১ লা বৈশাখ
১ লা বৈশাখ
"তিতাসা এ তিতাসা" -১ লা বৈশাখ এর সকালে হঠাৎ এই ডাকটা শুনে বেশ চমকে উঠলাম। দোতলায় উঠে দেখি তিতাসার মা বারান্দা থেকে বাইরের দিকে কাকে যেনো ডাকছে ,কাকে কেন বলছি ও তিতাসা কে ডাকছে ,ও হ্যাঁ তিতাসা আমাদের মেয়ে।কিন্তু বাইরে তিতাসা নেই।বাইরে বর্ষবরণের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে বিকালে অনুষ্ঠান।এখন চলছে আধুনিক গান।এইসব দেখে তিতাসার মা রান্না ঘরে গেলো।আজ আমাদের বাড়ির ঠাকুরকে পায়েস ভোগ নিবেদন করা হয় সাথে নানান পদ।ভোগ হবে ১২ টায় ।আমার আর কোনো আগ্রহ নেই বাইরের এই উৎসব এর প্রতি।যদিও আমি চালু করেছিলাম এই উৎসব।এখন সারা দিন ঘরের দরজা বন্ধ থাকে পাছে কোনো আনন্দের কিছু না আসে এই অন্ধকারপুরি তে।
তিতাসার মা বললো " কি গো স্নান করো ভোগ এর দেরি হয়ে যাবে যে,তোমার তো চুল খুলে ভোগ দেওয়া যাবে না।"তিতাসের মা বরাবরই সাদামাটা জীবন পছন্দ করে।কাল সব পরিষ্কার করে রেখেছে ঘর - দোর। বিশেষ করে ওই যে দেখছেন ওই মেডেল,কাপ,ট্রফি গুলো ওগুলো ও রোজ পরিষ্কার করে। হ্যাঁ ওগুলো আমার মেয়ের।খানিক অগোছালো খামখেয়ালী মেয়ে আমার।আমি স্নান করে চুল শুকোবো বারান্দাতে ।রোজের কাজ এটা। তার পর ভোগ নিবেদন হবে আমার গিন্নি করবে।আমি বসে থাকবো। ওনার পরিষ্কার কাজ চুল যদি একটাও থাকে ভোগ বাতিল হয়ে যাবে।তাই আমাকে এখন ঢুকতে দেবে না ঘরে। স্নান এর পর আমি সব রেডি করে বললাম 'এসো ভোগ নিয়ে '। ও আসতেই আমি হাত থেকে ভোগের থালা নিয়ে নিলাম, না নিলে ওর হাত থেকে পড়ে যাবে ওই থালা।আমি থালা রাখতেই ও বসে পড়ে কেঁদে উঠলো ,এটা বিগত ৩ বছর ধরে হচ্ছে।আমি তো বাবা তাই কাঁদতে পারিনা সামনে, আমি বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে।আমি কাঁদলে যে ও আরও ভেঙে পড়বে।
ভিতরের সব এবার ও সামলে নেবে। হ্যাঁ আজ পয়লা বৈশাখ,ভিতরে ঠাকুরের পাশে এক বড়ো ফটোতে বড়ো রজনীগন্ধার গোড়ে মালা দেখে ও কাঁদছে।অন্য দিনের থেকে আজকের কান্না বেশি আজ ১ লা বৈশাখ কিনা।ঠাকুর জন্য যেমন ভোগ বস্ত্র রাখা ঘরে তেমন একটা শাড়ি আর একটা ভোগ এর থালা আছে ।১ লা বৈশাখএ আমার মেয়ের একটা নতুন জামা চাই চাই।আজ আমার মেয়ের মৃত্যু দিন।
ও এখন ভোগ নিবেদন করে বেরোবে। ঘর থেকে বেরোবে এক মা এর যন্ত্রণা নিয়ে আর আমার কাছে এসে বলবে "তোমার চুল আর কত বড় হবে" কান্নায় ফেটে পরবে সে।
আমার চুল আজ হাঁটু পেরিয়েছে ৪ বছরে।আমি ছোট করে চুল কাটাতাম কিন্তু ৪ বছর আগের থেকে চুল কটিনি।বলা যেতে পারে মানসিক এর মত।
আজ থেকে ঠিক ১০ বছর আগে শুরু হয় এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আমি ছিলাম এর প্রধান।এখন আর আমি থাকি না পড়ার লোকেরা করছে । তখন ছোট বড় সবাই মেতে উঠত নাচ,গান,আবৃত্তি,নাটক আরও কত কি।আমার মেয়ে ছিল নাচ এর বিভাগ এ।খুব ভালো নাচে পারদর্শিতা তার, বয়স ১৫ মাধ্যমিক দেবে পরের বছরে।এত বছর সব ঠিক থাক চলছিল ।ঠিক ৪ বছর আগে সব আনন্দ হয়ে গেলো অন্ধকারনগরী।
সেই বছর আমার সব অনুষ্ঠান এর কাজ করে বাড়ি গেছি চেঞ্জ করতে তখন অনুষ্ঠান মাঝের দিকে।হঠাৎ এক বন্ধু এসে বললো তিতাসাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।আমি তো অবাক ও তো এত দায়িত্বহীন নয় যে কোথাও কিছু না বলে চলে যাবে, এর পর ওদের নাচ।আমি বেরিয়ে দেখি নাচ বাদ দিয়ে পরের জন গান করছে ,সময় ৮ টা হবে হয়তো।সবাইকে খবর দিতে আমি বারন করেছিলাম ।একটু খোঁজ করতে জানা গেলো একটা গাড়ি করে ওকে কারা যেনো নিয়ে গেছে ।তক্ষুনি আমরা গাড়ি যেদিকে গেছে ঐদিকে গেলাম খানিক যাবার পর একটা খাল এর ব্রিজ আছে তার কাছে যেতেই জলে কিছু পড়ার আওয়াজ এলো আমরা তীরে এসে দেখলাম তিতাসা।আমি সাঁতরে তুলে হসপিটাল এ নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করছি কারণ ওর দেহে ক্ষতের চিন্হ স্পষ্ট।কোনো সার নেই কোনো রকমে ওকে হসপিটাল নিয়ে গেলে ওকে ভর্তি করার কিছুক্ষণ পর ডক্টর বললেন ওর মৃত্যু হয়েছে আর ওর শরীরে নির্যাতনের ছাপ স্পষ্ট। কিছু মানুষ রুপী মানসিক রোগীর মতো পশু ছিঁড়ে খেয়েছে তিতাসার দেহ।যাকে সভ্য সমাজে বলে রেপ।অত সুন্দর কাজল পড়া চোখ কাজল মুছে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে খোলা,পরনের নাচের সাজ নেই আর,নেই কোনো সৌন্দর্যটা ,নেই মাথায় চুল সব চুল উপরে ফেলেছে পশুর দল,শুধু আছে রক্তাত্ব দেহ যেটা ভোগ করেছে কিছু কামে উম্মত্ত পশু।
খবর বাড়িতে গেলে থেমে যায় সব আয়োজন। তিতসার মা পরিণত হয় মানসিক রুগীতে। আমি একা সবদিক সমলাতাম।কোনো কিছুই ছিলনা আমার কাছে শুধু আমার জামাতে লেগেছিল তিতাসার মাথার চুল।আমি তখনই প্রতিজ্ঞা করি যতদিন না ওই পশুদের শাস্তি দিতে পারি ততদিন আমি চুল কাটবো না।
পুলিশ এলো টেষ্ট হলো জিজ্ঞাসাবাদ সব হলো।কেস উঠলো কোর্টে কিন্তু মীমাংসা কি আর এত সহজে হয়!আমারও হাত বাঁধা তাই অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।দেখতে দেখতে ৪ বছর হলো সেই পশুদের কোনো শাস্তি হলো না তাই আমার চুল হাঁটু পেরিয়েছে।প্রশাসনিক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এখনও পশুরা নির্দ্বিধায় ঘুরছে শিকারের জন্য।
আবার সেইদিন সেই আলোকপূর্ণ ঝলমলে বাড়ি আজ অন্ধকার এর সমুদ্রে ডুবদিয়েছে।নেই কোনো সাজ,নেই কোনো নতুন শাড়ি পড়া কোনো বাবার রাজকন্যা,নেই সেই বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক এসো এসো গান -এর তালে নাচ।শুধু বিচার চেয়ে দুই প্রাণ আছে।
তিতাসা মা ১ লা বৈশাখ আসবিনা আজ প্রণাম করতে বাবা কে, হ্যাঁ হয় তো আমার চুল দেখে বলবি " আহ বাবা চুলটা কাটোনা" ।কাটতে তো চাই মা কিন্তু আগে খাঁচায় পুরি পশুদের তারপর।
"কতদিন যে এই চুল বইতে হবে কে জানেরে মা"?
" আজ ১ লা বৈশাখ"
