Debdutta Banerjee

Romance


3  

Debdutta Banerjee

Romance


অধরা মাধুরী

অধরা মাধুরী

12 mins 1.0K 12 mins 1.0K

-''একা আবার ছাদে উঠেছো। কখন থেকে খুঁঁজছি সে খেয়াল আছে! এসো নিচে এসো।''

নাতি দৃশানের ডাকে ফিরে তাকায় চারুলতা। দৃশান মেয়ের ঘরের ছেলে। 

বিকেলের এই সময়টা চারুর রোজ ছাদে বসেই কাটে। ঘরে ফেরা পাখির ঝাঁক কিছু স্কুল ফেরত বাচ্চার ঘরে ফেরা দেখেই সময়টা পার হয়ে যায়। তার ঘরে কেউ আসে না। পথ চেয়ে থেকে সন্ধ‍্যার ছায়া যখন ছাদটাকে পুরো জড়িয়ে ধরে তখন ধীর পায়ে ও নিচে নেমে যায় রোজ। 

মেয়ে জামাই কাছেই থাকে, পরের গলিতে। দৃশান আর ওর মা প্রায় রোজ আসে খোঁজ নিতে। 

দৃশান টানতে টানতে দোতলায় ওঁর ঘরে এনে বসায়। তারপর একটা প‍্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলল -''শুভ জন্মদিন ডার্লিং। দেখো উপহার পছন্দ হল কি না।''

-''আবার কি এনেছিস আমার জন‍্য? বলেছি না কিছু কিনবি না।''

-''তোমার মোবাইলে লিখতে অসুবিধা, এই নাও ট‍্যাব, বড় স্ক্রীন, পড়তে লিখতে সুবিধা হবে। ফেসবুকটা করবে এবার থেকে মন দিয়ে।এই দেখো ''আমি সেই চারুলতা'' তোমার প্রোফাইল খুলে দিয়েছি।''

চারুলতা দেখে রবীন্দ্রনাথের চারুলতার ছবি দিয়ে একটা একাউন্ট। 

-''এবার একে একে তোমার প্রেমিকদের নাম বল। খুঁজে দেখি। কে কে রয়েছে।'' দৃশান চটপট টাইপ করতে থাকে।

-''এখনো কি তারা রয়েছে! তুই বরং টুসুকে খোঁজ। পরাগ কে ও পেতে পারিস। মনসিজ, শ‍্যামল ওরা যে কোথায়?'' বড় ট‍্যাবটার দিকে চেয়ে চারুলতা হারিয়ে যান সুদূর অতীতে। ফেলে আসা ছেলেবেলাকে আজ মনে হয় স্বপ্ন। 

-''টাইটেলগুলো বলো দিন্না, কে কি করত?''

-''কি হবে ওদের খুঁজে? ছেড়ে দে ভাই। তুই বরং তোর নতুন বান্ধবীদের ছবি দেখা। '' মৃদু হাসেন চারু।

-''কিন্তু তোমার সঞ্চয়িতার মধ‍্যে যে নামটি লেখা রয়েছে দিন্না সেই সামন্তকের নাম তো বললে না। এই দেখো সামন্তক চৌধুরী। তিনজন আছেন। দুজন ইয়ং, বাকি থাকল এই দাড়িয়ালা বুড়োটা। দেখো। এটাই কি.... ওকি দিন্না? কি হয়েছে? ট‍্যাবটা বিছানায় রেখে বালিসে হেলান দেওয়া চারু দেবীর দিকে তাকায় রক্তশুন‍্য মুখ। দৃষ্টি ঘোলাটে। 


********


-'' ইয়ে... মানে আপনাকে অনেকক্ষণ থেকে দেখছি। স্টেশনে বসে রয়েছেন।কারো অপেক্ষায় কি?'' নতুন ষ্টেশনমাষ্টার নিজের কৌতূহলকে চাপতে পারে না আর। সকাল দশটার ট্রেনে মেয়েটি এসে ঐ কোনের রাঙা কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচের বাধানো চাতালটায় বসেই রয়েছে। কিছুক্ষণ পর আজকের শেষ ট্রেনটা হাওড়ার দিকে বেরিয়ে যাবে। তারপর এই স্টেশনে আর কোনো ট্রেন দাঁড়াবে না। 

মেয়েটি চোখ তুলে তাকায়। সেই চোখে ভয়, দুঃখ, হতাশা, অভিমান মিলেমিশে একাকার। সারাদিনের ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। -''বলছি কোথায় যাবেন? কার বাড়ি?''

মেয়েটি স্টেশন মাষ্টারের দিকে ফ‍্যাল ফ‍্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

-''কাহা জানা হ‍্যায়? কই আয়েগা ক‍্যায়া?'' স্টেশনমাষ্টারের মনে হয় ভাষাগত সমস‍্যা বোধহয়। 

-''না, মানে.... একজনের আসার কথা....বলেছিল...!'' অস্থির চোখে দূরের খোয়া ওঠা রাস্তার দিকে তাকায় যুবতী। 

-''দেখুন, কলকাতা ফেরার শেষ ট্রেন আসছে। অবশ‍্য টাটা যাওয়ার আরো একটা গাড়ি আসবে। তারপর কিন্তু এই স্টেশন চত্বর আপনার জন‍্য নিরাপদ নয়। পাশেই জঙ্গল। হোটেল বা থাকার জায়গা নেই এখানে। আদিবাসীদের কয়েকটা গ্ৰাম রয়েছে।'' সমস‍্যাটা বুঝিয়ে বলে স্টেশনমাষ্টার।

 মেয়েটা উঠে দাঁড়ায়, বলে -''এখানে কোন স্কুল রয়েছে?''

-''কাউকে খুঁজছেন ?''

-''ইয়ে... পরাগপুর উচ্চ বিদ‍্যালয়। তার শিক্ষক।''

-''দেখুন আসে পাশে বাংলা স্কুল বলতে ঘাটশিলার দিকে। এই গড়শালবনীতে স্কুল রয়েছে দুটো, তবে প্রাইমারী। ঝাড়গ্ৰামে রয়েছে দুটো স্কুল।''

-''আমায় তো গড়শালবনী বলেছিল।''

-''উনি জানতেন আপনি আজকে আসবেন ?''

-''হ‍্যাঁ, মানে...না, মানে গত সপ্তাহে চিঠি দিয়েছিলাম একটা।'' মেয়েটার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। 

সবুজ আলোটা বলছে এখনি ট্রেন এসে যাবে। সেদিকে তাকিয়ে মাষ্টার বলে -''আসুন, খোঁজ করছি।"

ট্রেনটা চলে যেতেই পয়েন্ট ম‍্যানকে ডেকে স্কুলের কথা জিজ্ঞেস করল মাষ্টার বাবু। সে নিজেও এখানে এসেছে সবে দেড় মাস। তিনমাইল দূরে একটা বাংলা স্কুল আছে জানা গেল। 

নগেনের রিক্সায় মেয়েটাকে তুলে দিতে গিয়ে কি মনে করে নিজেও উঠে বসেছিল মাষ্টার। এখন দু ঘন্টা কোনো ট্রেন নেই। আজ নাইট ডিউটি বদ্রীর। ওকে সব বুঝিয়ে বেরিয়ে এসেছিল সে।

কিন্তু আসেপাশের তিনটে স্কুল ঘুরেও মেয়েটি যাকে খুঁজছে তাকে পাওয়া যায়নি। 

সম্পূর্ন অসহায় মেয়েটির দিকে তাকিয়ে যুবক স্টেশন মাষ্টার বলেছিল -'' ভয় পাবেন না। রাতের দিকে দুটো হাওড়ার ট্রেন আছে। থামিয়ে আপনাকে গার্ডের কামরায় তুলে দেবো। ভোরে হাওড়া পৌঁছে যাবেন।''

হু হু করে বাধ ভাঙা জলচ্ছাস নেমে আসে। ভেজা গলায় মেয়েটি বলে -" ফেরার পথ তো বন্ধ। সামন্তক কথা দিয়েছিল সঙ্গে থাকবে, কিন্তু....! ''

স্টেশন মাষ্টার এমন বিপদে কখনো পড়েননি। বললেন -''রাতটা স্টেশন লাগোয়া আমার কোয়ার্টারে কাটিয়ে দিতেই পারেন। আমি না হয় স্টেশনেই থাকব। সকালে ঝাড়গ্ৰাম আর ঘাটশিলার স্কুলগুলো খুঁজে দেখবেন না হয়। ''


কিন্তু দুই যুবক যুবতি জানত না বিধাতা কি রহস‍্যজাল বুনছিল। পরদিন জানা গেল শালবনীর ভেতর এক প্রাইমারীতে কিছুদিন পড়িয়েছিলেন সামন্তক চৌধুরী। মেয়েটির সঙ্গে একটা ছবি ছিল। দেখে চিনল অনেকেই। তবে গত একমাস আগে চাকরী ছেড়ে কলকাতা ফিরে গেছে সে।

মেয়েটিকে একা ছাড়তে ভয় পাচ্ছিল রমাপদ। মেয়েটি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে, আর ফেরার ইচ্ছা নেই। এমন মেয়েরা হারিয়ে যায় সহজেই। দুটো দিন ওকে নিজের কোয়ার্টারে রেখে পৌঁছে দেবে না হয়। এই ভেবেই ওকে রেখেছিল, কিন্তু পরদিন সকালে ষ্টেশন থেকে বাড়ি ফিরে দেখে কেউ নেই কোথাও। খাটের উপর বালিশ চাপা ছোট্ট একটা চিরকুট।


"শ্রদ্ধেয় বন্ধু"


'আপনি খুব ভালো মানুষ। কিন্তু এভাবে আপনাকে ঘর ছাড়া করে থাকতে ভালো লাগছে না। সামন্তক কে আর পাবো না জানি। কারণ যে নিজে থেকে হারিয়ে যায় তাকে আর পাওয়া যায় না। ওর সন্তান রয়েছে আমার সঙ্গে। তাই চললাম পথের খোঁজে। ভালো থাকবেন।'


"চারুলতা"


চিঠিটা পড়ে রমাপদর মনটা কেমন মুচড়ে উঠেছিল। দু দিনেই একটা কেমন টান পড়ে গেছে চারুর উপর। সারাটা কোয়ার্টারে ওর ছোঁয়া, বালিশে এখনো মিষ্টি তেলের গন্ধ। মেয়েটা গেল কোথায়? অন্তঃসত্তা লিখেছে! আত্মহত‍্যা করতে ছোটেনি তো! ট্রেন তো যায়নি একটাও। বাস রাস্তা তিন মাইল দূরে। সাইকেলটা নিয়ে সে পথেই রওনা দিল রমা। কে জানে কখন ঘর ছেড়েছে চারু। তবে সকালের প্রথম বাস এখনো যায়নি।

শালবনের ভেতর দিয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে রমা ভাবছিল মেয়েটা তো কারোর বাকদত্তা। এভাবে ওর সঙ্গে জড়ানো কি ঠিক হচ্ছে। পরক্ষণেই ভেতর থেকে কে জেনো বলে ওঠে মেয়েটা তার আশ্রয়ে ছিল। যতক্ষণ না ওকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেবে দায়িত্ব ওর।


শুকনো শালপাতা মারিয়ে সুড়ি পথ ধরে সাইকেল নিয়ে এগিয়ে যায় রমাপদ। কিন্তু শুনশান বাস রাস্তা দেখে হতাশ হয়ে যায়। মনের মধ‍্যে হাজারটা প্রশ্ন ঝড় তোলে, চারু কোথায় যেতে পারে? 


ধুলো উড়িয়ে বাসটা চলে যায়। ক্লান্ত রমা একটা গাছের গুড়ির উপর বসে দুহাতে মাথার চুল খামচে ধরে। কোথায় গেলো মেয়েটা! যদি কিছু হয়ে যায় রমা নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।তার বাড়িতে যখন ছিল দায়িত্ব তো তার। হঠাৎ শাল গাছের গুড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে জংলা ছাপার শাড়িতে চারু। রমার হৃদয়ে তখন শতপদ্ম বিকশিত হয়েছে। ভুলে যায় ও যে চারু কারোর বাগদত্তা। আচমকা ওর হাত দুটো ধরে বলে -''কোথায় চলে যাচ্ছিলে একা একা? এভাবে কি চলে যেতে আছে?''

চারুর দু চোখে জল। যার ভালোবাসার টানে বাড়ি ছেড়েছিল সে কোথায় কে জানে? কিন্তু আপাতত এই যুবক তাকে বেধে ফেলেছি এক অচ্ছেদ্দ‍্য বন্ধনে।


রমা কথা দিয়েছিল সামন্তক কে খুঁজে ওকে পৌঁছে দেবে, কিছুদিনের জন‍্য ওর দু কামরার কোয়ার্টারে দুটিতে মিলে পুতুল পুতুল সংসার পেতেছিল। একা রমা ভাতে ভাত ফুটিয়ে খেত। কিন্তু চারু পাকা গৃহিনীর মত ফর্দ ধরিয়ে বাজার করাতে শুরু করেছিল। সপ্তাহ শেষে ঝাড়গ্ৰামের থেকে নতুন হাড়ি কড়া মশলা পাতির সঙ্গে চারুর জন‍্য দুটো শাড়ি আর ব্লাউজ কিনে এনেছিল রমা। 


সামন্তকের খোঁজ করতে দুটিতে কলকাতাও যাবে ভেবেছে। তখনি আরেকটা খবর ভেসে এসেছিল, সামন্তক বিবাহিত। খড়গপুরে ওর পরিবার রয়েছে। বদ্রী ওর ছবিটা নিয়ে খোঁজ করছিল। সেই খবর এনেছে। 


-''তুমি কি করে চিনতে সামন্তককে?'' প্রশ্ন করে রমা।

-''ওর পিসির ননদের বাড়ি আমাদের পাশের বাড়ি। যেত মাঝে মধ‍্যে। আমায় একটা সঞ্চয়িতা দিয়েছিল আমার কবিতা শুনে। তারপর.... প্রতি মাসেই আসত। গত মাসে সব শুনে বলল একটু সময় চাই। দু সপ্তাহের মধ‍্যে সব গুছিয়ে এসে আমায় নিয়ে আসবে। আরো একমাস কেটে যেতেই বাড়ির সবাই টের পেল আমার অবস্থা। বাধ‍্য হয়ে ওর খোঁঁজে পথে নামলাম।'' আবার কেঁদে ফেলে মেয়েটা। রমার খুব ইচ্ছা করছিল মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে ওর চোখের জল নিজের গাল দিয়ে মুছিয়ে দিতে। কিন্তু কে যেন বলে কানে কানে। কাঁদুক চারু। কেঁদে হালকা হোক। সব তিক্ত স্মৃতি ধুয়ে যাক। ধীরে ধীরে বাইরে এসে দাঁড়ায় রমা। উথাল পাথাল ঝড় উঠেছে বাইরে। ঈশান কোনের কালো দৈত‍্যটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, ধীরে ধীরে গ্ৰাস করছে পুরো আকাশ।

না বলা কথাগুলো আর বলা হয়নি সেভাবে। আস্তে আস্তে চারুর শরীরে যে লক্ষণগুলো ফুটে উঠছিল তাকে পূর্ণতা দিতে শাখা সিঁদুর কিনে এনেছিল রমা। ওকে ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজনে ঝাড়গ্ৰামে বাড়ি ভাড়া নিয়ে উঠে এসেছিল। 

চারুও ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে গেছিল রমার উপর। তিথির জন্মের পর রমার আনন্দ দেখে খুশিতে চোখের জল ফেলেছিল চারু। তারপর রমা হাওড়ায় বদলি হয়ে আসে। তিনকুলে তেমন কেউ ছিল না কোনোদিন। চারুকে বহুবার বলেছিল বর্ধমান যাওয়ার কথা, বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করার কথা। চারু রাজি হয়নি। রমা যেন ওর জীবনে ভগবানের রূপে এসেছিল। 

 রমা দূর থেকেই চারুকে ভালোবেসেছে। মুখ ফুটে কখনো বলতে পারেনি সে কথা। আর চারু ওর কৃতজ্ঞতার নিচে চাপা পড়তে পড়তে কখনো আদায় করে নেয়নি নিজের অধীকারটুকু। কি এক অদৃশ‍্য পাঁঁচিল বিধাতা এঁকে দিয়েছিল দুই প্রেমিক সত্ত্বার মাঝে। 


বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না, তিথিকে ঘিরেই ওদের যাবতীয় স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্খা। 

সেই তিথি যখন বারো বছরের হঠাৎ এক কালবৈশাখীর বিকেলে উদভ্রান্তের মত এক আধপাগল এসে হাজির হয় চারুদের বাড়িতে। রমার সেদিন ইভনিং ডিউটি, ফিরতে রাত দশটা। সন্ধ‍্যায় কাজের মেয়েটি বেরিয়ে যেতেই দরজায় ঠকঠক। 

দরজা খুলেই কেঁপে ওঠে রমা। এ কে! কাকে দেখছে সে? কেন এলো এ লোকটা? বহুদিন আগে যে নামটাকে জীবন খাতার পাতা থেকে মুছে ফেলেছিল সে আজ এতো দিন পর কি চাইতে এসেছে?

-''ঘরে ঢুকতে দেবে না লতা?’' সেই স্বর, যার মোহে এক সদ‍্য যুবতী ভেসে গেছিল একদিন।

দু পা পিছিয়ে আসে চারু। মেয়ে গেছে এক বন্ধুর জন্মদিনে। রাতে পৌঁছে দেবে তারা। রমাও চলে আসবে। 

প্রায় জোর করেই ওর স্বপ্নর নীড়ে পা রাখে সামন্তক। পর্দার ধাক্কায় পাশের কাচের বড় ফুলদানিটা ছিটকে পড়ে মেঝেতে।কাচ ভাঙার শব্দে সম্বিত ফিরে পায় চারু। 

কঠিন গলায় বলে -'' আপনি কে? কি চাই এখানে? কেন এসেছেন?''

-''তোমার জায়গায় আমি হলেও এভাবেই তেজ দেখাতাম লতা। রাগলে পড়ে এখোনো তোমায় আরো বেশি সুন্দর দেখায় । আর রমাপদ বাবুর আদরে আরো ডাগরটি হয়েছো দেখছি। তা আমার মেয়েটি কোথায়। ওকে দেখবো বলেই তো ছুটে এলাম।''

রাগে শরীর জ্বলে ওঠে রমার। বলে -''এখনি বেরিয়ে যান বলছি। নয়তো চীৎকার করবো।''

-''থাকতে আসিনি। তবে মেয়েকে নিতে এসেছি। তাকে ডেকে দাও। কোথায় রে মামনি.... দেখ তোর হতভাগ‍্য বাপ এসেছে।'' 

সপাটে চারুর চড় এসে আছড়ে পড়ে লোকটার গালে। অপমানে, রাগে লাল গালে হাত বুলিয়ে সে বলে -''কাজটা কি ভালো হল। কাল মেয়েটার স্কুলে যাবো। আর রমাপদর অফিসে। অন‍্যের বউ বাচ্চাকে সে কি করে ভোগ করে দেখবো!''


চমকে ওঠে চারু। একটু আগের কাচের ফুলদানিটা ভেঙে পড়ার রেশ রয়ে গেছে মাথায়। সাজানো সংসারের ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় শিউড়ে ওঠে ও।


চারদিকে তাকিয়ে ঘর সাজানো দেখে লোকটা বলে-''ভালোই ফাঁসিয়েছ কিন্তু। তা আমায় কিছু ছাড়ো এবার।''


দরজার ডাঁশাটা হাতের কাছেই ছিল। সেটা শক্ত করে ধরে চারু বলে -'' লজ্জা করে না তোমার এসব বলতে? আর কত নাটক করবে? বেরিয়ে যাও বলছি। নাহলে আজ .....''

-'' ওকে, ওকে, চলেই যাবো। তোর মতো বেশ‍্যার ঘরে রাত কাটাবো না। কিন্তু মাল্লু তো দে।'' সোফায় পা তুলে জমিয়ে বসে লোকটা।

-'' ভাবতেও লজ্জা হয় তোর ছলনায় ভুলে একদিন ঘর ছেড়েছিলাম। ঘেন্না হয় তোর রক্ত বহন করেছি বলে।'' রাগে কাঁপতে থাকে চারু।

-''এই সামন্তক চৌধুরী তোর নাটক দেখতে আসেনি বে। মাল বের কর। প্রতি মাসে মেয়ের বাপকে ঐ রক্তের জন‍্য ভাড়াটুকু দিয়ে দিবি, তবেই হবে। তোকে জ্বালাবো না। ফুলের মধু যে খায় সে তো দাম দেবেই। এটাই আমার ব‍্যবসা। ''

সব কিছু কেমন ঝাপসা হয়ে আসে চারুর চোখের উপর। রমা তিথি সবাই কেমন দূরে সরে যাচ্ছে। টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে সব সুন্দর স্মৃতির মুহূর্তগুলো। 

হাতের ডাঁশাটা শক্ত করে আঁঁকড়ে ধরে সংসারটাকে বাঁচাতে চায় চারু


******


ঝড় বৃষ্টির জন‍্য আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছিল রমা। বসার ঘরে ঢুকেই রক্তাক্ত চারুকে দেখে চমকে উঠেছিল। কার্পেটের উপর কালছে রক্ত আর ঘিলুতে মাখামাখি লোকটাকে চেনা দায়...... । ওদিকে মেয়ে ফিরে আসবে। মাথার মধ‍্যে কেমন করে সব জট পাকিয়ে যায়। চারুর হাত থেকে ডাঁশাটা কেড়ে নেয় প্রথমেই। 

থানায় ফোন খরে ঠাণ্ডা মাথায় রমা বলে বাড়িতে একটা পাগল ঢুকে আচমকা তার স্ত্রীকে আক্রমণ করেছিল। তাকে বাঁচাতে গিয়ে বাধ‍্য হয়ে ....। রমা চারুকে মেয়ের দিব‍্যি দিয়ে বলেছিল একটা কথাও বলতে না। 

ভালো উকিল থাকায় বারো বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল রমার। এই বারোটা বছর চারু তপস‍্যা করেছে ভগবানকে ফিরে পাওয়ার জন‍্য। একটা স্কুলে পড়িয়ে মেয়েকে বড় করেছে। 

এগারো বছরের মাথায় ছাড়া পেয়েছিল রমা। কিন্তু এ কোন রমা, সাদা চুল দাড়িতে ঢাকা এক বৃদ্ধ কে দেখে চারু কেঁদে ফেলেছিল। রমা আর বাড়িতে আসেনি। জেলে বসেই সে ঠিক করেছিল পাহাড়ে চলে যাবে। আধ‍্যাত্মিক শান্তির খোঁজে সে হিমালয়ের কোলে চলে যাবে। চারুর চোখের জল আটকাতে পারেনি তাকে। তিথির বিয়ে দিয়েছে, নতুন সংসার এসব কথায় ভোলানো যায়নি রমাকে। তিথির ছেলে হয়েছে শুনেও আগ্ৰহ দেখায়নি সে। বলেছিল -''জেল খাটা কয়েদির ছায়া ওদের জীবনে না পড়লেই মঙ্গল।’'


*******


-'' দিন্না... কী হল তোমার? মাকে ডাকবো?'' দৃশানের ডাক যেন মস্তিস্কে পৌঁছচ্ছে না আর। একের পর এক দৃশ‍্যপট পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। 

আবার চোখ বোজে চারু। মনটা খারাপ হয়ে যায়। 

-''ভাই, সবাইকে খুঁজে পাওয়া যায় এই যন্ত্রে? '' খুব ধীরে কথাগুলো বলে চারুলতা।

-'' যদি তার ফেসবুক থাকে তবে। কাকে চাই বলো। ''

-'' রমাপদ মাইতি। দেখ তো ভাই। একটা বুড়ো লোক... সাদা চুল দাড়ি। বাইশ বছর হল ... যদি পাস কোথাও। অন্তত বেঁচে আছে কি না, সেটুকু....।'' দৃশান ট‍্যাবের মধ‍্যে খুঁজে চলে।

-''লোকটা কে দিন্না?''

দুঃখের হাসি ফুটে ওঠে চারুর মুখে। তিথি ছেলেকে বাবার নামটাও বলেনি বোধহয়। আজকালকার ছেলেমেয়েরা নিজের গুরুজনদের নাম জানে না!

 -''আমার ভালোবাসা, আসল বয় ফ্রেণ্ড। দেখ যদি খুঁজে পাস।'' চোখ বোজে চারু। 

ফোন ঘাটতে ঘাটতে নাতি বলে -''কি করত? কোথায় থাকত ? কিছু তো বলো। চাকরী? পড়াশোনা?''

-''থাকত আমার মনের মাঝে। আমায় আগলে রাখত। আর .... আজ আমার যা আছে সব ওর। ''

খুব থেমে থেমে আস্তে আস্তে কথাটা বলে চারু। দৃশানের মনে হয় অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে কথাগুলো। দিন্নাকে এমন দার্শনিকের মত কথা বলতে ও শোনেনি। 

-''কি রে, তোদের নাতি দিদার কথা কখন শেষ হবে ? নিচে চল। মা কেক কাটবে তো। তোর বাপিও চলে এসেছে।’' তিথির তাড়া দিতে ঢোকে।

-'' আঃ মম। এখন দিন্নার বয়ফ্রেণ্ডের খোঁজ চলছে। থামো তো তুমি। আজ তাকে নিয়েই কেক কাটিং হবে।'' দৃশান সার্চ করেই চলেছে। 

হঠাৎ একটা রবীন্দ্রনাথের মত সাদা চুল দাড়িকে দেখে ও ভ্রু কুঁচকায়। -'' রমাপদ মাইতি কি হরিদ্বারে থাকেন। এই দেখো তো। '' 

ঘরের মধ‍্যে এক অপার নিস্তব্ধতা, তিথি যেন স্ট‍্যাচু, চোখ খুলে উঠে বসে চারু। 

-''তুই এই নামটা জানলি কি করে?'' তিথির থমথমে মুখ।

-''দিন্না বলল তো। তুমিও চেন নাকি?'' ট‍্যাবটা এগিয়ে দেয় দৃশান দিন্নার দিকে। 

দু জোড়া চোখ ট‍্যাবের উপর, এক সৌম দর্শন বৃদ্ধ গঙ্গার ঘাটে। কিন্তু এই লোকটা সে নয়।

পরের ছবিটা কলকাতার এক রমাপদর, তারপরেরটা জলপাইগুড়ির। মালদার রমাপদ ইয়াং। এবারের রমাপদর ছবিতে সাদা গোলাপ। বয়স পঞ্চাশ। তবে এ ও বাতিল। 

তিথি মায়ের পাশে বসে পড়ে ধপ করে। তারপর বলে -''বেঁচে রয়েছে কি?''

-''জানি না রে। সবটাই কপাল।'' 

-''এতদিন পর.... কেন মা? আরো আগেই তো খুঁজতে পারতে!''

-''জানি না রে….. কদিন ধরে খুব মনে পড়ছে জানিস। লোকটা আমাদের ভুলে ওভাবে.... কেন যে চলে গেলো?'' দু ফোঁঁটা জল নেমে আসে চারুর চোখ দিয়ে।

-''ভুলে যাও মা, আমারও কষ্ট হত ছোটবেলায়। কিন্তু ভুলতে শিখেছি। ভুলে যাও।'' মাকে জড়িয়ে ধরে তিথি। বাবার ওপর ওর প্রবল অভিমান। লোকটা ওকে ভীষণ ভালোবাসত। চোখে হারাত। কিন্তু সেই লোকটা খুনি ভাবলে ওর গা গুলায়। বন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরে সেদিন যে দৃশ‍্য ও দেখেছিল সহ‍্য করতে পারেনি। রক্তের সমুদ্র যেন। ওর বাবা এতো নৃশংস হতে পারে !! জ্বর এসেছিল সেদিন। একটা ঘোরের মধ‍্যে চলে গেছিল তিথি। ঘুমের মধ‍্যে ভয় পেয়ে মাকে আঁঁকড়ে ধরত। বাবার ছবিটা আস্তে আস্তে মুছে গেছিল ওর মনের ভেতর থেকে। 

কখনো জেলে দেখা করতে যায়নি তিথি। চিঠি লেখেনি বাবাকে। বন্ধুরা ওকে খেপাত খুনির মেয়ে বলে। ছোটবেলাটা বিষিয়ে উঠেছিল ওর কাছে। লোকটা চলে যাওয়ায় ও স্বস্তির শ্বাস নিয়েছিল।

-''মম, ইউ নো দ‍্য গাই?'' দৃশান বলে। 

-''তুই নিচে যা। ''


না, রমাপদকে সোস‍্যাল মিডিয়ায় পাওয়া যায়নি খুঁজে। দৃশান জেনেছিল দাদুর গল্প পুরোটাই। চারু নিজেই সব বলেছিল। দৃশান খুঁজেছে…. কিন্তু এত বড় পৃথিবীর কোথায় রয়েছে সে কে জানে। 


সেদিন দিন্নার বাড়ির লেটার বক্সে একটা সাদা খাম দেখে টেনে বের করেছিল দৃশান। চিঠি তো আজকাল কেউ লেখে না, তাছাড়া দিন্নার ওরা ছাড়া কেউ নেই। ব‍্যাঙ্ক বা পোষ্টঅফিসের কিছু ভেবেই ও তুলেছিল। গুপ্ত কাশির কোন আশ্রমের চিঠি।

 দিন্নার সব কিছুই দৃশান জানে। তাই দুরু দুরু বক্ষে চিঠিটা খুলেছিল ও। মহারাজ জানিয়েছেন তার আশ্রমে রমাপদ মাইতি গত মাসের শেষদিন দেহ রেখেছেন। তার শেষ ইচ্ছা ছিল এ ঠিকানাতে যেন একটা খবর দেওয়া হয়। তাই উনি জানালেন। দৃশান হিসাব করে দেখে তারপর দিনটাই ছিল দিন্নার জন্মদিন।লোকটা যখন অনন্ত লোকের পথে ওরা সোসাল মিডিয়ায় খুঁজে বেরাচ্ছিল। চোখের কোনটা মুছে দোতলায় দিন্নার ঘরে যায় দৃশান। কদিন আর বাঁচবে দিন্না, ঐ আশাটুকু নিয়েই বেঁচে থাক। নাই বা জানল খবরটা। ভালোবাসাটুকু বেঁঁচে থাক।


Rate this content
Log in

More bengali story from Debdutta Banerjee

Similar bengali story from Romance