Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Piyali Chatterjee

Romance


4.5  

Piyali Chatterjee

Romance


ভালোবাসায় পাগল

ভালোবাসায় পাগল

15 mins 183 15 mins 183

(১)


প্রতিদিনের মতো আজ ও এলার্ম বাজার আগেই মা এসে ডাক দিলো,

:- "কিরে ওঠ কলেজ যাবি না?"

দু চার বার এপাশ ওপাশ করার পর ঝপ করে উঠে বসে পড়লাম বিছানায়। গতকাল স্যার একটা নতুন এসাইনমেন্ট দিয়েছেন একটি মানসিক হাসপাতালে গিয়ে একটি মানসিক রোগী কে পরীক্ষা করে রিপোর্ট তৈরি করতে হবে।

একটু দেরি হলেও ঠিক সময় বাস পেয়ে যাওয়ায় এ যাত্রায় রক্ষা পেলাম। হাসপাতালে পৌঁছেই দেখি বাইরে মালবিকা আমার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাকে দেখেই বললো,

:- "উফফ! কি যে করিস আজ ও দেরি। তাড়াতাড়ি চল সবাই পৌঁছে গেছে।"

একটি মিটিংরুমে সব ছাত্র ছাত্রী কে একটি করে ফাইল দেওয়া হলো। ফাইলে যার যার রোগীর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা রয়েছে। ফাইল পেয়ে সবাই যার যার কেস স্টাডি করতে লাগলো। দীপ্তি ও নিজের ফাইলটির প্রথম পাতা উল্টালো।

রোগীর নাম- সায়ন সেন

বয়স- ২৯

সায়ন কে দেখে দীপ্তি অবাক হয়ে কতক্ষন চেয়ে থাকলো সায়নের দিকে। হাসপাতালের পরিচ্ছদেও সে কোনো ছবির নায়কের থেকে কম সুদর্শন নয়। এই রকম একটি ছেলে মানসিক রোগী?

দীপ্তির সঙ্গে সায়নের যে ডাক্তার চিকিৎসা করছেন ডক্টর অভিজিৎ সে ও সায়নের ঘরে যায়। নিয়মিত ভাবেই অভিজিৎ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চলে গেলেন। দীপ্তি সায়নের মুখোমুখি বিছানার অপরদিকে বসলো। সায়ন একবার ঘুরে দীপ্তি কে দেখলো আবার অন্য পাশে ফিরে বসে রইলো।

দীপ্তি :- আমি দীপ্তি। তোমার কেস টা স্টাডি করছি। তোমার ব্যাপারে কিছু বলবে?

সায়ন :- আমার ব্যাপারে কিছু নেই যেটা আপনাকে বলা যেতে পারে।

এর আগে অনেক মানসিক রোগী কে দেখেছে দীপ্তি কিন্তু এত স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে সে কাউকে দেখেনি।

দীপ্তি :- আছে। কিভাবে তুমি এখানে এসেছো? তোমায় দেখে বা কথা শুনে তো মনে হয়নি যে তুমি অসুস্থ তাহলে এখানে কেন?

সায়ন :- হাহাহাহাহা। সেই তা বেশ বললেন। দেখে কি করে বোঝা যাবে বলুন তো যখন আমি তো আসলে পাগল নই আমাকে জোর করে রাখা হয়েছে এখানে পাগল সাজিয়ে।

দীপ্তি :- কিন্তু কেন?

সায়ন বলতে শুরু করলো-

সায়ন :- ছোটবেলা থেকে অনাথ আশ্রমে মানুষ হয়েছি আমি। বাবা, মায়ের ভালোবাসা কি কখনো বুঝিনি। ছোটবেলা থেকেই অনাথ আশ্রমে অর্পণের সাথে বন্ধুত্ব হয় আমার। অর্পণ আমার মতই ছিল সাহসী, স্পষ্টবাদী, পরোপকারী। কিন্তু একদিন সব খুশির অবসান ঘটলো যখন অর্পণ কে একটা বড় বাড়িতে সন্তানরূপে দত্তক নেওয়া হলো। অর্পণের বাবা, মা ভালো ছিলো তাই মাঝে মাঝেই আমার সাথে দেখা করতে দিত অর্পণ কে। যখন আমার তেরো বছর বয়স তখন একটি পরিবারে আমাকেও দত্তক নিয়ে যাওয়া হলো। আমাকে তারা পড়াশোনা করায়। আমাকে যারা দত্তক নেয় তাদের অনেক বছর পর নিজেস্ব সন্তান হয়। আমাকে ছোটবেলা থেকে মা ভালোবেসেছে ঠিকই তবে বাবা কখনোই আমাকে মেনে নিতে পারেনি মায়ের জোর করায় আমাকে দত্তক নেয়। ভাই আস্তে আস্তে যত বড় হতে থাকে ততই আমার প্রতি বাবার ঘৃণা টাও বৃদ্ধি পায়। এতটাই যে বাবা আমাকে মেরে ফেলার জন্য লোক লাগায়। একদিন বাবার ঘরে ঢুকতে গিয়ে শুনতে পাই বাবা ফোনে আমাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছে। কলেজ থেকে ফেরার পথে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে এমন টাই ছক কসেছিলো তবে অর্পণের সাহায্যে আমি অন্য প্ল্যান বানাই। অর্পণ বাড়িতে মিথ্যে খবর পাঠায় যে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বাসের সাথে ধাক্কা লাগে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় আমায় বাবা দেখতেও আসেনি আমাকে একবারের জন্যও। আমিও পাগল হওয়ার অভিনয় শুরু করি অর্পণের কথা মতো। কাউকে চিনতে না পারার অভিনয়। পাগল ভেবে আমাকে ওই হাসপাতাল থেকে এখানে পাঠানো হয়। এখানে ভর্তি করার পর বাবা আমার থেকে মুক্তি পেয়েছে। অর্পণ বললো মা ও ভাই কে নিয়ে সুখে আছে যতই হোক নিজের পেটের সন্তান।

দীপ্তি :- কাউকে কিছু বলোনি কেনো?

সায়ন :- কি লাভ বলুন তো? কেই বা আছে আমার? কার জন্যেই বা লড়াই করবো? কেউই তো নেই আমার। ছোটবেলায় বাবা মা কে ছাড়া বড় হয়েছি। অর্পণ একমাত্র বন্ধু আমার তবে তার সাথে আমার এখানেই দেখা হয়ে যায়। এই তো আপনি আসার আগেই ও দেখা করে গেল আমার সাথে।

দীপ্তি :- আমি আসছি। কাল আবার আসবো।

সায়ন :- হুম।

বাইরে বেরিয়ে দীপ্তি সোজা বাথরুমে চলে যায়। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান দীপ্তি সব রকম আদর ভালোবাসা পেয়েছে সে তার বাবা মায়ের কাছ থেকে তবে দুঃখ কে এত কাছ থেকে কখনো দেখেনি। কারুর জীবনে যে এত দুঃখ থাকতে পারে সে ধারণাও তার নেই। সায়নের জীবনী শুনে কেমন এক অদ্ভুত কষ্টে বুক ভরে ওঠেছে। দীপ্তি ঠিক করে যেভাবেই হোক সায়ন কে এই হাসপাতালের চার দেওয়াল থেকে মুক্তি দেবেই সে। যেই জীবনটা সে পায়নি যেই জীবনটা তার প্রাপ্য এমন একটা জীবন ও দেবে সে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়ে সে বাড়ির পথে।


(২)

হাসপাতালের একটি ঘরে শুয়ে শুয়ে সায়ন দীপ্তির কথা ভাবছে। আজ পর্যন্ত অর্পণ ছাড়া আর কাউকেই সে তার মনের কথা বলেনি। তবে হঠাৎ দীপ্তি কে দেখে কেমন এক আলাদা অনুভূতি হলো তার। এমন মায়ার চোখে আজ অব্দি কেউ তাকে দেখেনি। তার জন্য কেউ দু'ফোটা চোখের জল ফেলেনি। দীপ্তি কেন তার দুঃখের কথা শুনে শুধু শুধু চোখের জল ফেললো!

পরেরদিন দীপ্তি সাত সকালে সায়নের কাছে গিয়ে জানিয়ে দিল যে সে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে সায়ন কে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। দীপ্তির বাবা বড় ডাক্তার। বড় নেতা মন্ত্রীদের সাথে তার আলাপ সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে দীপ্তি।

দীপ্তি :- চিন্তা করো না। তুমি যে এই হাসপাতাল থেকে কোথায় গেছো সে বিষয়ে কেউ কিছু জানতে পারবে না।

সায়ন :- কিন্তু আমার এখানে থাকতে কোনো অসুবিধা ছিল না। আপনি কেনো এসব করতে গেলেন শুধু শুধু?

দীপ্তি :- তার মানে? তোমার মাথাটা বোধহয় সত্যি খারাপ হয়ে গেছে। তুমি এই ভাবে সারাজীবন কাটাতে চাও?

সায়ন :- আপনি বুঝবেন না। যার এই পৃথিবীতে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। সে যদি কোথাও আশ্রয় পায় দুবেলা দু মুঠো ভাত পায় তাহলে সেটাই তার কাছে সুখ।

দীপ্তি এবার বুঝতে পারলো যে এত অত্যাচার সহ্য করেও কেন সে কিছুই বলেনি কাউকে আর কি কারণে সে হাসপাতাল থেকে মুক্তি চাইছে না।

দীপ্তি :- আপনার থাকার কোনো অসুবিধা হবে না। একটু দাঁড়ান।

দীপ্তি সায়নের ঘর থেকে বেরিয়ে তার বাবা কে ফোন করলো।

বাবা :- হ্যাঁ মা বল।

দীপ্তি :- বাবা তোমাকে ওই রোগী টার কথা বলেছিলাম না?

বাবা :- হ্যাঁ আমি ওর ব্যাপারে কথা বলে নিয়েছি। ওকে কাল পরশুর মধ্যে সব কাগজপত্র তৈরি করে ছেড়ে দেবে।

দীপ্তি :- বাবা বলছি যে ওর কোনো থাকবার জায়গা নেই। ও যদি আমাদের বাড়িতে থাকে তাহলে কি তোমার অসুবিধা হবে?

বাবা :- আমাদের বাড়িতে থাকবে মানে? একি বলছিস তুই মা। একটা অচেনা ছেলে একদিন মাত্র আলাপ কি ভাবে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসবি তুই তাকে?

দীপ্তি :- বাবা প্লিজ। ওর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তুমি তো একজন ডাক্তার। এটা তো আমাদের কর্তব্য অন্যদের সাহায্য করা। প্লিজ বাবা না করো না।

বাবা :- ঠিক আছে ও আমাদের বাড়িতে থাকতে পারে। আমি জানি তুই যা করবি ভেবে চিনতেই করবি।

ফোন রেখে দীপ্তি সায়নের ঘরে গেল।

দীপ্তি :- এখান থেকে ছাড়া পেয়ে তুমি আমাদের বাড়িতে থাকবে। আমি আমার বাবার সাথে কথা বলে নিয়েছি।

সায়ন :- কিন্তু আপনি কেন?

দীপ্তি :- কোনো কিন্তু না। কিছু খেয়েছো?

সায়ন :- হ্যাঁ ওই যে বললাম এখানে আমার কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না। আচ্ছা আপনি আমার এত উপকার কেন করছেন?

দীপ্তি :- কারণ তুমি খুব ভালো মনের মানুষ আর এই জিনিসগুলো তোমার প্রাপ্য না। আচ্ছা তুমি কি তোমার বাবা মা কে কোনোদিনই দেখোনি?

সায়ন :- বাবার কথা মনে নেই তবে মা কে দেখেছি। যতদূর মনে আছে যখন আমার ছয় বছর বয়স হবে তখন আমায় মা সেই অনাথ আশ্রমে রেখে আসে। আমার মায়ের মুখটা এখনো মনে আছে।

দীপ্তি :- কি নাম ছিল তোমার মায়ের?

সায়ন :- সম্পূর্না রায়। মা অনেক ভালোবাসতো আমাকে। আমাকে যখন দত্তক নেওয়া হয় তখন ভেবেছিলাম একটা নতুন পরিবার পেয়েছি তবে এই পৃথিবীতে যে এত স্বার্থপর মানুষ আছে তা আমি জানতাম না। আচ্ছা ওরা তো আমাকে চলে যেতেও বলতে পারতো বলুন? আমাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা কেন করলো বলুন তো?

দীপ্তি :- সত্যি আমাদের আসে পাশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা শুধু নিজের স্বার্থটাই বোঝে। আমি আজ আসি কেমন? কাল আবার আসবো।

সায়ন :- না আপনাকে শুধু শুধু কষ্ট করতে হবে না। তা ছাড়া অর্পণ তো আছেই।

দীপ্তি :- আমাকে সাথে এই আপনি আজ্ঞে করে কথা বলতে হবে না। আর এইটা আমার দায়িত্ব একজন ডাক্তার হিসেবে। ভালো থেকো। 

(৩)

(হাসপাতাল থেকে ফোন)

দীপ্তি :- হ্যালো...

কণ্ঠস্বর :- আমি কি ডাক্তার দীপ্তি মজুমদারের সঙ্গে কথা বলছি?

দীপ্তি :- হ্যাঁ বলুন। আমি দীপ্তি বলছি।

কণ্ঠস্বর :- সায়ন চৌধুরীর সব কাগজপত্র তৈরি। আপনি ওনাকে নিয়ে যেতে পারেন আজ।

দীপ্তি :- হ্যাঁ আমি এখুনি আসছি।

ফোন কাটার পর দীপ্তির চোখে মুখে এক অন্য রকমের খুশির আভাস এলো। আজ থেকে সায়ন তাদের বাড়িতে থাকবে এটা ভেবেই সে অনেক খুশি হচ্ছে। ছোটবেলা থেকে সে বড়ই একা। মা বাবা ভালোবাসার কোনো খামতি রাখেনি ঠিকই তবুও কাউকে নিজের মনের কথা বলা, কারুর সাথে শৈশব ভাগ করে নেওয়ার মতো কাউকে পায়নি। মালবিকার সাথে তার কলেজে আলাপ তবে সে ও নিজের জীবন নিয়ে আর তার বন্ধু রাহুল কে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ওদের প্রেম টা ভারী মিষ্টি। সম্ভবত স্কুল থেকেই তাদের সম্পর্ক সে রোজই মালবিকার জন্য কলেজের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। মালবিকা রাহুল কে দেখে খুব ভালো লাগে দীপ্তির। তাড়াতাড়ি স্নান করে তৈরি হয়ে নিলো দীপ্তি।

মা :- কিরে এত সকাল সকাল উঠে কোথায় যাচ্ছিস?

দীপ্তি :- মা তোমাকে বলেছিলাম না সায়নের কথা ওকে আজ হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেবে। হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল। তুমি আজ ভালো ভালো রান্না করো কিন্তু। সায়ন কে দেখাতে হবে না আমার মা কত ভালো রাঁধুনি।

মা :- ওরে শয়তান মেয়ে। তুমিও তোমার বাবার মতো হয়েছো না? তোর বাবা যখনই কাউকে নেমন্তন্ন করে তখনই আমাকে বলে যে ওদের দেখাতে হবে না তুমি কত ভালো রাঁধুনি। তুই চিন্তা করিস না সাবধানে যা। আর শোন আমি উপরের ঘরটা মালতি কে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে রাখবো। সায়ন কে ওই ঘরেই থাকতে বলিস

দীপ্তি :- আচ্ছা আসছি আমি।

মা :- আরে কিছু খেয়ে যা।

দীপ্তি :- না মা আমি বাইরে খেয়ে নেব।

হাসপাতালে পৌঁছে দীপ্তি দেখলো যে সায়ন স্বাভাবিক জামা কাপড় পরে তৈরি হয়ে আছে। এই প্রথমবার সে অর্পণ কে দেখলো।

সায়ন :- আসুন। এই হচ্ছে অর্পণ। অর্পণ ইনি দীপ্তি।

অর্পণ :- ধন্যবাদ। আপনি এত উপকার করলেন কি ভাবে যে আপনার ঋণ শোধ করবো জানিনা।

দীপ্তি :- আমি কিছুই করিনি। আপনি না থাকলে হয়তো সায়নের আজ বেঁচে থাকার আশা টাও থাকতো না। নিন চলুন এবার। অর্পণ আপনি কিন্তু আসবেন আমাদের বাড়িতে এই নিন আমার বাবার কার্ড এর মধ্যেই আমাদের বাড়ির ঠিকানা রয়েছে।

অর্পণ :- অবশ্যই আসবো। ভালো থাকিস সায়ন। চল তোদের গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আমিও চলে যাবো।

দীপ্তি আর সায়নকে গাড়িতে উঠিয়ে অর্পণ চলে গেল। কিছুটা পথ এসে একটি শপিংমল দেখে দীপ্তি গাড়ি থামাতে বললো।

দীপ্তি :- দাদা ওই শপিং মলটার সামনে দাঁড়ান।

সায়ন :- শপিংমলের সামনে কেন?

দীপ্তি :- দরকার আছে।

(শপিং করতে গিয়ে দীপ্তি সায়নের জন্য কয়েকটা শার্ট নিলো)

দীপ্তি :- এই শার্ট গুলো পরে দেখো তো ফিট হচ্ছে কিনা।

সায়ন :- আমার জন্য নিচ্ছেন কিন্তু কেন? দেখুন আপনি এমনিতেই আমার জন্য অনেক করেছেন। এমনিতেই আমি আপনার কাছে ঋণী হয়ে আছি।

দীপ্তি :- দেখো তোমাকে কালকেই বলেছি আমাকে আপনি আপনি না করতে। আর যেটা বলছি সেটা করো। সময় হলে ঋণ শোধ করে দিও। না দিলেও অসুবিধা নেই আমি কোনো স্বার্থ নিয়ে কিছু করছি না। তুমি আমাকে নিজের বন্ধু মনে করতে পারো। দেখো বাবা মা ছাড়া আর কারুর সাথেই এত ভালো করে মিশতে পারিনি। তোমার মধ্যে আমি একটা বন্ধু খুঁজে পেয়েছি আমাকে পর ভেবো না।

সায়ন :- আচ্ছা দিন শার্টগুলো। আমি পরে দেখছি।

দীপ্তি :- আবার আপনি?

সায়ন :- আসলে অভ্যেস হয়ে গেছে। চেষ্টা করছি তুমি বলার।

দীপ্তি :- হাহাহা যাও তাড়াতাড়ি।

{১০ মিনিট পর}

জামাকাপড় কিনে তারা একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকলো।

সায়ন :- কি হলো বাড়ি যাবেন না? মানে যাবে না?

দীপ্তি :- সকাল থেকে কিছু খাইনি হাসপাতালের ফোন পেয়েই স্নান করে চলে এসেছি তাড়াতাড়ি। এখন কিছু না খেলে মাথা ঘুরে পরে যাবো।

সায়ন :- সে কি! আগে বলবে তো। জামা কাপড় না কিনে আগে খেয়ে নিতে পারতে।

দীপ্তি :- সে ঠিক আছে। মা কে বলেছি আজ ভালো ভালো রান্না করতে। এখন সাড়ে দশটা বাজছে চলুন এখানে ব্রেকফাস্ট টা করেনি।

সায়ন :- হ্যাঁ চলুন।

খাওয়া দাওয়া সেরে বাড়ি ফিরলো তারা দুজনে। সায়নকে তার ঘরটা দেখিয়ে দিলো দীপ্তি।

(৪)

বেশ কয়েকদিন পর-

দীপ্তির মা :- জানো ছেলেটা বেশ ভালো। ভদ্র, সভ্য, বড়দের সন্মান দিতে পারে।

দীপ্তির বাবা :- হ্যাঁ সেটা আমিও খেয়াল করেছি। দীপ্তি কে বেশ খুশি খুশি লাগছে বলো?

দীপ্তির মা :- হ্যাঁ গো ছোট থেকে তো আমাদের সাথেই কেটেছে। খেলাধুলো পড়াশোনা সবই এই চার দেওয়ালের মাঝে। জানো আমাদের মেয়ের মধ্যে যে এত মায়া মমতা আছে দেখে খুব ভালো লাগছে। ঠিক এইভাবেই তুমি আমাকে আর আমার বাবা মা কে এই বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলে একদিন। বাবার চিকিৎসায় যখন সব টাকা শেষ হয়ে যায় বাড়ির ভাড়া না দেওয়ায় যখন বাড়িওয়ালা আমাদের বের করে দেয় তুমি আমাদের আশ্রয় না দিলে যে কি করতাম।

দীপ্তির বাবা :- উফফ তুমি আবার সেসব দিনের কথা নিয়ে পড়লে কেন? আচ্ছা তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি সায়নের জন্যে দীপ্তি একটি চাকরির কথা বলেছিল। আমি আমার চেনা একজনের সঙ্গে কথা বলেছি ওনার নিজেস্ব ব্যবসা কলকাতার বুকে তিনটি অফিস তার মধ্যে কোনো একটি অফিসে সায়নের চাকরি হয়ে যাবে। তাছাড়া ছেলেটি বেশ ভালোই শিক্ষিত।

দীপ্তির মা :- এটা তুমি খুব ভালো করেছো গো। চাকরি টা পেলে ওর ও ভালো লাগবে সারাদিন বাড়িতে থাকতে ওর ও হয়তো ভালো লাগেনা।

*পরের দিন*

দীপ্তি :- আসতে পারি?

সায়ন :- হ্যাঁ আসো। তোমারই বাড়ি আর তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো আসবে কিনা।

দীপ্তি :- বাড়িটা আমার হলেও ঘর টা কিন্তু তোমার। কারুর ঘরে যাওয়ার আগে তার পারমিশন নেওয়া টা গুড মেনার্স।

সায়ন :- (হেসে) তোমার সাথে কোথায় পারা যায়না।

দীপ্তি :- হ্যাঁ তা ঠিক বলেছো। শোনো বাবা তোমার জন্য একটি চাকরি দেখেছে। সামনের সপ্তাহের মধ্যে তোমায় ডাকতে পারে। তোমার সব সার্টিফিকেট গুলো কোথায়? ওগুলো তৈরি রেখো কিন্তু।

সায়ন :- এই রে ভুলেই গেছি। সব সার্টিফিকেট গুলো তো অর্পণের কাছে। আমাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করেছিল জেনে আমি সব দরকারি কাগজপত্র আমার সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিলাম। হাসপাতালে ভর্তি করার আগে সেগুলো অর্পণ কে দিয়ে দিয়েছিলাম। আমি আজই ওর থেকে ঐগুলো নিয়ে আসবো।

দীপ্তি :- বিকেলে যেও আনতে এখন তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। একটা ভালো সিনেমা এসেছে আমরা সবাই মিলে দেখতে যাবো।

সায়ন :- আমি?

দীপ্তি :- হ্যাঁ তুমিও। আমরা সবাই যাবো। বাবা টিকিট কেটে এনেছে কাল রাতে। আমার প্রিয় নায়কের সিনেমা তাই বাবা এনেছে।

সায়ন :- তোমাকে আঙ্কেল অনেক ভালোবাসে না?

দীপ্তি :- হ্যাঁ অনেক। যাও এবার তাড়াতাড়ি দেরি হয়ে যাবে।

(সিনেমা দেখার পর রেস্টুরেন্টে খেয়ে দীপ্তি আর সায়ন অর্পণের থেকে সায়নের সার্টিফিকেট ও বাকি জরুরি কাগজপত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল)

চার দিন পর সায়ন কে ডাকা হলো চাকরির ইন্টারভিউয়ে এবং সায়নের পরীক্ষার মার্কশিট দেখে তাকে অনায়াসেই চাকরি দিয়ে দিলো তারা।

দীপ্তি :- হ্যালো, কেমন হলো ইন্টারভিউ?

সায়ন :- আমাকে ওরা সিলেক্ট করে নিয়েছে।

দীপ্তি :- বাহ! কি দারুন একটা খবর দিলে।

সায়ন :- এই সব কিছুর কৃতিত্ব তোমার। তুমি আমার জীবন টা কোথা থেকে কি করে দিলে। আমি তো ওই হাসপাতালেই জীবন কাটাতে রাজি ছিলাম। সত্যিই আমি চিরকালের জন্য তোমার কাছে ঋণী হয়ে থাকবো।

দীপ্তি :- উফফ সেই এক গান গেয়ে চলো তুমি সবসময়। আজ কে কিন্তু আমাকে ট্রিট দিতে হবে এত সহজে ছাড়বো না।

সায়ন :- হ্যাঁ নিশ্চই। বাড়ি ফিরে তারপর একটা প্ল্যান বানাবো। আজ সবাই বাইরে খাবো।

দীপ্তি :- সবাই না শুধু আমরা। মা আর বাবা দুদিনের জন্য কাকুর বাড়ি গেছে। পরশু ফিরবে। বাড়িতেই কিছু অর্ডার করে খেয়ে নেওয়া যাবে। তুমি অর্পণ কে ডেকে নাও। আমি এদিকটা সব দেখে নিচ্ছি।

(৫)

বাড়িতে দীপ্তি সায়নের চাকরি পাওয়ার সুবাদে একটি ছোট পার্টির আয়োজন করলো। সেখানে মালবিকা আর তার বন্ধু কেও ডাকলো। বাড়িতে নানা খাবার আনা হলো সাথে একটু মদ্যপানের ব্যবস্থা ও করা হলো। এর আগে কেউই কখনো নেশা করেনি অর্পণ ছাড়া। দু এক পেগ খেয়েই মাথা ঘুরতে শুরু করলো তাদের। দেখতে দেখতে রাত বাড়লো একে একে সবাই রাতের খাবার খেয়ে বিদায় নিলো।

সায়ন :- আমিও ঘরে যাই অনেক রাত হলো মাথা টাও খুব ঘুরছে।

দীপ্তি :- না দাড়াও।

সায়ন :- কি হলো আবার।

দীপ্তি :- বাবা মা নেই। তোমার ঘর টাও উপরে। নীচে আমি একা আমার খুব ভয় করছে।

সায়ন :- হুমম তাহলে?

দীপ্তি :- একটু পরেই তো সকাল হয়ে যাবে। ততক্ষণ না হয় জেগে থাকি?

সায়ন :- আচ্ছা।

দীপ্তি :- চলো ছাদে যাবে?

সায়ন :- এত রাতে?

দীপ্তি :- হ্যাঁ চলো না। এখানে এমনিও বোর হবো। বাইরে ভালো হাওয়া ও দিচ্ছে সময় ও কেটে যাবে।

(১০ মিনিট পর ছাদে)

দীপ্তি :- কেমন লাগলো নতুন অফিস?

সায়ন :- ভালো। সবই তো তোমার জন্য। এত কম সময় কত ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে আমাদের। জানো তোমার এই পরিবারটা দেখে খুব ভালো লাগে আমার। কাকু, কাকিমা কত ভালো।

দীপ্তি :- আর আমি?

সায়ন :- তোমার কথা কি বলবো? অনাথ একটা ছেলে আমি.....

কথা টা শেষ করার আগেই দীপ্তি সায়ন কে জড়িয়ে ধরলো।

দীপ্তি :- শোনো আজকের পর আর পুরোনো কথা বলবে না। এখন এটাই তোমার পরিবার বুঝলে। আমাদের কে ছেড়ে কক্ষনো যাবে না তুমি। আমরা একসাথে থাকবো সারাজীবন।

সায়ন :- কিন্তু দীপ্তি আমার সে যোগ্যতা নেই। আমার মতো ছেলের কাছে এটা একটা স্বপ্ন যেটা দেখা সহজ কিন্তু পাওয়া খুব কঠিন।

দীপ্তি :- আমি তোমায় ভালবেসে ফেলেছি সায়ন।

দীপ্তি আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না। সায়ন দীপ্তির হাতটা নিজের হাতে ধরলো।

সায়ন :- আমি যে তোমায় কতটা ভালোবাসি সেটা হয়তো বলে বোঝাতে পারবো না। শুধু তোমাকে না তোমাদের সবাই কে। কিন্তু জানিনা আমার ভাগ্যে তোমাদের সাথে থাকার সুখ আদেও আছে কিনা। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি দীপ্তি আমি যেদিন তোমার যোগ্য হয়ে যাবো সেদিন নিজে তোমার বাবার সাথে কথা বলবো।

দীপ্তি :- আমি নিশ্চিত তুমি পারবে।

দীপ্তি সায়নের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো। সায়ন দীপ্তির দিকে তাকিয়ে বাকি রাতটা কাটিয়ে দিলো।

(৬)


চাকরি পাওয়ার কিছু মাস পর সায়ন আর দীপ্তির বাড়িতে থাকেনি। একটা মেস ভাড়া করে কিছু মাস কাটায় এবং আস্তে আস্তে কিছু টাকা জমিয়ে একটা জায়গা কিনে বড় বাড়ি করে।

(৩ বছর পরে)

দীপ্তির বাবা কে সায়ন কিছু না জানলেও সে ঠিকই বুঝে যায় তাদের ভালোবাসার কথা। একটা ভালো দিন দেখে সায়ন ও দীপ্তির বিয়ে ঠিক করে ফেলে। একদিন দীপ্তি এবং সায়ন বিয়ের কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফেরার পথে একটি রেস্টুরেন্টে ঢোকে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিল মিটিয়ে বেড়াতে যাবে এমন সময় একটি অতি পরিচিত গলার আওয়াজ শুনে সায়ন থেমে যায়।

দীপ্তি :- কি হলো থেমে গেলে কেন?

সায়ন :- দীপ্তি এই গলা টা আমার খুব চেনা। আমার মায়ের গলা।

দীপ্তি :- মা? মানে যারা তোমায় দত্তক নিয়েছিলেন তিনি?

সায়ন (এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে) :- না দীপ্তি আমার মা। আমার জন্মদাত্রী মা।

ওই যে দীপ্তি ওই টেবিলে বসে আছে।

দীপ্তি :- যাও সায়ন মায়ের সাথে কথা বলো।

সায়ন :- কিন্তু দীপ্তি মা তো একা নেই। ওনার সাথে একজন ভদ্রলোক এবং একটি ভদ্রমহিলা ও রয়েছেন। তাছাড়া মা কি আমাকে চিনতে পারবে? মা যদি আমাকে চাইতো তাহলে কি আমাকে সেই অনাথ আশ্রমে রেখে আসতো?

দীপ্তি :- হয়তো কোন কারণ ছিল এমন টা করার পিছনে। এতবছর পর মা কে পেয়ে এভাবে চলে যাবে সায়ন? চুপ করে থেকো না যাও মায়ের সাথে কথা বলো।

সায়ন কয়েক পা এগিয়ে যাচ্ছিলো হঠাৎ তার মা তাকে খেয়াল করতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে তার দিকে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে।

সায়নের মা :- বাবা! কোথায় ছিলিস তুই এত বছর ধরে? কত খুঁজেছি তোকে বাবা আমার।

সায়ন :- তুমি তো নিজেই আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে মা।

সায়নের মা :- না বাবা। তখন আমি বাধ্য হয়ে তোকে অনাথ আশ্রমে রেখে আসি। তোর জন্মের পর তোর বাবা আমাকে ছেড়ে চলে যায়। ছ'বছর ধরে অনেক লড়াই করে তোকে বড় করে তুলেছিলাম। তোর বাবা একদিন হঠাৎ ফিরে আসে তার নতুন বউ কে নিয়ে এবং আমাদের কে রাস্তায় বের করে দেয়। তখন তোকে অনাথ আশ্রমে রেখে আসা ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিলো না রে।

সায়ন :- এত বছর তুমি কোথায় ছিলে মা?

সায়নের মা :- (টেবিলে বসা সেই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা কে দেখিয়ে বলে) আমি এনাদের সাথে ছিলাম। ক্ষুদা কষ্টে যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম তখন একদিন ওনারা আমাকে দেখতে পায়। ওনারা খুব ভালো মানুষ রে বাবা ওনাদের নিজেস্ব এনজিও আছে এরকম কত মানুষ কে পথের থেকে তুলে নিয়ে সেখানে ঠায় দিয়েছে এনারা। আমাকে সেই এনজিও তে একটা কাজ দেয়। ওনাদের কোনো সন্তান নেই আমাকে ওনারা নিজেদের বাড়িতেই রেখেছে সযত্নে।

সায়ন :- মা তোমাকে একজনের সাথে আলাপ করাবো আসো আমার সাথে।

সায়ন দীপ্তির কাছে নিয়ে যায় তার মা কে। দীপ্তি প্রণাম করে সায়নের মা কে।

সায়ন :- মা ও দীপ্তি আমাদের বিয়ে পরশুদিন।

সায়নের মায়ের চোখে খুশির চমক দেখা যায়। দীপ্তি আর সায়ন কে জড়িয়ে ধরে।

সায়ন :- মা আজ থেকে তুমি আমার সাথে তোমার নিজের বাড়িতে থাকবে। আমি অনেক ভালো চাকরি পেয়েছি মা। তোমাকে আমি আর দূরে থাকতে দেবো না।

সায়নের মা :- আসবো বাবা আমি তোকে আর হারাতে চাইনা। আজই আসবো আমি। চল ওনাদের সাথে দেখা করে আসি।

সেই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা কে সব জানিয়ে তারা বিদায় নিলো। দীপ্তির বাড়িতে গিয়ে দীপ্তির মা বাবার সাথেও সায়ন তার মায়ের পরিচয় করিয়ে দিলো। পরেরদিন টা বিয়ের তোড়জোড় করতেই কেটে গেল।

এতদিন সায়নের পাশে কেউ ছিল না তবে আজ তার মা তার পাশে থাকায় সে খুবই খুশি। দেখতে দেখতে সায়ন আর দীপ্তির চার হাত এক হয়ে গেল। আজ সায়ন আর দীপ্তির ফুলশয্যার রাত। সায়ন ঘরে ঢুকেই দীপ্তি কে দেখে আর চোখ ফেরাতে পারলো না।

সায়ন :- কি অপূর্ব লাগছে তোমায়। ঠিক একটা স্বপ্নের মতো।

দীপ্তি লজ্জায় মুখ লুকায়।

সায়ন তার কাছে গিয়ে কানে কানে বলে, "আগে পাগল না থেকেও পাগল হওয়ার অভিনয় করতে হয়েছিল তবে এখন সত্যি সত্যিই তোমার ভালোবাসায় পাগল হলাম।"

দীপ্তি সায়ন কে জড়িয়ে ধরলো। সায়ন ঘরের আলো নিভিয়ে দিলো।

  





Rate this content
Log in

More bengali story from Piyali Chatterjee

Similar bengali story from Romance