Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Shubhranil Chakraborty

Inspirational


2  

Shubhranil Chakraborty

Inspirational


আই এ এস

আই এ এস

16 mins 817 16 mins 817


                             

“সরি ম্যাডাম,সেটা সম্ভব নয়।“

“প্লিজ স্যার একটু কনসিডার করুন,আমি ভীষণ নিডি।আপনি প্লিজ ডেটটা একটু এক্সটেন্ড করুন,আগামী সপ্তাহের মধ্যে আমি যে করেই হোক টাকা জোগাড় করে এনে দেব।“

“কী মুশকিল,এটা একটা প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট।আপনার ধারণা আছে,প্রতি বছর আমাদের ইনস্টিটিউট থেকে কোচিং নিয়ে কত শত ছেলে সাকসেসফুল হয়েছে, সিভিল সার্ভিসে জব পেয়েছে।কেন জানেন?আমরা এখানে বেস্ট কোচিং প্রোভাইড করি।শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় বাইরে থেকেও হাজার হাজার ছেলে এখানে পড়তে আসে।এখানে আমাদের বেস্ট ফিচার হল আমরা আপনাদের সামনে নিয়ে আসি সেই সমস্ত টিচারদের যারা নিজেরাও অনেকে ইউপিএসসি ক্র্যাক করেছে।এর জন্য তো কিছু অ্যামাউন্ট পে করতে হবেই।না হলে আমরা চালাব কী করে?মানছি অ্যামাউন্ট টা সামান্য নয়,তবু তো আপনার ক্ষেত্রে অনেক কনসিডার করা হয়েছে।আমরা আমাদের অ্যাডমিশন টেস্টে যারা ভাল ফল করে,তাদেরকে পঁচিশ পারসেন্ট ডিসকাউন্ট দিয়ে থাকি।আপনি তো সেটা পাচ্ছেনই।তা্রপরেও আপনার অসুবিধা?”

“না না স্যার টাকা দিতে অসুবিধা বলিনি, আসলে যদি একটু পিছনো যেত ডেটটা...বুঝতেই পারছেন...এতগুলো টাকা..একটু টাইম তো লাগবেই জোগাড় করতে।“

প্রমোদবাবু ঘাড় নেড়ে বললেন,”না তা সম্ভব নয়।তিনদিন বাকি আছে অ্যাডমিশন প্রসেস কমপ্লিট করার।এক বছরের পুরো ফি একসাথে জমা দিতে হবে তিনদিনের মধ্যে।এরপর ব্যাচ স্টার্ট হয়ে যাবে,আর ইয়ারের মাঝখানে আমরা কাউকে অ্যাডমিশন দেই না।সুতরাং যে করে হোক তিনদিনের মধ্যে টাকাটা জোগাড় করুন।“

“স্যার..”

“দেখুন,আপনি আই এ এস অ্যাসপির‍্যান্ট,ভাল স্টুডেন্ট।তাই বলছি,একটু বাস্তববুদ্ধি প্রয়োগ করে ভাবুন। সময়মত টাকা না পেলে কিচ্ছু হবে না।আর ভবিষ্যতে এ ধরনের রিকোয়েস্ট করবেন না।ধন্যবাদ,এখন আসতে পারেন।“

বিরসবদনে বাইরে বেরিয়ে এল মৌসুমি।মনটা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেছে তার।ছেলেবেলা থেকে তার স্বপ্ন বড় হয়ে আই এ এস কিংবা আই পি এস অফিসার হবে,দেশের সেবা করবে।তার জন্য সময় আর প্রস্তুতি দুটোই নিয়েছে সে।পরিশেষে সে কলকাতা তথা ভারতবর্ষের এই নামী ইনস্টিটিউট এ কোচিং নিতে মনস্থির করেছিল। কারণ মৌসুমি শুনেছে,সত্যিকারের পরিশ্রমী আর অধ্যাবসায়ী ছাত্রছাত্রীরা কখনো এখান থেকে খালি হাতে ফেরে না। এখানে এসে সঠিক পথে অধ্যয়ন করলে সাফল্য নাকি বাধা।তবে এখানে ভর্তি হতেও কাঠখড় পোড়াতে হয় অনেক।মৌসুমি সে সব করেছে,তার জীবনের লক্ষ্যকে সাকার করে তোলার জন্য।এবং তাতে সফলও হয়েছিল।কিন্তু আজ শুধু টাকার জন্য....।

মৌসুমি ভেবে পায় না কী করবে।বাবা অবসর-প্রাপ্ত কর্মচারী,পেনশনের টাকাটুকু সম্বল,তার উপরে মায়ের অসুখের জন্য প্রতিমাসেই প্রচুর খরচ হয়ে যায়।তার নিজের দুবছর স্কুলের চাকরি আর টিউশনির জমানো টাকা দিয়েও সবটা কুলিয়ে উঠতে পারবে না।বাকি রইল রজত।

না রজতের কাছে একটা টাকাও চাইবে না সে।যা হয় হয়ে যাক। এ লড়াই তার একার,সে জয়ী হয়ে মুখের উপর জবাব ছুড়ে দেবে রজতের।দেখিয়ে দেবে,মৌসুমি তার বন্দিনী হয়ে বেঁচে থাকার জন্য জন্মায়নি।তারও অধিকার আছে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার।

ঘরে ফিরে এল মৌসুমি।আজ মঙ্গলবার,কোন কারণ বশত রজতের অফিসে ছুটি,সে বাড়িতেই ছিল।মৌসুমি ঘরে ঢুকতেই রজত চেঁচিয়ে উঠল,” মা,তোমার আই এ এস বৌমা বাড়ি ফিরেছেন।যাও বরণডালা নিয়ে এসো,ওনাকে খাতির করে আপ্যায়ন করতে হবে না?”

ভিতর থেকে একটা ব্যাঙ্গার্থক ধ্বনি শোনা গেল।মৌসুমি জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রজতের দিকে তাকাল।তারপর গটগট করে দোতলায় নিজের ঘরে চলে গেল।

নীচ থেকে আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল,

“আমার সংসারটা ছারখার হয়ে গেল।ও বাবু,তুই যে কোন দুঃখে এ মেয়েকে ঘরে পছন্দ করে ঘরের বৌ করে নিয়ে এলি?এ এখন লেখাপড়া করবে,জজ ব্যারিস্টার হবে,সংসারের কাজ কে করবে শুনি?”

“ভারী আই এ এস অফিসার হবে?মুখে বলা সহজ,কাজটা কত কঠিন সেটা জানে না তো,তাই এত দেমাক।ঐ তো হয়তো কোনমতে প্রিলিমস ক্লিয়ার করবে।মেইন্সে গিয়ে সব ফুস।মিলিয়ে নিও মা।“

“কিন্তু অতদিন সংসারের হাল কে দেখবে?”

“সেই হচ্ছে কথা।এখন তো আবার বেশি কিছু বলাও যায় না,নারী স্বাধীনতার যুগ বলে কথা।আর কি করবে মা বল,আমি না হয় সাহায্য করে দেব তোমায় হাতে হাতে।আর কাজের লোক তো আছেই।“

“বাবু রে,আমরা সাধারণ,ভীরু মানুষ।তাই বলে ও আমাদের মাথার উপর ড্যাং ড্যাং করে নেচে রাজ করবে আর আমরা দেখব?কিছুই কী বলা যায় না ওকে?”

“মা প্লিজ একটু ঠান্ডা মাথায় ভাব।এ অবস্থায় ও যেমন জেদ ধরে আছে,ওকে আটকাতে গেলে তো আমাদের ততোধিক কঠোর হতে হবে।মানে চূড়ান্ত ঝামেলা অশান্তি,এমনকি শক্তিপ্রয়োগের পর্যায়েও চলে যেতে পারে।তখন তোমার আমার মান সম্মান থাকবে তো?পাড়ার লোকে জানবে,একটা বিশ্রী কেলেঙ্কারী হবে।আমাদের তো ভদ্র বলে একটা সুনাম আছে।“

“তাই বলে চুপ করে থেকে এই অনাচার দেখব?”

একটুক্ষণ পর আবার আওয়াজ ভেসে এল,”এক মিনিট মা।ও একটা জায়গায় কোচিং নিচ্ছে কলকাতায়। রেগুলার ক্লাস হলে ওকে তো থাকতে হবে মনে হয় ওখানে।“

“বাবু রে,তুই তাই কর,বিদায় কর ঐ মেয়েকে।যতদিন ও বাড়ি বসে আয়েশ করবে আমার দুচোখে সইবে না রে।ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে আমি একটু শান্তি পাই। “

মৌসুমি নীচে নেমে এসেছিল।ধরা গলায় সে রজত আর রজতের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,”কোন চিন্তা নেই তোমাদের।আমি এখানে থাকব না।আমার কাজ কাউকে করতে হবে না।আমি কলকাতার মেসে থেকে পড়াশুনো করব।“

“তাও ভালো।তবে টাকা ফাকা আমার কাছে চেয়ে বোস না।নিজের স্বপ্ন সফল করছ কর,তোমার ব্যাপার।কিছু বলা যাবে না,বললেই তো মহাভারত।কিন্তু আমার রোজগার আমি তোমার ফালতু টাইম ওয়েস্টের পিছনে ঢালতে রাজি নই,পরিস্কার বলে দিলাম।“

“আমিও বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নই তোমার করুণা গ্রহণ করতে।আমি আমার ব্যাবস্থা করে নিতে পারি নিজেই।তোমাদের বিদ্রুপ আর খোটার পাশাপাশি আমার অনেক মানুষের আশীর্বাদও আমার সাথে রয়েছে।কাজেই তোমরা কি করলে না করলে তাতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না।“

“আজ কি ভর্তি হয়ে এলে নাকি?টাকা কে দিল?”

“সে কথা তো তোমার জানার অধিকার নেই রজত।তোমার কাছে টাকা তো চাইনি।“

বেরিয়ে এল মৌসুমি।পিছনে শুনতে পেল তার শ্বাশুড়ি মা বলছেন,”বাড়ির বৌ বাইরে গিয়ে থাকবে,কত অনাসৃষ্টি কাণ্ড ঘটাবে,কালে কালে কত কি দেখব।আমি আর পারিনা রে।কি মোহে যে তুই এখনো সম্পর্ক ধরে রেখেছিস,তুই ই জানিস।“

রাতে শুয়ে শুয়ে মৌসুমির কান্না পাচ্ছিল।এই সেই রজত,যাকে দেখে একদিন তার তরুণী হৃদয় তোলপাড় হয়ে উঠেছিল? এই সেই রজত,যে কিনা একদিন তার হাতে হাত রেখে শপথ করেছিল,যে যত ঝড় ঝাপটাই আসুক না কেন,জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে সে সবসময় মৌসুমির পাশে থাকবে?

রজত আর মৌসুমির প্রেমের সূচনা হয়েছিল কলেজে।তখন রজত থার্ড ইয়ারে পড়ে আর মৌসুমি ফার্স্ট ইয়ারে।তথাকথিত স্মার্ট ডিএসেলার,বাইক কিংবা পয়সাওয়ালা নয়, রজতকে তার মনে ধরেছিল তার সুন্দর কথাবার্তা,ভদ্র ব্যবহার আর একটা ভাল মনের জন্য।কলেজ পাশ করে বেরোনোর পর পরই রজত চাকরি পেয়ে যায়,কিন্তু মৌসুমি বিয়ের ব্যাপারে ভাবেনি,তার কারণ সে গ্রাজুয়েশনের পর মাস্টার্স কমপ্লিট করতে চেয়েছিল।মাস্টারস হয়ে যাওয়ার পর মৌসুমি একটা স্কুলের চাকরি পায়,আর তার কিছুদিনের মধ্যেই রজতের সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়।

বিয়ের বিষয়ে মৌসুমিদের বাড়ি থেকে কোন আপত্তি ছিল না।তবে রজতের মা যে ছেলের পছন্দ করে বিয়ে করাটাকে ভালো চোখে নেননি,সেটা তার হাবভাবেই পরিস্কার হয়ে গিয়ে ছিল মৌসুমির কাছে।এমনকি মৌসুমি বিয়ের পর চাকরি করবে সেটাও তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি।কিন্তু তখন রজতের সম্মতি থাকায় কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি মৌসুমিকে।

স্কুলের চাকরিটা মৌসুমির জীবনের লক্ষ্য ছিল না স্বাভাবিকভাবেই।তাই দুবছর চাকরির পর সে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল পরীক্ষার জন্য।বিয়ের আগেই সে রজতকে জানিয়েছিল যে সে এই পরীক্ষা দেবে।তখন রজত শুনেছিল,কিন্তু বিশেষ কিছু বলেনি বা সোজা কথায় গুরুত্ব দেয়নি।কিন্তু সে যখন সত্যি সত্যি একদিন রজত আর তার মায়ের কাছে বলে যে সে পরের বছর পরীক্ষা দেবে তখন তুমুল অশান্তি হয়।রজতও মন থেকে মেনে নিতে পারেনি ব্যাপারটাকে,সেও বারংবার মৌসুমিকে নিরস্ত করতে সচেষ্ট হয়েছিল।রজতের হাবভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে মৌসুমি সফল হলে তার মেল ইগোতে জোরদার ধাক্কা লাগবে।মৌসুমিরও বুঝতে বাকি ছিল না যে সমাজে কিছু কিছু ভদ্রতার ভেক ধরে থাকা মানুষের ভিতরের চেহারাটা কতটা নির্মম হয়।

 কিন্তু মৌসুমি কেও চিনতে বাকি ছিল রজতের।রজতের তোয়াক্কা না করে মৌসুমিও উঠেপড়ে লেগে শপথ করে এখন থেকে তার রাস্তা একার।নিজেকেই লড়ে যেতে হবে।নিজেই স্টাডি মেটেরিয়াল জোগাড় করে সে পড়াশোনা শুরু করে দেয় এই বহুল চর্চিত সংস্থানে ভর্তি হওয়ার জন্যে।এবং তাতে সফলও হয়।এডমিশন টেস্টে তার নাম ছিল প্রথম দশে।

কিন্তু সব ভালো যার শেষ ভাল।মৌসুমির মাথায় এখন একটাই চিন্তা টাকার জোগাড় কি করে হবে।না হলে তার সব স্বপ্ন একবছরের মতন পিছিয়ে যাবে।আর একবার ফোকাস নড়ে গেলে তাকে কায়েম রাখা খুব মুশকিল।ভেবে রাত্রে মণিকার ঘুম হয়না।

পরের দিন সকাল দশটা নাগাদ মৌসুমির একটা ফোন এল।কোচিং স্কুল থেকে।ধরতেই কালকের সেই ভদ্রলোক বললেন,”মিসেস মুখার্জী,আপনার সাথে একটু দরকার ছিল।কাইন্ডলি আপনি একবার আসতে পারবেন?”

“হ্যা,নিশ্চয়ই,কখন বলুন?টাকাটা আমার...”

“সেই ব্যাপারেই কথা বলব।তাড়াতাড়ি এলে ভাল হয়,একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক ওয়েট করে আছেন।“

রাস্তায় যেতে যেতে মৌসুমির মাথায় একরাশ চিন্তা জড়ো হয়।কেন তার এই জরুরি তলব,যেখানে কাল এই ভদ্রলোক কাল তাকে প্রায় রিজেক্ট ই করে দিয়েছিলেন।আর ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোক ই বা কে?আর টাকাটার বিষয়ে কি বলবেন উনি?

লিফটে করে পাঁচতলার অফিসে এল মৌসুমি।লম্বা করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রমোদবাবুর রুমের সামনে দাঁড়িয়ে চমকে ওঠে সে।বাইরে ছাতা হাতে বসে আছে যে বৃদ্ধ ভদ্রলোক,সে আর কেউ নয়-তার বাবা।মৌসুমি বিস্মিত হয়ে তাকে ধরে বলল,”বাবা তুমি এখানে?”

“হ্যাঁ রে মা।তুই তোর স্বপ্ন পূরণ করবি,আর আমি তোর পাশে না দাঁড়িয়ে পারি?”

“কিন্তু তুমি জানলে কি করে,যে আমি আজ এডমিশন নিতে আসব?আমি তো বাড়িতে কিছুই বলিনি।“

“বাবা মায়ের কাছে সন্তানের কি কোন খবর লুকোনো থাকে রে?তোর সংসারের অবস্থাও আঁচ করেছি,তাই তো চলে এসেছি আজ।ভাবলাম তোকে নিজের হাতে ভরতি করিয়ে দিয়ে যাই। এডমিশন টেস্টে এত ভাল করেছিস,তারপর যদি না পড়তে পারিস তাহলে তার থেকে আফশোসের আর কি হত বল?”

“কিন্তু,কিন্তু..”বলে চোখ পাকাল মৌসুমি,”এত টাকা তুমি কেন দেবে?মায়ের শরীর খারাপ,আর তোমারো..,না না তা হয় না।আর তাছাড়া তোমাকে তো বলেছি যে টাকা নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই,আমি ব্যাবস্থা করে নেব।বলেছি না গ্রাজুয়েশনে ভাল নম্বর আর এডমিশন টেস্টের রেজাল্টের জন্য আমি ভাল ডিস্কাউন্ট পাচ্ছি?তোমার কোন চিন্তা নেই,হয়ে যাবে আমার।“

“মৌ, তুই চিন্তা করিস না।আমিও খবর পেয়েছি আর দুদিনের মধ্যে ভরতি হতে হবে,আর টাকা বড় সামান্য নয়।অত তুই কী করে জোগাড় করবি।টাকার জোগাড় হয়ে গেছে।আর তোর মাকে নিয়ে চিন্তা করিস না,তোর মা ভালই আছে।চল এবার।“

মৌসুমি কেঁদে ফেলে বলে,”কিন্তু এত টাকা তুমি পেলে কোথায়?তোমার তো ঐ কটা টাকা সম্বল।এরপর আমার পিছনে এত খরচ করলে তো তুমি নিঃস্ব হয়ে যাবে বাবা।না বাবা এ কাজ কোর না প্লিজ।“

“মা রে তুই ভাবিস না।আমার পুরনো কয়েকজন কলিগ আমায় টাকা দিয়ে সাহায্য করেছে।তাদের যে কোন সময় শোধ করে দিলেই হবে।আরে তুই কেন চিন্তা করছিস,আমি পেনশনের টাকা তো পাইই,আমার কোন অসুবিধা হবে না।তুই ই ভাল চাকরি পেয়ে ও টাকা শোধ করে দিতে পারবি।নে এখন চল,দেরি হয়ে যাচ্ছে।“

মৌসুমি আরো কয়েকবার পীড়াপীড়ি করল।তার বাবা কানেই তুললেন না।

প্রমোদবাবু আবারো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মৌসুমির সমস্ত ডকুমেন্ট গুলো দেখলেন।সবশেষে বললেন,”ঠিক আছে,আপনার মেয়ের রেজাল্টের জন্য আমরা ওকে টপ ব্যাচেই দিচ্ছি,ক্লাস শুরু হবে আগামী মাসের এক তারিখ থেকে।সোম থেকে শনি রোজ ক্লাস হবে,সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।আপনি নীচে গিয়ে অফিস থেকে টাকা জমা দেওয়ার ফর্ম নিয়ে ফিলাপ করে টাকাটা পে করে দিন।তবে হ্যাঁ,পারসোনালিটি ডেভলপমেন্ট আর ইন্টারভিউ এর জন্য আমাদের একটা কোর্স আছে,সেটা অপশনাল।চাইলে নাও নিতে পারেন।তবে যেহেতু প্রায় সব স্টুডেন্টই নেয়,তাই বলছি যদি নেন,তবে তার জন্য কিন্তু আলাদা একটা এমাউন্ট প্রতি মাসে দিতে হয়।নিতে চাইলে আপনাকে একটা ফর্ম দেওয়া হবে সামনের মাসে,ওটায় লিখে জানিয়ে দেবেন আর মাসের শেষে পে করে দেবেন।“

 বাইরে বেরিয়ে এসে মৌসুমি বাবাকে বলল,”বাবা তোমাদের কত অসুবিধায় ফেলে দিলাম।আমি পেরে যেতাম বাবা,যে করেই হোক,টাকাটা জোগাড় করতাম,দরকার হলে গয়না বেচে..”

“আমার মাথার দিব্যি রইল তোকে,আর অমন কথা বলবি তো।যতদিন তোর বাবা বেঁচে আছে,টাকা নিয়ে তোর কোন অসুবিধা হতে দেব না।তুই শুধু তোর ক“

“ঠিক আছে,কিন্তু আমি যদি খবর পাই মায়ের আবার অসুখ হয়েছে,আমি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পড়া ছেড়ে দেব বলে দিলাম,”মৌসুমির মুখ কঠিন হয়ে উঠল,”আর তুমি আমার জন্য কোনদিনও রজতের কাছে হাত পাতবে না কথা দাও।“

“কথা দিলাম রে মা।যে তো্কে সম্মান করতে জানেনা,তার কাছে ভিক্ষা করার প্রবৃত্তি আমার কোনদিন হবেনা।“

সব কাজ হয়ে গেলে মৌসুমি সজল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,”বাবা তোমার এত কষ্টের দাম আমি দেব,দেখে নিও।সেদিন আর তোমাদের কোন কষ্ট রাখব না।“

একমাস কেটে গেছে।মৌসুমির কোচিং ক্লাস আরম্ভ হয়েছে।ইনস্টিটিউশনের সংলগ্ন একটা লেডিস হোস্টেলে জায়গা পেয়ে গিয়েছিল সে।বাবা তার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তার হাতে এ মাসের ভাড়া আর মাসিক কোর্সের সমস্ত ফি রেখে গেছেন।ক্লাসের চাপে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না আর সবচেয়ে বড় কথা ইচ্ছাও হয় না।রজত তার খোঁজ নেয় না, ফোনও প্রায় করে না বললেই চলে।শ্বাশুড়ি মায়ের কথা ছেড়েই দিলাম।তাতে মৌসুমির খুব একটা কিছু যায় আসে না। এর মধ্যে এক রবিবারে সে বাপের বাড়ি গিয়েছিল তার মা বাবার প্রকৃত অবস্থাটা যাচাই করার জন্য। মা বাবাকে স্বাভাবিক ছন্দে দেখে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছিল সে।

মৌসুমির জেদ বেড়ে গেছে।এই বছর সে সফল না হলে কি হবে জানেনা,কিন্তু তার সামনে এখন দুটো মুখই ভাসে,তার মা আর বাবার।ছোটবেলা থেকে তার পড়াশোনা আর প্রতিষ্ঠার জন্য তার বাবাকে সে দেখেছে প্রাণপাত পরিশ্রম করে যেতে।রোজগার এমন কিছু আহামরি ছিল না,কিন্তু তার জন্য তার বাবা নিজের সেরাটুকু দিতে কখনো পিছপা হননি।নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে হলেও তাকে কখনো ভুগতে দেননি তারা।আর সেই জন্যই ইচ্ছা থাকলেও এখানে ভরতির কথা সে প্রথমে জানায়নি তাদের।পরে অবশ্য বলেছিল,কিন্তু খরচ খরচার কথা কোনভাবেই সে বাবাকে জানায়নি বিস্তারিতভাবে।তাও কারো মারফত খবর পেয়ে বাবা প্রায় সর্বস্ব বাজি রেখে তাকে এখানে পাঠিয়েছেন।এর দাম তো তাকে চোকাতেই হবে।তাকে জিততেই হবে,একজন সফল আই এ এস অফিসার হয়ে।

দিন এগিয়ে চলে।এখন বহির্জগতের সাথে যোগাযোগ অনেক কমে গিয়েছে তার।খালি বাবা মাসে মাসে আসে ভাড়া আর মাসিক খরচ খরচা দেওয়ার জন্য।ক্রমে মৌসুমি বুঝতে পেরেছে,উচ্চাশা পূরণের জন্য পরিশ্রম করতে গিয়ে মানুষ কতটা একঘরে হয়ে পড়ে।বড় একলা লাগে তার,জীবন টা শুধু সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে ডেইলি প্র্যাক্টিস সেট,নিউজপেপার কাটিং সহস্র স্টাডি মেটেরিয়াল আর মান্থলি টেস্টের আবরতে।কতদিন চন্দ্র সূর্যের মুখ দেখেনি কে জানে।অনেকেই সে শুনেছে এই কঠিন জীবনযাপন সহ্য না করতে পেরে ছেড়ে দিতে।কিন্তু মৌসুমি সে সবের পরোয়া করেনি।তার কারণ সে জানে, তার সামনে রাস্তা একটাই খোলা আছে।আর সত্যি কথা বলতে তার তো সেভাবে অন্যদের মতন পিছুটানও নেই।

পুজোয় এখানে কেবল চারদিন ছুটি থাকে।হস্টেল ঐ কদিন বন্ধ থাকবে,তাই ষষ্ঠীর দিন রাতে মৌসুমি বাপের বাড়ি চলে গেল।সপ্তমীর দিন সকালবেলা বসে সে পড়ছিল,এমন সময় তার বাবা এসে তাকে বললেন,”মৌ,ওনারা এসেছেন।“

রজত আর তার মা ঘরে ঢুকলেন।মুখে হাসি নেই।দুজনেই গম্ভীর।মৌসুমির বাবা মাথা নীচু করে বসে রইলেন।মৌসুমির মা রান্নাঘরে চা করতে গেলেন।মৌসুমিই প্রথম কথা বলল,”কী ব্যাপার,তোমরা?এখানে তো তোমাদের আসার কথা না।কী জন্যে এসেছ?”

দুজনেই গম্ভীর।তারপর রজতের মা রজতকে বললেন,”বাবু,ওকে বলে দে পূজোর সময় ঘরের বৌ ঘরে না থাকলে ভাল দেখায় না।অতএব ও যেন দয়া করে এ কদিন বাড়িতে আসে।“

রজত কিছু বলার আগেই মৌ বলল,”রজত তোমার মাকে বলে দাও,ঘরের বৌ যখন এতদিন ছিলনা এবং তার খোজ নেওয়ার কথাও কেউ ভাবেনি,তাহলে এই কদিনেও সে না থাকলেও খুব একটা অসুবিধা হবে না।“

গম্ভীর গলায় রজত বলল,”মা বলছে যখন,তখন চল।এমনিতে তোমায় নিতে আসার ইচ্ছা ছিল না আমার বিশেষ,শুধু মা বলল বলেই।“

“শোন রজত,এ সব লোক দেখানো জিনিস আমার সহ্য হয়না।পুজোয় বাড়ির বৌ না থাকলে পাড়ার লোকে হাজারটা প্রশ্ন করবে তাই এখানে এসেছ,কেমন?তাহলে ঠিক আছে,আমিও আমার উত্তর দিয়ে দিয়েছি,তোমায় আর কষ্ট করে আমায় নিয়ে যেতে হবে না।“

“তুমি তাহলে যাবেই না?”

“না।“

মৌসুমির বাবা একবার বললেন,”ওরা এতবার বলছেন,একবার ঘুরে আসতে পারিস মা।কতদিন হল যাসনি।ওদেরো তো খারাপ লাগছে।“

“না বাবা।এই ধরনের মানুষ গুলোকে খুব ভাল করে চিনে গেছি আমি,এরা কী চায় না চায়।তাছাড়া আমার হাতে পুজোয় কিছু করার মতন সময় নেই।শুনুন মা আপনি যা বলার বলেছেন,আমিও যা বলার বলেছি,আর নিশ্চয়ই কোন কথা থাকতে পারে না।এবারে আপনারা আসতে পারেন।“

এর মধ্যে মৌসুমির মা এসে গেছিলেন।চা য়ের ট্রে টা নামিয়ে মৌয়ের মা বললেন,”দিদি,এতদিন বাদে আপনারা এসেছেন,নিন একটু বসে চা খান।“

“বসে চা খাওয়া!”হেসে উঠলেন রজতের মা,”যে রঙ আপনার মেয়ে দেখাল,তারপর একটু বিষ মিশিয়ে আমাদের বরং খাওয়ান।চল রজত,আর মান খোয়ানোর ইচ্ছা আমার নেই।তবে ওকে একটা কথা বলে দিস,এরপর চিরকালের জন্য আমাদের বাড়ির দরজা ওর জন্য বন্ধ থাকবে।চল।“

ওরা চলে গেলে মৌয়ের মা প্রায় হাহাকার করে উঠলেন,”তোর এই জেদই কাল হল রে।একবার ঘুরে এলে কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত?এত গোঁ তোর?আর যদি কোনদিন তোকে বাড়ির বৌ বলে মেনে না নেয়,তখন কী করবি?কোথায় গিয়ে দাঁড়াব আমরা?”

“যামিনী,শান্ত হও।আমাদের মেয়ে এতটাও খেলো নয় যে কেউ ওকে গ্রহণ না করলেই ও পরিত্যজ্য হয়ে যাবে।ও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ওদের দেখিয়ে দেবে।তুমি ওর চিন্তা কর না।বরং আজ ব্রেকফাস্টে ওর জন্য ভাল কিছু বানাও তো।রোগা হয়ে গেছে মেয়েটা আমার,চোখের নীচে কালি পড়েছে এত পড়ে পড়ে।“

‘এক্সাক্টলি বাবা।তবে মা নয়,আজ ব্রেকফাস্ট আমি বানাব।“মৌ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,”রোগে ভুগে কষ্ট পায় মানুষটা,তাকে দিয়ে তুমি আবার খাটাচ্ছ?আবার এদিকে এক গেরো বাধিয়ে রেখেছ অতগুলো টাকা দিয়ে।সে যাই হোক,এই আমি বলে দিলাম যতদিন আমি এখানে আছি,ততদিন রান্না কাজকর্মের দায়িত্ব আমার।মাকে কোন পরিশ্রম করতে আমি দেব না।“

“কিন্তু তোর পড়া..”

“ও নিয়ে তুমি চিন্তা কোর না বাবা,সব ঠিক হয়ে যাবে।“

প্রিলিমস পরীক্ষা হয়ে গেছে।মৌসুমি সফলভাবেই তাতে উত্তীর্ণ হয়েছে।এখন তার সামনে ইউ পি এস সির সবথেকে কঠিনতম ধাপ-মেইনস এক্সাম। প্রিলিমসের পর পরই সিঙ্গেল রুম পেয়ে সেখানে চলে গেছিল মৌসুমি,পড়ার সুবিধার জন্য।

দিনরাত এক করে ফেলে মৌসুমি।নাওয়া খাওয়া ভুলে একচ্ছত্র ভাবে ন খানা পেপার দেওয়ার প্রস্তুতিতে মেতে ওঠে সে।বাবা মায়ের সাথেও আর ফোনে বিশেষ কথা হয়না।করলে তার বাবাই ফোন করে এবং উদ্বিগ্ন ভাবে তাকে পড়াশোনার পাশাপাশি শরীর ঠিক রাখতে বলে।কিন্তু মৌসুমি কোন কথাতেই কর্ণপাত করে না।তার স্বপ্ন সফলের পথে সবথেকে বড় বাঁধার মুখে আজ দাড়িয়ে।তাকে বাস্তবে পরিবর্তিত করতে হবে না? রজতদের করা প্রতিটা অপমানের জবাব ফিরিয়ে দিতে হবে না?তুচ্ছ শরীরের কথা ভাবলে চলবে এখন?

শারীরিক সমস্যা যে একেবারে হয়নি তা নয়।এর মধ্যে দুবার মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল সে।একবার তো কিভাবে বাড়িতেও খবর পৌছে গিয়েছিল,সম্ভবত হোস্টেলেরই কারো কাজ।বাবা মা তো শুনেই তাকে দেখতে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন,কিন্তু মৌসুমি অনেক বুঝিয়ে তাদের নিরস্ত করেছিল।এমনকি রজতও ফোন করে খোঁজ নিয়েছিল তার।তাকেও আসতে বারণ করেছিল মৌসুমি।

মেইনসের রেজাল্ট বেরোল।অভাবনীয় সাফল্য মৌসুমির।দেশের মধ্যে পঞ্চাশ তম স্থান অধিকার করেছে সে।আই এ এসের ইন্টারভিউ পর্বের জন্যও ডাক পেয়েছে সে।স্বভাবতই বাবা মা ভীষণ খুশি।মৌসুমির মুখেও হাসি উপচে পড়ছে।এর মধ্যে রজতও তাকে ফোন করেছিল।অবাক হয় মৌসুমি,যখন রজতও তার এই সাফল্যে তাকে শুকনো অভিনন্দন জানাল।যাক তাহলে হয়তো এতদিনে তার বোধ হয়েছে,যে মৌসুমিরও দম আছে আর সে হারার মেয়ে নয়। তবে তাদের সংসারের কী হবে তা এখনই ভাবতে রাজি নয় সে।এখন শেষ ধাপে সফল হওয়াই তার লক্ষ্য।

ইন্টারভিউয়ে সিলেক্ট হয়েছে মৌসুমি।আজ ই এপয়েন্টমেন্ট লেটারটা পেল সে।ট্রেনিং য়ে থাকতে হবে তাকে প্রথম এক বছর,তারপরে তার পোস্টিং হবে সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট পোস্টে।মৌসুমির বাবার চোখে জল।“মা রে আমি জানতাম তুই ঠিক পারবি।তাই তো অত ঝুঁকি নেওয়ার সাহসটা আমার মধ্যে এসেছিল।এখন তাহলে তুই নিশ্চিন্ত তো তুই মা?তুই তোর লক্ষ্যে সফল হয়েছিস,এখন আর কারুর মুখের দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই তোর।“

মা একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন,”তোর শ্বশুরবাড়ির লোক কি খবরটা জানে?ওরা কী বলছে?”

মৌসুমি বলল,”হ্যা মা আমি একটু আগেই ফোন করেছিলাম রজতকে।ও বলল ও শুনেছে।বিশেষ কিছু আর বলেনি,তবে বলল একবার যেন দেখা করি।“

“তাহলে আমি বলি কি মা,তুই বরং দেখা করেই আয়।যতই হোক,স্বামী সংসারকে এইভাবে বিসর্জন দিস না মা।হয়েছে তো অনেক কিছু,তুই যা চেয়েছিলি তা তো পেয়েছিস।এবারে ওদের সাথে বিবাদটা মিটিয়ে নে মা।ওরা যদি মেনে নেয় তাহলে অমত করিস না তুই।“

রজত আর রজতের মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মৌসুমি বলল,”তোমরা তো সবটাই শুনেছ।আমি যা চেয়েছিলাম তা হতে পেরেছি।আমার স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে।তোমরা হয়তো ভেবেছিলে আমি ব্যর্থ হয়ে আবার ভিখারির মত তোমাদের কাছে ফিরে আসব,কিন্তু সেটা হয়নি।তবে তোমরা এতদিন আমাদের সাথে যা ব্যবহার করেছ,সেজন্য আজ আর আমার মনে তোমাদের জন্য কোন রাগ নেই।এ সংসারকেও আমি আবার আপন করে নিতে পারব,যদি তোমরা আমায় সম্মতি দাও।তোমাদের কাছে আমি এক হিসেবে কৃতজ্ঞও, তার কারণ তোমাদের প্রতিটা অবহেলা আমার জেদকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল যে আমায় পারতে হবেই,শুধু নিজের জন্য নয়,সাথে দুটো বুড়োবুড়ি যারা জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত আমার প্রতিটা পদক্ষেপে নিরলসভাবে সাহায্য করে গেছে।তোমাদের অবহেলা আর বঞ্চনাই আমার ভিতর থেকে খাঁটি হীরেটাকে বার করে আনতে পেরেছে,এজন্য তোমাদের ধন্যবাদ।এবার তোমরা স্থির কর কী করবে?আই এ এস বৌকে রাখবে না তাতে তোমাদের অহংবোধ আহত হবে?সিদ্ধান্ত তোমাদের। শুধু এটা বলতে চাই,যাই সিদ্ধান্ত নাও না কেন,তাতে আমার কিছু আসবে যাবে না।ভেবে নাও রজত।“

কিছুক্ষণ সবাই চুপ।মৌসুমির বাবা মা বিহ্বল চোখে তাকিয়ে দেখছিল।রজতের মার মুখে কোন কথা নেই,তিনি নিঃশব্দে ভিতরে চলে গেলেন।হঠাত রজত এগিয়ে এসে রুদ্ধ গলায় বলল,” আমি স্বীকার করছি মৌসুমি অনেক পাপ করেছি। যদি কোনদিন পার তাহলে আমায় ক্ষমা করে দিও।তবে এ সংসার ছেড়ে যেও না,এটা আমার অনুরোধ।মা রাগের মাথায় অনেক কিছু বলেছিল,ওগুলো ধরে বসে থেকো না।মাকে আমি বুঝিয়ে বলব খন।মানছি তোমার সাফল্যে আমার কোন ভূমিকাই নেই,তবু এ অনুরোধ টুকু তুমি রাখ।“

“সংসারে বেশি সময় তো দিতে পারব না।তবে বলছ যখন,তবে ঠিক আছে।কী বল বাবা,”এক ঝিলিক হাসি খেলে গেল মৌসুমির মুখে।

ক্লান্তভাবে উপরে উঠে এল রজত।পাশের ঘরে মা বসে আছেন চুপ করে।রজত নিজের ঘরে ঢুকল।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। পিছন থেকে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে এলেন মৌসুমির বাবা।

রজত দেখে বলল,”ও আপনি,কিছু লাগবে আপনার,তাহলে..”

মৌসুমির বাবা স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন রজতের দিকে।তারপর বললেন,”কেন এমন করলে বাবা?কী পেলে তুমি?”

“কী বলছেন আপনি,আমি তো..”

“বাবা আমার বয়স হয়েছে,আজ আছি কাল নেই।কিন্তু তুমি আমায় দিয়ে এটা করালে কেন বাবা?এই বয়সে এতগুলো মিথ্যা কথা বলেছি, আমি যে নরকে যাব বাবা।“

“আপনি শুনুন আমার কথা...”

“তার আগে তুমি বল তুমি কেন এত সব কিছু গোপন রাখলে সবার থেকে?কেন তুমি মৌসুমির এডমিশনের সমস্ত খরচ আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলে আমি যেন বলি এ টাকা আমি দিয়েছি।কেন তুমি মাসে মাসে মৌসুমির সমস্ত খরচ পাঠিয়ে দিতে আমার হাত দিয়ে?কেন তুমি ওর মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে আমায় সাহায্য করতে,অথচ মৌসুমিকে দেখিয়েছিলে তুমি আমাদের প্রতি উদাসীন?বল কেন করেছিলে?”

রজত চুপ করে গেছে,একটা কথাও বেরল না মুখ দিয়ে।মৌসুমির বাবা ডুকরে উঠে বললেন,”কী পেলে তুমি বাবা?মৌসুমির কাছে কী তোমার সম্মান এতটুকুও বাড়ল?ও তো এসবের কিছুই জানে না।উপরন্তু তুমি আমায় অপরাধী বানিয়ে দিলে বাবা।দিনের পর দিন ওকে মিথ্যা কথা বলেছি।একজন বাবা সত্যিকারের যে শ্রম ব্যয় করে নিজের সন্তানের পিছনে,তার কিছু না করেই আমি মৌসুমির সম্ভ্রম আদায় করে গেছি।মহান হওয়ার অভিনয় করে গেছি,পিতার অনুভূতি গুলোকে নিয়ে জঘন্যভাবে খেলা করেছি।এজন্য আমি নিজেকে কোনদিনও ক্ষমা করব না।“

রজত এতক্ষণে বলল,”আপনি কোন অন্যায় করেননি বাবা।আমি যা করেছি সবটাই মৌএর ভালোর জন্য।আপনিও তাইই করেছেন।“

মৌসুমির বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।

“যখন মৌসুমি আমায় এই পরীক্ষা দেওয়ার কথা বলে,তখনই আমি বুঝেছিলাম ওর উচ্চাশা অনেক,ও পড়াশোনায় ভাল,জীবনে কিছু করতে চায়।কিন্তু সাথে এটাও আমার মনে হয়েছিল এই ধরনের পরীক্ষা দিতে গেলে নিজেকে পুরোপুরি পড়ায় মনোনিবেশ করতে হয়,অন্য কোন দিকে তাকালে চলে না।সংসারে বহাল থাকলে বা আমাদের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে ওর সংসারের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে যেত,কখনোই এতটা তাগিদ অনুভব করত না।আপনি ভাবুন বাবা,যখন ও শুনেছিল যে আপনি সংসার খরচ মায়ের চিকিৎসা এসব কিছুর তোয়াক্কা না করে লোকের কাছ থেকে টাকা ধার করে ওকে পড়তে দিয়েছিলেন,তখন কী ওর সফল হওয়ার আকাঙ্খা তীব্র হয়ে যায়নি?ও কী ভাবেনি,যে আমায় এ সকল কিছুর জবাব দিতে হবেই?ওর মধ্যে এই চাহিদা টুকু জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম আমি।বলুন,খুব ভুল কি করেছি?”

মৌসুমির বাবা চুপ।তারপর বিস্ময় ভরা কন্ঠে তিনি বললেন,”কিন্তু বাবা তুমি এতসব কিছু করলে,মৌসুমিকে এখন কি জানানো উচিত নয়? ওরও তো সত্যিটা জানা দরকার।“

“প্লিজ বাবা,আপনি ওকে কোনদিন জানাবেন না এ বিষয়ে।থাক না,সব সময় কী ভালোবাসা সামনা সামনি হয়?কিছু ভালোবাসা তো দূর থেকেও হয়।আমিও না হয় তাইই করলাম।আর মৌসুমি তো সংসারে ফিরে আসতে কোন আপত্তি করেনি।“

“তোমার মা কী বলছেন?তিনি কী মত দিয়েছেন মৌসুমির ব্যাপারে…”

“মাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না।মা পুরনোপন্থী মানুষ,তাই মেনে নিতে পারেননি তখন।এখন সব ঠিক হয়ে গেছে,একটু সময় দিলেই মা বুঝবেন।কোন অসুবিধা হবে না।“

“আপনি আর কোন চিন্তা করবেন না।আপনার দুঃখের দিন শেষ,আপনার মেয়ে ভাল চাকরি পেয়েছে,সে আপনাদের আর কোন কষ্ট রাখবে না।আর আমি তো রইলামই।“

মৌসুমির বাবার চোখে জল।পরম স্নেহে রজতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,

“বাবা কীভাবে তোমার ঋণশোধ করব তা আমার জানা নেই। বেঁচে থেকো বাবা। তোমার মতন জামাই যেন ঘরে ঘরে জন্মায়।“


Rate this content
Log in

More bengali story from Shubhranil Chakraborty

Similar bengali story from Inspirational