Participate in the 3rd Season of STORYMIRROR SCHOOLS WRITING COMPETITION - the BIGGEST Writing Competition in India for School Students & Teachers and win a 2N/3D holiday trip from Club Mahindra
Participate in the 3rd Season of STORYMIRROR SCHOOLS WRITING COMPETITION - the BIGGEST Writing Competition in India for School Students & Teachers and win a 2N/3D holiday trip from Club Mahindra

Anishri's Epilogue

Romance


3  

Anishri's Epilogue

Romance


অনাদৃতা (পর্ব ৯)

অনাদৃতা (পর্ব ৯)

20 mins 232 20 mins 232

'এই শহরের প্রতিটা সকাল নতুন স্বপ্ন দেখায় আমাদের... দেওয়ালে প্রতিটা আনাচেকানাচে লুকিয়ে থাকে হাজারো প্রেমহীনতার গল্প... এই ব্যস্ত শহরেও নেমে আসে নীলচে সন্ধ্যে... সবার অলক্ষ্যে ছুঁয়ে যায় তোমায় আমায়... আসে আরো একটা তারাখসা রাত... পৃথিবীর সমস্ত প্রেম-অপ্রেমের গল্প আঁকড়ে জেগে থাকে কেবল এই বোবা শহর...' (সংগৃহীত)

পথচলা আমার থাক, তোমার থাকুক শুধু পথ :

--------------------------------------------------------------------

বারবার মৈথিলীর ফোনটা বেজে যাওয়াতে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে আদ্বান... মেয়েটা তো কখনো এমন করে না... ফোন ধরতে না পারলেও ঘুরিয়ে ফোন ঠিক করে... এতক্ষণ ধরে ফোন করছে আদ্বান... মৈথিলী ফোন তো ধরছেই না, ঘুরিয়ে ফোনও করছে না... এইবার ফোন না ধরলে আদ্বান মৈথিলীর হোস্টেলের পথে পা বাড়াবে ভাবনা ভাবতেই ফোন ধরে মৈথিলী... আসলে মৈথিলী কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না... ওর জীবনের সাথে নিজেকে না জড়ানোর জন্য অনেকবার বোঝাবার চেষ্টাও করেছিল আদ্বানকে, কিন্তু সে বুঝলে তো !!! গুরুত্বই দিল না ওকে... কেমন করে যেন একে অপরের সঙ্গে প্রতিটা মূহুর্তে জড়িয়ে পড়লো... কান্নাভেজা ধীমে গলায় একরাশ ভয়মেশানো উদ্বেগ ভেসে আসে ফোনের ওপার থেকে....

মৈথিলী : বল...

আদ্বান : কি হয়েছে তোর !!! গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন !!! কাঁদছিলিস !!!

একটু ফোঁপানোর শব্দ এলো যেন ফোনের ওপার থেকে... তারপরে ধরা গলায় উত্তর ভেসে এলো,

মৈথিলী : কিছু বলার ছিল !!!

আদ্বান : কেন মৈথিলী !!! অকারণে তোকে ফোন করতে পারি না !!! আর তুই ফোন ধরছিলিস না কেন !!! আজ তন্বীও নেই, যে ওকে ফোন করব... Tension হয় আমার !!!

মৈথিলী : আমি তোর কে হই, আদ্বান !!! ঠিক কি সম্পর্ক তোর আর আমার মধ্যে !!!

আদ্বান : প্রশ্নটা কার মৈথিলী !!!

মৈথিলী : কেন !!!

আদ্বান : তোর এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই... কারন শর্তবিহীন কোনো ভালোবাসার নাম আজ পর্যন্ত আমাদের সমাজ দিতে পারে নি রে... নিঃস্বার্থ সব বন্ধন নামবিহীন হয়... আর এই নামবিহীন সম্পর্কগুলো কেমন জানি অদ্ভুত হয়, অজান্তেই চোখের কোণে ভালোলাগার জল এনে দেয়... তাই কেউ যদি তোর কাছে জানতে চায়, কি নাম দিবি আমাদের সম্পর্কের !!! তাদের অবলীলায় বলে দিস, 'কিছু সম্পর্কের যে নাম দিতে নেই'... রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি বলেছিলেন জানিস,

"আমি তোমাকে অসংখ্যভাবে ভালবেসেছি,

এক জীবনের পর অন্য জীবনেও ভালবেসেছি,

বছরের পর বছর, সর্বদা, সবসময়।"

শান্ত, গম্ভীর, স্বল্পবাক, চুপচাপ ছেলেটার মনের এই গভীরতায় মৈথিলী যে প্রতি মূহুর্তে একটু একটু করে নিমজ্জিত হচ্ছে, তা মৈথিলী বেশ অনুভব করে... একটা সময় কলকল করে কথা বলে মৈথিলী প্রায় নির্বাক হয়ে পড়েছিল... এখন সে আবার কলকল করে কথা বলে, প্রাণখুলে হাসে... তার এই প্রাণবন্ততা আর ওই মিষ্টি লাবণ্যে ভরা মুখটাই আদ্বানের প্রাণবায়ু হয়ে গেছে, সেটা আদ্বান এই অবুঝ মেয়েটাকে কি করে বোঝাবে !!! আদ্বানের তো কতো কথা বলার ছিল মৈথিলীকে, কত কথা জানারও ছিল... কিন্তু কিছু বলতে গেলেই তো ও আদ্বানের জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবে, যাতে আদ্বান কোনোভাবে ঠকে না যায়... তখন মেয়েটা নিজেও বাঁচবে না, আর আদ্বানের বাঁচার পথটাও চিরতরে বন্ধ করে দেবে... আদ্বানের চোখের ব্যকুলতাও তো পাগলিটার চোখে পড়ে না এখনো... না কোনো অভিযোগ নেই আদ্বানের তার জন্য... সবার জীবনের নিয়ম তো এক হয় না... তার উপর মৈথিলীর ওই বিভীষিকাময় অতীত... সেই ভয়, সেই আতঙ্ক ক্রমশঃ বাড়তে বাড়তে এসেছে ওর নিজের প্রতি এক তীব্র ঘৃণা আর উপেক্ষা... বড্ড অসহায় লাগছে আদ্বানের নিজেকে... এইসব কথাগুলোর জন্য ও আবার নিজেকে গুটিয়ে না নেয়... নিজের মনের দ্বন্দ্ব আর স্মৃতির বিভীষিকার রেশ যার এতদিন কাটে নি, যে বরাবর নিজেকে সরিয়ে রেখেছে, নিজের মধ্যেই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে- সে কি অন্য কারুর এইসব কথায় নিজের খোলস ছেড়ে বেরতে পারবে !! নাহহহ... আদ্বানকেই ওকে ঠান্ডা মাথায় সহজ করে বোঝাতে হবে... কিন্তু বুঝবে তো ??

মৈথিলী : তোর কাছেও উত্তর নেই... তাহলে আমি আঁখিকে কি বলব !!!

আদ্বান : আখ... আঁখি আমাদের মধ্যে কোথা থেকে এলো !!!

মৈথিলী : আমাকে ফোন করেছিল তো... আমাদের ওই ছোট্ট Trip-টা নিয়ে কথা বলার জন্য... বলছিল, এই বুধবার হবে Trip-টা... আমি বললাম, তুই তো পরশু চলে যাবি IIT Madras, Seminar-এ... দিন পনেরো থাকবি না... দিন কুড়ি পর Trip-টা করতে... রেগে গেল হঠাৎই... বললো, আদ্বান সব কথা শুধু তোকেই বলে কেন !! আমাকে বলে না, কোয়েলকে বলে না, রাহুলকে বলে না, সাত্যকিকে বলে না... শুধু তোকেই বলে... কে হোস তুই ওর ?? এবার বল, আমি কি বলব ওকে ??

আদ্বান : তুই এত কথা বলতে গেলি কেন !!

মৈথিলী : বলব না !! তোকে ছাড়া Trip-এ যাব, না কি !!

আদ্বান : ঠিক আছে... এত চিন্তা করিস না... এরপর ওর সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেব... তুই শুধু নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখ... এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়িস না যেন... বিপদ ঘটাবি তাহলে... যা গিয়ে শুয়ে পড়...

মৈথিলী : প্রেম পাখির মতো সরল... বাসা বাধার মতো গাছ পেলে আকাশ ছেড়ে নেমে আসে রে... আর হাজার উপেক্ষার পরেও মানুষ যেটা টিকিয়ে রাখতে চায়, তার নামই তো ভালোবাসা...

আদ্বান : কি বললি !!!

মৈথিলী : রুদ্র গোস্বামীর কবিতা রে...

আদ্বান : বাবা... আজ কি চাঁদমামা উঠে নি, না কি !!! আমার মেথি পাতা তার কাকতাড়ুয়াকে প্রেমের কথা বলছে !!

মৈথিলী : তুই কাউকে ভালোবাসিস আদ্বান !!!

আদ্বান : একটা কবিতা শুনবি, কবিতার নাম 'অপেক্ষা'

'এসো না দু'জনে মিলে মাধবীলতার রঙিন ঝাড়ে,

সবুজ দুর্বার গলিচায় বসে কল্পলোকে হারিয়ে যাই' 

                        (রচয়িতা : সাবেরা সুলতানা সুমি)

আচ্ছা, তোর কেমন মনের মানুষ চাই !! ডক্টর, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ, না কি তোর বাবার মতো শিক্ষক !!!

মৈথিলী : তোর মতো শিক্ষক হলেও চলবে... কিন্তু শুধুমাত্র সাদা পোশাকে নয়, রঙিন পোশাকে মোড়ানোও কিছু লাশ থাকে, যারা জীবিত থেকেও মৃত লাশ হয়ে আছে... তাই আমি যে আর কাউকে ভালোবেসে তার ক্ষতি করতে পারব না রে... সে চোর, ডাকাত, ছিনতাইবাজ হলেও নয়... আর সেটা তুই সবথেকে ভালো করে জানিস... তোর কাকে ভালো লাগে বললি না !!

আদ্বান : তোর রুদ্র গোস্বামীর কথাতেই উত্তর দিই,

'তোমাকে যেতে যেতে দিয়ে যাচ্ছি

মাথার পালক, হাতের বাঁশি...

কোনও একদিন চোখের জলের কাছে গল্প শুনিয়ো,

'ছেলেটা ভীষণ প্রেমিক ছিল"...

মৈথিলী : মানে !!!

আদ্বান : আমার একটা স্বপ্ন আছে জানিস... যদি কাউকে কোনোদিন ভালোবাসার কথা বলতে পারি... যদি পারি আর কি !!! হয়তো সেটা কোনোদিনই সম্ভব হবে না...

মৈথিলী : তুই শুধু কাউকে একবার ভালোবেসে দেখ, আদ্বান... তোর ভালোবাসা নিয়ে সব স্বপ্ন মৈথিলী পূর্ণ করবে...

আদ্বান : বাহঃ বাহঃ বাহঃ... প্রেম করব আমি, আর আমার প্রেম নিয়ে স্বপ্ন পূরণ করবি তুই !!! মানে মাথার Screw গুলো কি সব খুলে পড়ে গেছে !!

মৈথিলী : আরে বল না !!! কি স্বপ্ন রে !!

আদ্বান : যদি একদিন প্রেম আসে... সে আসবে নগ্ন পায়ে নূপুর পরে... একটা রঙিন ছাতার নিচে দু'জনে একসাথে সিক্ত হবো... গাছের সবুজ টিয়া পাখি যেমন তার ভালোবাসাকে আদরে ভরিয়ে দেয়, ঠিক তেমনই তাকে গভীর আলিঙ্গনে বেঁধে অধরে অধর ছুঁয়ে দেব...

(এবার যেন আদ্বানের গলাটাও ধরে এলো) আচ্ছা, একদিন কি সব ভুলে তার কাছে আসবি না, যে শুধু তোর অপেক্ষায় আছে !!!

মৈথিলী : আদ্বান !! তুই কাকে বললি কথাটা !!!

এবার ফোনের ওপারের একটা চাপা অব্যক্ত কান্নার আওয়াজে চমকে উঠলো মৈথিলী... ছোট্টবেলায় কান্নার খুব জোর থাকে... বয়স যত বাড়তে থাকে, কান্নার শব্দ আর চোখের জল সমানুপাতে কমতে থাকে... কমতে কমতে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ কাঁদে বটে... কিন্তু সেই কান্নায় না ঝরে চোখের জল, আর না হয় শব্দ... আর আজ যে আদ্বানের নিজেকে সামলানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে....

আদ্বান : মেথি, আমি এখন ফোনটা রাখছি রে...

মৈথিলী : তুই !! তুই কাঁদছিস আদ্বান !! মনে মনে কার জন্য এত ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছিস তুই !! বলবি না আমাকে !!!

আদ্বান : Bye... Good Night....

মৈথিলী : হ্যালো... হ্যালো আদ... আদ্বান !!! এইভাবে ফোনটা কেটে দিল !! কাঁদল কেন !!! আমি কাঁদার মতো কি বললাম !!! নাহহহ... কাল ওর সাথে কথা বলতে হবে....

University :

-------------------

মৈথিলী গাছের তলায় বসে চুপচাপ বই পড়ছিল... আঁখি আর কোয়েল ওর পাশে বসে...

আঁখি : আজ আদ্বান আসবে তো রে, মৈথিলী !!! না মানে, আদ্বানের সব খবর তো এখন তোর কাছ থেকেই পেতে হয়...

মৈথিলী : এইভাবে কেন বলছিস !!!

আঁখি : আচ্ছা মৈথিলী, আদ্বান তোকে Propose করেছে !!!

মৈথিলী : আঁখি Please... আমাদের সহজ বন্ধুত্বের মধ্যে এইসব এনে আমাদের সম্পর্কটাকে Complicated করিস না... এতে আমাদের মধ্যে কোনো বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তো উঠবেই না, উল্টে বন্ধুত্বটা শেষ হয়ে যাবে... Please...

আঁখি : বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে নি বলছিস !!! তোরা Committed নোস !!

নেপথ্যে : না ওঠে নি... আর Commitment-এর কথা কোথা থেকে এলো !! তুই Public Place-এ এইসব কথা কেন বলছিস !!

পেছন থেকে আদ্বানের গলা পেয়ে সবাই চমকে পেছনে তাকায়... বিশেষ করে মৈথিলী... ওর শিড়দাড়া দিয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল, চোখের কোলটা জলে ভরে গেল... আদ্বান আড়চোখে একবার মৈথিলীকে দেখে আদ্বান কেমন যেন অনুভব করলো, যেটা ওর আগে কখনো হয় নি... মৈথিলী কত অসহায়ভাবে আদ্বানকে হারানোর ভয়ে কেঁদে ফেললো... তাহলে কি মৈথিলীও মনের অন্তরালে কোথাও !! আদ্বান সরাসরি আঁখির চোখের দিকে তাকিয়ে মৈথিলীকে বলে,

আদ্বান : মৈথিলী, তুই আর কোয়েল এখান থেকে যা... আঁখির সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেব... ওর সাথে আমার কিছু কথা আছে... একা... যা তোরা এখান থেকে...

মৈথিলী একবার জোরে ফুঁপিয়ে উঠে ওখান থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যায়... এরপর আদ্বান সারাদিন কোথাও মৈথিলীকে খুঁজে পায় না... গোধুলিবেলার কনে দেখা আলোয় আতঙ্কিত আদ্বান মৈথিলীকে দেখতে পায় সোনাঝুড়ির জঙ্গলে... তখনও সে একা একা বসে ফোঁপাচ্ছে... আদ্বান মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল, মৈথিলীকে একবার খুঁজে পেলে বকবে... ভীষণ ভীষণ বকবে... কিন্তু যে অবস্থায় সে মৈথিলীকে খুঁজে পেল, তারপর তার মৈথিলীকে বকার কথা মাথা থেকেই বেরিয়ে যায়... ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মৈথিলীর পাশে বসে সামনের ক্যানেলের দিকে তাকিয়ে বলে,

আদ্বান :

নাই যদি বা এলে তুমি, এড়িয়ে যাবে তাই বলে ?

অন্তরেতে নাই কি তুমি, সামনে আমার নাই বলে ?

মৈথিলী : তুই ই ই !!! কখন এলি !!!

আদ্বান : এইমাত্র...

মৈথিলী : আদ্বান !! তুই কাঁদছিস !!! চোখগুলো এত লাল কেন !!

আদ্বান : কোনোদিন যদি এমন আসে, যে সারাদিন আমাকে তুই খুঁজে পেলি না... সেদিন বুঝবি, আমার চোখ লাল কেন !! আজ বুঝবি না...

মৈথিলী : Sorry... কিন্তু আমার ভালো লাগছিল না... আমি... আমি জানি, তুই আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছিস... অনেক কষ্ট সহ্য করেছিস... কিন্তু আমি যে কাউকে ভালোবাসতে পার...

আদ্বান : কখনো নিজের মনের কোণে উঁকি দিয়ে দেখেছিস !! কেউ সেখানে আছে কি না !! অন্ততঃ দিব্যান্ত আছে কি না !!

মৈথিলী : আমার চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবতে ভয় লাগে আদ্বান... চোখ বন্ধ করলেই সেই স্মৃতিগুলো... ওই স্মৃতিগুলো আমাকে বাঁচতে দেবে না রে... বাঁচতে দেবে না...

আদ্বান : বেশ তাহলে আসি... একসাথে যখন বাঁচতে পারব না... একসাথে মরি বরং... চললাম...

ক্রুদ্ধ আদ্বান উঠে দাঁড়ালে আকুল মৈথিলীও উঠে দাঁড়িয়ে আদ্বানের বাহু আঁকড়ে ধরে আদ্বানকে আটকায়... মৈথিলীর ছোঁয়া পেয়ে আদ্বান মূহুর্তের জন্য একবার চোখ বন্ধ করলো.. তারপর যখন চোখ খুলল, ওর চোখ থেকে যেন আগুন বেরচ্ছে... মৈথিলী একটু ভয়ই পেয়ে যায় আদ্বানের এই রূপ দেখে... আদ্বান এবার নিজের দুই হাতের শক্ত বাঁধনে মৈথিলীকে নিজের বুকের উপর এনে সরাসরি ওর চোখে চোখ রেখে শেষ লড়াই-এর জন্য প্রস্তুত হয়... আজ যে একটা সিদ্ধান্তে আসতেই হবে মৈথিলীকে- হয় সে জীবনকে আলিঙ্গন করবে, নয়তো আদ্বান মৃত্যুকে... তাই আজ জীবন আর মৃত্যু মুখোমুখি হয়েছে... বা মুখোমুখি হয়েছে কারুর স্বার্থপরতা, লালসার ভয়াবহ স্মৃতি আর দুটো সরল মনের নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব, ভালোবাসার বাঁধন...

মৈথিলী : কি করতে যাচ্ছিস তুই, আদ্বান !!!

আদ্বান : বিশেষ কিছু না... Bike-টা Full Speed-এ start দেব, তারপর সোজা Divider-এ গিয়ে মারব... একেবারেই সব শেষ...

মৈথিলী : (চাঁপা আর্তনাদে) আদ্বাননন....

আদ্বান : আরে... আমি বাঁচলাম কি মরলাম- তাতে তোর কি !!! তুই মর না তোর স্মৃতি নিয়ে... আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না... ছাড়... হাত ছাড় আমার...

মৈথিলী : নাহহহ... কক্ষনো না...

আদ্বান : ভালো থাকার অভিনয় করতে করতে আজ আমিও ক্লান্ত মৈথিলী... বিশ্বাস কর... ভীষনরকম ক্লান্ত... সবকিছু ছাড়তে ছাড়তে আজ নিজের এই শেষ কণাটুকুই বাকি পড়ে আছে...

মৈথিলী : নাহহহ আদ্বান... নাহহ... Please... আমি তোর ছোট থেকে ছোট আঘাতও সহ্য করতে পারি না... কিন্তু আমি তোকে কি দিতে পারব বল তো !!! কি আছে আজ আমার তোকে দেবার মতো !! একঘেয়ে রঙ... শূন্যতা... একাকীত্ব... কিছু নোংরা স্পর্শের যন্ত্রণা... আর ঘুমহীন দুঃস্বপ্নের রাত...

আদ্বান : তাহলে কেন আমার Emotion নিয়ে খেলছিস মৈথিলী !!! কেন নিজের Emotion নিয়ে খেলছিস !!! তুই যদি নিজেকে এইভাবে শেষ করে দিস, আমি কার কোলে নিজের ক্লান্ত মাথাটা রাখবো বলতো !!! মনখারাপ হলে কাকে নিঃসঙ্কোচে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরবো !! নিজেকে চেন মৈথিলী... নিজেকে চিনতে শেখ...

মৈথিলী : আমার হৃদয়ের আর্তনাদ আমি চিৎকার করে বলতে পারি না রে আদ্বান... আমার যে প্রথমবারে বিশ্বাস, ভালোবাসা মাটিতে আছড়ে পড়ে দলিত হয়েছে... সবসময়ই অবহেলা, অপমান, যা আমার প্রাপ্তির কথাই ছিল না, সহ্য করতে করতে তোর চোখের মায়াটুকু আমি পড়েও তোকে কিছু বলতে পারি নি... জীবনের সুদকষার অঙ্কে আমি যে বড্ড কাঁচা ছিলাম রে আদ্বান... বরাবরই অঙ্কে কোনোমতে ৩০-৪০ পেয়ে পাশ করতাম, জানিস... তাই তো অন্ধকারে এমন হোঁচট খেয়ে পড়েছি যে যার ক্ষত কোনোদিনও মেলাতে পারে না... আমি এই ক্ষতবিক্ষত নিজেকে কি করে তোর মতো মানুষের কাছে নৈবেদ্য দেব, বল তো !!!

আদ্বান : তুই কি রে !!! এত অবুঝ !!! আমি তোকে ভালোবাসি রে... মৈথিলীকে ভালোবাসি... তার অতীত, তার বর্তমান, তার ভালো, তার মন্দ মিলে গোটা মৈথিলীকে ভালোবাসে রে আদ্বান... হ্যাঁ, এই ভালোবাসার হয়তো তথাকথিত 'প্রেম' নামক সামাজিক নাম নেই... কারন, আমি তোকে শুধুই ভালোবাসায়, আদরে মুড়ে রাখতে চাই... তোর কাছ থেকে সমগুন ভালোবাসার প্রত্যাশা নেই আমার, আমি জানি তুই-ও সেরকম প্রত্যাশা রেখে আমাকে ভালোবাসিস না... কারন, তুই সেইভাবে ভালোবাসতেই জানিস না... ভালোবাসায় প্রত্যাশা এলে ভালোবাসার মানুষটার প্রতি দায়িত্ব আর ভালোবাসার গভীরতা দুটোই কমে... ভালোবাসার স্বার্থকতা সবসময়ই নিঃস্বার্থ এবং অপ্রত্যাশিত... আর সেই অসীম ভালোবাসার বিচ্ছেদ ঘটানোর ক্ষমতা কারুর থাকে না, ভালোবাসার মানুষটারও না রে... আমাদের ঠিক সেইরকম দু'জনের ভালোবাসার বাঁধন যে একটু একটু পরষ্পরকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে নিয়েছে, সেটা তুই বুঝতে পারিস না !! আজ প্রথমবার আদ্বান তোর কাছ থেকে কিছু চাইছে মৈথিলী... দিবি !!

মৈথিলী : কি চাস বল !!

আদ্বান : আজ শেষবারের মতো নিজের চোখের কার্ণিশ বেয়ে দু'ফোটা চোখের জল ওই দুঃসহ অতীতের জন্য শেষবারের মতো ফেলে এই লাল মৃত্তিকায় মিশিয়ে দে... একবার... আমার জন্য শুধু একবার সাহস করে চোখ বন্ধ করে দেখ- কি আছে তোর চোখের তারায় !!! Please... Please একবার চোখ বন্ধ কর...

আদ্বানের বুকের জামা আঁকড়ে ধরে অতি কষ্টে মৈথিলী চোখ বন্ধ করে... নাহহহ... কোনো বিভীষিকাময় স্মৃতি তার আঁখিপটে ভেসে ওঠে না... হঠাৎই যেন প্রেম এসে মৈথিলীর কানে কানে বলে যায়, 'তোরে না হেরিয়া প্রভাতের ফুল অকালে ঝরিয়া যায় !' (কাজী নজরুল ইসলাম)... মৈথিলীর চোখে ভেসে ওঠে আদ্বানের দেখা সেই স্বপ্ন....

ভেসে ওঠে নূপুর পায়ে ছমছম শব্দ করে সিক্ত পায়ে বৃষ্টিস্নাত হয়ে ছুটে আসা কল্লোলিনী মৈথিলী... সে এসে দাঁড়ায় আদ্বানের সামনে... নিঃসঙ্কোচে ধরা দেয় আদ্বানের গভীর বাহুবন্ধনে... ধীরে ধীরে প্রেমাসিক্ত হয় দুই তৃষিত অধর...

চমকে ওঠে বড় বড় চোখ করে আদ্বানের দিকে তাকায় মৈথিলী... আদ্বান চোখের ইশারায় জানতে চায়, কি দেখলো সে !!! কোনোমতে ঠোঁটদুটো নড়ে মৈথিলীর,

মৈথিলী : স্ব... স্বপ্ন...

আদ্বান : মৈথিলী, আজ আমার কিছু বলার আছে... হয়তো আজ না বললে আর কোনোদিনও তোকে বলা হবে না রে... মৈথিলী !!! মৈথিলীইইই !!!

মৈথিলীর স্নায়ু আর সহ্য করতে পারে না... আদ্বানের বুকে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারায় মৈথিলী... অসাড় মৈথিলীকে বুকে আগলে নিয়ে পরম মমতায় সোনাঝুড়ির জঙ্গলের মাটিতেই বসে পড়ে আদ্বান... বোঝে অতিরিক্ত উত্তেজনাই-এর কারণ... কিন্তু আপাত মানসিকভাবে শক্ত আদ্বানও আজ কেমন যেন দিশেহারা... ধীরে ধীরে গালে চাপড় মেরে বলে,

আদ্বান : মেথি পাতা... এই মেথিপাতা... চোখটা একটু খোল না Please... আর বলবো না এমন কখনো... তোকে ছেড়ে কোথাও যাবো না দেখিস... Please একটিবার চোখটা খোল... লক্ষ্মীটি !! মেথিপাতা... আআআ...

আদ্বানের মৃদু হাহাকার যেন গোটা জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ে... প্রকৃতি যেন দু হাতে আগলাতে চায় এই যুগল বন্ধুকে... গাছের পাতার খসখসানি যেন নিঃশব্দে বলে যায়,

“ভুল করে যদি ভালোবেসে থাকি ক্ষমিয় সে অপরাধ

অসহায় মনে কেন জেগেছিলো ভালোবাসিবার সাধ।"

                                            (কাজী নজরুল ইসলাম)


ভালোবাসার মানুষটার পাশে থেকে তার প্রতিকূলতাকে জয় করার মতো মানসিক জোর দেবার মনের মানুষ খুব কম দেখা যায়... তবে কিছু সংখ্যক মনের মানুষ পাবেন যারা শেষ পর্যন্ত প্রিয় মানুষটার জন্য লড়াই করে যায়...

একটুখানি সাহস আর মনোবল- 'যাই হয়ে যাক না কেন, আমি তোর পাশে আছি... দুজনে একসাথে Career-ও তৈরি করবো আর প্রতিকূল পরিস্থিতিকেও হার মানাবো... পাশের মানুষটার থেকে এটুকু সাহস পেলে আর কোনো কিছুর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না... অথচ এরকম হাতে গোনা খুব অল্প মানুষই আছে, যারা কথা দিয়ে কথা রাখে... শুধু ভালোবাসলে হয়না... ভালোবাসার মানুষটাকে সারা জীবন জন্য নিজের করে নেওয়ার জন্য চাই প্রচণ্ড মনোবল আর আত্মবিশ্বাস...

সোনাঝুড়ি :

-----------------

ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায় মৈথিলী... তাকে বুকে আগলে আকুলভাবে তাকিয়ে আছে আদ্বান... ধীরে ধীরে কাঁপা কাঁপা হাতে আদ্বানের গালটা একবার ছোঁয় মৈথিলী... আদ্বান হাত বাড়িয়ে একবার মৈথিলীর চোখের জলটা মুছতে যায়, কিন্তু তারপর দ্বিধায় হাত সরিয়ে নেয়... মৈথিলীর দিকে হাতে ধরা জলের বোতলটা এগিয়ে দেয়, মৈথিলী খুব আস্তে আস্তে কিছুটা জল খেয়ে নেয়... আদ্বান এই প্রথম ভেবে পাচ্ছে না যে, ও কি বলবে আর কি করবে !!! আপাতত মৈথিলীকে একটু ধাতস্থ হতে দেওয়া দরকার... মেয়েটা এখনও কেমন যেন ঘোরের মধ্যে আছে...

কিন্তু মৈথিলী এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে আদ্বানের দিকে তাকায়... চমকে ওঠে আদ্বান... মৈথিলীর চোখের ভাষা যেন বদলে গেছে... মৈথিলীর সব অব্যক্ত কথা সে অনায়াসে পড়তে পারে, তাই বুঝতে খুব একটা অসুবিধা যে হচ্ছে তা নয়... তবুও... আজ থাক... মেয়েটা বড্ড ক্লান্ত... ধাতস্থ হলেও এখনও একটু ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে মৈথিলী... আদ্বান একহাতের বাঁধনে শক্ত করে মৈথিলীকে আগলে রেখেছে... অন্য হাত মৈথিলীর হাতের উপর রাখা...

আদ্বান : তুই আজ বড্ড ক্লান্ত মৈথিলী... চল... তোকে হোস্টেলে দিয়ে আসি...ওখানে গিয়ে একটু Rest নিবি...

মৈথিলী : আমার... আমার কাছে কিছু জানতে চেয়েছিলি তুই... উত্তরটা শুনবি না !!!

আদ্বান : দরকার নেই... আমার বন্ধুত্বটুকুই আমাদের দু'জনের জন্য যথেষ্ট রে...

মৈথিলী আদ্বানের হাতটা নিজের দুটো হাতের অঞ্জলির মধ্যে নেয়... তারপর সেই অঞ্জলি নিজের বুকে আঁকড়ে ধরে বলে,

মৈথিলী : এই হাতের স্পর্শটা সবসময়ই একদম আলাদা ছিল... এমন স্পর্শ কেউ কখনো করে নি আমাকে... এই স্পর্শ ছিল নিখাদ বন্ধুত্বের, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার... এই স্পর্শ ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞার- সব বিপদ থেকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞার, সব ক্ষত মুছে দেবার প্রতিজ্ঞার... মান-অভিমান, ভালোবাসাকে আগলে রাখার প্রতিজ্ঞার... এই স্পর্শ ছিল একটা স্নেহের আশ্রয়ের, অনেকটা ওই সব বিষ নিজের অন্তরে ধারণ করে নীলকন্ঠ হবার মতো... যখনই ভেঙে পড়েছি, এই হাতটা নিজের বুকে টেনে আগলে নিয়েছে ছোট্ট শিশুর মতো... এই স্পর্শ আমাকে অনুভব করিয়েছে যে সব আলিঙ্গনে, সব স্পর্শে কামের গন্ধ থাকে না...

এতগুলো কথা একসাথে বলে একটু থামে মৈথিলী... আদ্বানের বাঁধন যেন আরো একটু দৃঢ় হয়... মৈথিলী একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে ক্লান্ত স্বরে বলে,

মৈথিলী : আমিও তো মানুষ, আদ্বান... কেউ আঁচড়ে, কামড়ে অশুচি করে দিলেও আমি মানুষ... আমারও মন আছে, অন্তর আছে.... (ক্ষণিক নীরবতা)... আর তাতে ভালোবাসার অনুভূতিও আছে...

আদ্বান : মৈথিলী.... কেন বারবার নিজেকে অশুচি বলিস !!!

মৈথিলী : বলতে দে আদ্বান... আজ তুই আমাকে আমার অন্তরের অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিস... আমি এইটুকু তো অনুভব করেছি যে, আমাদের সম্পর্কটা শুধুই বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়... বন্ধুত্বের থেকে আমাদের অনুভূতির, সম্পর্কের উত্তরণ ঘটেছে... কিন্তু আমার যে কিছুটা সময় লাগবে রে... আমি এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নই...

আদ্বান : তোকে কে এত তাড়া দিয়েছে রে... আমি সবসময়ই তোর পাশে থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করব... আমি জানি মৈথিলী, আমি তোর জন্য যতটা না লড়েছি... তার থেকেও অনেক অনেক লড়াই তুই একা একা লড়েছিস... তোর শরীরের ক্ষতর থেকেও তোর মনের, তোর ভেতরের ক্ষতটা তোকে তিলে তিলে দগ্ধ করেছে... কেউ বোঝে নি তোকে, তুই কাউকে বুঝতেও দিস নি... শুধু একা একা পুড়েছিস... শুধু একবার আমাকে বিশ্বাস করে দেখ, একবার ভরসা করে দেখ... অনেক তো নিজের পরীক্ষা নিলি... (মৃদু হেসে)... আমাকে ভালো রাখতে গিয়ে আমারও পরীক্ষা নিয়েছিস... আরো একবার পরীক্ষা নিয়েই দেখ না, আমাদের বাঁধনের জোর কতটা !! আমাদের সম্পর্কটা ভালোবাসার না বন্ধুত্বের- এত ভাবিস না... আমাদের বাঁধনের উপর শুধু তুই একটু ভরসা রাখ... দেখ, সব ঠিক হয়ে যাবে...

মৈথিলী : কিন্তু আদ্বান... আমি যে তোকে ভা...

মৈথিলীর ঠোঁটের উপর নেমে আসে আদ্বানের আঙুলের বারণ... আদ্বানের চোখে ফুটে ওঠে আশ্বাসের নীরব বাণী....

আদ্বান : আজ না মৈথিলী... আজ তুই বড্ড ক্লান্ত হয়ে আছিস... তোর আরো কিছুটা সময় লাগবে আমি জানি... আর এটাও জানি, তুই আমাদের এই বাঁধন ছিঁড়ে কোথাও যাবি না... যেতে পারবিই না... তাই আমার কোনো তাড়া নেই রে... আমার উপর ভরসা রাখ... আমি সব ঠিক করে দেব... তারপর একদিন যদি খুব সকালে তোর ঘুম ভাঙে আর তোর মনের জানালাটা খুলে দিস... দেখবি দখিনা বাতাস হয়ে আমি

তোর হৃদয়ে শিহরণ জাগাবো, তোর এলোমেলো চুলে ঢেউ তুলে তোকে উতলা করবো... আর তুই প্রশয় দিয়ে আমাকে বুকে আগলে নিবি... কিন্তু আজ থাক...

মৈথিলী আদ্বানের বুকে আছড়ে পড়ে ওকে আঁকড়ে ধরে রুদ্ধ আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়ে... আদ্বানের ভালোবাসার বাঁধন বরাবরের মতোই তাকে আগলে নেয়, ছোট্ট মেয়ের মতো বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে... আদ্বানের চোখও সিক্ত হয়ে ওঠে... তবুও আদ্বান জানে, এক দীর্ঘকালীন প্রখর দাবদাহের পর আদ্বান মৈথিলীর জীবনে বর্ষা হয়ে এসেছে... তাই ওর স্নেহের আশ্রয়ে এইটুকু তো বারিধারা ঝরবেই... তবে মৈথিলী ঠিক একদিন সব অতীত ভুলে আদ্বানের কাছে আসবে... ওই যে বর্ষাসিক্ত পায়ে পায়ে রুনঝুন রুনঝুন নূপুর পরে... এইজন্যই বোধহয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন,

"প্রত্যেকটি ঝরে যাওয়া ভালবাসার জায়গায় আবার তেমনি একটি করে ভালবাসা জন্মায়.."


কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায় !

-----------------------------------------------------------------------

মৈথিলী সাধারণত ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠে না... বরং রাত জেগে পড়তেই বেশি ভালো লাগে ওর... কিন্তু কাল ফিরে এসেই শুয়ে পড়েছিল... তন্বী কোনোপ্রকারে ওর মুখে দু'মুঠো ভাত ভরে দিয়েছিল... আজ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে মৈথিলী... তন্বীর বরাবরই আবার ভোরে ওঠা অভ্যেস... ভোরে উঠে প্রাণায়াম করা অভ্যেস ওর... প্রাণায়ম করতে করতেই একটা চোখ একটু ফাঁক করে দেখে মৈথিলী উঠে ধীর পায়ে জানলার পাশে দাঁড়াল... চুপ করে জানলা দিয়ে আসা দখিনা বাতাস অনুভব করে... ওই হাওয়াতে ওর চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে, এলোমেলো করে দিচ্ছে ওর গায়ের ওড়না... মৈথিলী চোখ বন্ধ করে সেই হাওয়া অনুভব করে, ঠোঁটে মৃদু হাসির একটা আভাস...

'বিচ্ছেদ যদি আঁকো,

দুই পাড়ে দুটি মানুষ আর মাঝখানে সাঁকো,

নদীটির নাম অভিমান,

তার মাঝে ভালোবাসা চুপিচুপি বহমান'

তন্বী একটু অবাকই হয়... এত শান্ত, এত স্নিগ্ধ সে কখনো দেখে নি মৈথিলীকে... বরং মৈথিলীর ভেতর সবসময়ই একটা অশান্ত ভাব থাকতো... পরে আদ্বান যখন ওর কাছ থেকে সাহায্য চাইলো, তখন ওর জীবনের অনেকটাই ও জানতে পেরেছিল আদ্বানের থেকে... যদিও ততদিনে ওর মৈথিলীর প্রতি একটা ভালোবাসা জন্মে গেছে... তাই নিজের মন থেকেই অনেকটাই ভালোবাসা দিয়ে মৈথিলীকে ও আগলে রাখে... মুখে কিছু না বলে একটা দুষ্টুমি ভরা হাসি হেসে ও আবার প্রাণায়ামে মনোনিবেশ করে...

কিছুক্ষণ পর University যাবার ব্যাগ গোছাতে গোছাতে লক্ষ্য করে মৈথিলী আলমারি থেকে একটা সুন্দর হাল্কা নীল-গোলাপী সালোয়ার কামিজ বের করে রাখলো... যে মেয়েকে সবসময় আগলে রাখতে হয়, যত্নে রাখতে হয়- সেই মেয়ে আজ নিজের থেকে একটা সুন্দর জামা বের করলো পড়বে বলে... তন্বী আবার নিঃশব্দে সবকিছু লক্ষ্য করতে লাগল... মৈথিলীর এলে তন্বী এবার পেছন থেকে ওকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে মৈথিলীর কানে কানে বলে,

"মাঝে মাঝে তোমার কথা ভাবি

আকাশে জমেছে মেঘ, বাতাসে বৃষ্টির গান

রাত্তির বড় দীর্ঘ, কিছুতেই ঘুম আর আসছে না...

একবার এপাশ, একবার ওপাশ আর

বিশ্বচরাচর জুড়ে… নিথর স্তব্ধতা..."

মৈথিলী মৃদু হেসে নিজের চুল খুলে আয়নার সামনে ক্ষণিক নিজেকে দেখে... মৈথিলীর মনে পড়ে না, শেষ কবে সে এতো মনোযোগ দিয়ে নিজেকে দেখেছে... তন্বী একটা ছোট্ট গোলাপী টিপ, আর একটা সরু Black Polish Bangles এগিয়ে দেয় মৈথিলীর দিকে... তন্বীকে অবাক করে মৈথিলী নিজেই একটা হাল্কা Lip Balm হাল্কা করে লাগিয়ে নেয়... এবার তন্বী মৈথিলীকে কাছে টেনে বিছানায় বসায়...

তন্বী : দেখ মৈথিলী, আমি কোনোদিন তোকে আর আদ্বানকে নিয়ে কথা বলি নি... কিন্তু আমি তাদের দু'জনেরই বন্ধু, তোদের দু'জনকেই ভীষণ ভালোবাসি... তাই আজ কিছু কথা বলব মন দিয়ে শুনবি... দেখ, সময় সবসময় আমাদেরর পক্ষেই কথা বলবে এটা ভাবা ভুল... হয়তো আজ তোর এই অবহেলিত ভাবনাগুলোই তোকে একদিন শেষ করে দেবে... কাজেই সময় থাকতে ভালোবাসার মানুষটার অনুভূতিগুলোকে মূল্যায়ন কর... নিজের অন্তরে অনুভব কর... যে মানুষটা তোর অবহেলা প্রতিনিয়ত সহ্য করেও তোমার পাশে থাকছে বলে ভাবছিস মানুষটা সস্তা, আসলে মানুষটা সস্তা নয় বরং মানুষটা তোমাকে হারাতে চায় না !!

মৈথিলী : আমি কাউকেই সস্তা ভাবি না রে !! সত্যি বলতে কি, আমার মতো সস্তা কে আছে বল তো !!! এমনকি আমার পুরোপুরি সুস্থ হবার সম্ভাবনাও নেই... একটা স্বাভাবিক মানুষকে আমার এই জীবনের সাথে জড়ানোটা...

তন্বী : দেখ, তোর জীবনের একটা পর্যায় ভীষণ খারাপ গেছে সেটা ঠিক... সেই পর্যায় যে কোনো মানুষের উপর দিয়ে গেলে সে ঠিক কতটা বিপর্যস্ত হয়, সেটা যাদের উপর দিয়ে যায় না তাদের পক্ষে সবটা অনুধাবন করা সত্যিই সম্ভব নয়... তাই বলে, ওই একটা ঘটনার উপর ভিত্তি করে তোর গোটা জীবনটা তো বেরঙীন হয়ে যেতে পারে না... জীবন যেখানে তোকে দুই হাত বাড়িয়ে আহ্বান করছে... তোকে হারানোর ভয় নিয়ে যদি এমন কেউ তোমার পাশে থাকে তাহলে তুই অনেক ভাগ্যবতী... ভাগ্য ভালো না হলে জীবনে এমন মানুষ পাওয়া যায় না... তবুও যদি ঐ মানুষটার দূর্বলতাকে পুঁজি করে তুই তাকে ক্রমাগত আঘাত করে যাস তাহলে তুই সত্যিই বোকা !!

মৈথিলী : আমি আদ্বানকে আঘাত করি !!

তন্বী : অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও করিস না কি !! ও তোকে স্বাভাবিক দেখতে চায়, নিজের মনের মানুষ করতে চায়... আর তুই !! তোর অতীতকে সবসময়ই তোদের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেওয়াল করে রেখে দিস... কারো দূর্বলতার সুযোগ পেয়ে যখন তুই নিজের ইচ্ছামতো তাকে আঘাত দিস, কষ্ট দিস তখন ওই মানুষটার সহ্য করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না... মানুষটা হয়তো মুখে কিছুই বলবে না কিন্তু সে মনের ভিতরে ঠিকই কষ্ট পুষে রাখে যা তুমি বুঝতে পারিস না !! তোমর করা এই অন্যায় অবহেলাগুলো মানুষটার মনে ধীরে ধীরে জমা হয়ে বাড়তে থাকে... সবকিছু সহ্য করতে করতে একটা সময় মানুষটা যদি হাপিয়ে ওঠে...

তন্বীর কথাগুলো শুনতে শুনতে মৈথিলী যেন নিজের মধ্যেই হারিয়ে যায়... আদ্বানকে নিজেকে দিয়ে অনুভব করতে থাকে... জলভরা চোখে আত্মমগ্ন হয়ে বলে,

মৈথিলী : ধীরে ধীরে যখন মানুষটা বুঝতে শুরু করবে যে সে তোমাকে পাওয়ার জন্য নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে... মানুষ ঠিক তখনই ভয়ঙ্কর রূপে পরিণত হয়ে যায় আর সেই রূপটা কারোর জন্যই শুভ নয়... ঠিক এমনটাই তো আমার সাথে হয়েছিল... ঠিক এইরকম ভয়ঙ্কর আমিও হয়ে উঠেছিলাম জানিস শেষদিকে, ওই ঘটনার পর... এত Mood Swing হতো আমার, এত রেগে যেতাম- দিব্যারা আমার কাছে আসতে ভয় পেত... কতবার তো রেগে নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছি, ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছি নিজেকে... আসলে সবাই হয়তো ভাবে মানুষটা সবসময় এমনই থাকবে, তোমার অন্যায় অবহেলা সহ্য করে চলবে, কিন্তু সেটা আসলে ভুল ভাবনা... সবকিছুরই একটা মাত্রা থাকে, যেটা অতিক্রম করলে তার ফল কখনো ভালো হয় না... তুই যখন প্রতিনিয়ত একইভাবে অন্যায় করতে থাকবি তখন মানুষটা ধীরে ধীরে নিজেকে বুঝতে শুরু করে দেয় আর তারপরেই মানুষটা কঠিন রূপে পরিণত হয়ে যায় !! আর সেই যে কঠিন হয়, তারপর সে আর নিজেকে খুঁজে পায় না !!

তন্বী : না মৈথিলী... কেন খুঁজে পাবি না তুই নিজেকে !!! তোকে বুঝতে হবে পৃথিবীতে কয়েকশো কোটি মানুষের মধ্যে সে তোকেই কেন এতো ভালোবাসে !! সে তোর সব ভুলগুলোকে শুধরে দিয়ে, তোর সব যন্ত্রণাকে আপন করে নিয়ে তোকেই আপন করে রেখে দিতে চায় তার জীবনে... তোমাকে বুঝতে হবে কেন তোর প্রতি তার এতো মায়া, যে মায়া দুনিয়ায় আর কারো প্রতি আসে না !!!

মৈথিলী : কিন্তু কোনোদিন যদি সব সত্যি সবার সামনে চলে আসে... সেদিন সমাজের সম্মুখীন...

তন্বী : শোন, এত ভয় পাবি না কখনো... ধৈর্যহারা হবি না, নিজেকে শক্ত করে তৈরি কর... দিন শেষে তোমার তুমিকে ভালো রাখার দায়িত্ব শুধুই তোর... দিন শেষে তোমার তুমিকে বড্ড প্রয়োজন... তোর ভালো থাকা, মন্দ থাকার দায়িত্ব শুধু তোর... তোমার তুমিকে ভালো রাখার জন্য তোমার তুমিই যথেষ্ট, অন্য কারো প্রয়োজন নেই !! সমাজের তো নয়ই... তোর খারাপ সময়ে সমাজ তোর পাশে ছিল !! তিন তিনটে বছর তোর লড়াইটা তুই একা লড়েছিলিস... আজ যখন জীবন, ভালোবাসা তোর দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন কারোর কটু কথায় ভেঙে পরবি না... লোকের সব কথায় কান দিতে নেই রে... বাঁচতে হলে নিজের জন্য বাঁচ... নিজের যা ভালো মনে হবে তাই কর... এই যে আজ আয়নাতে তুই নিজের দিকে তাকালি, এইটা তোর অনেক আগেই করা উচিত ছিল... আমি জানি না, আজ তুই নিজের জন্য সাজলি না আদ্বানের জন্য... হয়তো তুই নিজেও জানিস না... কিন্তু এটার খুব দরকার ছিল... সাজটার জন্য নয়... এই যে তুই নিজের জন্য একটু যত্ন নিলি, তার জন্য... তোর এই ভীত, শান্ত ও গভীর দৃষ্টি যেন অনেককিছু বলতে চায়, সেই চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতা সকলের থাকে না... কিন্তু আদ্বান সংবেদনশীল ও বুদ্ধিমান... ওর কিন্তু তোর চোখের ওই অব্যক্ত কথাগুলো পড়তে কোনো ভুল হয় না... আমাদের সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরে মেয়েদের নিজস্ব পছন্দের জীবনসাথী বেঁচে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা আজও নেই.. তাদের জন্য আছে শুধু মেনে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়া... কিন্তু সুখপাখি যদি স্বেচ্ছায় ধরা দেয়, তাহলে আমাদের মৈথিলী তাতে ধরা পড়বে না কেন? অসম্মানের রাজরানী হওয়ার থেকে কারোর মনের রাণী হওয়া অনেক সুখের... হোক না সমালোচনা... হোক না কাদা ছোড়াছুড়ি, সে তো সমাজ সবকিছুতেই সবসময়ই করে... দুটো মন যদি সমাজের রীতিনীতি ভেঙে পরস্পরের ভালোবাসায় বিবাগী হয়, তো হোক না দুটো মন বিবাগী... জীবনের যত কঠিন স্তর আসুক না কেন, ভালোবাসার মানুষ পাশে থাকলে বেঁচে থাকা যায় আরও কয়েকটা জন্ম... তাই আর মনে কোনো দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব রাখিস না... যা মৈথিলী- আদ্বানকে গিয়ে বল,

"তোমার ছুঁয়ে দেওয়া বাতাসের

নিঃশ্বাসে বেঁচে উঠতে চাই,

নব যৌবনের, নব ধরনীতে,

ভালোবাসার আলিঙ্গনে, শুধু তোমারই পূন্যতায়"


(আদ্বানের বন্ধুত্বের হাত ধরে বিভীষিকার প্রহর পেরিয়ে অন্তরের আঙিনাতে এসে দাঁড়ালো মৈথিলী... আজকের দিনটা কি নবরূপে ধরা দেবে মৈথিলী আর আদ্বানের জীবনে !! কেমন হবে তাদের সম্পর্কের নব উত্তরণের পর্যায় !!)


Rate this content
Log in

More bengali story from Anishri's Epilogue

Similar bengali story from Romance