বৃত্তের বাইরে পর্ব ইট
বৃত্তের বাইরে পর্ব ইট
পর্ব আট
চায়ের নেশা মিটাতে গিয়ে করালীকিঙ্কর যে এমন অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়বে তা' কল্পনাও করতে পারেনি । হলুদ ট্যাক্সিটি প্রায় তার শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল । স্বাভাবিক ভাবেই নজর গেল সেই দিকে । করালী তাকিয়ে দেখল সম্পাতির মা মিসেস ব্যানার্জী হাত নাড়িয়ে তাকে ডাকছেন ।
অত্যন্ত পরিচিতা ভদ্রমহিলা ; মাঝখান থেকে পত্রটি পিতামহের হস্তগত না হলে তিনি যে তার শাশুড়ি-মাতা হতেন - এতে কোন দ্বিরুক্তি ছিল না ।
করালীকিঙ্কর প্রথমে একটু ইতস্তত করছিল । এই কাকভোরে ভদ্রমহিলা কেন এসেছেন ভাবতেই কয়েক মুহুর্ত কেটে গেল ।
ভদ্রমহিলা হাত নেড়ে ইশারা করছেন নিকটে যেতে । করালীকিঙ্কর হতচকিত হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাঁর কাছাকাছি আসতেই তিনি হেঁচকা টান মেরে তাকে গাড়িতে উঠিয়ে নিলেন । তারপর 'দুম' করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন শীঘ্র চলে যেতে । গাড়ি বাজারের পথ না ধরে বামদিকের একটা গলিপথে ঢুকে গেল ।
এত আকস্মিকভাবে ঘটনাটা ঘটে গেল যে করালীকিঙ্কর কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে শুভমিতা দেবীর মুখের দিকে চেয়ে রইল ।
কোন ভণিতা না করে শুভমিতা দেবী বললেন - দুর্গাপুরে যাচ্ছিলে , তাই না ? বাসে বা ট্রেনে যাবে ভেবেছিলে !
করালীকিঙ্কর মুখের ভাষা পর্য্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে । একজন ভদ্রমহিলা এত ভোরবেলায় কেন তাকে নিয়ে পড়েছেন ভেবে উঠতে পারল না ।
শুভমিতা দেবী তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন - খুব অবাক হয়ে গেছ তো ? এই ভোর বেলায় হঠাৎ এসে তোমাকে একরকম ছিনতাই করে গাড়িতে তুলে নিলাম বলে ! ভয় নেই, আমি তোমাকে দুর্গাপুরে নিয়ে যাচ্ছি ।
করালীর মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না । সেই মুহুর্তে সে ভুলে গেছে যে সে একজন নামজাদা অঙ্কোলজিস্ট । তথাপি চুপ করে থাকলে কেমন ক্যাবলা ক্যাবলা মনে হতে পারে ভেবে কোন মতে বলল - সুবলদা গাড়ি বের করছিল।
একগাল হেসে উঠলেন শুভমিতা দেবী ।
- তা হলে একাকী ভোর বেলায় ফুটপাত ধরে হাঁটছিলে কেন ?
সে যে চায়ের দোকানে যাচ্ছিল সে কথাটাও বলতে ভুলে গেল ।
- আসলে ভেবেছিলাম গাড়ি বের করতে তো একটু সময় লাগবে তাই...
- প্রাতর্ভ্রমণ করছিলে ? হাসতে হাসতে বললেন শুভমিতা দেবী । আচ্ছা, তুমি কি সত্যিই দুর্গাপুর যাচ্ছিলে ?
- হ্যাঁ , মানে ...
- মিঃ বিভূতিভূষণ বিয়ে ভেঙে দিয়েছেন কেন - সে কথা জানতে ?
গাড়ি তখন ন্যাশনাল হাইওয়ের পথ ধরেছে । পরিস্কার আলো ফুটেছে , কিন্তু আকাশটা ধোঁয়া ধোঁয়া মনে হচ্ছে । মঙ্গলপুর শিল্পতালুকের ধোঁয়ায় ঢেকে দিয়েছে আকাশ । পথে যান চলাচল বেড়েছে । শুভমিতা দেবী ড্রাইভারকে বললেন - একটু ধীরে গাড়ি চালাও রামমোহন ।
করালীকিঙ্করও ধীরে ধীরে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিচ্ছে । প্রশ্ন করল - এ ভাবে আমাকে নিয়ে এলেন কেন ? আমি তো যাচ্ছিলাম ।
শুভমিতা দেবী বললেন - শুনে তুমি হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না যে বিয়ে ভাঙার পিছনে আমার কোন হাত নেই । বস্তুত যা ঘটেছে তা সবই আমার অজ্ঞাতসারে। যা করার ওরা বাবা ও মেয়ে মিলে করেছে । আমি যখন জানতে পেরেছি চিঠি তখন অলরেডি কাকাবাবুর হস্তগত হয়ে গেছে ।
- দেখুন ম্যা'ম ! এ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই ।
এতদিন শুভমিতা দেবীকে মাসীমা বলে ডেকেছে করালী । এই মুহুর্তে ' ম্যা'ম ' ছাড়া মাসীমা বলে সম্বোধন করতে পারল না । শুভমিতা দেবীর বুকে আঘাত করল শব্দটা , কিন্তু করালীকে দোষারোপ করতে পারলেন না । এই সময় ওই সম্বোধন করা ব্যতীত গত্যন্তর নেই তা' হৃদৎঙ্গম করলেন ।
বললেন - গতকাল রাত্রি থেকে আমি গৃহত্যাগী হয়েছি কারণ গতকালই শুনেছি যে বিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং তা অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের মত একটি সাধারণ ডাকে পত্র পাঠিয়ে । তোমার এবং তোমার বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে গত ছয় সাত মাস যাবৎ মেলামেশা করে আমার যেটুকু ধারণা হয়েছে তাতে এইরূপ মামুলি চিঠি দিয়ে বিয়ে ভেস্তে দেওয়া যে অপরাধের পর্য্যায়ে পড়ে - আমি তা' বেশ ভালো করে জানি ।
করালীকিঙ্কর বলল - ছাড়ুন না ও সব ! এমনও তো হতে পারে যে সম্পাতি প্রি-এনগেজড অথবা তার বাবা বেটার কোন সম্বন্ধ পেয়ে গেছেন !
উত্তেজিত হয়ে শুভমিতা দেবী বললেন - হাসালে তুমি ! যা ভাবছ তার কোনটাই নয় ।
- তবে ?
- এই ' তবে' কথার উত্তর পেতেই তোমাকে কিডন্যাপ করতে হল বাবা । কাল সারারাত আমি একলা প্লাটফর্মের ওয়েটিং রুমে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছি । অতি ভোর বেলায় এই ট্যাক্সি নিয়ে তোমাদের বাড়ি যাচ্ছিলাম । তবে তোমাকে যে এ ভাবে পেয়ে যাব স্বপ্নেও ভাবিনি । তুমি শুনেছ নিশ্চয় গতকাল দুপুরেও আমি তোমাদের বাড়ি এসে সকলের সঙ্গে কথা বলে গিয়েছি । ওঁরা বলেছিলেন বিভূতিকে নিয়ে আসতে । আনতে পারিনি বলে রাগ দেখিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই । একবার ভেবেছিলাম বাপের বাড়ি পুরন্দরপুরে চলে যাই । মন মানেনি । তাই সোজা এখানে চলে আসি , কিন্তু রাত হয়ে যায় বলে তোমাদের বাড়ি যেয়ে অভব্যতা দেখাতে পারিনি ।
করালীকিঙ্কর ভদ্রমহিলার কথায় অবাক হয়ে গেল । ভাবল এমন শাশুড়ি পাওয়াও ভাগ্যের কথা । কিঊ বিধি বাম । বলল - যা হবার তা তো হয়েই গেছে ম্যা'ম । আমার ঠাকুর্দার সম্মানে লেগেছে। সুতরাং দুনিয়া একপক্ষে হয়ে গেলেও ভাঙা কাঁচ জোড়া লাগবে না । আপনার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই । তবে আমাকে বৃথাই ছিনতাই করলেন এ'টুকুই বলতে পারি ।
শুভমিতা দেবী বললেন - তা' আমি জানি । তুমি তো ওখানে যেতেই ভোর বেলায় বেরিয়েছ - তুমি কিন্তু আমার সামনেই ওদের জবাবদিহি চাইবে - প্লীজ । আমার বাবা সত্যব্রত চক্রবর্তী কাকাবাবুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন । সেই সুত্রে তিনিই এই বিবাহের যোগাযোগ করে দিয়েছিলেন । তিনি আজ বেঁচে থাকলে ....
গলা বুঁজে এল তাঁর । আর কোন কথা বলতে পারলেন না । আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন । তা' করালীকিঙ্করের জন্য আফশোষ করেই হোক বা স্বর্গত পিতার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশতই হোক ।
- ম্যা'ম ! আমার দুর্গাপুর যাবার কোন প্রয়োজন ছিল না । আর আমি বিয়ে ভেঙে গেছে বলে কষ্ট পাইনি । আমার সেখানে যাবার একমাত্র উদ্দেশ্য হল মিঃ ব্যানার্জীর শরীরে আইসোটোপের বিকিরণ কতখানি প্রভাব ফেলেছে; চিকিৎসক হিসাবে তা' পরীক্ষা করবার জন্য আমার এই সিদ্ধান্ত । কারণ আজ এক মাসের বেশী হল তিনি চেক আপের জন্য যাচ্ছেন না । এটাও এক দুশ্চিন্তা ।
শুভমিতা দেবী বললেন - তোমাদের এত বড় ক্ষতি সাধন করার পরও তুমি ....
- ম্যা'ম ! এতে আমাদের কোন ক্ষতি হয়নি । আর আর্থিক ক্ষতি যেটুকু হয়েছে তা' আপনাদেরও হয়েছে ।
- কচুপোড়া ! আমাদের কোনরূপ আর্থিক ক্ষতি হয়নি ।
বিস্ময়ের সঙ্গে শুভমিতার দিকে চাইল করালী ।
- তার মানে ?
- তুমি কি ভেবেছ মিঃ ব্যানার্জী তোমাদের মত কার্ড ছাপিয়ে, ম্যারেজ হল, কেটারিং, সব বুক করে রেখেছেন ?
হা হা করে হেসে বললেন - ওঁকে শুধুমাত্র আমিই চিনি । আর সম্পাতিও চেনে না । বাবার ভালো ভালো কথা শুনে লাডলী মেয়ের মত মানুষ হয়েছে তো ! আমার কথার কোন মূল্যই দেয় না !
করালীকিঙ্কর যার জন্য দুর্গাপুর আসছিল তার রহস্য জেনে গেল । সুতরাং আর সেখানে যাবার তো কোন প্রয়োজন নেই । বলল - ম্যা'ম ! তা হলে আমাকে এখানেই ড্রপ করে দিন । আমি বাড়ি ফিরে যাই !
শুভমিতা দেবী বললেন - তাই কি হয় বাবা ! আমার সারা রাতের কষ্টটা এ ভাবে তুমিও অস্বীকার করবে বাবা ?
তবে মেয়ের সঙ্গে তোমার ফারাক তো কিছুই রইল না ।
করালীকিঙ্করের সহানুভূতি উপলব্ধ হল । বলল - ঠিক আছে, এসেই পড়েছি যখন একবার ওনাকে চেক আপ করেই আসি ।
( চলবে )

