ছায়ানট ত্রয়োদশ পর্ব
ছায়ানট ত্রয়োদশ পর্ব
খবর গেল থানায় । কে বা কারা খবর দিল হাড়মাসড়া গাঁয়ের মোড়ল বিপত্তারণ চাটুজ্যে নিজের ছেলেকে খুন করবার চেষ্টা করেছেন। ওনারই ছেলে মেয়ে বৌ মিলে ওঁকে সস্ত্রীক একটা ঘরে তালাবন্ধ করে রেখেছে।
সম্ভবতঃ মোড়লের পরিচিত কেউ এই খবর দিয়েছে। পুলিশ প্রথমে পারিবারিক ঘটনা বলে চেপে যায় । কিন্তু মোড়লের দুই মেয়ে এসে থানায় ডায়েরী করে যে তাদের বাবা বিপত্তারণ চাটুজ্যে এবং মা তক্ষশীলা দেবী নিজেদের দুই জামাইকে খুন করে তাদের সম্পত্তি হস্তগত করে নিয়েছেন স্রেফ পুলিশের ভয় দেখিয়ে।
থানার বড়বাবু মিঃ সেনশর্মা মোড়লের মেয়েদের মুখ থেকে এমন আশ্চর্য্যজনক করুণ ঘটনা শুনে বিব্রত হয়ে যান । বিপত্তারণ চাটুজ্যে মশাই শাসকদলের অনুগত এবং বিশ্বস্ত জন । দুম করে তাঁর বিরুদ্ধে আইনমাফিক অ্যাকশন নেওয়ার আগে পুলিশ সুপারের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত মনে করে মাগধী এবং বৈশালীকে বলেন - আপনাদের ডায়েরী নিলাম। পুলিশ উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে। আপনারা বাড়ি যান ।
মাগধী বলে - এত ভয়ঙ্কর ঘটনা জেনে আপনারা তদন্তে যাবেন না ?
মিঃ সেনশর্মা বলেন - দেখুন ম্যাডাম ! আপনাদের বাবা অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। তথ্য প্রমাণ হাতে না পাওয়া পর্য্যন্ত অপেক্ষা তো করতেই হয় !
বৈশালী বলে - তার মানে পুলিশও ওঁকে ভয় পায় ।
মিঃ সেনশর্মা ধৈর্য্য না হারিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেন ।
মাগধী বলে - আমাদের সঙ্গে চলুন । বাড়িতে আটকে রেখেছি । কখন পালিয়ে যাবেন বলা তো যায় না ! কমপক্ষে জিজ্ঞাসাবাদটুকুও তো করতে পারেন ।
মিঃ সেনশর্মা বলেন - আপনারা আসুন। আমি ফোর্স নিয়ে রেডি হয়ে যাব।
সেনশর্মার কথায় নিমরাজি হয়েও ওরা ফিরে আসে ।
রমাদি তখনও ভবতারণের শুশ্রুষা করে চলেছে। পাশের বাড়ির কমলকে বলে ডাক্তার আনতে পাঠিয়েছে ।
ডাক্তার বাবু পরীক্ষা করে বললেন - তেমন কিছু চোট পাননি । একটা ইঞ্জেকশন আর ক্ষত শুকানোর ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি । আর হ্যাঁ, বমিটমি কিছু করেননি তো ?
রমাদি বলল - বমি করেননি কিন্তু গা গরম হয়েছিল ।
ডাক্তার বাবু বললেন - ওটা সাময়িক । চিন্তা করার কিছু নেই ।
গোরুর গাড়িটা যখন বিপত্তারণের দরজায় এসে থামল ; ডাক্তারবাবু তখন সবে বেরিয়ে তাদের মুখোমুখি পড়লেন। মাগধী বৈশালী গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে বলল - কেমন দেখলেন ডাক্তারবাবু ?
- তেমন কিছু না । সামান্য আঘাত পেয়েছেন। দিন কয়েকের ভেতর সব ঠিক হয়ে যাবে ।
ওরা ভেতরে এসে রমাদিকে সব ঘটনা বলল । এও বলল যে বাবার মত প্রভাবশালী লোকের বিরুদ্ধে দুমদাম তদন্ত করা যায় না । তবে কিছু তথ্য জানতে জেরা করা যেতেই পারে ।
রমাদি বুঝল পুলিশের ভূমিকা কি হতে চলেছে । সে তখনকার মত কিছু না বলে স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে রইল।
মাগধী বলল - বৌ কি ভয় পেয়ে গেলি ?
রমাদি বলল - বড়দি, ছোটবেলা থেকেই আমার মনে ভয় ডর বলে কোন কথা নেই । আমি ভাবছি প্রমাণ নিয়ে । আমার হাতে যে তথ্যগুলো আছে; সেগুলো প্রমাণ হিসেবে কতটা গ্রহনীয় হবে সেটাই ভাবছি ।
বৈশালী টেবিলের উপরে খাতার মত একটা বস্তু দেখতে পেল । মোটামুটি পড়তে শিখেছে । তাতে লেখা " প্রভুমাধব " । ভাবল কোন গল্পটল্প হবে হয়তো । মলাট খুলে দেখতে যাবে রমাদি হাত থেকে খাতাটা ছিনিয়ে নিয়ে একবার ভবতারণের দিকে এবং একবার বৈশালী মাগধীর দিকে চেয়ে কিছু ঈশারা করল ।
ওরা বুঝল না কিন্তু চুপ করে গেল ।
রাতের দিকে ভবতারণের জ্বর বেড়ে গেল । জ্বরের ঘোরে অস্পষ্ট ভাবে বলতে লাগল মাধবদা ! প্রভুদারও তোমার দশা হয়েছে গো ! এবার আমার পালা ।
ভয়ে কুঁকড়ে গেল রমাদি, মাগধী এবং বৈশালী। কি বলছে ভবতারণ ? তবে কি সেও জানে ঘটনাগুলো?
রমাদি স্থির চোখে ভবতারণের দিকে চাইল । জ্বরটা কমাতে কেউ জলপট্টি কেউ পাখার বাতাস করতে করতে একসময় মনে হল জ্বর কমেছে। ভবতারণ ঘুমিয়ে পড়েছে।
রমাদি বলল - পেয়ে গেছি !
বৈশালী বলল - কি পেয়ে গেছিস ? মাগধীও একই কথা বলল।
রমাদি বলল - আসল কথাগুলো জেনে গেছি । তোমরাও তো শুনলে । জ্বরের ঘোরে কি বলছিল ও ?
ওরা দুজন বলল - শুনেছি। আমাদের স্বামীর নাম নিচ্ছিল।
রমাদি বলল - একটা ভয়ংকর কথা বলতে যাচ্ছি। এখনও সাবধান না হলে তোমরাও কেউ বেঁচে থাকবে না । ভবতারণ বা আমি তো নয়ই।
বৈশালী বলল - কি করতে হবে আমাদের ?
রমাদি বলল - কাল জলখাবার দেবার সময় লক্ষ্য করবে বাবা মাকে । কি করে দেখে যেও।
সে তো হল । বাবাকে জব্দ করার উপায় কি ?
মাগধী নিরাশ হয়ে বলল ।
বৈশালী বলল - একটাই উপায় মাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা । তাহলেই বাবা খোঁড়া হয়ে যাবে ।
রমাদি বলল - বাজে কথা বল না তো! পুলিশ কি ছেড়ে দেবে। তোমার না শিশুর ভাবনা ।
আরও বলল - ওই যে খাতাটা দেখলে ওখানে বেশ কিছু তথ্য আছে । পঞ্চায়েতের চুরির সামগ্রীর হিসেব যেমন আছে তেমনি তোমাদের শ্বশুরদের সম্পত্তির হিসেবও আছে।
রমাদি মাগধীকে বলে - আচ্ছা বড়দি, মাধবদার কি হয়েছিল ?
মাগধী বলল - আমাকে তো না বাবা না আমার শ্বশুর মশাই কেউই কিছু বলেনি । শহরের হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে বলেছিল - এবার তোর কপাল ! জানিস বৌ আমার কপাল যে এমন বিচ্ছিরি ফাটা কি বলব ! দিন দশেক পর মড়াটা বয়ে আনল তুলসীতলায় ।
- তো দিদি! তোমার বাবা তখন তোমাকে কি বলেছিলেন ?
- বলল নে চল, আর এখানে থেকে কি করবি ?
বৈশালী বলল - আমাকেও একই কথা বলেছিল ।
রমাদি বলল - তারপর , আমি যেমনভাবে প্রভুদাসকে উইলে সই করিয়ে নিয়েছিলাম ; ঠিক তেমনই করে শিশুড়ি মা মাধবদার বাবার থেকে সই আদায় করে নিয়েছিলেন। সব লেখা আছে ওই খাতায় । বুদ্ধিটা তো আমি ওখান থেকেই পেয়েছি ।
মাগধী বলল - কিন্তু আমার শ্বশুর তো আমাকে বিয়ে করবে বলেনি ।
রমাদি বলল - ওই একই হল । তোমার শ্বশুর তোমাকে চায়নি কিন্তু তোমার মা চেয়েছিলেন । তিনি শোনেননি বলে তাঁর এই হাল করেছেন। ছোড়দির শ্বশুর বিয়ে করতে চেয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। আর সে সব কথা তোমাদের মা বাবার মস্তিষ্কপ্রসুত ; কার্য্যকরী করেছিল তোমাদের ভাই । অবশ্য দ্বিতীয়টা আমি নিজের হাতে করেছি । কারণ কি জানো ?
বৈশালী এবং মাগধী উভয়েই হাঁ করে রমাদির মুখের দিকে চেয়ে আছে ।
রমাদি বলল - তোমাদের সংসারে একটু ঠাঁই পেতে নিজের উদ্যোগে আমি এই কাজ করেছি । তোমরা তো থানায় গিয়েছিলে, ডাইরীও করে এসেছ। কিন্তু ওটা তো অসম্পূর্ণ ডায়েরী । ওখানে শুধু বাবা মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছ ; তোমাদের ভাই এবং আমাকেও জড়িয়ে দিলে ভালো করতে । খেলা জমে যেত ।
- কিন্তু আমরা তো তা' জানতাম না! আর জানলে ডাইরী করতেই যেতাম না ।
- কেন ?
- সব হারিয়ে শুধু ধনসম্পত্তি নিয়ে বেঁচে থাকার কোন মানে হয় ?
মাগধী বলল বৈশালীর দিকে চেয়ে ।
- বড়দি! ছোড়দি ! তোমাদের দুজনকেই বলছি । সব কিছুর মালকিন হবে তোমরা দুজন। বল তো এত বিত্ত নিয়ে কি করবে ?
- সব ছেড়ে দেব কিন্তু কাউকে আর হারিয়ে যেতে দেব না ।
- তাহলে কথা দিচ্ছ ; যাদের জিনিস কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাদেরকে সব ফেরৎ দেবে ?
জ্বর ঘুম দুই কেটে গেছে ভবতারণের । বিছানা ছেড়ে নেমে এসে চারজনে হাত একাকার করে বলে - নিশ্চয় ফেরত দিয়ে দেব । আমরা প্রতিজ্ঞা করছি ।
- ঠিক আছে। কাল সকালে থানায় গিয়ে প্রথমে তোমরা ডাইরী তুলে নেবে । আর যাও বাবা মাকে যেখানে বন্দী করে রেখেছ তাদের দরজা খুলে দাও ।
( ক্রমশঃ )
