বনমালী তুমি পর জনমে হইও রাধা শেষ অংশ
বনমালী তুমি পর জনমে হইও রাধা শেষ অংশ
রাজা রাজা
“হ্যাঁ বলুন?”
“দেখুন আমরা কলকাতা থেকে আসছি।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ আমাকে গতকাল বলেছে। আপনারা একজনকে খুঁজছেন।”
“হ্যাঁ এই দেখুন তার ছবি। নাম কৃষ্ণ।”
পাগলাগারদের ফাদার ছবিটা দেখে চমকে যায়।
“কি অদ্ভুত সমাপতন!!!”
“কোন সমস্যা ফাদার?”
“নাহ। আসলে দুইদিন আগেও এর খোঁজ করতে দুই জন এসেছিলেন।”
“মাই গড!!!”
“আমি আসলে কিছু হদিশ দিই নি, কারণ এটা আমাদের অরগ্যানাইজেশানের নিয়ম বিরুদ্ধ। অবশ্য আপনাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা।”
“এই করেছ ভালো, নিঠুর,
এই করেছ ভালো।
এমনি করে হৃদয়ে মোর
তীব্র দহন জ্বালো।
আমার এ ধূপ না পোড়ালে
গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে,
আমার এ দীপ না জ্বালালে
দেয় না কিছুই আলো।”
“বাহ কি সুন্দর গলা। স্বয়ং দেবী সরস্বতী গলায় অধিষ্ঠান করছেন।”
“সেটাই ফাদার।”
“হ্যাঁ বলুন। আসলে প্রায় এক বছর আগে আচমকা একদিন কয়েকজন এসে একপ্রকার জোর করে ওই ছেলেটাকে এখানে ভর্তি করে দিয়ে যায়।”
“কালুর দলবল।”
“হ্যাঁ রাজু সেটাই।”
“কি ব্যাপার।”
“আসলে ফাদার অনেকটা বড় গল্প।”
“কিছুটা যদি বলেন।”
“কৃষ্ণ কলকাতার ছেলে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে পরীক্ষা দিয়ে সরকারী চাকরী পায়। কাজের সূত্রে যায় আমদেপুরে। সেখানে আলাপ কমলের সাথে। কমল গান গায়, বাঁশি বাজায়, কমবয়সে পিতৃ-মাতৃহীন কিন্তু অনেক জমিজমার মালিক।”
“গড সবাইকে সমান খুশী দেয় না। আইমিন কিছু জিনিস সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হয়।”
“হয়ত।”
“হ্যাঁ বলুন।”
“আচ্ছা ফাদার দুটো পুরুষ এক অপরকে ভালোবাসতে পারে।”
“কঠিন প্রশ্ন। সমাজ, ধর্ম এক কথা বলে কিন্তু মানুষের মন অন্য।”
“কমল আর কৃষ্ণ দুইজনকে ভালোবাসে, একসাথে থাকতে চায়। এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখনকার শাসকদলের ঘনিষ্ঠ এক মস্তান।”
“কেন?”
“কারণ তার নজর ছিলো ওই অসহায় কৃষ্ণের জমি এবং তার শরীর।”
“কাম আর লালসা মানুষের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
“তারা সহজ পথে না পেরে একদিন আক্রমণ করে। কমলকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে এবং কৃষ্ণকে মাথায় আঘাত করে।”
“মাই গড। মানুষ কতোটা পাশবিক।”
“কৃষ্ণকে প্রথমে কলকাতার হাসপাতাল তারপরে এখানে দিয়ে যায়। কারণ কৃষ্ণের বাবা এই অসম লড়াই লড়তে পারেন নি।”
“যখন থাকে অচেতনে
এ চিত্ত আমার
আঘাত সে যে পরশ তব
সেই তো পুরস্কার।
অন্ধকারে মোহে লাজে
চোখে তোমায় দেখি না যে,
বজ্রে তোলো আগুন করে
আমার যত কালো।”
“আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাও। আমার ওর কাছে।”
“ফাদার কেবিন নং ১০২ আবার ছটফট করছে।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি আসছি। একমিনিট আপনারা একটু বসুন আমরা আসছি।”
আচমকা একটা চিৎকারে সবাই চমকে যায়। ফাদার আর নার্স বেড়িয়ে যায়। রাজু আর বিমান বাইরের বাগানে আসে।
“দাদাগো।”
“হ্যাঁ কমল।”
“খোঁজ পেলে আমার পাগলপারার?”
“সব হবে একটু সবুর কর ভাই আমার।”
“সব ঠিক হয়ে যাবে তো দাদা?”
“ভাই ভুল তুই করিস নি। আপরাধ কোনদিন ছাড় পায় না রে।”
“দাদা ভাইজান কল করছে...”
“হ্যাঁ আসফ ভাইজান বলো?”
“ভালো খবর আছে।”
“কালু ধরা পড়েছে?”
“না না।”
“তাহলে?”
“আহমেদ ধরা পড়েছে। কালু কিন্তু উত্তরবঙ্গ আছে। অবশ্য চাপ নেই কারণ আমার দলবল তোমাদের চারপাশে আছে।”
“মানে!!!”
“মানে চোখে চোখে রাখছে তোমাদের। ওইদিকের খবর বলো।”
“এইতো আমরা এখানে ফাদারের সাথে কথা বললাম। অবশ্য কৃষ্ণের দেখা পাইনি।”
“ঠিক আছে। তুমি ওইদিকে দেখো আর আমি কালকের মধ্যে সাক্ষীর গোপন জবানবন্দীর ব্যবস্থা করছি।”
“লাভ ইউ ভাইজান।”
“এই দাদা কি বলল ভাইজান?”
“বাছাধন এখানেও হাজির হয়েছে।”
“উফফফ!!!”
“ফাদার আপনাদের ডাকছে।”
কেবিং নং ১০২ রুমে একজনকে দেখা যায় হাতে বেড়ি পড়ে।
রাতের পরে রাত আসে
কাঁটার পরে ক্ষত
কান্নাগুলো আটকে রাখি
বুকে চাপা যতো...
তীরহারা ঢেউ উথলে ওঠে
নীল হৃদয়ের ফেনা,
অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াই
কেটে ফেলা সব ডানা...
“একটা আগল, একটা ফাঁস কিন্তু সেটা পরিবার, সমাজ কিংবা মানসিকতার নয়... এটা পরিণতির প্রাপ্তি... আমাকে একটু আদর করবে, অনেকদিন কেউ আমার কাছে আসে নি, গল্প করেনি...”
সমুদ্র কেন ক্ষুদ্রতা চায়?
তার তো বিশাল রাশি,
এক মুহূর্তে গলায় লাগায়
কালো বিষের ফাঁসি...
আকাশেতে নীড় আমার
তারার মাঝেই শান্তি
ছলকে পড়ে চোখের জল
বাকি রয় শুধু ক্লান্তি...
অনদিকে ফাদারের রুমে সবাই কথা বলছে।
“সব বুঝলাম কিন্তু ওই পেশেন্ট মানে তোমরা যার নাম কৃষ্ণ বলছো, সে কিন্তু মাঝেমাঝে খুব অ্যারোগেন্ট হয়ে যায় তাই হাতে বেড়ি পড়া।”
“আমাকে নিয়ে চলুন আমার কৃষ্ণের কাছে। আমাকে পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“দাঁড়াও দেখছি।”
কিন্তু কেন এই পরিণতি?
এটা কিসের ফল?
অপরাধ কার?
“আমি আমি কার কাছে উত্তর চাইব বিধাতা? কে দেবে আমাকে সদুত্তর?”
তার কি তবু মন গলে?
জানতে পারি না আর,
চাই না আমি মুখ তুলে
দুঃখ হৃদয় একাকার...
থাকুক সে একলা পড়ে
দূরে দূরে আমি রই ,
খুঁজবো না আর আঁধার ফুঁড়ে
আবেগ থাকুক যতোই...
“ক্যালেন্ডারের পাতা উলটায়। রাত শেষ নতুন সকাল হয় কিন্তু আমার সময় কেন আটকে আছে ঈশ্বর?”
“চলো আমার সাথে। দেখি কি করা যায়।”
সহবাস তো নয় এক সাথে,
এক শয্যায় দুইজন পুরুষের শুয়ে থাকা;
সহবাস হল প্রথম রাতের
শরীরের উষ্ণ ছোঁয় ,
পুরুষের সাথে পুরুষের যৌন সঙ্গম...
সহবাস যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রের
উত্থান -পতন ,
সহবাস যেন এক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য
দুটি হিংস্র পশুর লড়াই...
কিন্তু তার ও তো উদ্দেশ্য সেই সৃষ্টি
-- কোন এক নতুন প্রজন্মের...
“এটা এটা আমার শোনা। কিন্তু কোথায় একটা শুনেছি আমি এই কণ্ঠ?”
“আমি তোমার কমল”
“কমল!!! অনেক দূর থেকে কেউ ডাক দিচ্ছে কিন্তু আমি মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না।”
“ফাদার!!!”
“এই কমল কাঁদিস না। সামনে অনেক বড় লড়াই।”
“আমি তো বললাম তোমাদের।”
“মিলন হবে কত দিনে,
আমার মনের মানুষের সনে||
চাতক প্রায় অহর্নিশি,
চেয়ে আছে কলো শশী|
হবো বলে চরণ দাসী,
তা হয়না কপাল গুণে||
মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন,
লুকালে না পায় অন্বেষণ|
কালারে হারায়ে তেমন,
ও রুপ হেরিয়ে দর্পণে||
যখন ঐ রুপ স্বরণ হয়,
থাকেনা লোক লজ্জার ভয়|
লালন ফকির ভেবে বলে সদায়,
প্রেম যে করে সেই জানে||”
“আমার মনের মানুষ কিন্তু আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?”
“এই তো মাই সন তোমার তোমার মনের মানুষ।”
“আমি এইখানে কৃষ্ণ।”
“তুমি কে? আমি কে?”
হোটেলের ঘরে সবাই চুপ করে বসে আছে।
“কি হবে রাজুদাদা?”
“সব ঠিক হয়ে যাবে কমল।”
“আমি অনুমতি চেয়েছি।”
“কিসের অনুমতি?”
“কৃষ্ণকে এখান থেকে নিয়ে যাবো কলকাতা।”
“কিন্তু ভাইজান?”
“আমি ভাইজানকে বলেছি। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”
“এই কমল কাঁদিস না আমার ভাই। দেখ সব ভালো হবে।”
“হ্যালো। হ্যাঁ বলুন। কোথা থেকে বলছেন? ও আচ্ছা বলুন বলুন...”
বিমান কিছুক্ষণ ফোনের অন্যপ্রান্তের কোথা শুনতে শুনতে মুখের অভিব্যাক্তি বদলায়...
“কার ফোন ছিলো বিমানদা?”
“ভালো খবর, ভালো খবর।”
“নমস্কার। আজ গ্র্যান্ড ফাইনাল। আপনাদের সামনে ফাইনালে শেষ গান গাইবে স্পেশান এন্ট্রি কমল। আমরা কমলের মুখ থেকে কিছু কথা শুনে নেবো...”
“নমস্কার সবাইকে। আমি প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ জানাই আমার মতন অজ পাড়াগাঁয়ের একজনকে এই সুযোগ দেবার জন্য। আমি আপনাদের চোখে মানে সমাজের চোখে বিকৃতকাম, অপরাধী কিংবা কলঙ্ক কারণ আমি সমপ্রেমী। আসলে কি বলুন তো ভালোবাসা চিরন্তন, নির্মল। ভালোবাসা যেমন বর্ণ, ধর্ম, উচ্চ-নীচ থেকে হয়না ঠিক তেমনি লিঙ্গ দেখেও হয় না। আচ্ছা ভালোবাসা মানে কি জানেন? অনেকের মনেই ধারণা নেই। ভালোবাসা হলো দুটো হৃদয়ের একটা চাহিদা। ভালোবাসা দুটো স্বপ্নকে একসূত্রে বাঁধা। শত-সহস্র বাধাবিপত্তির মাঝেও শক্ত করে হাত ধরে পথ চলা হলো ভালোবাসা। হাজার দুঃখ-কষ্টর মাঝেও অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে যাবার নাম ভালোবাসা। আমি আমার ভালোবাসা কৃষ্ণের কাছ থেকে শিখেছি রূপ দেখে ভালোবাসা হয় না কারণ সেটা হলো বেছে নেওয়া। ভালোবাসা দেহ দেখেও হয় না কারণ তাকে লালসা বলে। টাকা দেখে ভালোবাসা যায় না কারণ সেটা লোভ। আমি একটা ছোট কবিতা শোনাই মানে আমার কৃষ্ণের লেখা কবিতা।
ভালোবাসা কাকে বলে জানো?
ভালোবাসা হলো একটা ধ্রুবতারা,
যে সহস্র মানুষের দঙ্গলে তোমাকে ঠিক খুঁজে নেবে।
ভালোবাসা হলো সকালের শিশিরস্নাত ঘাসে ওপর
দামাল প্রেমের ছাপ।
ভালোবাসা হলো মাঝরাতে তোমায় নিয়ে দেখা স্বপ্ন...
ভালোবাসা আসলে তোমাকে নিয়ে দেখা ছোট-বড় কল্পনা।
ভালোবাসা আমার ফেসবুকের টাইমলাইনে জ্বলজ্বল তোমার ছবি।
ভালোবাসা মোবাইলের হোম স্ক্রিনে তোমার হাসিমুখ ছবি।
ভালোবাসা বললে তোমার গালে আমার প্রেমের পরশ।
ভালোবাসা আমার কাঁধে তোমার হেলে থাকা।
ভালোবাসা দুইজনে মিলে দিগন্তে সুর্যাস্ত দেখা।
ভালোবাসা বলতে ভোরবেলা উঠে তোমার মুখ দেখা।
ভালোবাসা ঘুমোতে যাবার আগে তোমায় নিয়ে ভাবা।
ভালোবাসা হলো
শুধুই তুমি আর আমি, নির্জনে-নিরালার। আমরা দুইজন...
“আমি আজ সবার মঙ্গল কামনায় এই গান গাইছি।’
““তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে।।
তব, পূণ্য-কিরণ দিয়ে যাক্, মোর
মোহ-কালিমা ঘুচায়ে।
মলিন মর্ম মুছায়ে।
তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে।
“লক্ষ্য-শুন্য লক্ষ বাসনা ছুটিছে গভীর আঁধারে,
জানি না কখন ডুবে যাবে কোন্
অকুল-গরল-পাথারে!
প্রভু, বিশ্ব-বিপদহন্তা,
তুমি দাঁড়াও, রুধিয়া পন্থা;
তব, শ্রীচরণ তলে নিয়ে এস, মোর
মত্ত-বাসনা গুছায়ে!
মলিন মর্ম মুছায়ে।
তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে।”
“আছ, অনল-অনিলে, চিরনভোনীলে, ভূধরসলিলে, গহনে;
আছ, বিটপীলতায়, জলদের গায়, শশীতারকায় তপনে।
আমি, নয়নে বসন বাঁধিয়া,
ব’সে, আঁধারে মরিগো কাঁদিয়া;
আমি, দেখি নাই কিছু, বুঝি নাই কিছু,
দাও হে দেখায়ে বুঝায়ে।
মলিন মর্ম মুছায়ে।
তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে।
তব, পূণ্য-কিরণ দিয়ে যাক্, মোর
মোহ-কালিমা ঘুচায়ে।
মলিন মর্ম মুছায়ে।
তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে।”
সারা স্টেডিয়ামে পিন পড়লেও শব্দ শোনা যাবে। কিছুক্ষণ বাদে হাততালির শব্দে কান পাতা দায়।
“কি বুঝলেন ডাক্তারবাবু?”
“দেখুন একটাই ভালো লক্ষণ পেশেন্ট চিনতে বা আপনাদের রিলেট না করতে পারলেও কোথাও আপনাদের সঙ্গ চাইছে মানে কোথাও কিছু একটা মনে করতে চাইছে এবং সেটা কোনভাবে কমলই পারবে।”
“আমি পারব, আমাকে আমার কৃষ্ণের জন্য সব পারতে হবে।”
“হ্যাঁ রে আমার সোনা ভাই। দেখ সব ঠিক। কালু ধরা পড়েছে। তুই তোর কৃষ্ণকে ঠিক করে ভালো থাক।”
পরম মমতায় বিমলের বুকে মাথা রাখে কমল।
সমাপ্ত

