বৃত্যের বাইরে ১২ পর্ব
বৃত্যের বাইরে ১২ পর্ব
পর্ব বারো
রাজদীপ লাহা - ' মাঙ্গলিকী ' বিবাহ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার , মধ্য রাতে তার মোবাইলে একটা কল এল । পরক্ষণেই তা' আবার কেটে গেল । ঘুমের ঘোরে রাজদীপ তা' খেয়াল করেনি । আবার ঘুমিয়ে পড়ল ।
রাজদীপ লাহা দুর্গাপুরের সম্ভ্রান্ত বংশীয় রাজশেখর লাহার কনিষ্ঠ পুত্র । এন আই টি ( পূর্বতন রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ) থেকে আর্কিটেকচার নিয়ে স্নাতক ডিগ্রী পেয়েছিল ।
ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টে সিলেক্ট হয়েও কাজে যোগদান করেনি । পিতা মাতার আদরের সন্তান বলে চাকরিতে যোগ দিতে দেননি । পরিবর্তে একটি বহুমূল্য বিবাহ প্রতিষ্ঠানে অধিষ্ঠিত করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন যে ছেলে তাঁদের আমৃত্যু সঙ্গে থাকবে ।
সম্পাতিও সেই কলেজে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংএ ভর্তি হয়েছিল । এখান থেকেই তাদের দু'জনের পরিচয় । ক্রমান্বয়ে প্রেম পর্ব শুরু হয় ।
রাজদীপ বাড়িতে তার ইচ্ছা প্রকাশ করে । তার পিতা মাতা তন্তুবায় সম্প্রদায়ভুক্ত বলে স্বনামধন্য বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যার সঙ্গে বিবাহ দানে অসম্মত হয়েছিলেন । কুলগত পার্থক্য হেতু এই বিবাহ অসম্ভব বিবেচনা করে পুত্রকে বলেছিলেন - কন্যাপক্ষ থেকে প্রস্তাব এলে বিবেচনা করব ।
রীতিমত তর্ক করেছিল রাজদীপ । তারা যে উভয়ে উভয়কে ভালবাসে অকুন্ঠচিত্তে তা' পিতামাতাকে জানিয়ে দিয়েছিল । শুধু তাই নয় ; সম্পাতির সঙ্গে বিবাহ না হলে সে যে আর কাউকে বিবাহ করবে না - সে কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছিল ।
এদিকে সম্পাতিও এই প্রস্তাব তার মা বাবাকে জানালে তাঁরা দু'জনেই ভীষণ আপত্তি করেন ।একমাত্র কন্যাসন্তান হওয়া সত্ত্বেও পরিস্কার জানিয়ে দেন - তোমার জন্য কুল মান খোয়াতে পারব না ।
সম্পাতি বলেছিল - তোমরা রাজী না হলে আমি গৃহত্যাগী হব ।
শুভমিতা দেবী বলেছিলেন - তোকে আজই গলা টিপে মেরে ফেলব । তবু তাঁতির ছেলেকে কখনোই জামাই বলে মেনে নিতে পারব না ।
বিভূতিভূষণ বলেছিলেন - মা বাবার দুর্বলতার সুযোগ নেবার চেষ্টা কর না । এতে ফল ভাল হবে না ।
সেদিন বাড়িতে এই অশান্তির জন্য অরন্ধন চলছিল । অভুক্ত বিভূতিভূষণ ঔষধও গ্রহন করেননি । রাত্রি থেকে তাঁর মাথায় কি যেন ব্যথা অনুভূত হচ্ছিল ।
শুভমিতা দেবীর পিতা সুরঞ্জন চক্রবর্তী মহাশয় তখনও কেবল বহাল তবিয়তে ছিলেন তা নয় ; রীতিমত সবলও ছিলেন । ফোনালাপে শুভমিতার নিকট সব জ্ঞাত হয়ে তিনি পুরন্দরপুর থেকে রওনা দিলেন দুর্গাপুরে ।
তাঁকে অকস্মাৎ বাড়িতে আসতে দেখে সম্পাতি বলল - ওহো ! দাদু তুমিও খবরটা পেয়ে গেছ তাহলে ?
সুরঞ্জন বাবু বললেন - তোমার বাবার খবর পেলাম দিদিভাই ! তাই তো আসতে হল !
- যাক বাবার খবর নিতে এসেছ - ভালো করেছ - আমি ভাবলাম আমার খবর শুনে তড়িঘড়ি ছুটে এলে নাকি !
সুরঞ্জন চক্রবর্তী বললেন - তোমার খবর তো আগেই শুনেছি দিদিভাই ! ভালোমত পাশ দিয়েছ, নিজের যোগ্যতায় চাকরি জোগাড় করে নিয়েছ । সবই তো জানি।
শুভমিতা দেবী বলে উঠলেন - আপনার নাতনি বরও জোগাড় করে নিয়েছে বাবা । কলেজে যেয়ে প্রেম করেছে । তাও আবার এক তাঁতির ছেলের সঙ্গে ।
সুরঞ্জন চক্রবর্তী যেন মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন এ হেন দশা হল । অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে সম্মুখস্থ সোফায় গিয়ে ধপাস করে বসে পড়লেন ।
- জীবনের নিকৃষ্টতম কাজ করেছ তুমি !
সুরঞ্জন বাবু নাতনির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন ।
- আমাদের কোন পক্ষেই সাত পুরুষে এমন জঘন্য কাজ কেউ করেনি । আমার মেয়েরাও ভালো ভালো বংশে বিয়ে করেছে । এমনকি ছেলেরাও - মানে তোমার মাতুলদের কেউই অসবর্ণ বিবাহ করেনি । আমি দেখেশুনে বিচার করে তাদের সকলের বিয়ে দিয়েছি । তুমি যা করেছ তা এককথায় ক্ষমাহীন অপরাধ । আমার মনে হয় সেই কারণেই জামাই বাবাজীবন আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছে ।
শুভমিতা দেবীর দিকে চেয়ে বললেন - বিভূতি কোথায় ? চল ওর কাছে নিয়ে চল ।
সম্পাতি বলে উঠল - জানি তো ! সব শেয়ালের একই রা - হুক্কা হুয়া !
সুরঞ্জন বাবু চোখ পাকিয়ে সম্পাতির দিকে চাইলেন । সেই চোখে এখন আর দাদুসুলভ আদর নেই - কেবলই একরাশ ঘৃণা দেখা গেল । তিনি নাতনিকে কিছু না বলে জামাইয়ের ঘরের দিকে চললেন ।
সম্পাতি একলা ড্রয়িংরুমে বসে তাঁদের গমনপথের দিকে চেয়ে রইল । হাতের মোবাইল থেকে রাজদীপকে ফোন করে ঘটনার পরিচয় দিতে থাকল ।
শুভমিতা দেবী পিতার হাত ধরে ধীরে ধীরে দোতলায় শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন । বিভূতিভূষণ তখন তন্দ্রায় আচ্ছন্ন ।
জামাইকে দেখে চমকে উঠলেন সুরঞ্জন চক্রবর্তী মহাশয় ।
- মিতা !
মেয়েকে বললেন - হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা কর । ওকে দেখে ভালো ঠেকছে না । বি কুইক ।
শুভমিতা দেবী ভয় পেয়ে গেলেন , তথাপি মনকে শক্ত করে শম্ভুকে ফোন করলেন - এক্ষুণই গাড়ি বের করে উপরে চলে এস শম্ভু । বাবুর শরীর খুব খারাপ। হাসপাতালে ইমিডিয়েট নিয়ে যেতে হবে ।
শম্ভু তাঁদের সর্বক্ষণের ড্রাইভার । সপ্তাহে ছয় দিনই তার বাবুর বাড়িতে কাজ । শুধু রবিবার কোন নির্দেশ না থাকলে দিনের বেলায় ছুটি পায় । কাছাকাছি থাকে বলে রাতে বাড়ি যেতে পারে । বলে দেওয়া আছে জরুরি হল রাতেও আসতে হবে ।
কিছুক্ষণের মধ্যে শম্ভু দৌড়ে দোতলায় উঠে এল । শম্ভুকে দৌড়াতে দেখে সম্পাতিও উপরে এসে উপস্থিত হল ।
সুরঞ্জন বাবু বললেন - ওকে তুলতে পারবি ?
শম্ভু বুঝতে পারল স্যারের অসুস্থতার কথা । তাগড়া জোয়ান শম্ভু দিব্যি কাঁধে তুলে বিভূতিভূষণকে গাড়িতে শুইয়ে দিল ।
সুরঞ্জন বাবু মেয়েকে নিয়ে নীচে নামলেন। পিছু পিছু সম্পাতিও গাড়িতে গিয়ে উঠল । শম্ভু জানে কলকাতা যেতে হবে । গাড়ি ছুটল কলকাতা অভিমুখে ।
হাসপাতালে পৌঁছে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হল । কেস হিস্ট্রি শুনে আর এম ও ইমিডিয়েট এডমিশনের জন্য সুপারিশ করলেন ।
এডমিশনের প্রসিডিওর শেষ হতে কিছু সময় লাগে । এদিকে যে ডাক্তারের অধীনে বিভূতিভূষণের চিকিৎসা চলছিল তিনি সেই হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন । বড়ই বিপদে পড়লেন ওঁরা ।
সাহায্যের জন্য এই কাউন্টার সেই কাউন্টার করে যখন ওঁরা দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছেন জনৈক সিটিউরিটি গার্ড বললেন - একজন নতুন ডাক্তারবাবু এসেছেন । আপনারা তাঁর আণ্ডারে ভর্তি করে দিতে পারেন । হাইলি কোয়ালিফায়েড ডক্টর । আশা করি আপনাদের ভালোই হবে ।
সুরঞ্জন বাবু বললেন - কি নাম তাঁর ?
- ডক্টর কে কে মুখার্জী ।
সুরঞ্জন বাবু আর সময়ের অপব্যবহার না করে ডক্টর মুখার্জীর তত্ত্বাবধানে বিভূতিভূষণকে ভর্তি করিয়ে দিলেন ।
ডাক্তার বাবু রোগী পরীক্ষা করছেন । খুঁটিয়ে পুরাতন কেস হিস্ট্রি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন - মেডুলোব্লাস্টোমা !
শুভমিতা দেবী বললেন - হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি ঠিক ধরেছেন ।
ডাক্তার বাবু পিছন ফিরে শুভমিতাকে বললেন - আগে ছিল । সেটাই এখন রিলাপস করেছে ।
সুরঞ্জন বাবুও ছিলেন ওখানে । ডক্টর মুখার্জীকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন - একটা কথা বলব ?
ডাক্তার বাবু বললেন - বলুন ।
- যদি ভুল না করি , তুমি কি কামদাকিঙ্করের নাতি করালী?
ডাক্তার বাবু ঘুরে দাঁড়ালেন । সুরঞ্জন বাবুর দিকে চেয়ে একগাল হেসে বললেন - ও সোনা দাদু যে !
খপ করে করালীর হাত দুটো ধরে সুরঞ্জন বাবু বললেন - থ্যাঙ্ক গড । ভাবতেই পারিনি তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে । করালী পায়ে হাত দিয়ে সুরঞ্জন বাবুকে প্রণাম করল ।
- আপনাদের আশীর্বাদে এখানে এসেছি দাদু । ভালো আছেন সবাই ? অনেকদিন দেখা হয়নি ।
শুভমিতা দেবী বললেন - কেমন আছেন উনি ?
- আপনি ?
সুরঞ্জন বাবু বললেন - আমার মেয়ে আর নাতনি । আর ( বিভূতিভূষণকে দেখিয়ে ) আমার জামাই । তোমার হাতে তুলে দিয়ে বড় নিশ্চিন্ত হলাম দাদুভাই । কামদা, কালী, বৌঠান আর বৌমা কেমন আছে ?
- সবাই ভালো আছে । আপনারা একটু বাইরে গিয়ে ওয়েট করুন। আমি ওনাকে আর একবার চেক করে দেখি ; নিউরো এফেক্ট কতটা সিরিয়াস ।
সুরঞ্জন বাবুরা বাইরে চলে এলেন । করালী মনোযোগ দিল রোগীর পরীক্ষায় ।
( চলবে )

