওর ঐ চেহারা দেখে সবাই মুখ টিপে হাসছে। এগিয়ে আসে অভ্র ,খুব নিচু গলায় বলে -" একে এতো দেরি, তার উপর এমন পোশাক!! তাও আবার কাঁদায় ভরা ..... আজ তো একটা ট‍্যাক্সিতে আসতে পারতে। ভাড়া না হয় আমিই দিতাম।"


-"আসলে এই হোটেলের সামনেই একটা গাড়ি এমন ভাবে কাঁদা জল ছেটালো ....!! আমি ওয়াশ রুম ঘুরে আসছি। " বিব্রত ঝিলিক আর উত্তর দিতে পারে না। বাথরুমে গিয়ে নিজেকে ভদ্রস্থ করার চেষ্টা করে।


একটু পরিস্কার হয়ে হলে এসেই বুকেটা নিয়ে এগিয়ে দেয় অভ্রর দিকে। বলে -" জন্মদিনের শুভকামনা।" অভ্র বোকেটা নিয়ে পাশের টেবিলে রাখে, কোথায় যেন একটা তাচ্ছিল‍্য ফুঁটে ওঠে। চাঁপা গলায় বলে -" ভালো ড্রেস ছিল না পার্টিতে আসার আমায় বলতে পারতে। জুতোটাও এমন অবস্থা.... আমার বন্ধুদের মধ‍্যে অনেকের বান্ধবী এসেছে। কি করে তোমার পরিচয় দেবো ওদের!! "


ঝিলিকের চোখে বর্ষা নামতে চায়। ও এতো কষ্ট করে এই দুর্যোগের মধ‍্যে কিভাবে এসেছে সেটা একবারো জানতে চাইলো না অভ্র!!


বেয়ারা একটা বড় কেক সাজিয়ে এনে রাখলো। সবাই অভ্রকে ঘিরে ধরেছে। ঝিলিক ভেবেছিল অভ্র এবার ওকে ডেকে নেবে। কিন্তু সব বন্ধুদের ভিড়ে ওকে তাকিয়েও দেখলো না অভ্র। অনেক কেক মাখামাখি হলো।হঠাৎ অভ্র এসে ওর দু গালেও মাখালো চকলেট কেক। ঝিলিক মনকে বোঝালো সব ঠিক আছে। সব বন্ধুরা যে যার মতো চেয়ার টেনে বসে গল্প করছিল। যারা ঝিলিকের চেনা তারা এসে কথা বলছিল। দু এক জন নতুন বন্ধুর সাথেও আলাপ হলো। কাঁচের জানালা দিয়ে ঝিলিক দেখছিল বাইরে অঝোর ধারায় ঝরে চলেছে, ঝিলিকের ভেতরেও এক বর্ষণের প্রস্তুতি। কিছুই ভাল লাগছে না। বিয়ারের গ্লাস হাতে অভ্র বন্ধুদের সাথেই ব‍্যস্ত। একবার ওকে বলে গেছে খিদা পেলে খেয়ে নিতে। যা ইচ্ছা অর্ডার করতে পারে ও।


হঠাৎ মনে পরে পার্সে কয়েকটা খুচরো পয়সা পড়ে রয়েছে। বাস বন্ধ হয়ে গেলে বাড়ি ফেরা যাবে না। হাতের স্পর্শে মনে হয় দশটাকা হয়ে যাবে। বড় রাস্তা থেকে জল ভেঙ্গে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে সন্ধ‍্যার আগেই। চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায় ঝিলিক। অভ্র বাকি বন্ধুদের সাথে ব‍্যস্ত। একবার আড় চোখে ওকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে গল্পে ডুবে যায়। ঝিলিক ধীরে ধীরে লিফটের দিকে এগিয়ে যায়। ছ তলার ওপর থেকে বৃষ্টি ভেজা শহরটাকে অচেনা মনে হয়। লিফটটা আসতে সময় নিচ্ছে। অভ্র কি ওকে ডাকতে বেরিয়ে আসবে !! একবার মনে হয় ঝিলিকের। লিফটের দরজাটা খুলছে। ঠিক সে সময় পিছন থেকে একটা বেয়ারার ডাক কানে আসে। -"ম‍্যাডাম কি চলে যাচ্ছেন? "


ঝিলিকের মনে হাজারটা সূর্যের ঝলকানি। নিশ্চই অভ্র দেখতে পেয়ে ডেকেছে!!


-"ম‍্যাডাম আপনার খাবারটা ......" বেয়ারার হাতে একটা খাবারের প‍্যাকট।


যন্ত্রের মতো হাত বাড়িয়ে প‍্যাকেটটা নেয় ঝিলিক। বর্ষাতিটা পরতেও ভুলে যায়। উপর থেকে নেমে আসে বৃষ্টি ভেজা পৃথিবীর বুকে। কর্দমাক্ত পিছল পথে এগিয়ে চলে নিজেকে বাঁচিয়ে। আর পড়তে চায় না সে।


হঠাৎ একটা বাইকের চেনা হর্ণ। পিছন ফিরতেই দেখে বর্ষাতির আড়ালে রোদ্দুর। বলে -" উঠে আয়। বর্ষাতিটা পরে নে। "


ঝিলিক অবাক, -"তুই এখানে ? এ সময় ?"


-"অপেক্ষা করছিলাম নতুন কবিতাটা তোকে শোনাবো বলে। উঠে পর। "


বৃষ্টি ভেজা ফুটপাতে নোংরা জলে দুটো ছেড়া জামা গায়ে বাচ্চা খেলছে। ভিজে একসা রোগা বাচ্চা দুটোর হাতে খাবারের প‍্যাকেটটা দিয়ে দেয় ঝিলিক। ওদের মুখে রোদ্দুরের ঝিলিক।


বাইকে উঠে শক্ত করে রোদ্দুর কে ধরে বসে ঝিলিক। বৃষ্টিতে ধুঁয়ে যায় সব মান অভিমান। ঝিলিক বলে -"তাড়াতাড়ি চল, বাড়ি ফিরেই তোর কবিতা শুনবো আজ। "



Rate this content
Log in

More bengali story from Debdutta Banerjee

Similar bengali story from Drama