Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sayantani Palmal

Romance


5.0  

Sayantani Palmal

Romance


বসন্ত এসে গেছে

বসন্ত এসে গেছে

13 mins 884 13 mins 884

ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়াতেই সারাদিনের যাবতীয় ক্লান্তি দূর হয়ে গেল অতনুর। ভেতরে তার প্রতীক্ষায় আছে মেঘলা। অতনুর সদ্যবিবাহিত সুন্দরী স্ত্রী। এখনও বিয়ের গন্ধ যায় নি তাদের গা থেকে। অফিস যেতেই ইচ্ছে করে না অতনুর কিন্তু বাধ্য হয়ে দিনগত পাপক্ষয় করতে যেতেই হয়। আজ একটা খুব সুন্দর ডায়মন্ড রিং এনেছে সে। মেঘলাকে সারপ্রাইজ দেবে। কলিংবেল না টিপে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে সন্তপর্নে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল অতনু। কিন্তু একি এতো অন্ধকার কেন! সারা ফ্ল্যাটে একটাও আলো জ্বলছে না কেন! মেঘলাই বা কোথায়? সব সময়ের কাজের লোক দীপা দিদিই বা কোথায়? একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে। ঘন কালো অন্ধকারটা যেন গ্রাস করতে আসছে। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আছে। অতনু কয়েকবার মেঘলার নাম ধরে ডাকল কিন্তু কোনো প্রত্যুত্তর পেল না। হৃদস্পন্দন ক্রমশ বাড়ছে অতনুর। গলা শুকিয়ে কন্ঠরোধ হওয়ার আগে মনের সমস্ত জোর একত্রিত করে ডাকলো,” মেঘলা আ আ…...।”


 নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না অতনু। এটা তার ফ্ল্যাট না স্বর্গের নন্দন কানন! রক্তরাঙা শিমূল, পলাশ আর গোলাপের মেলা বসেছে যেন। মোমবাতির নরম পেলব আলোয় সে দেখে বসার ঘরের প্রতিটি কোনা ভীষণ যত্ন করে সাজানো আর তার মাঝে লাল শিফনের শাড়ি পরে লাস্যময়ী ভঙ্গিতে হাতে মোমবাতি স্ট্যান্ড ধরে অপ্সরার মতো দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা। অতনু অপার বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এত সব আয়োজন মেয়েটা করল কি করে কে জানে! তবে একটা বিষয়ে অতনু আজ নিশ্চিত হয়ে গেল যে মেঘলা সম্পূর্ণ রূপে নিজের শরীর শুধু নয় মনটাও অতনুর কাছে সমর্পণ করেছে নাহলে এভাবে অতনুকে সারপ্রাইজ দেওয়ার প্ল্যান করত না। মেঘলার গাঢ় লাল লিপস্টিকে রাঙানো ঠোঁটে দুস্টু হাসির ছোঁয়া। ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে অতনু মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঘলার দিকে। এখন অন্য এক পিপাসায় কাতর সে। সোফার ওপর ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে এগিয়ে যায় সে।

-----কেমন সারপ্রাইজ দিলাম?

------ওয়ান্ডারফুল বাট হঠাৎ এই নগন্য মানুষটার ওপর মহারানীর এত দয়ার কারণ জানতে পারি।

-----আজ যে বসন্ত এসেছে।


মু

হুর্তে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল অতনুর আর প্রায় একই সাথে মস্তিষ্ক আর হৃদয় দুই জায়গাতেই দাবানলের সূত্রপাত হলো। বসন্ত, বসন্ত, বসন্ত…...। মেঘলার নরম ঠোঁট দুটো এ নামটা যখনই উচ্চারণ করেছে অতনুর মনটা রক্তাক্ত হয়েছে কিন্তু আজ তো মেঘলার শরীর, মন সমস্ত কিছু শুধু অতনুর। কয়েক সেকেন্ড নিজের সাথে যুদ্ধ করার পর অতনুর হঠাৎ নিজেকে খুব বোকা মনে হলো আরে আজ তো পয়লা ফাল্গুন। বসন্তের শুরু বলে ফেসবুক, হোয়াটস আপে অনেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ছবি টবি পোস্ট করেছে। নতুন বিয়ের উচ্ছ্বাসে মেঘলা তার জন্য এত সুন্দর একটা আয়োজন করেছে আর অতনু কি সব উল্টো পাল্টা ভাবতে শুরু করে ছিল। সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে অতনু এগিয়ে গেল তার প্রিয়তমার দিকে।


মেঘলাকে জড়িয়ে ধরতে গেল কিন্তু মেঘলা ধরা দিলো না। চকিতে সরে গিয়ে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা থালা থেকে একমুঠো লাল আবীর তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল অতনুর দিকে। কিন্তু একী শুকনো আবীর লেগে অতনুর সাদা জামা থেকে রক্তের মতো কি গড়িয়ে পড়ছে! খিলখিল করে হাসতে হাসতে মেঘলা সারা ঘরে আবীর ছড়িয়ে দিচ্ছে। সাদা মার্বেলের মেঝে, ঘরের দেয়াল সব জায়গা থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। অতনুর মন আর মস্তিষ্কের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে। মস্তিষ্ক বলছে এটা কোনও নতুন ধরনের রং কিন্তু মন যে কোনও এক অজানা আশঙ্কার সংকেত পাচ্ছে। শুকনো গলায় বলে,

--- এটা কি মেঘলা? এত রং ছড়াচ্ছ কেন?

---বা রে। তোমায় বললাম না আজ বসন্ত এসেছে। আমার বসন্ত। ওর প্রিয় রং লাল তাই তো আজ সব কিছু আমি লালে রাঙিয়ে দেব। দেখ না আজ ওর জন্য আমিও লাল শাড়িতে সেজেছি। কত দিন পরে ওকে দেখলাম, কাছে পেলাম।

আর সহ্য করতে পারলো না অতনু চিৎকার করে উঠলো,

----স্টপ দিস ননসেন্স টক। ইউ আর মাই ওয়াইফ। তোমার শরীর, মন সব কিছুতে শুধু আমার অধিকার আছে। শুধু আমার আর তুমি এখনও ওই বসন্তটার কথা ভাবছ? যে কিনা একটা চরিত্রহীন, লম্পট। তোমাকে ডিচ করেছিলো।

---না না না। তুমি এরকম কথা বলবে না। বসন্ত আমায় ছেড়ে কোথাও যেতে পারে না তাই তো ও আবার আমার কাছে ফিরে এসেছে আজ। আর তুমি এসব কি ভাষা প্রয়োগ করছো! বসন্ত না তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল?

অতনু মনে মনে বললো, " বেস্ট ফ্রেন্ড মাই ফুট।" কিন্তু নিজের মনের কথা মনেই চেপে রাখা অতনুর পুরোনো অভ্যেস তাই নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, " সরি সোনা, আমি আসলে ওভাবে বলতে চাইনি কিন্তু তুমি তো জানো আট মাস আগে উম্মোচিত সত্যিটা আমার মনেও কি ভীষণ ভাবে আঘাত করেছিল। তুমি আর আমি দুজনে দুজনকে অবলম্বন করে বহু কষ্টে সেই মানসিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি। নতুন জীবন শুরু করেছি আমরা এখন তুমি আবার আজ বসন্তের কথা বলতেই আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। আয়াম এক্সট্রিমলি সরি সোনা। প্লিজ রাগ করো না।"

------ রাগ কেন করব? আজ যে আমার আনন্দের দিন আজ আমার বসন্ত এসেছে। তুমি তো জানো অতনু আমি বসন্তকে কতটা ভালোবাসি। আমার মন, প্রাণ আমার সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে আছে শুধু বসন্ত।

মেঘলার পাগলামি দেখে অতনুর মাথাটা আস্তে আস্তে গরম হচ্ছে। রগের শিরা দুটো ফুলে উঠছে কিন্তু অতনু চিরকালই দক্ষ অভিনেতা তাই অসহায় প্রেমিকের মতো কণ্ঠে বললো, " তাহলে মেঘলা তোমার মনে আমার জায়গা কোথায়?"

----- আমার মনে তো তুমি কোনও দিন ছিলে না অতনু আর আজও নেই। কোনও দিন থাকার চেষ্টাও করো না। আমি শুধু বসন্তের। হিসহিসিয়ে বলে উঠলো মেঘলা।

চিৎকার করে উঠলো অতনু," ইউ স্লাট! আমার বিয়ে করা বউ হয়ে এসব বলতে লজ্জা করে না!

এক অদ্ভুত বিষাদঘন কণ্ঠে মেঘলা বলে," আমার লজ্জা, আমার অভিমান, আমার অনুরাগ সব শুধু তার। আমার বসন্তের।"

অতনু দুহাতে মাথার চুলগুলো খামচে ধরল। উফফ আর সহ্য করতে পারছে না। সত্যিই কি আজ বসন্ত এসেছিল নাকী? সন্দেহের কালো মেঘটা ক্রমশঃ ঘনাচ্ছে। সন্দিগ্ধ স্বরে জিগ্যেস করে," আজ কি বসন্ত এসেছিল নাকি?" খিলখিলিয়ে উঠে মেঘলা ঘুরে ঘুরে গাইতে লাগলো," ......কানাঘুষো শোনা যায় বসন্ত এসে গেছে........। আস্তে আস্তে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে অতনু। সমুদ্রে স্নান করার ইচ্ছে নিয়ে এসে একটা মানুষ যদি দেখে তার সামনে পচা ডোবা তার মানসিক অবস্থা তখন কি হয় সেটা সহজেই অনুমেয়। মেঘলা সেই রহস্যময় আবীর ছড়াতে ছড়াতে ডাইনিং স্পেসে চলে এল।

----মেঘলা দীপা দিদি কোথায়?

----- তাকে তো আজ আমি ছুটি দিয়েছি। বসন্ত আসবে বলে । এতদিন পরে ওকে কাছে পেয়ে আমি চাইনি কেউ আমাদের বিরক্ত করুক।

------মেঘলা এত নির্লজ্জ তুমি! কি অবলীলায় আমার সামনে কথাগুলো বলছো ! সেদিন তো খুব বলেছিলে আর কোনো দিন ওর মুখ দেখবে না। আজ হঠাৎ কি এমন হয়ে গেল যে......।

------ আজ যে ও এসে বললো ভুল করে ফেলেছিল।

------ ও বললো আর তুমি সব ভুলে এমনকি আমাদের বিয়ের কথাও ভুলে ওর সাথে একান্তে সময় কাটালে?

চিৎকার করে ওঠে অতনু। হঠাৎ অতনুর চোখ চলে যায় কাঁচের ডাইনিং টেবিলটার দিকে। অপূর্ব সুন্দর গ্লাস পেন্টিং করা হয়েছে। এটা নিশ্চই মেঘলার কাজ। প্রফেশনালি পেন্টিং করে ও কিন্তু একদিনের মধ্যে এটা করল কি করে! আলো জ্বালার জন্য অতনু সুইচে হাত দিল কিন্তু ব্যর্থ প্রয়াস। আলো জ্বললো না। বোধহয় লোডশেডিং আর ইনভার্টারটাও খারাপ হয়েছে। মেঘলা অবশ্য সারা ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছে। মোমবাতির মৃদু আলোয় কাছে গিয়ে পেন্টিং টা দেখতেই অতনু রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল। রাধাকৃষ্ণ আঁকা কিন্তু কৃষ্ণের বদলে বসন্তের মুখ বসানো। পাথরের ফুলদানিটা ছুঁড়ে মারলো অতনু। খানখান করে ভেঙে পড়ল টেবিলটা।

----এ কী করলে তুমি? কত যত্ন করে আমি পেন্টিংটা করেছিলাম। মেঘলা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল।

---- বেশ করেছি। ফুঁসে ওঠে অতনু।

মেঘলা ছুটে শোয়ার ঘরে চলে গেল। শোয়ার ঘরে ঢুকে অতনুর ক্রোধ স্ফুটনাংকের পারদ ছুঁল। গোটা ঘরটা হৃদয় আকৃতির রঙিন মোমবাতি দিয়ে সাজানো আর মস্ত বড় ডিভানটার মাথার দিকের দেওয়ালে তাদের বিয়ের যে ফটোটা লাগানো ছিল তার পরিবর্তে মেঘলা আর বসন্তের একটা অন্তরঙ্গ ফটো ঝুলছে।

-----ইউ ব্লাডি বিচ মেঘলা। ইউ আর ক্রসিং অল দ্য লিমিটস। চিৎকার করতে করতে ড্রেসিং টেবিলের। ওপর থেকে পারফিউমের বোতলটা নিয়ে ফটোটার দিকে ছুঁড়ে মারল অতনু। ঝনঝন শব্দ করে ফটোর কাঁচটা চুরমার হয়ে গেল। ড্রেসিং টেবিলে রাখা মেঘলার একলার ফটো ফ্রেমটার মধ্যেও বসন্ত প্রবেশ করেছে। ছুঁড়ে ফেলল অতনু সেটা।

-----তুমি কি ভাবছো ফটো গুলো নষ্ট করলেই আমার মন থেকে বসন্তের ছবি নিশ্চিহ্ন করতে পারবে? আমার শরীর থেকে বসন্তের আদরের প্রলেপ মুছে ফেলতে পারবে? ব্যাঙ্গের সুরে বললো মেঘলা।

------ তোমাকে আর তোমার বসন্তকে কী করে জব্দ করতে হয় আমার ভালোই জানা আছে। কি অবস্থা হবে তোমাদের স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না তোমরা। আমার আসল রূপটা তোমরা কেউ জানো না। আহত বাঘের মত গর্জন করে ওঠে অতনু।

------তাই নাকি চেষ্টা করে দেখ তাহলে। আগেও তো আমাদের আলাদা করার জন্য জঘন্য একটা খেলা খেলেছিলে। পারলে আমাদের আলাদা করতে?

ফুঁসে উঠলো মেঘলা। মেঘলার উচ্চারিত শব্দ গুলো কাঁপিয়ে দিল অতনুকে।


 অতনু, মেঘলা আর বসন্তকে নিয়ে একটা অদৃশ্য ত্রিভুজ তৈরী হয়েছিল ওদের কলেজ জীবনে। যার খবর শুধু অতনু জানত। মেঘলা বা বসন্তর কাছে তা অজানা ছিল। বলা ভালো জানার সুযোগ অতনু কোনোদিন দেয়নি। তার সুনিপুণ অভিনয়ের ফলে ওরা তাকে গ্রহণ করেছিল নিজেদের সবচেয়ে ভালো, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে। কিন্তু অতনুর সারা শরীরে আগুন ধরে যেত যখন মেঘলা বসন্তর হাত ধরে আনমনে হেঁটে যেত কিংবা লেকের ধারে বসন্তের কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিসিয়ে নিজেদের প্রেমের কথা বলত। দোলের দিন যখন ওরা পরস্পরকে ভালোবাসার রঙে রঙিন করে তুলত তখন অতনুর মাথায় খুন চড়ে যেত। কি ছিল না অতনুর? বর্ধমানের নাম করা ডাক্তারের ছেলে সে। দাদাও ডাক্তার। অর্থের অভাব তো দূরে থাক বরং প্রয়োজনের অনেক বেশিই অর্থ আছে তাদের। নিজে হবু ইঞ্জিনিয়ার । আর রূপ? তার এই রূপের টানে বর্ধমানের বহু মেয়ে ভেসে গেছে। তাদের পরিণতি জানার কোনও আগ্রহ বোধ করেনি সে কখনোও। কিন্তু মেঘলাকে প্রথম দিন দেখেই অতনুর মনে হয়েছিল এ মেয়েকে ক্ষণিকের অতিথি হিসেবে নয় তার বাড়িতে সাজানো জীবন্ত ম্যানিকুইন হিসেবে চাই তার যাকে যখন ইচ্ছে নিজের মত করে পাওয়া যাবে। কিন্তু বাধ সাধল বসন্ত। অর্থ, পারিবারিক প্রতিপত্তির দিক থেকে সে পিছিয়ে না থাকলেও অতনুর রূপের কাছে সে ম্লান। ওই কালো রোগাটে ছেলেটাকে মেঘলার মত অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে কি করে ভালোবাসল অতনু ভেবেই পায়নি । অতনু ভাবত চোখ থাকতেও অন্ধ কথাটা মেঘলার ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য। গভীর ভাবে অতনুকে বিশ্বাস করত ওরা কিন্তু অতনু শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। কলেজ শেষে অতনু আর বসন্ত মোটা মাইনের চাকরিতে ঢুকলো। মেঘলা ঠিক করল সরকারি চাকরি করবে । অফিসে অতনুর সুন্দরী পি.এ ছিল রেশমা। রেশমা হলো সেইরকম মেয়ে যারা কেরিয়ারের জন্য সব কিছু করতে পারে। কোনও ছুঁতমার্গ নেই। ফাঁদ পাতল অতনু। মেঘলা আর অতনুর সাথে রেশমার পরিচয় করাল ওর ফিয়নসে হিসেবে। তারপর পরিকল্পনা মাফিক রেশমা ওদের সাথে এমন বন্ধুত্ব পূর্ন ব্যবহার শুরু করল যে ওরা অতনুর মত ওকেও বিশ্বাস করার ভুল করল। মেঘলা আর বসন্ত তখন ওদের আগামী দিনের স্বপ্নে বিভোর। মেঘলা বলত বিয়ের পর ওরা বসন্তদের চা বাগানের বাংলায় হানিমুনে যাবে কোনও দেশ-বিদেশে নয়। সেখানে নিরালায় দুজনে একান্তে সময় কাটাবে। কিন্তু অদৃষ্ট ওর জন্য অন্য কিছু স্থির করে রেখেছিল। অতনু ধাপে ধাপে ওর লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছিল। প্রথমে বসন্তের নামে একটা সিম কার্ড কেনে। বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বসন্তের ভোটার আইডি আর ফটো জোগাড় করা খুব একটা কঠিন হয়নি অতনুর কাছে। তারপর সেই সিম থেকে রেশমার ফোনে শালীনতার মাত্রা ছাড়ান সব মেসেজ পাঠায়। বারবার লেখে যে মেঘলাকে আর ওর ভালো লাগছে না। রেশমার মত অত্যাধুনিকা মেয়েকে দেখে ও পাগল হয়ে গেছে। অন্তিম ধাপের পরিকল্পনা অনুযায়ী একদিন রাস্তায় রেশমার সাথে বসন্তের দেখা হয়। রেশমা অসুস্থতার ভান করায় বসন্ত ওকে ওর ফ্ল্যাটে ছাড়তে যায়। ব্যস আর কি চাই? নেশার জিনিস মেশান কোল্ড ড্রিংক্স খেয়ে বসন্ত প্রায় অচেতন। বাহ্য জ্ঞান লোপ পায় তার। তার সাথে কে আছে মেঘলা না অন্য কেউ বোঝার ক্ষমতা থাকে না তার। অতনু আর রেশমা দুজনে মিলে তাকে রেশমার শোয়ার ঘরে নিয়ে যায়। তারপর আর কি মেঘলাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রেশমার ফ্ল্যাটে নিয়ে আসার চেষ্টা করে অতনু । বসন্তকে ফোনে না পেয়ে চিন্তিত হলেও মেঘলা বন্ধুর অনুরোধ ফেলতে পারে না। অবিন্যস্ত পোশাকে রেশমার দরজা খোলা, রেশমার শোয়ার ঘরে প্রায় অনাবৃত বসন্ত, রেশমার ফোনে আসা মেসেজ, রেশমার স্বীকারোক্তি যে সে আর বসন্ত পরস্পরকে সম্পূর্ণ ভাবে চায় এগুলোই যথেষ্ট ছিল মেঘলাকে বসন্তের প্রতি বিমুখ করে তোলার জন্য। আর কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকেছিল অতনু মেঘলাকে সিম কার্ডের মালিকের নাম জানিয়ে। এরপর মেঘলার মনে যেটুকু দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল তাও কেটে যায় বসন্তের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে সে। বসন্তের কোনও কথাই সে শোনে না আর বসন্ত তো তার সঙ্গে কি ঘটল ভালো করে অনুভব করার আগেই দেখে সে সব হারিয়ে বসে আছে। কিন্তু ওদের কারোর মনে একথা একবারের জন্যও আসেনি যে এসবের নেপথ্যে আছে অতনু সেন। উল্টে ওদের মনে হয় সে রেশমার কাছে প্রতারিত। বসন্তের মনে হয় এই গল্পের ভিলেন রেশমা আর মেঘলা ভাবে সে আর অতনু এক সরলরেখার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দুজনের সাথেই তাদের ভালোবাসার মানুষরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এরপর অতনুর নিখুঁত অভিনয়ের শিকার হয়ে মেঘলা তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে যেদিন মেঘলা সারাজীবনের জন্য অতনুর হয়ে যায়। কিন্তু এসব কথা তো মেঘলার জানার কথা নয়। রেশমার মুখ বন্ধ রাখার সব রকম ব্যবস্থাই তো অতনু করেছে। ও তো কিছু বলবে না। তাহলে? মেঘলার চোখমুখ অস্বাভাবিক রকম লাগছে । ওর চোখের দিকে তাকালেই ভয় করছে অতনুর।

-----কি চুপ করে আছ কেন? রেশমা নাকি তোমার ফিয়নসে ছিল? তুমি তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতে? বাঁকা সুরে বলল মেঘলা।

-----হ্যাঁ বাসতাম তো। কিন্তু এখন এসব কথা উঠছে কেন? শুকনো গলায় বলে অতনু।

------শয়তান এখনও তুই ছলনা করছিস আমার সাথে? আমি সব জেনে গেছি। সবাই তো তোর মত নয় আজ রেশমা এসে আমাকে সব বলেছে। তোর টাকায় ওর ভাইয়ের চিকিৎসা করিয়েছিল বড় হাসপাতালে তাও ওর ভাই বাঁচেনি। তখন থেকেই ওর একটু বিবেক দংশন হচ্ছিল তারপর কাল ও হঠাৎ জানতে পারে বসন্ত আত্মহত্যা করেছে তারপর আর থাকতে না পেরে আমাকে সব জানিয়েছে।

-------কি বললে বসন্ত আত্মহত্যা করেছে! তাহলে তুমি কেন পাগলের প্রলাপ বকছিলে যে বসন্ত এসেছিল। দেখ মেঘলা তুমি সব জেনেছ ঠিক আছে কিন্তু বসন্তই যখন আর বেঁচে নেই শুধু শুধু আমার সঙ্গে ঝামেলা করছ কেন? আমি যা করেছি তোমাকে পাওয়ার জন্য করেছি। নাও আয়াম ইওর হাসব্যান্ড। আমার সাথে ফালতু ঝঞ্ঝাট করে কি পাবে তুমি? নাথিং। সব ভুলে যাও। আমার সাথে আরামে বিন্দাস জীবন কাটাও।

বসন্তের মৃত্যুর খবরে অতনুর নিজেকে অনেক হালকা লাগছে।

------শয়তান এখনও তোর কোনও অনুতাপ নেই! এত নিচ তুই! তোকে আমি ছাড়ব না।

আচমকা শুরু হওয়া দমকা হাওয়ায় মেঘলার একরাশ লম্বা কালো চুল গুলো উড়ছে। চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। মুখটা কেমন বিকৃত। এত সুন্দরী একটা মেয়েকে যে এত বীভৎস লাগতে পারে অতনুর কল্পনার অতীত ছিল। মেঘলা এক পা এক পা করে অতনুর দিকে এগিয়ে আসছে। অতনু পিছিয়ে যাচ্ছে।

-----শয়তান পালাবি কোথায়?

মেঘলার হাতটা হঠাৎ লম্বা হয়ে এগিয়ে এলো অতনুর দিকে। অতনু চিৎকার করতে চাইল কিন্তু আতঙ্কে গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না। কোনও স্বাভাবিক মানুষের হাত এত লম্বা হয় কি করে! অতনু পালাতে চাইল কিন্তু দড়াম করে ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। অতনু একটু টানাটানি করে বুঝতে পারল এ দরজা সারাজীবনের জন্য তার কাছে বন্ধ হয়ে গেছে। মেঘলার দুহাতের কব্জি থেকে রক্ত ঝরছে। সারা ঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সেই রক্তস্রোত বন্যার জলের মতো বাড়তে বাড়তে অতনুর হাঁটু ছুঁয়েছে। গুড়গুড় শব্দে মেঘের ডাক শোনা যাচ্ছে। হাড়হিম করে দেওয়া চাপা স্বরে মেঘলা বলছে," শয়তান আজ তোর শেষ দিন। তোর জন্য আমার বসন্ত অকালে চলে গেছে। তোর মত একটা নরকের কীট আমার শরীরটাকে ভোগ করেছে। তোকে শাস্তি পেতেই হবে।" মেঘলার এই ভয়ংকর মূর্তি দেখে শিউরে উঠল অতনু। ব্যালকনির দরজাটা এখনও খোলা সেদিকে ছুটে গেল সে। কড়কড় শব্দে পরপর বাজ পড়ল কোথাও সঙ্গে ক্রমাগত ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুৎ এর আলোয় অতনু দেখল ব্যালকনিতে রাখা মেঘলার প্রিয় ইজিচেয়ারটায় মেঘলার নিস্পন্দ শরীরটা এলিয়ে আছে। বাম হাতের কব্জি থেকে রক্ত ঝরে সারা ব্যালকনির মেঝে বসন্তের প্রিয় রঙে রঙিন হয়েছে। কিচেন নাইফটা চেয়ারের পাশে পড়ে রয়েছে। অতনুর মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষ আতঙ্কে কাজ করা বন্ধ করে দিল। ইজিচেয়ারে মেঘলার দেহ আর ব্যালকনির দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে তার বিদেহী আত্মা।

-----রেহাই নেই তোর রেহাই নেই শয়তান।

------না না মেঘলা না।


 একটা রহস্যের সমাধান পুলিশ করতে পারে নি। সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার অতনু সেনের ফ্ল্যাটে ঠিক কি ঘটেছিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং বিভিন্ন সাক্ষীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অতনু সেন অফিস থেকে ফেরার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আগে মেঘলা সেন আত্মহত্যা করেছেন কিন্তু গোটা ফ্ল্যাটে ভাঙচুর করল কে? অতনু সেনকে ব্যালকনি থেকে ধাক্কাই বা মারল কে? তদন্ত কারীদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অতনু আর মেঘলার বন্ধু তথা মেঘলার প্রাক্তন প্রেমিক বসন্ত দাশগুপ্ত অতনুদের বিয়ের দিন তাদের চা বাগানের বাংলোয় আত্মহত্যা করে আর এই কথাটা মেঘলা সেদিন জানতে পারে। মেঘলার আত্মহত্যার কিছু সম্ভাব্য কারণ জানা গেলেও অতনুর সাথে কি হয়েছিল তা এখনও ধোঁয়াশা আবৃত। এ রহস্যের সমাধান সম্ভব হবে যদি কোনদিন প্রায় নব্বই শতাংশ প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া অতনু সেন সুস্থ হয়ে ওঠে। গলা দিয়ে ঘরঘর আওয়াজ বেরোনোর পরিবর্তে পরিস্কার কথা বলতে পারে যার সম্ভাবনা প্রায় শুন্য।

আরেকটা রহস্য ঘনিয়ে উঠেছে বসন্তবাড়ি টি এস্টেটের বাংলোয়। বন্ধ বাংলোর জানালা কে যেন খোলা-বন্ধ করে। খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে কার যেন এক চিলতে লাল শাড়ির আঁচল উঁকি মারে। মালিকের মৃত ছোট ছেলের মত কে যেন গিটার বাজায়। আবার কখনও বাতাসে ফিসফিস করে ভেসে বেড়ায় দুই নরনারীর একান্ত আদুরে আলাপ। বাংলোর বাগানে অসময়ে বসে যায় লাল ফুলেদের মেলা যেন বসন্ত এসে গেছে।


   





Rate this content
Log in

More bengali story from Sayantani Palmal

Similar bengali story from Romance