অবিস্মরণীয় ভালোবাসা❤ পর্ব ৮
অবিস্মরণীয় ভালোবাসা❤ পর্ব ৮
আদির ড্রাইভার আমান অহনাকে ওর বাড়ির গেটের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় । অহনা বাড়ির গেট খুলে দুরুদুরু বুকে খুব সন্তর্পণে ঢোকে বাড়ির ভিতরে , উঠান পেরিয়ে ঘরের দরজা খুলে ঢুকতেই মা বলে , " তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে একবার এদিকে আয় কিছু কথা আছে । " অহনাও মুখে কোনো উত্তর না দিয়ে ছোট্ট একটা " হুমমমম " শব্দ করে ঢুকে যায় নিজের ঘরে । কোনোরকমে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়েই সোফায় গিয়ে মায়ের পাশে বসে । মাকে ও ভয় পায় না, মায়ের সাথে একেবারে বন্ধুর মতো সম্পর্ক কিন্তু আজকে একটু হলেও ভয় পাচ্ছে সে । না না ঠিক ভয় না খুব টেনশন হচ্ছে অহনার , মায়ের মুখের দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না । অহনার মা কফির কাপটা ওর হাতে দিয়ে বলে , " এই নে কফি । আজকে তোর মা হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে তাই এই ব্যাপারে তোর সাথে খোলাখুলি আলোচনা করা ভীষণ দরকার । ভয় না পেয়ে একদম চিন্তামুক্ত হয়ে কথা বল আমার সাথে । " অহনা মুখে কিছু না বলে শুধু মাথাটা সামান্য কাত করে " হ্যাঁ " সূচক সম্মতি জানাতেই মা বলে, " তুই আদিত্য মুখার্জীকে পছন্দ করিস ? আজকে ইভানের মুখে আমি সবটাই শুনেছি । শুনলাম আয়ুশ আদিত্যর দাদার সন্তান, সে বিয়ে করলে যদি আয়ুশকে না ভালোবাসে সেই জন্য এতোদিন বিয়ে করেনি আদিত্য । আমার কথা হচ্ছে তুই কি পারবি adjust করতে ? এই ব্যাপারে ভালো করে ভেবে দেখেছিস ? দ্যাখ তুই আমার একমাত্র সন্তান তাই আমি চাই না তোর কোনোরকম অসুবিধা হোক । এবার তুই বল কি চাস তুই ? " এবার অহনা মায়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে, " মা আমি সব ভেবেই এই বিয়েতে রাজি হয়েছি , আয়ুশকে আমি যতোটা ভালোবাসা দিতে পারবো জানি না অন্য কেউ তা পারবে কিনা । হয়তো পারবে কিন্তু আমি আয়ুশকে বা আদিত্যকে অন্য কারো হাতে তুলে দিতে পারবো না । আয়ুশকে আমি আমার সন্তান মেনে নিয়েছি তাই তুমি অযথা চিন্তা কোরো না । " অহনার মা বলে, " কিন্তু ভবিষ্যতে তুই পস্তাবি নাতো ? " অহনা বলে, " না মা আমি পস্তাবো না , আদিত্য ভীষণ ভালো মানুষ আর আয়ুশ তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না তাই আমার কোনো আপত্তি নেই । তুমি আপত্তি কোরো না মা , আমি জানি আমি ঠিক সুখে থাকবো আদিত্য আর আয়ুশকে নিয়ে । কালকে আদিত্য আসবে তোমার সাথে কথা বলতে , তুমি একবার ওকে দ্যাখো আমি বলছি তোমারও ওনাকে খুব ভালো লাগবে । " অহনার মা বলে, " ঠিক আছে , তুই যখন রাজি তখন আমি আর আপত্তি করবো না । কালকে কখন আসবে আদিত্য ? " অহনা বলে, " আসলে আমি বলেছি তোমার সাথে কথা বলে তারপর ওনাকে ফোন করে জানাবো । " এই শুনে অহনার মা বলে, " তাহলে একটা কাজ কর, আদিত্যকে বল কালকে সন্ধ্যায় চলে আসতে রাতে একেবারে ডিনার করেই যাবে । আর হ্যাঁ , ইভান এবং আয়ুশকে সাথে নিয়ে আসতে বলবি, আমিও দেখতে চাই আমার নাতিকে । " অহনা মায়ের কথা শুনে হকচকিত হয়ে চোখ দুটো গোলগোল করে বলে , " কি বললে মা ? নাতি ? " অহনার মা বলে , " হ্যাঁ নাতি , তুই যখন ওকে নিজের সন্তান বলে মেনে নিয়েছিস তখন তো ও আমার নাতিই হবে তাইনা ? " মায়ের কথা শুনে আনন্দে একটা উল্লাসের চীৎকার করে অহনা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরতেই মা বলে , " অনেক হয়েছে আর লাফালাফি করতে হবে না , কালকের জন্য তৈরী হতে হবে । " এরপর মায়ে - মেয়েতে মিলে পরের দিন ডিনারের মেনু ঠিক করে আর রান্নার উপকরণ কেনার একটা তালিকা তৈরী করে । অহনা রাতে ডিনার শেষ করে নিজের ঘরে গিয়ে তাড়াতাড়ি ফোন করে আদিত্যকে ।
আদিত্যর ফোনে রিং হওয়ার সাথে সাথেই ফোনটা রিসিভ করে আদিত্য বলে, " হ্যাঁ অহনা বলো কি খবর ওদিকে ? সব ঠিক আছে তো ? " আদিত্যর অস্থিরতা দেখে অহনা মনে মনে হাসে তারপর বলে , " বাব্বা ! আপনি কি আমার ফোনটার জন্যই অপেক্ষায় ছিলেন ? একবার রিং হতে না হতেই রিসিভ করলেন
যে । " অহনার কথায় আদিত্য একটু লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা উত্তর দেয় , " না মানে আমি , মানে .......... আসলে আমি মোবাইলে একটা কাজ করছিলাম তাই । " অহনা মজা করে বলে , " হুমমম, বুঝতে পেরেছি । " আদিত্য বলে, " তোমার মায়ের সাথে কথা হয়েছে ? কি বললেন উনি ? " আদিত্যর অবস্থা দেখে অহনা একটু মজা করার লোভ সামলাতে পারলো না তাই বললো , " হ্যাঁ আমি কথা বলেছি এই ব্যাপারে কিন্তু ........ " । আদিত্য বলে , " কিন্তু ? কিন্তু কি ? বলো অহনা চুপ করে থেকো না । কিন্তু কি ? " আদিত্যর অবস্থা বুঝতে পেরে ফোনটাকে বালিশের তলায় চেপে ধরে হাসিতে ফেটে পড়ে অহনা তারপর আবার ফোনটা ধরে বলে, " I'm Sorry মিঃ মুখার্জী , মা কিছুতেই রাজি না এই বিয়েতে । আমি অনেক চেষ্টা করলাম মাকে বোঝানোর কিন্তু পারলাম না । মা বললো এই ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চায় না । " আদিত্য কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে , " উনি রাজি হলেন না ? তাহলে এখন কি হবে অহনা ? কি করলে তোমার মা রাজি হবেন বলো, আমি তাই করবো । আসলে আয়ুশ তোমাকে নিজের মায়ের মতো কাছে পেতে চায় তাই ওর জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে । " আদিত্যর কথা শুনে অহনা বলে, " ওহ্ ! শুধুমাত্র little boy এর জন্য খারাপ লাগছে ? আপনার নিজের খারাপ লাগছে না তাইতো ? " অহনার গলায় অভিমানের আভাস পেয়ে আদিত্য বলে, " সেটা কি আলাদা করে বলার কোনো প্রয়োজন আছে ? আজকে আমার সাথে কথা বলে বুঝতে পারোনি ? " অহনা একটু চুপ করে থেকে বলে, " মিঃ মুখার্জী , মা কালকে আপনাদের ডিনারে আমন্ত্রণ করেছে । আপনাদের বলতে আপনি, আয়ুশ আর ইভান বাবু । " আদিত্য উত্তেজিত হয়ে বলে, " মানে ? অহনা তুমি সত্যি বলছো ? উনি সত্যিই আমাকে যেতে বলেছেন ? " অহনা হেসে বলে , " হ্যাঁ, হ্যাঁ সত্যি বলছি মা আপনাদের আসতে বলেছে । " এই কথা বলার পরেই অহনা ফোনের মধ্যে থেকে দুজনের একসাথে উল্লাসের চীৎকার শুনতে পেয়ে বুঝতে পারে আদিত্য একা নেই, সাথে ইভানও আছে । আদিত্য বলে, " কালকে আমি সময়মতো পৌঁছে যাবো ওদের নিয়ে । অহনা , একটা অনুরোধ ছিল তোমার কাছে শুনবে ? " অহনা অবাক হয়ে বলে, " অনুরোধ ? কি অনুরোধ মিঃ মুখার্জী ? " আদিত্য তখন খুব আদুরে গলায় বলে, " আচ্ছা, আমাকে কি তুমি করে বলা যায় না ? মিঃ মুখার্জী না বলে আদি বলে ডাকা যায় না ? " অহনা এবার লজ্জা পেয়ে যায় তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে, " কালকে তাহলে তাড়াতাড়ি চলে এসো , এখন বেশি রাত কোরো না শুয়ে পড়ো । " অহনার কথা শুনে আদি বলে, " কি বললে অহনা ? আমি কি ঠিক শুনলাম ? আমাকে তুমি করে বললে ? Thank you । " অহনা বলে, " ভালো কথা কালকে আমি নার্সিংহোমে এবং আয়ুশের কাছে যেতে পারবো না , আসলে মাকে সাহায্য করতে হবে নয়তো মা একা সব সামলাতে পারবে না । " আদি বলে, " ঠিক আছে কোনো ব্যাপার না । তবে আমরা যাওয়ার আগে তোমাকে ফোন করে নেবো । Ok, Good Night । " এই বলে আদি ফোন রেখে দিতেই অহনা বলে , " উফ্ ! ফোন রাখার এতো কিসের তাড়া জানি না , আরেকটু কথা বললে কি হোতো ! " এই বলে অহনা ফোনটা বালিশের পাশে রেখে শুয়ে পড়ে ।
যেহেতু নার্সিংহোমে যাবে না তাই একটু দেরী করেই ঘুম থেকে ওঠে অহনা । ঘড়িতে তখন নয়টা বাজে , অহনা আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠেই মাকে গিয়ে বলে, " মা চলো বাজারে যাবো "। অহনার মা অবাক হয়ে বলে, " সেকি ! তুই বাজারে যাবি ? তুই তো বাজারে যেতেই চাস না তবে আজকে হঠাৎ কি হোলো ? না মানে আমি বুঝতে পেরেছি তোর আর আনন্দ ধরছে না । " মায়ের কথা শুনে অহনা লজ্জা পেয়ে বলে,
" আনন্দ ? না মা সেইজন্য না, আসলে তুমি একা পারবে না তাই বললাম আমিও
যাবো । " অহনার মা মজা করে বলে, " হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি বুঝতে পেরেছি । তবে মাছের বাজারে ঢুকতে হবে কিন্তু, ঘৃনা পাবি নাতো ? তোর তো আবার মাছের বাজারে ঢুকলে নাকি গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে । " অহনা বলে, " না না কিছু হবে না, এখন তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নাও আমিও আসছি তৈরী হয়ে । " এই বলেই অহনা এক দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যেতেই অহনার মা মেয়ের অবস্থা দেখে হেসে ফেলে বলে , " পাগলী মেয়ে একটা " ।
বিকেল থেকেই মা - মেয়ের শুরু হয় রান্না আর ঘর সাজানোর তোড়জোড় , এ যেন এক যুদ্ধের পূর্ব প্রস্তুতি । সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ কলিংবেল বেজে উঠতেই অহনা দৌড়ে চলে যায় নিজের ঘরে । অহনার মা বলে, " কিরে দরজাটা খোল । " অহনা বলে, " আমি পারবো না তুমিই খোলো । " অগত্যা অহনার মা গিয়ে দরজা খোলে । দরজা খুলতেই ইভান বলে, " মাসিমা, আমরা এসে পড়লাম আপনাকে বিরক্ত করতে । " অহনার মা বলে, " এমা, এতে বিরক্তর কি আছে বাবা , এসো এসো ভিতরে এসো । " সোফা দেখিয়ে অহনার মা বলে, " তোমরা বসো আমি অহনাকে ডাকছি । " ঘরে ঢুকেই আদিত্য প্রনাম করে অহনার মাকে তারপর আয়ুশের দিকে ইশারা করতেই আয়ুশও প্রনাম করতে যেতেই অহনার মা আয়ুশে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, " না না , ছোটোদের প্রনাম করতে নেই দাদুভাই । " অহনার মায়ের মুখে " দাদুভাই " ডাকটা শুনে আদিত্য তাকিয়ে থাকে অহনার মায়ের মুখের দিকে । আদিত্যর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে অহনার মা বলে,
" আয়ুশ আজ থেকে তোমার আর অহনার সন্তান তাই এখন থেকে ও আমার নাতি । কি আদিত্য কিছু ভুল বললাম ? " অহনার মায়ের কথায় আদি লজ্জা পেয়ে মুখটা নীচু করে বলে, " না মানে ........ " । অহনার মা বলে, " আর মানে মানে করতে হবে না এখন বোসো তো । " আদিত্য আর ইভানকে বসতে বলে অহনার মা আয়ুশকে অহনার ঘরের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে, " যাও দাদুভাই, ঐ ঘরে তোমার মা আছে । " অহনার মায়ের কথা শুনে আয়ুশ একবার তাকায় আদির দিকে তখন ইভান একটু হেসে বলে, " চ্যাম্প আজকে থেকে ইনি তোমার দিদুন আর অহনা আন্টি তোমার মা । " ইভানের মুখে " অহনা আন্টি তোমার মা " এই কথাটা শুনে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বাবার গলা তারপর গালে একটা চুমু দিয়েই এক ছুটে চলে যায় অহনার ঘরের দিকে । অহনার ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় দুবার টোকা দিতেই দরজা খোলে অহনা আর সাথে সাথেই আয়ুশ জড়িয়ে ধরে অহনাকে ।
******** To Be Continued

