STORYMIRROR

pallab kumar dey

Drama Fantasy

4  

pallab kumar dey

Drama Fantasy

ব্রহ্মপুত্র যায় বয়ে-32-মনে পড়ে

ব্রহ্মপুত্র যায় বয়ে-32-মনে পড়ে

5 mins
3


 ময়মনসিংহ শহরের কাছারি রোডে ধরে উত্তর অভিমুখে ব্রহ্মপুত্র পারের দিকে যাওয়ার সময়ে ডানদিকের একটা রাস্তায় কিছুটা ভেতরে, কয়েকটি হিন্দুবাঙালি পারিবার এ দেশের মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছে আজও। তারা এই দেশ ছেড়ে ছিন্নমূল উদ্বাস্তু হয়ে আজও পাড়ি জমায়নি ভারতে। 

 শৈশবে তাদের সবার বাড়িতে যাতায়াত ছিল আমার। কাছেই ছিল আমাদের বাড়ি। আমি বাংলাদেশে আসা কয়েক মাস হয়ে গেলেও আজও দেখা করতে যাইনি তাদের সঙ্গে। আর কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো আমি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাব। তাই ভাবলাম একবার তাদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসি।

 আমাকে যেই দেখে সবার মুখেই প্রায় একই কথা, কিরকম আছিলি পাটকাঁটির মতো চেহারা তুই দেখতে! ভারতের জল পেটে পইড়া এক্কেবারে বদলাইয়া গেছস দেখছি!

 পলাশদার বোনটাকে এ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়ে যতদূর আমার মনে পড়ে অনেক ছোট দেখেছিলাম ওকে। যদিও আমিও তখন ছোট, কৈশোরের প্রাক মুহূর্ত, তবুও যেন ঝাপসা মনে পড়ে মিষ্টি মুখের সেই মেয়েটাকে। সেই মেয়েটি যে এত তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে গেছে ভাবতেই পারিনি! চিনতেই পারছিল না আমি ওকে। মেয়েরা যেন ছেলেদের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়িই বড়ো হয়ে ওঠে।

 আমাকে দেখে সে যেন লজ্জায় আড়ষ্টা হয়ে দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর সরে গিয়ে এদিকে লুকোয় ওদিকে লুকোয়। আবারও ফিরে এসে তাকাচ্ছিল দরজার আড়াল থেকে। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি চপলতায় ভরা হাসি।

 ওর ওপরের দাদা আমারই সমবয়সি। ওর সঙ্গেই বসে আমি ভারত দেশের অনেক গল্প করছিলাম। অনেকক্ষণ বসে গল্প করলাম ওদের সঙ্গে। এবার বেরোবো, সদর দরজা দিয়ে সবে নেমেছি রাস্তায়। ওমনি দেয়ালের কোণায় দাঁড়ানো সে ডেকে উঠল আমাকে, খোকনদা তুমরা বুঝি ভারতে থাকো?

 আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম। জবাবে বললাম, হাঁ আমরা তো এখন ভারতেই থাকি। আমরা কবেই তো বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছি ভারতে, তোর মনে নেই? অবশ্য তুই তখন অনেক ছোট। মনে না থাকারই কথা।

 সুন্দর একটা পাখির মতো মনে হচ্ছিল যেন তাকে। পাখির সুরেই বলে উঠল, ভারত কত সুন্দর তাই না! তুমি ভারতে গিয়া আমারে চিঠি দিও খোকনদা?

 ‘মানে?’ আমি হাসি মুখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। জিজ্ঞেস করলাম, তোকে চিঠি লিখব কী জন্যে? কেন?

 মিষ্টি মিষ্টি চপলতায় হেসে সে বলল, এমনিই! তুমি চিঠি দিলে আমিও তুমারে চিঠি দিমু!

 ‘তাই নাকি? আমি তোকে চিঠি দিলে তুইও আমাকে চিঠি দিবি? বাহ্‌ দারুণ কথা তো! বেশ তোকে আমি চিঠি লিখব ঠিক, কিন্তু তোর ঠিকানা?’

 ‘আমার নামের পরে দাদার নাম আর কাছারি রোড লিইখ্যা দিয়া দিবা, ঠিক পাইয়া যামু।’

 ‘তোর নামটা যেন কী, সেটাই তো আমি ভুলে গেছি?’

 ‘তুমি এত ভোলামন! আমার নাম তুমার মনে নাই? আমি তো তুমার শিউলি!’

 কেমন যেন চোখের অভিমানে তাকিয়ে রইল সে আমার দিকে। সেই তাকানোর মধ্যে এক কিশোরী মেয়ের প্রথম রাজকুমার দেখার স্বপ্নও বোধহয় লুকিয়ে রয়েছে। যেন হিরে-জহরত-সোনা দিয়ে মোড়া ভারত নামের এক কল্পরাজ্য থেকে আচমকা আবির্ভূত হয়ে গেছি এই আমি সেই স্বপ্নে দেখা রাজকুমারের মতো তার সামনে!   

 ‘হাঁ হাঁ তোমার নাম তো শিউলি, মনে পড়েছে এবার শিউলি। আমি ভারতে গিয়েই তোমাকে একটা চিঠি দেব। ঠিক আছে, আসি তাহলে?’ বলে রওনা হয়ে পড়লাম।

 যতক্ষণ না আমি গলির মাথায় বাঁকে হাত নাড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে যাই, দাঁড়িয়েই রইল সে রাস্তার ওপরে। শিউলির সেই ক্ষণিকের রূপকথার মতো ভালোলাগাটুকু কেমন যেন উদাস করে দিল আমাকে ওই মুহূর্তে। সেই ছোট্ট একটি মেয়ে শিউলি আজও মনে রেখেছে আমাকে? কেন, কী জন্যে? শিউলির স্বপ্নে দেখা সেই রূপকথার অজানা অজ্ঞাত রাজকুমারের মতো এই খোকনকে তার অজানার ভালোলাগার টানে? 

 কাছারি রোডের আমাদের সেই বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয় শিউলিদের ওই বহু পুরানো পলেস্তারা খসে পড়া দালান বাড়িটা। আমি পিকুর সঙ্গে লাটিম খলতে চলে আসতাম ওদের বাড়ির সামনের সেই ছোট্ট মাঠটাতে। আমার লাটিম ছোঁড়ার সঙ্গে পিকু যখন আর পেরে না উঠত না, খুশিতে হাত তালি দিয়ে উঠত শিউলি।  

 পিকুরাও সেই কবে চলে গেছে এই দেশ ছেড়ে! আইন ব্যবসায় যার হাত দিয়ে আমার পিতৃদেবের হাতেখড়ি সেই সত্যেন জ্যাঠামশায়ের বাসগৃহও ছিল এই কাছেই। ওনার বাসগৃহের সামনেই ছিল দোচালা ঘরের মস্ত এক বৈঠকখানা। বৈঠকখানার আলমারিতে থরে থরে সাজানো থাকত মোটা মোটা আইনের পুস্তক। আমাদের পিতৃদেব প্রায় সন্ধ্যেসময় এখানে এসে বসতেন। আইনের বইগুলো খুলে নিয়ে বসতেন টেবিলে। সেই সত্যেন জ্যাঠামশায় আজ আর নেই। আমরা ভারতে পাড়ি জমানোর বছর খানেক আগেই তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে পরপারে চলে গেছেন। একমাত্র পুত্র কলকাতা পুলিশে চাকরি করতেন। পাকিস্তান সরকার ভিসা দেয়নি বলে পিতার মৃত্যুর সময়েও তিনি আসতে পারেননি। পিতার মৃত্যুশয্যায় শেষদেখাটুকুও আর হয়ে ওঠেনি। 

 সত্যেন জ্যাঠামশায়ের সেই বাসগৃহ, বৈঠকখানা, সামনের চণ্ডীমণ্ডপ যেখানে প্রতি বছর মহাধুমধামের সঙ্গে কালীপুজো সম্পন্ন হতো সেসব আজ কিচ্ছু নেই। সব দখল হয়ে গেছে। জ্যাঠিমাও সেই কবে গত হয়ে গেছেন!...এখানেই কাছে থাকতেন লালু-ভুলু নামের সেই দুই যমজভাই। একভাই ছিলেন প্রতিবন্ধী। লাঠি ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতেন তিনি। দুজনই ময়মনসিংহ আদালতে ওকালতি করতেন। কিন্তু কোনও পশার ছিল না তাদের। ছোটবেলার কথা আজও আমার মনে পড়ে। যেন অনুভব করতে পারতাম। খুবই দৈন্যদশার মধ্যে দিয়ে যেন দিন অতিবাহিত হতো দুই ভাইয়ের।.. প্রতিবন্ধী ভাইটি বিয়েও করেছিলেন। খুবই রূপবতী ছিলেন সেই স্ত্রী। আমাদের মায়েদের মধ্যে সেই রূপসী স্ত্রী আর ভাইদের সম্পর্ক নিয়ে কি যে কানাঘুষো হতো বুঝতাম না তখন।.. ভেঙে জরাজীর্ণ এখন তাদের বাড়িটা। কেউ আর এখন সেখানে থাকে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই যে তারা নিখোঁজ হয়েছেন কেউ আর তাদের কথা জানে না। বংশধরও তাদের কেউ নেই। 

 হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম কাছারি রোডের পুকুর পাড়ে। ওই তো ডেপুটি কমিশনারের সেই দোতলা অফিস বাড়িটা। ওই তো ডানে রাস্তাটা ঢুকে গেছে অফিস-আদালতের ভেতর দিয়ে বার কাউন্সিল ভবনের দিকে। ছোটবেলায় কতদিন দেখেছি সাদা ট্রাউজার আর সার্টের ওপরে কালো ব্লেজার পরে পিতৃদেব এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসতেন। 

 পুকুরের উলটো দিকেই পিতৃদেবের সেই কাছারিঘর। আজও যেন সেইরকমই রয়ে গেছে। তবে পাশের সেই হোটেলটা আজ আর নেই। সেই হোটেলের জায়গায় গজিয়ে উঠেছে অন্যান্য দোকানপাটের সারি। আশেপাশে পালটেও গেছে অনেক কিছু। তাছাড়া একত্তরের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এসব জায়গায় খুব বেশি কিছু একটা হয়নি। 

 কাছারিঘরের পাশ দিয়ে কয়েক পা এগোলেই আমাদের সেই ফেলে রেখে যাওয়া বাড়িটা। আজও যেন সেরকমই রয়ে গেছে। পরিবর্তন খুব বেশি কিছু একটা হয়নি। তাকিয়ে রইলাম গলির মুখে অনেকক্ষণ। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার শৈশবের দিনগুলো কোন অজান্তে উদাস মনের তীরে এসে যেন আছড়ে পড়ছিল। আছড়ে পড়ে তুলে দিচ্ছিল স্মৃতির কত অজস্র ঢেউ। মনে পড়ছিল রুবির কথা। রুবির দিদি ছবি। দুটো বোন তারা। তাদের বাবা সরকার মহাশয়। যেন আমাদের পরম এক আত্মীয়ের মতো ছিলেন। তারাও চলে গেছেন এই কাছারি রোড ছেড়ে। কোথায় গেছেন কেউ বলতে পারল না।

 দেশ ভাগ আর দেশ দেশান্তরের অভিশাপ মাথায় নিয়ে আমরা সবাই কে যে কোথায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছি! কেউ কারও খবরও নিতে পারি না। কে যে কোথায় আছি তাও জানিও না! অথবা আদৌও কারা আমরা বেঁচে আছি, এবং কে এই জগৎ সংসার ছেড়ে বিদায় নিয়েছি, তারও খবরা-খবর নিতে পারি না!

   

next episode- প্রতীক্ষার অবসান 


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Drama