arijit bhattacharya

Inspirational

3  

arijit bhattacharya

Inspirational

ভোরের নতুন আলো

ভোরের নতুন আলো

5 mins
671


ঠিক সকাল ছটার সময়ই ঘুম ভাঙল অজিতের। কয়েকদিন আগেই আন্তর্জাতিক কোলকাতা বইমেলা শেষ হয়েছে,ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিক,সোনালী রৌদ্রকিরণ জানলা দিয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। বাইরে ফুরফুরে দখিনা বাতাস বইছে,কোকিল কুহু কুহু ডাকছে। গোলাপ আর পলাশে সেজে উঠেছে চারিদিক,সুনীল আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্রও নেই। প্রকৃতিরাণী নবরূপে নবসাজে সজ্জিতা হয়ে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনবার্তা ধ্বনিত করছেন।

কতো মনোরম সাজে সেজে উঠেছে শাল,শিমূল,মহুয়া আর পলাশের বন। পাহাড়কে আলো করে ফুটে উঠেছে রডোডেনড্রন। চারদিকেই অফুরান সৌন্দর্য,চারদিকেই অনাবিল আনন্দ। প্রকৃতি যেন প্রেমের গান গাইছে। কিন্তু এই স্বর্গীয় সঙ্গীত উপলব্ধি মানসিকতা ও সময় কোনোটাই নেই অজিতের। চারপাশের আনন্দমুখরিত উচ্ছল জলতরঙ্গে আজ সে বড়োই একা। একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা আর হতাশা তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। চারদিকে স্বর্গীয় পরিবেশ,কিন্তু বেকারত্ব আর অপমানের জ্বালায় অজিত আজ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন।চারদিকে শুধু আঁধার,এ এক অন্ধকারময় ভয়ঙ্কর রাত। সূচীভেদ্য আঁধার,এ আঁধারের কোনো শেষ নেই।


সময় বড়োই বিচিত্র। স্কুল ও কলেজ জীবনে অজিত ছাত্রহিসাবে খারাপ ছিল না। কিন্তু ক্লাস টেনে পড়ার সময়ই তার বাবা লিভার ক্যান্সারে মারা যায়। মা ও যেন কেমন। চিরকালই তাকে নিজের জীবনের বোঝা বলে মনে করে। মার ধারণা,অজিতকে ছোটবেলায় দেখভাল করতে গিয়েই তার নিজের ক্যারিয়ার ব্যর্থ হয়েছে। তাই অজিতের বেকারত্ব যতো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে,ততোই সে মায়ের দুচক্ষের বিষ হয়ে উঠছে।

মা তো বলেই দিয়েছে, কিছু করতে না পারলে অজিতকে ঘর থেকে বার করে দেবে। অজিতের মাঝে মাঝে মনে হয়,মা কারোর কথায় প্রভাবিত হয় নি তো! নিজের ছেলের সাথে এ কেমন বিমাতৃসুলভ আচরণ! যতো ভালোবাসা ছোট ভাইকেই,অথচ তার নিজের ভাগ্যে শূন্য। নিয়তি কোন্ দিকে নিয়ে যেতে চায় তাকে! আত্মীয় স্বজনরাও একই রকম। আগে যারা গুণগান করত,এখন তারাই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। সবার মুখে একটাই কথা , এ ছেলের কিছু হবে না। এ পুরো নষ্ট। ভস্মে ঘি ঢালা হচ্ছে। মা মাঝে মাঝে এমন কথা শোনায় যে,তাতে অজিতের পড়াশোনায় মনঃসংযোগ করাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

"তুই আমাদের সবার বোঝা"," তোকে জন্ম দেওয়াটাই আমার ভুল" এইসব কথায় অজিতের সমস্ত মনোবল যেমন ভেঙে পড়ে,তেমন নিজের জীবনটাই ব্যর্থ বলে মনে হয় তার।চোখের সামনে একরাশ অন্ধকার,সত্যিই আশা বলে আর কিছুই নেই।

লেখালেখি আর ফটোগ্রাফি অজিতের প্যাশন। এইদুটো ছাড়া সে বাঁচতেই পারে না,এদুটোই যেন তার কাছে অক্সিজেন। সম্প্রতি বইমেলায় তার একটা গল্পও বেরিয়েছে। অনেকেই তার লেখনশৈলীর প্রশংসা করে। কিন্তু এই জটিল পরিস্থিতির চক্রব্যূহে পড়ে তার এই দুটো জিনিসও বন্ধ হতে চলেছে। কিছু কিছু আত্মীয় স্বজন সমবেদনা জানায় , না এই পরিস্থিতি কেটে যাবে,ভালো দিন আসবেই। অজিত ঠিক ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তাদের সমবেদনার মধ্যে কৃত্রিমতার বাড়বাড়ন্ত নজর এড়ায় না অজিতের । অনেক বন্ধুই ভালো চাকরি করে,তাদের জীবনও সুন্দর। অজিতও বুঝতে পারে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন একটা ভালো চাকরি। তাহলে অনেক কিছু আপনা থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। প্রাইভেট টিউশনির পয়সায় হাতখরচ চলতে পারে কিন্তু তা দিয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা ও সমাজে খ্যাতি অর্জন করা সম্ভব নয়।

আধুনিক সমাজ বিত্ত আর ক্ষমতাকে মূল্য দেয়,গুণকে নয়। একটা ভালো চাকরি অত্যন্ত প্রয়োজন। তাতে যেমন সে সমাজের বুকে দাঁড়াতে পারবে,তেমনই নিজের প্যাশনগুলোও চালিয়ে যেতে পারবে। এমন কি একদিন আসবে,যেদিনে তার সম্পূর্ণ জীবন পরিবর্তিত হয়ে যাবে। আশার কিরণে ভরে যাবে তার অন্ধকারময় জীবন। অজিত কি জানে, ভোরের আগের অন্ধকার কতোটা ভয়ানক। কিন্তু অজিত এটাও জানে না যে,ভোর খুব কাছেই।


একটা কথা আছে, যতোই আঁধার হোক রাত্রি কালো,জানবে ততোই কাছে ভোরের আলো।না ,এবার উদ্যমের সময়। পরশুই তার কাছে মেল এসেছে যে সেক্টর ফাইভের এক নামী সংস্থা তার সিভিকে সিলেক্ট করেছে। তাকে ডাকা হয়েছে ইন্টারভিউয়ের জন্য। হ্যাঁ,আজ অজিত নিজের সেরাটা দেবে, যতোটা সম্ভব পজিটিভ থাকবে।

ট্রেনে যেতে যেতে প্রচণ্ড নার্ভাস লাগে অজিতের। সে কি পারবে ইন্টারভিউতে সফল হতে,অনেকটাই তো ভাগ্যের ব্যাপার। যদি এবারও সে ব্যর্থ হয়ে যায়,তাহলে কি হবে। অনেকের কাছেই উপহাসের পাত্র হয়ে যাবে সে।

টেনশনে আর নার্ভাসনেসে সকালের খাবার না খেয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় অজিত।

ইন্টারভিউতে একের পর এক রাউন্ড সাফল্যের সাথে পেরিয়ে অবশেষে সে শুনতে পায়," ইউ আর সিলেক্টেড ফর ফাইনাল রাউন্ড অফ ইন্টারভিউ।" আধঘন্টার ব্রেক পেয়েছে। ইন্টারভিউ এরিয়া থেকে বেরিয়ে মনটা বেশ ফুরফুরে লাগে অজিতের এতগুলো রাউন্ড তো সে পার করেছে। না তাকে পারতেই হবে এবার। বাইরে সন্ধ্যাবেলার ফুরফুরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। সন্ধ্যাবেলার আলোকোজ্জ্বল সৌন্দর্যময়ী সল্টলেক নগরী। দারুণ পরিবেশ। খাবার আর কোল্ডড্রিংস খেয়ে কিছুটা ফ্রেশ লাগে অজিতের। কিন্তু,এবারই যে ফাইনাল রাউন্ড। ফাইনাল রাউন্ডে না পারলে যে সব পরিশ্রম ধূলিস্যাৎ।মহাভারতে দানবীর কর্ণের মতো সারাদিন যুদ্ধ করে যদি রথের চাকা শেষমুহূর্তে মাটিতে বসে যায়,তাহলেই যে তার স্বপ্নের সলিলসমাধি। না,নিয়তিকে তার সাথে আর কোনো ক্রূর খেলা খেলতে দেবে না সে।


দাদুর কথা মনে পড়ল অজিতের। দাদু তাকে বলতেন,"পারব কি পারব না - সেটা বড়ো কথা নয়। নিজেকে খালি একটা কথাই বোঝাবি যে,তোকে পারতেই হবে।" দাদুর কথাগুলো নিজেকে বলে ইন্টারভিউয়ের ফাইনাল রাউন্ডের জন্য বসল অজিত।এখন দরকার সাহস,প্রয়োজন অনুপ্রেরণার।


ফাইনাল রাউন্ডের একের পর এক প্রশ্নের পরে যখন তার সামনে অফার লেটার টা দেওয়া হল,তখন অজিতের মনে আনন্দ আর ধরে না। না সে পেরেছে,এবার সে পেরেছে। হ্যাঁ,এমন একদিন এসেছে তার জীবনে, যেদিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্র তাকে সমস্ত বিপত্তি থেকে রক্ষা করেছে। ঘনীভূত আঁধার দূরীভূত হয়েছে। জন্ম নিয়েছে আশার নতুন কিরণ। ভবিষ্যৎ সবসময় মানুষের অজানা। নিয়তি কি খেলা খেলবে মানুষ জানে না,কিন্তু সে তো তার উদ্যম প্রয়োগ করতে পারে,কোনো ফলের চিন্তা না করেই নিরন্তর সঠিক কর্ম করে যেতে পারে।


পরে কি হবে সে জানে না, কিন্তু এই মুহূর্তটা তার একান্তই আপন,তার একান্তই নিজের। কোলকাতার কোলাহল পূর্ণ পরিবেশেও সে অনুভব করল বসন্তের ফুরফুরে হাওয়া, উপলব্ধি করতে পারল বসন্তপ্রকৃতির স্বর্গীয় সঙ্গীতকে। দু লাইন মনে পড়ল তার।" প্যার কে রঙ্গিন মৌসম জিস পল মে রহতে হ্যায়/ বক্ত কে সচ্চে নগমে জিস পল মে রহতে হ্যায়।"


মানুষের উচিত ফলাফল ভুলে পরিশ্রম করে যাওয়া । সঠিক উদ্যম থাকলে পরিস্থিতির যতোই চাপ থাকুক না কেন, ব্যর্থতা যতোই দীর্ঘস্থায়ী হোক না কেন, তার জীবনে এমন একদিন আসবে যেদিন সমস্ত ব্যর্থতা কেটে গিয়ে জন্ম নেবে আশার নতুন কিরণ, জন্ম নেবে নতুন উদ্যম, নতুন প্রেরণা।জন্ম নেবে সুন্দর ফুলের মতো নতুন স্বপ্ন।

আকাশের দিকে চাইল অজিত। অন্ধকার আকাশে স্নিগ্ধ হাস্যবদনে বিরাজ করছেন চন্দ্র,ঔজ্জ্বল্য বিকিরণ করছে নক্ষত্ররাজি। আকাশে ঘনীভূত মেঘের চিহ্নমাত্র নেই,আকাশ এখন সুনীল।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Inspirational