বৃত্তের বাইরে পর্ব পঞ্চাশ
বৃত্তের বাইরে পর্ব পঞ্চাশ
পর্ব পঞ্চাশ
ক্ষণপ্রভা দেবী এখন অনেকখানি সুস্থ হয়ে উঠেছেন । আদরের নাতিকে কাছে পেয়ে তাঁর মন বেশ ফুরফুরে।
কামদাকিঙ্করও পাশে বসে আছেন । তিনি নাতিকে আদ্যোপান্ত বিবরণ দিয়ে বলে দিয়েছেন - আমি ভাই, নিজের চোখে দেখিনি কিন্তু তোমার ঠামি বা সুবল সবটাই নাকি দেখেছে । তুমি বরং সুবলের সঙ্গে একবার...
- আমার দায় পড়েছে খবর নিতে । আমি তো বলে দিয়েছি দাদু, আমার বিয়ে নিয়ে আমি কোনদিন ভাবিনি আর এখনও ভাবছি না । তোমরাই গেয়েছিলে ; এখন তোমরা শলাকয়াই বাজাচ্ছ । আমি শুধু দর্শক বা শ্রোতা । বিয়ে নিয়ে আমার মাথাব্যথা কোন কালেই ছিল না, আজও নেই ।
কামদাকিঙ্কর বললেন - সে তো জানি দাদুভাই । ডাক্তারিতে হাত পাকিয়েছ, বিয়ে নিয়ে এক আধটু ভাবতেও তো পারো !
ক্ষণপ্রভা দেবী বললেন - দাদুভাই কি প্রেমে পড়তে পার না ?
করালীকিঙ্কর লজ্জা পেল না । বলল - ঠামি ! জীবনে অনেক হল শুধু প্রেম করা আর হল না । ও সব বাদ দাও তো ! নিজের খেয়াল রেখো ।
কালীকিঙ্কর ভেতরে এলেন । কামদাকিঙ্করকে বললেন - বাবা ! একটা কথা ছিল ।
কালীকিঙ্করের চাউনি দেখে করালী বুঝে গেল এমন কোন কথা যা তিনি তার সামনে প্রকাশ করতে কুন্ঠিত বোধ করছেন ।
- দাদু ঠামি আমি একবার ছাদ থেকে ঘুরে আসি। দেখে আসি নারকেল গাছটা ছাদ ছুঁতে পেরেছে কি না ।
করালী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।
হরিসাধনের বউ গত হয়েছে । হরিসাধন বাড়ি পৌঁছানোর আগেই ওর বউ অনন্তলোকে চলে গেছে। সুবলই ফিরে এসে খবর দিয়েছিল ।
করালীও শুনেছে সে কথা । দুঃখও পেয়েছে , কিন্তু মৃত্যু নিয়ে তো কিছু বলার নেই । হরি দাদুও কিছু কম করেননি। আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন স্ত্রীকে সারিয়ে তুলতে । সে নিজেও গিয়ে দেখে এসেছে । কোন বিশেষজ্ঞকে দেখালে সুচিকিৎসা পাওয়া যাবে বলে দিয়েছে।
তথাপি বাঁচানো যায়নি । শেষবার হরিদাদু যখন দেশের বাড়ি থেকে এসে বলেছিল ' এখন তো মনে হচ্ছে সুস্থ , তারপর দেখি '! - সেদিনই করালী বুঝে গিয়েছিল আর বেশীদিন নয় । কারণ এ সব বার্ধক্যজনিত ব্যাধি এই রকমই আচরণ করে । যে মুহুর্তে মনে হয় ভালো তারপরই চলে যায় পরলোকে ।
ছাদে উঠে নারকেল গাছ দেখছিল করালী । দিব্যেন্দু ফোন করে ডিনারে নেমন্তন্ন করে বসল । করালী বলল - ওকে যাব ।
নীচে তখন কামদাকিঙ্কর ও কালীবাবু মিলে আলোচনা করছিলেন কি ভাবে করালীকিঙ্কর ও সম্পাতির বিয়ে ভেঙে দেওয়া যায় ।
সেদিন রাগের বশে কামদাকিঙ্কর যা বলেছিলেন তা' নিয়ে আজ কামদাকিঙ্করও সন্দিহান ।
- তুমি ঠিকই বলেছ বাবা ।
কালীকে বললেন কামদাকিঙ্কর ।
- বিভূতিরা যে প্রকৃতির মানুষ চিঠির কথা অস্বীকার করে ক্ষতিপূরণের মামলাও করে দিতে পারে । সুতরাং টেলিগ্রাফ করে দিলে কেমন হয় । সরকারি নিয়মে তো টেলিগ্রাম ইজ এ সিক্রেট ডকুমেন্ট । তার একটা সার্টিফায়েড কপিও পাওয়া যেতে পারে ।
কালীকিঙ্কর বললেন - আমার টেলিগ্রাম সম্বন্ধে কোন আইডিয়া নেই বাবা ।
- বাট আই হ্যাভ । আই নো ইট ভেরি ওয়েল ।
কামদাকিঙ্কর বললেন - গোপালপুর পোস্ট অফিস থেকে একটা টেলিগ্রাম ফর্ম নিয়ে আসবে । আমি ফিল আপ করে দেব । পরে তুমি ওটা পোস্ট অফিসে যেয়ে বুক করে আসবে ।
কালীকিঙ্কর বললেন - তাই হবে বাবা ।
- একটা সার্টিফায়েড কপিও আনবে, আমার ফাইলে গেঁথে রাখব ।
কথা শেষ হয় । কামদাকিঙ্কর বলেন - আমি নিজে গিয়ে বিয়ে ভেঙে দিয়ে আসতে পারতাম । কিন্তু আমার ইচ্ছে নয় আবার ওদের মুখ দেখি ।
কালীকিঙ্কর বললেন - আমি গেলে কাজ হবে ?
করালীকিঙ্কর নীচে নেমে এসে বলল - আজ বিকেলে আমি যাচ্ছি । ইনভাইটেশন পেলাম ।
কামদাকিঙ্কর , কালীকিঙ্কর এমনকি ক্ষণপ্রভা দেবীও তিনজনে এক সাথে বলে উঠলেন - তুমি যাবে মানে ?
করালীকিঙ্কর বলল - ইয়েস । আমি যাব । আমাকে ইনভাইট করেছে ।
- কে ?
- কেন দিব্যেন্দু ! ওই তো বলল আজ সন্ধ্যেয় আয়, তোকে রাসলীলা দেখাব ।
কামদাকিঙ্কর বললেন - আমি কি তোমার সঙ্গে যেতে পারি ?
করালীকিঙ্কর বলল - হোয়াই নট দাদু ! তুমি গেলে তো জমে ক্ষীর হয়ে যাবে ।
ক্ষণপ্রভা দেবী বললেন - তুমি এই বয়সে রাসলীলা দেখবে ।
করালী হাসতে হাসতে বলল - এই তো উপযুক্ত বয়স ।
যাই হোক ঠিক হল সন্ধ্যে ছ'টার সময় ওঁরা রওনা দিবেন । দিব্যেন্দুকে সেই মত বলেও দেওয়া হল ।
কামদাকিঙ্কর স্ত্রীকে রেখে যেতে পারলেন না অবশ্য । তা ছাড়াও ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে যাওয়া কেমন যেন মনে হচ্ছিল তাঁর । আবেগের বশে বলে ফেলেছিলেন ; যাবার আগে বলে দিলেন তিনি যাবেন না ।
দিব্যেন্দু বলল - ওয়েটিং হিয়ার এট কুমারমঙ্গলম পার্ক । দে আর স্টিল হিয়ার নাউ ।
করালী বলল - আমি প্রায় এসে গেছি । পার্কে ঢুকছি ।
মেইন গেটেই দাঁড়িয়ে ছিল দিব্যেন্দু । করালীর গাড়ি এসে গেলে বলল - ওই দেখ! কেমন জমিয়ে দিয়েছে !
করালী ও দিব্যেন্দু পার্কের যেখানে সুইমিং পুল আছে সেখানে একটা বড় শিরীষ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রাজদীপ লাহা এবং সম্পাতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিসার দেখছিল ।
দিব্যেন্দু একটা সিগারেট ধরাল । সন্ধ্যে পেরিয়ে পার্কে অন্ধকার নেমে আসছে । পার্কের ভেতরে আলোগুলো জ্বলছে । সেই আলোয় দিব্যেন্দু ও করালী দেখতে লাগল ওদের আনন্দ কলোচ্ছ্বাস ।
হঠাৎ রাজদীপের নজরে পড়ল দিব্যেন্দুকে । সম্পাতির আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে একটু সরে বসল । ওরা বোটিং করছিল । সম্পাতি এভাবে রাজদীপকে গুটিয়ে যেতে দেখে প্রশ্ন করল - কি হল ?
রাজদীপ বলল - মনে হচ্ছে দিব্যেন্দুদা !
- কে দিব্যেন্দুদা ?
- ওই তো তোমার হবু বরের বন্ধু । আমাদের পাশের বাড়িটাই ওর ।
এবার সম্পাতিরও বুকে কাঁপুনি এল ।
রাজদীপ বলল - ভালো করে দেখ তো - দিব্যেন্দুর সঙ্গে যে আছে তাকে চিনতে পারছ কি না ?
সম্পাতি বেশ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে বলল - ঠিক তো । ওই তো আমার হবু বর ।
রাজদীপ বলল - কি হবে এবার ?
- কি আর হবে ! বড় জোর বিয়েটা ভেঙে যাবে । এর বেশী কিছু তো নয় ! আমিও চিরদিনের মত তোমার হয়ে যাব ।
দিব্যেন্দু এবং করালী দু'জনই ওদের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল ।
সম্পাতিকে করালী বলল - হ্যালো মিস ব্যানার্জী ! উইশ ইউ গুড লাক ।
রাজদীপ বলল - আপনি কি সেই বিখ্যাত ডক্টর কে কে মুখার্জী ?
দিব্যেন্দু বলল - হ্যাঁ রে ! তুই ওকে চিনিস নাকি !
রাজদীপ বলল - ওঁর কথা অনেক শুনেছি।
করালী দিব্যেন্দুকে বলল - চল ওদিকে একবার দেখে আসি ।
দিব্যেন্দু ও করালী চলে গেল । সম্পাতি অজানা আশঙ্কায় এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল ।
রাজদীপ বলল - এখন পথ পরিস্কার হয়ে গেল , কি বল ?
সম্পাতি উত্তর দিল না । বলল - চল এবার ফেরা যাক ।
সম্পাতি ও রাজদীপ পার্ক থেকে বেরোতে না বেরোতে করালী গাড়ি নিয়ে হুশ করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল দিব্যেন্দুর বাড়িতে ।
সম্পাতির মনে পড়ে গেল পুরীর সমুদ্র স্নান । করালী ও সে খুব মজা করেছিল সেবার ।
( চলবে )

