চন্দ্রবিন্দু থেকে চ - ৪
চন্দ্রবিন্দু থেকে চ - ৪
রত্না জিজ্ঞাসা করলো- খুব জরুরী দরকার কি? আমি আপনাদের থানার উল্টোদিকেই কোচিং-ক্লাসে আছি এখন! আধঘন্টায় ক্লাসটা শেষ করেই আসছি, কিন্তু কি ব্যাপার সেটা একটু বলবেন?
মেজবাবু- আপনার বন্ধু তো স্বপ্না দাস?
রত্না- হ্যাঁ, তার খোঁজ পাওয়া গেছে? কোথায় সে?
মেজবাবু- সে মারা গেছে। তাই আপনাকে ডাকা, এসে জাস্ট তাকে আইডেন্টিফাই করে দিয়ে চলে যাবেন, পাঁচ দশ মিনিটের কাজ। ঠিক আছে, আপনি ক্লাস শেষ করেই আসুন।
রত্না- না না, আমি এখনই আসছি, দু'মিনিট টাইম দিন।
অপূর্ব সাহা ফোনটা কেটেই, বরানগর থানায় কল করলেন। বড়বাবু ফোন ওঠাতেই, তিনি বলা শুরু করলেন- স্যার, মেয়েটা থানার সামনেই আছে, দু'মিনিটে চলে আসছে থানায়। আপনি কি ওখান থেকে কাউকে পাঠাতে পারবেন? এদিকে প্রবর্তক-পল্লীতে বিশাল ঝামেলা লেগেছে, টিভি নিউজেও দেখাচ্ছে, দেখুন। বড়বাবু তো আগেই গেছেন ওখানে, এখন আমিও বেরোচ্ছি
বড়বাবু ফোনটা ধরে এতক্ষণ কিছু বলার চেষ্টাই করছিলেন, অপূর্ববাবু থামতেই তিনি বললেন- ঐ ঝামেলার খবরটা দেখে, এএসআই সুমিত আগেই বেরিয়ে গেছে আপনাদের থানার দিকে। ওকেই বরং মোবাইলে একটু জানিয়ে দিন।
সুমিত বেলঘরিয়া থানায় পৌঁছে গাড়ি থেকে নামতে নামতেই, রত্নাও ওখানে পৌঁছালো৷ দু'জনকে তাঁর চেম্বারে বসিয়ে দিয়েই, মেজবাবু দৌড় দিলেন প্রবর্তক-পল্লীর দিকে। সুমিত রত্নাকে জানালেন যে, স্বপ্নার বডিটা তো মর্গে, কিন্তু তার ফটো তাঁদের কেস ফাইলে আছে। এখন, সে যদি তাঁর সঙ্গে বরানগর থানায় গিয়ে তাকে শনাক্ত করে, তাহলে ভালো হয়।
রত্না তাঁর সঙ্গে বরানগর থানাতেই চলে যায়। সেখানে বড়বাবু তাকে ফাইলে রাখা স্বপ্নার ছবি দেখালে, সে আইডেন্টিফাই করে তাকে। রত্নাকে বড়বাবু স্বপ্নার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেন। মানে, স্বপ্না আগে কোথায় কোন কলেজে পড়তো, কোথায় তার আসল বাড়ি, এখানে পরে কোথায় সে থাকতো, ইত্যাদি।
রত্নার থেকেও অবশ্য বিশেষ কিছু নতুন তথ্য পুলিশ পায়নি। কারণ, প্রায় মাস দুয়েক আগে মেস ছেড়ে যাবার সময়, নিজের সঠিক ঠিকানা দিয়ে যায়নি স্বপ্না। পরে এসে, ওকে তার নতুন মেসে নিয়ে যাবে বলেছিল। নিজের বইপত্র জামাকাপড় পোশাক-আশাক সবই সে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে যে আর ফিরবেই না কখনও, এটা রত্না ভাবতেই পারেনি।
মালদার গ্রামে স্বপ্নার আসল বাড়ির কথাটা বললেও, গ্রামের নামটা সেও বলতে পারল না। তার কলেজের ব্যাপারে প্রশ্নের উত্তরেও সেই একই সমস্যা হলো- দক্ষিণভারতের কোন কলেজ থেকে স্বপ্না পড়েছে, তার নাম মনে রাখেনি সেও। সম্ভবত তার বাবা-মা দক্ষিণ ভারতেই থাকতেন, কর্মসূত্রেই হবে হয়তো। কিন্তু স্বপ্নাকে তার বাবা মার সাথে কথা বলতে সে দেখেনি কখনও।
তবে নদীয়ার সুধাকরপুর গ্রামটাতে তার যাওয়ার ব্যাপারটা সে জানতো। কল্যাণী ইউনিভার্সিটির কিছু এক্স-স্টুডেন্টদের সঙ্গে গিয়েছিল সে সেখানে। কিন্তু ঠিক কাদের সঙ্গে সেটা বলতে পারলো না। সেই আই-কার্ডের রহস্যটার অবশ্য সমাধান হল। স্বপ্না তাদের সঙ্গে সুধাকারপুর না গিয়ে, পরে যাবে বলায়, তাদেরই একজন পার্সের ভিতরে যেসব মডেল আই-কার্ড থাকে, সেইরকমই একটা কার্ডে, তার নাম আর ঐ গ্রামের ঠিকানাটা লিখে দিয়ে গিয়েছিলো তাকে। সেই মেয়েটিরও যে ওখানে বাড়ি নয় সেটা জানলেও, কোথায় যে তার আসল বাড়ি তা' অবশ্য রত্না জানতো না।
অভিরূপ স্যারের সাথে স্বপ্নার প্রেমের ব্যাপারটা সে জানতো, তারা বিয়ে করবে খুব তাড়াতাড়ি সেটাও জানতো। কিন্তু ইদানিং স্যারকে যেন একটু এড়িয়ে চলছিল স্বপ্না, যদিও কারণটা সে জানে না, স্বপ্নাও তাকে কিছু বলেনি। তবে, বোধ হয় অন্য কোনো ছেলেকে তার ভাল লেগেছিল, কিন্তু সেটা যে কে সে বিষয়েও কিছুই জানা নেই তার।
তার এমন মনে হওয়ার কারণ সম্পর্কে, সে ব্যাখ্যা দিয়েছিল, স্যারের সাথে কথা বলার জন্য স্বপ্না কখনই উঠে যেত না তার কাছ থেকে। বরং তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই সে স্যারের সাথে প্রেমের কথা বলতো! কিন্তু ইদানিং একজনের ফোন এলেই, সে তার থেকে দূরে চলে গিয়ে, চুপি চুপি একা কথা বলতো। তার যতটুকু নজরে পড়েছিল, সেই নম্বরটা লোকাল ল্যান্ডলাইন নম্বর ছিলো, হয়তো কোন টেলিফোন বুথ থেকে ফোনটা আসতো। কারণ, তারা ফোনে বেশিক্ষণ কথা বলতো না। দ্রুত ফোনের কথা শেষ করে, সে বেরিয়ে যেতো মেস থেকে, আর ফিরতোও অনেক দেরী করে।
-চলবে-
