আঁচল ভরা ফুল
আঁচল ভরা ফুল
মেয়ে দেখতে যাওয়া, এই ব্যাপারে
আমার প্রচন্ড আপত্তি ছিল।চোখের দেখায় কী বোঝা যায় মানুষ টি কেমন? না কি দেখার পর বলা যায় না পছন্দ হয় নি।
আমি পুরুষ হলেও নারীদের সম্মান করি। তাই দোকান থেকে জিনিস কেনার মত করে মেয়ে দেখতে যাবো না। অথচ মা নিজে সবটা দায় নিতে চায় না। বলে, "সারাজীবনের ব্যাপার বাবু"
আমার ইচ্ছা দূর থেকে কোনভাবে দেখ।
মা একটি মেয়ের সন্ধান পেয়েছে।
প্রিয় বান্ধবীর বোনের মেয়ে।
একটিমাত্র মেয়ে, শিক্ষিতা, রূপ গুণ দুই আছে।মায়ের পছন্দ হয়েছে। আমি প্রথাগত ভাবে দেখতে যাবো না। মায়ের কাছে বাড়ীর ঠিকানা নিলাম। ঠিক দেখে নেবো কোনভাবে, কিন্তু বুঝতে দেওয়া যাবে না।
আমার প্রিয় বন্ধু জয়ের মাসীর বাড়ী ওই পাড়ায়। মাসীর বাড়ীর ছাদ থেকে ওদের বাড়ী দেখা যায়।
জয়ের মাসী বললেন," হ্যাঁ মুকুটিদের বাড়ির একমাত্র মেয়ে
রূপবতী , গুণবতী।"
আমি আর জয় মাঝে মাঝেই ছুটির দিনে জয়ের মাসীর বাড়ী যেতে লাগলাম। মুকুটি বাড়ীর সামনে দিয়ে তাকাতে তাকাতে
যেতাম, যদি এক ঝলক দেখা যায়!
একদিন গোধূলিবেলায় বাগানে বসে গান গাইছিলো। একরাশ কোঁকড়া কালো চুলে মুখের একপাশ ঢাকা।
"নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল।"
আমি আর জয় যেন মন্ত্রবলে আটকে গেলাম পথের মাঝে।গানের সুর কানের ভেতর দিয়ে গিয়ে মরমে আঘাত করেছে।
এত সুন্দর করে যে গাইতে পারে তার মনটাও না জানি কত সুন্দর ।
কোন অন্তরের ব্যথা থেকে সে এমন গান গাইছে কিনা জানিনা। যদি তাই হয়, আমি দূর করে দেবো তার সব ব্যথা। ভালো বাসায় ভরিয়ে দেবো তাকে।
গিন শেষ হবার পরেও আমরা দুবন্ধু দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ পাড়ার দুই দাদা মাটি ফুঁড়ে উঠে এসে
বললো," কী হে নয়নচাঁদেরা মাঝে মাঝেই দেখছি এ পাড়ায়। কাকে ঝাড়ি মারছো যুগল?"
জয় বললো মোহিত চ্যাটার্জী আমার মেসো মশাই হন। ওনার বাড়ীতে আসি।
যাক মেসোর নাম করায় এ যাত্রা ফাঁড়া কাটলো।
শয়নে ,স্বপনে, দিবা জাগরণে ওই গানের সুর আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখলো। কেশাবৃত মুখসুধা পান না করলেও কন্ঠসুধা পান করেই মত দিয়ে দিয়েছি।
স্বপ্নর মত কটা দিন কেটে গেল।
ফুলশয্যার রাতে আমি মৌকে বললাম," এবার সেই গানটা শোনাও।"
"গান? আমি? গানের সঙ্গে আমার আড়ি। বরং বলো ক্যরাটের একটা প্যাঁচ দেখাতে, এখনি দেখিয়ে দেবো।"সুন্দরী মৌ ভ্রুভঙ্গী করে বললো।
"শোন, আমি তোমার গান শুনেই তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম।
এখন তো শোনাতেই হবে।"
"লে হালুয়া, আমি গান জানি না, ন্যাকা ন্যাকা লাগে। আমি অ্যাথলিট। হাইজাম্প, লঙ জাম্প,
জ্যাভলিন থ্রো, ক্যারাটে যে কোন একটা বলো, করে দেখাবো। গান গাইতে বোলোনা প্লিজ। একটাই গান জানি, জাতীয় সংগীত। সেটা গাইবো? তবে উঠে দাঁড়াও।"
জয় ছাড়া আর কার কাছে দুঃখ প্রকাশ করবো! জয় তো
সেদিনের সাক্ষী।
কিছু করার নেই। ফুলশয্যা হয়ে গেলো। আমার পরিবারের সবাই
বৌএর প্রশংসা য় পঞ্চমুখ।
এমন বৌভাগ্য কারো হয়?ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হল আমার বৌ। তাকে নিয়ে নাচানাচি করে সবাই, আমার কিন্তু মনে হয় আমি হেরে গেছি, ঠকে গেছি।
আমি কিন্তু সেই গানটা ভুলে গেছি , ইচ্ছা করেই।
রেডিওতে হলে বন্ধ করে দিই।
আমার বুকে ব্যথা করে।
অনেকদিন হয়ে গেছে। জয় চাকরী পেয়েছে আসান সোলে।
ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। কিন্তু ঐ সময়েই আমার কাজ পরায় যাওয়া হয় না। মৌএর জ্যাঠতুতো দিদিরো বিয়ে ছিলো ওই দিন।ওর ও যাওয়া হলো না।
একদিন জয়কে সারপ্রাইজ দেবো বলে ওর বাড়ী গেলাম এক সন্ধ্যেবেলা। দরজার বাইরে থেকে শুনতে পেলাম সেই ভুলে যাওয়া
গানের কথা," ফুল যদি নিই তোমার হাতে,
জল রবে গো নয়নপাতে
অশ্রু নিলে ফুটবেনা আর প্রেমেরই মুকুল...."
ঠিক তখনই জয় ফিরছিল, আমাকে দেখে ফেললো।
ওর কাছে সব শুনলাম।
"তোর বিয়ের পর যখন শুনলাম যে মৌ গান জানে না, তখন খুব অবাক লাগল। তাহলে গানটা গেয়েছিল কে?
মৌএর মায়ের কাছে শুনলাম ও মৌএর জ্যাঠার মেয়ে। এক দুর্ঘটনায় মা বাবাকে হারিয়ে নিজের চোখ দুটোও হারিয়েছে।
মামা বাড়ীতে মানুষ। সেদিন মৌদের বাড়ী এসে ছিল, ওর নাম সুধা। সুধার মামাবাড়ী যোগাযোগ করলাম। বিয়ে হয়ে গেল।
তোকে বলিনি, তুই যদি কষ্ট পাস তাই।
আমি কী ভুল করেছি, বল?"
আমি জয়ের হাত দুটো ধরে বলি,
তুই ঠিক করেছিস।
তুই জিতে গেছিস। ভালো থাক দুজনে।
যেতে যেতে কানে আসে,"ফুল নেবো না অশ্রু নেবো ,ভেবে হই আকুল..."
আমি পুরুষ। কান্না আমার সাজে না। তাই অশ্রু নেবো না।
আমি বিবাহিত, পরস্ত্রীকে ভালোবাসা অন্যায়।
তাই তারপর থেকে ওই গান আমি একদম ভুলে গেছি ।
প্লিজ, যদি রেডিওতে ওই গানটা বাজে, আর আমি যদি কাছে থাকি, তবে আমি শোনার আগেই
চ্যানেলটা ঘুরিয়ে দেবেন। এইটুকু সহযোগিতা তো বন্ধুদের কাছে আশা করা যায়, তাই না?

