STORYMIRROR

Sanchaita Roy Chowdhury

Romance Inspirational Others

3  

Sanchaita Roy Chowdhury

Romance Inspirational Others

অন্যরকম ভালোবাসা

অন্যরকম ভালোবাসা

6 mins
170

                                              


অদৃত যখন বাড়ি ফিরলো, বাইরে তখন বজ্রবিদ্যুৎসহ মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। অদৃত দরজা খুলে দেখলো,একজন বৃদ্ধা মহিলা ঘরের মেঝেতে বসে আছেন,সে ঘরে ঢুকে একটু সামনে গিয়ে দেখলো, যে মাসি রান্না এবং ঘর পরিষ্কার করেন তিনি বসে আছেন। মাসি বললেন,'অদৃত বাবা তুমি এসে গেছো,আমি সেই কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। কতদিন পর এলে তুমি কলকাতায়।জানোই তো তোমার সাথে দেখা না করে যাই না আমি।'

অদৃত বলল,'মাসি আমি তোমাকে কতবার বলেছি তুমি মাটিতে বসবে না, আমরা যখন বসি না তুমি কেনো বসবে?'

মাসি বললেন,'আমরা কি আর ওই ওতো দামী সোফাতে বসতে পারি না কি! আমরা হলাম গিয়ে গরীব মানুষ,সাত বাড়ি কাজ করে খাই।আমরা ওই ওতো সুন্দর সোফাতে বসলে সোফা নোংরা হয়ে যাবে। আর তুমিতো নোংরা দেখতে পারো না।'

অদৃত বলল,'আবার সেই এক কথা। হ্যাঁ,আমি অপরিষ্কার দেখতে পারি না এই কথাটা ঠিক,কিন্তু তার মানে এটা নয় যে তুমি সোফায় বসলে সোফা অপরিষ্কার হয়ে যাবে। কোনো কাজই ছোট নয় মাসি। শোনো তুমিও খেটে খাও,আমিও খেটে খাই,আমরা দু'জনেই সমান। উঠে সোফায় বসবে চলো।আর এইসব কি গরীব বড়োলোক,মাসি শোনো দিনের শেষে আমরা সকলেই মানুষ।'

অদৃত মাসিকে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসালো। অদৃত বলল,'একটু চা হয়ে যাবে না কি?'

মাসি হেসে বললেন,'তুমি হাতমুখ ধুয়ে নাও আমি করে দিচ্ছি।'

অদৃত বলল,'পাগল নাকি।তুমি সারাক্ষণ কাজ করো, এখন একটু বিশ্রাম নাও। আর এরকম আবহাওয়াতে একটু চা না খেলে হয়।'


অদৃত চা করার সময় ভাবলো,'এতক্ষণ হয়ে গেলো আর্যকে তো দেখতে পাচ্ছি না। ঘরের দরজাটাও তো বন্ধ। মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো।একেবারে চা করে নিয়ে তারপর ডাকবো।' সে চা করে তিনটে কাপে চা ঢেলে, ট্রেতে চা ভর্তি কাপগুলি সাজিয়ে নিয়ে আসলো। চায়ের ট্রেটা টেবিলের ওপর রাখতেই মাসি দেখে বললেন,'একি তিনটে কাপ কেনো?'

অদৃত বলল,'কেনো?তোমার,আমার আর আর্যর।'

মাসি ভুরু কুঁচকে বললেন,'আর্য! সে কে?'

অদৃত বলল,'মানে?যে ছেলেটি আমার সাথে আছে এখানে। দাঁড়াও ওকে ডাকি,মনে হয় ঘুমোচ্ছে।' সে এই কথাটি বলতে বলতেই ঘরের দরজাটি খুলল।

মাসি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,'কি বলছো !আমি তো কাউকে দেখিনি।'

অদৃত ঘরের দরজা খুলে দেখলো , আর্য সত্যিই ঘরে নেই।

সে একটু চমকে উঠে বলল,'আর্য! কোথায় গেলো?'

তারপর কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে মাসিকে জিজ্ঞাসা করলো,'তুমি কখন এসেছিলে?তুমি যখন এখানে এসেছিলে তখন কেউ ছিল না এই ঘরে?ঠিক করে মনে করে দেখো,একটা বছর কুড়ির ছেলে ছিল না এখানে ?'

মাসি বললেন,'না , কেউ ছিল না তো।আমি তো প্রথমে কলিংবেল বাজিয়ে ছিলাম কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না দেখে তোমার দেওয়া ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ঘর খুলতে গিয়ে দেখলাম ঘর লক করা নেই,যদিও প্রথমে আমিও একটু অবাকই হয়েছিলাম কারণ তুমি তো সবসময় ঘর বন্ধ করে বেরোও,তারপর ভাবলাম হয়তো ভুলে গেছো।কিন্তু কই কাউকে তো দেখতে পাইনি। আর তাছাড়া কেউ যদি থাকতো তাহলে আমি এতক্ষণ আছি আমি জানবো না।'

অদৃত বলল,'এটা অসম্ভব ! কোথায় গেলো আর্য?'

সে পুরো ফ্ল্যাট তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলো, কিন্তু কোথাও খুঁজে পেল না আর্যকে।

সে তার ফোন থেকে আর্যকে বারংবার ফোন করতে থাকলো।কিন্তু আর্যর ফোনটা সুইচ অফ্ থাকার দরুন তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়ে উঠলো না। অদৃত মনে মনে ভাবলো,'কোথায় গেল আর্য আমাকে না বলে? একবার নীচে সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞাসা করবো? হ্যাঁ, সেই বরং ভালো হবে।'

অদৃত মাসিকে বলল ,'মাসি তুমি বোসো আমি নীচ থেকে একটু আসছি।একবার সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞাসা করে দেখি।'

মাসি বললেন,'আরে চা'টাতো খেয়ে যাও, নিজে হাতে করলে যে।'

অদৃত বলল,'তুমি খেয়ে নাও,আমি পরে খাবো।'





অদৃত নীচে সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞাসা করতে সে জানায় যে, আর্য অদৃত বেরোনোর কিছুমূহূর্ত পরই বেরিয়ে গেছে। অদৃত এইসব শুনে ভাবলো,'আর্য আবার পালিয়ে গেছে নাকি ?এত সাহস ওর হল কি করে?'

সে রাগের মাথায় ওপরে উঠে এলো। ঘরে ঢুকতেই মাসি বললেন,'কি বলল ওই সেকুরটি গার্ডো?'

অদৃত চেঁচিয়ে বলল,'ও মনে হয় আবার চলে গেছে।ওর এত সাহস হলো কি করে??? একবার দেখা হোক আমার সাথে, আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না তোমাকে আর্য।'

মাসি বললেন,'কি করবে এখন?'

অদৃত বলল,'খুঁজতে যাবো।'

মাসি বললেন,'কি?মাথাখানা খারাপ হল নাকি তোমার?'

অদৃত বলল,'হ্যাঁ,আমি এক্ষুনি খুঁজতে যাবো।'

মাসি বললেন,'শান্ত হও অদৃত বাবা। তুমি কেনো এতো অস্থির হয়ে পড়ছো।তোমাকে তো কখনো এতো অস্থির হতে দেখেনি। কে হয় ওই ছেলেটি? আরে ,ও তো কোনো ছোট ছেলে নয়।আর তাছাড়া এত ঝড়বৃষ্টির মধ্যে তুমি ছেলেটাকে কোথায় খুঁজবে বলোতো।'

অদৃত বলল,'না, তুমি ওকে জানো না।আমার কাছ থেকে পালাতে গিয়ে যদি কোনো বিপদে পড়ে তখন কি হবে?'




হঠাৎই কলিং বেলের শব্দ হলো। মাসি বললেন,'দাঁড়াও, আমি দেখছি।'

অদৃত বলল,'না, আমি দেখছি।'

অদৃত তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুলল, দরজা খুলতেই সে দেখলো আর্যকে। অদৃত তাকে দেখে ক্ষোভে ফেঁটে পড়ল, সে গম্ভীর গলায় একটু জোরে বলে উঠলো,'কোথায় গিয়েছিলে আমাকে না বলে?আবার পালিয়ে যাওয়ার ভাবনাতে ছিলে,তাইতো? এত সাহস হলো.. কি করে...?? কি হলো কথার উত্তর দাওওও.... ।'

আর্য চোখ নীচু করে বলল,'আমি যদি পালিয়েই যেতাম তাহলে আমি কেনো আবার ফিরে আসতাম?' অদৃতের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,'আমি আর কোথায় পালাবো? সত্যিই কি আমার কোনো পালানোর জায়গা আছে?' অদৃত এবার যেন তার নিজের মধ্যে ফিরলো।

অদৃত বলল,'তাহলে তোমার ফোন সুইচ অফ্ কেন ছিল?'

আর্য বলল,'আমার ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছে।'

সে দেখলো আর্যর সর্বাঙ্গ বৃষ্টির জলে ভেজা,তার সাথে আছে কিছু জিনিসপত্র।এইসব দেখেতো সে অবাক, সে এতক্ষণ এইসব কিছুই খেয়াল করেনি। অদৃত শান্ত হয়ে বলল,'কি হয়েছে আর্য? এইসব জিনিসপত্র কোথা থেকে পেলে? কোথায় গিয়েছিলে তুমি? তাছাড়াও তোমার চোখমুখ কেমন বসা বসা লাগছে।কি হয়েছে তোমার? এসো , ভিতরে এসো।' অদৃত আর্যকে নিয়ে এবং তার সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে ঘরে এলো।





অদৃত বলল,'মাসি,এই জিনিসপত্রগুলো একটু গুছিয়ে রেখে দাও।আর্য তুমি গিয়ে স্নান করে নাও।'

মাসি বললেন,'ঠিক আছে। আমি রেখে দিচ্ছি।'

আর্য অদৃতের কথা মতোন স্নান সেরে বেরোল।অদৃত বলল,'কিছু খাওয়া হয়েছে দুপুর থেকে? মুখটা দেখেতো মনে হচ্ছে কিছু খাওয়া দাওয়া হয়নি। তুমি বোসো আমি এক্ষুনি তোমার জন্য কিছু তৈরী করে দিচ্ছি।'

আর্য চুপ করে বসে রইলো।

একটু পরে অদৃত আর্যকে ম্যাগি বানিয়ে দিয়ে বলল,'আর্য খেয়ে নাও।'

এর মধ্যেই মাসি এসে বললেন,'অদৃত বাবা, আমি সব গুছিয়ে রেখে দিয়েছি।

অদৃত বলল,'ঠিক আছে।'

তারপর মাসি বললেন,' এই ছেলেটা কেগো? জানো ছেলে,তোমার জন্য আমার অদৃত বাবা কত চিন্তা করছিলো? তুমি কি গো কাউকে তো একটু বলে যাবে।'

অদৃত বলল,'উফ্,থাক না মাসি।'

মাসি বললেন,'থাকবে কেনো? আর কে ও বললে না তো।'

অদৃত বলল,'ও আমার ভাইয়ের মতো হয়। যাইহোক মাসি,এবার তুমি যাও।বৃষ্টিটা অনেকটা কমেছে,আর অনেকটা রাতও হয়ে এলো।'

মাসি বললেন,'হ্যাঁ,সেই ভালো আমি বরং এবার আসি।' এই কথা বলে মাসি চলে গেলেন।








অনেকক্ষণ পর অদৃত এসে আর্যর পাশে বসল। অদৃত আর্যর দিকে তাকিয়ে ভাবলো,'দেখে মনে হচ্ছে পালানোর চেষ্টায় ছিল না,কারণ যদি পালানোর চেষ্টায় থাকতো ,তবে আর ফিরে আসতো না। তাছাড়া,চোখগুলো দেখে মনে হচ্ছে খুব কান্নাকাটি করেছে। কি হয়েছে ওর? একবার জিজ্ঞাসা করবো;কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে? না আমাকে জানতেই হবে কোথায় ছিল।' আর্য দেখলো অদৃত তার দিকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়েই আছে, এবার একটু অস্বস্তি প্রকাশ করে বলল,'কিছু বলবেন?'

অদৃত বলল,'হুম্,কোথায় ছিলে?' অদৃত আর্যর একটু কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চাপা গলায় বলল,' না কি আবারও পালাচ্ছিলে?'

আর্য এবার ভীষণ রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো,'কতবার বলবো আমি পালাচ্ছিলাম না; আমার প্রতি আপনাদের বিশ্বাস নেই না।কারণ আমি তো ভালো পড়াশোনায় নই,আমি তো খারাপ ছেলে।আমার তো কিছু করার কোনো যোগ্যতাই নেই। আমি তো আর সবার মতোন সফল নই।' অদৃত তো আর্যর এইরূপ আচরণ দেখে অবাক। অদৃত বলল,'আর্য..'

আর্য বলল,'আপনিও কি আমার মতোন অপয়ার মুখ দেখতে চান না ,যদি না চান বলে দিন আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি।'

অদৃত এবার আর্যর হাত চেপে ধরলো।অদৃত বলল,'কি হয়েছে তোমার? আর এসব অপয়া টপয়া কি?আমি কেনো তোমার মুখ দেখতে চাইবো না?'

আর্য কাঁদতে কাঁদতে বলল,'আজ আমি আমার বাড়িতে গিয়েছিলাম,কিন্তু আমার বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। শুধু তাই-ই না উনি বলেছেন উনি আর আমার মুখদর্শন করতে চান না।'

অদৃত বলল,'কি??'

আর্যর মুখ থেকে সবকিছু শোনার পর অদৃতের আর্যর জন্য খুব খারাপ লাগলো। আর্য বলল,'আমি জানি না আমি কোথায় যাবো? কি করবো?'

অদৃত আর্যর মাথায় হাত দিয়ে বলল,'আমি তো আছি আর্য।তুমি আমার সাথে থাকবে।আর্য তোমাকে তোমার বাবার কাছে প্রমাণ করতেই হবে। তোমাকে দেখিয়ে দিতে হবে যে তুমিও পারো। আমি তোমার পাশে সবসময় থাকবো। তুমি তোমার যে কোনো বিপদে আমাকে পাশে পাবে, আমি কথা দিলাম।'

আর্য যেন কোথাও গিয়ে একটা ভরসার স্থল খুঁজে পেলো।না আর্যকে এতো আশা,ভরসা এর আগে কেউ কখনো দেয়নি।

আর্য বলল,'বলছি আমার পরীক্ষা পরের সপ্তাহে শুরু হবে , আজকে আমার বন্ধু ফোন করে বলল অ্যাডমিট কার্ড দিচ্ছে কলেজে,সেইজন্যই বেরিয়েছিলাম ,আর তারপর....। '

অদৃত তাকে থামিয়ে বলল,'আর্য,এরপর থেকে কোথাও গেলে আমাকে জানিয়ে যেও।'

আর্য বলল,'আচ্ছা। আজকে ভুল হয়ে গিয়েছে,আর হবে না এরকম। ওহ্,আরেকটা কথা আমি রাত্রিবেলা পড়লে অসুবিধা হবে না তো আপনার?'

অদৃত বলল,'না না আমার কোনো অসুবিধা নেই।'অদৃত বলল,'আর্য,আমাকে ক্ষমা করে দিও,আমার তখন ওইভাবে আচরণ করাটা ঠিক হয়নি।'

আর্য হেসে বলল,'না,আমি কিছু মনে করিনি। তবে সেই মূহূর্তে অল্প একটু রাগ হয়েছিল,তারপর ঠিক হয়ে গেছে।'

অদৃত হাসলো আর মনে মনে ভাবলো,'আমি সবটা না জেনেই কত খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি।ছিঃছিঃ!'অদৃত কিছুক্ষণ পর বলল,'আর্য আজকে রাত জেগে পড়ার দরকার নেই ,আজকে তোমাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে আর তাছাড়া তোমার মনটাও আজ ভালো নেই।তার থেকে বরং আজকে খেয়ে নিয়ে ভালো করে ঘুমিয়ে নাও, তারপর কাল থেকে মন দিয়ে শুধুই পড়াশোনা আর কোনো বাজে চিন্তা নয়। কেমন!'

আর্য অল্প হেসে বলল,'ঠিক আছে।'





 To be continued...................


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Romance