Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Drishan Banerjee

Inspirational


3  

Drishan Banerjee

Inspirational


তুমি কি কেবল ছবি( শেষ পর্ব)

তুমি কি কেবল ছবি( শেষ পর্ব)

5 mins 7.0K 5 mins 7.0K

নীলদার সাথে আমার দেখা সেই নিষিদ্ধ গলির আধা অন্ধকার ঘরে যখন আমার বয়স মাত্র এগারো। ঐ বয়সেই জীবনের আসল সত্য জেনে গিয়েছিলাম। যৌবন প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই আমি পণ্যে পরিণত হয়েছিলাম। শিশু থেকে কিশোরী হওয়ার আগেই নারী নামক সুস্বাদু মাংসের পিণ্ডে পরিণত হয়েছিলাম। সেই অন্ধকার জগতে কি করে এসেছিলাম ভাল করে মনে নেই। আবছা মনে আছে কোনো ষ্টেশনে হারিয়ে গিয়ে এক মাসীর খপ্পরে পড়েছিলাম। আমায় বোধহয় কিছু খাওয়ানো হয়েছিল স্মৃতিশক্তি নষ্টের জন্য। জ্ঞান হয়ে থেকেই নাচ,গান আর ছলাকলা শেখানোর নামে নগ্ন করে আমায় ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল একদল পশুর মাঝে। না, পশুরাও বোধহয় এতো হিংস্র হয় না। স্বজাতির শাবকের উপর এমন অত্যাচার করে না। ঐ নরখাদকেরা শুধু শরীর নয় ঐ শিশুসুলভ মনটাকে আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করেও শান্তি পেত না , তৃপ্ত হতো না। ঐ বয়সে প্রতি নিয়ত ধর্ষিতা, অত্যাচারিতা হয়ে আতঙ্কে থাকতে থাকতে আমার মধ্যে যে শিশুর সত্ত্বা তার মৃত্যু ঘটেছিল। সমাজের প্রতি এক তীব্র ঘৃণা আমার চোখে ফুটে উঠত।

 সেই সময় একদিন এক-ঝলক আলো আর ঠাণ্ডা বাতাস নিয়ে আমার ঘরে এসেছিল এক তরুণ শিল্পী। আমার নগ্নতাকে খাদ্য হিসাবে নয়,আমার কিশোরী মনকে ফুটিয়ে তুলেছিল তার ক্যানভাসে। আমার দুঃখ, কষ্ট, সমাজের প্রতি তীব্র ঘৃণা,আমার না বলা কথা,সব তার তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছিল সেই জীবন্ত ক্যানভাসে। আমার অসাবধানতায় কিছু লাল রং ছিটকে লেগেছিল ক্যানভাসের এক কোনে।

আমায় ছাড়াও বেশ কয়েকজনকে মডেল করে সে এঁকেছিল কয়েকটা ছবি। বেশ কিছুদিন ধরে আমার মডেল আঁকতে আঁকতে আমার গল্পটাও জেনে নিয়েছিল সে। আমায় স্বপ্ন দেখিয়েছিল এক নীল আকাশে উড়ে বেড়ানোর। কিন্তু সে পথ ছিল ভীষণ পিচ্ছিল।

কোন জাদুমন্ত্রবলে আমায় একদিন সেই অন্ধকার দমবন্ধ করা গর্তের বাইরে টেনে এনেছিল সে। আমরা পালিয়ে গেছিলাম বহু বহু দূরে এক পাহাড়ের ছোট্ট একটা গ্ৰামে। না, এই প্রথম আমার শরীরের দখল কেউ নেয় নি। ছবি আঁকা শেষ হয়েছিল আগেই। আর আমায় নগ্ন হতে হয় নি। সারাদিন নীলদা ব্যস্ত থাকত নিজের রঙের জগতে। আর আমি তাকে সাহায্য করতাম হাতের কাছে সব এগিয়ে দিয়ে। ক্যানভাসে ফুটে উঠত আমার দেখা পরিচিত সব দৃশ্য একের পর এক। নীলদাকে দেখতাম কি অপরিসীম যত্নে তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলত সেই সব মেয়েদের যন্ত্রণা। আমি সেই কিশোরী বয়সে মনে মনে পূর্ণ যুবতী হয়ে উঠেছিলাম। আমার ভগবান ছিল নীলদা। আমি মনেপ্রাণে তাকে আমার সবটুকু অর্পণ করেছিলাম। কিন্তু সে ছিল সব কিছুর ঊর্ধ্বে, এক আপন ভোলা মহাপুরুষ।

একদিন থাকতে না পেরে প্রশ্ন করেছিলাম-" এতো সুন্দর পৃথিবী তে এতো কিছু থাকতে শুধু ঐ একটি বিষয়ের উপর ছবি কেনো ?"

 অনেকক্ষণ আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে থেকে সে বলেছিল -" আমিও একজনকে খুঁজছি, জানি না পাবো কিনা। এতো বড় পৃথিবীর কোন অন্ধকার গলিতে সে আছে, আদৌ আছে নাকি অত্যাচারের বলি হয়েছে এতদিনে......"

 আমাদের এই সুখের জীবনের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র অল্প কিছুদিন। নীলদার আঁকার হাত ধরেই একদিন সেই অন্ধকারের বাদশারা আমার সন্ধান পেয়ে ছুটে এসেছিল। নীলদার অপরাধ ছিল ক্ষমার অযোগ্য। আমার মত সোনার ডিম দেওয়া রাজহাঁসের জন্য সেদিন রঙ তুলির বদলে অস্ত্র তুলতে হয়েছিল তাকেও। পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল আমাদের। ঐ কানের আর হাতের কনুইয়ের গভীর ক্ষত আমায় বাঁচানোর উপহার। বেশ কিছুদিন নিজের আঁকা আর আমাকে আগলে পালিয়ে পালিয়ে বেরিয়ে নীলদা বুঝেছিল এভাবে চলবে না। বেঁচে থাকতে হলে অর্থের প্রয়োজন, আর রঙ তুলির আঁচড় বহন করছে নীলদার পরিচয়। লুকিয়ে থেকে এভাবে লড়াই করা যাবে না। ছবি বিক্রি করতে গেলেই ধরা পড়ে যাবো আমরা।

অবশেষে বেনামে কিছু ছবি বিক্রি করে আমায় এক মিশনে দিয়ে এসেছিল নীলদা। আমার ছবিটা কখনো বিক্রি করবে না বলেছিল।তখন বুঝি নি এই শেষ দেখা, আমায় বলেছিল ছুটিতে আসবে। মন দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে। অতীতকে ভুলে গিয়ে পড়াশোনা করে ভবিষ্যৎ কে মজবুত করতে। আমিও ওর কথা মত এগিয়ে গেছিলাম ভবিষ্যতের দিকে। মিশনের সন্ন্যাসিনীদের সান্নিধ্যে এ পথ প্রশস্ত হয়েছিল। প্রথম প্রথম অপেক্ষা করতাম সে আসবে। সেই অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে হতে আমি শিক্ষকতার কাজ নিয়ে কলকাতায় ফিরে এসেছিলাম সাত বছর আগে, সেই এগারো বছরের কিশোরী আজ একত্রিশ বছরের যুবতি। প্রতিটা অঙ্কন প্রদর্শনীতে আমি খুঁজে বেড়াতাম আমার প্রথম ভালবাসা কে। সেই দিনের সেই তরুণ যুবক আজ বার্ধক্যের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।

 নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে সে বলল -" কেমন আছিস বৃষ্টি?" এ নাম তারই দেওয়া। প্রথমদিক আমার দু চোখে জলের ধারা দেখে এই নামেই আমায় ডেকেছিল সে। আমার আসল নাম মনে পরে না, মাসী যে নাম দিয়েছিল সেই নামের সাথে লজ্জা আর প্রবল ঘৃণা জড়িয়ে আছে। আমি আজ বৃষ্টি নামেই পরিচিত। পদবিটা নিজেই চুরি করেছিলাম, আজ আস্তে আস্তে ভিক্ষা চাইলাম পরিচয়ের। স্বীকৃতি চাইলাম আমার ভালবাসার।

সূর্য ডোবার পরেও আজ আকাশ নীল। এক মায়াবী আলোয় মুক্ত নীল আকাশের দিকে চেয়ে সে বলল -" আমার নিজের পরিচয় আজ হারিয়ে গেছে। পালাতে পালাতে আর লুকিয়ে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত হয়ে পরেছিলাম। যার খোঁজে একদিন ঐ অন্ধ-গলিতে প্রতিনিয়ত ছুটে যেতাম সে যে আর নেই বুঝতে পেরেছিলাম। ছবি আঁকার নামের আড়ালে আমিও আমার ছোটবেলার ভালবাসাকে খুঁজে বেড়াতাম, ওকে ওর কাকা ওখানে বিক্রি করেছিল। কিশোর বয়সে আমি পারি নি ওকে বাঁচাতে। ওর বদলে তোকে বাঁচাতে পেরে হয়তো একটু প্রাশচিত্ত হয়েছিল। আমার শত্রুর অভাব নেই , তাই সারাটা জীবন লুকিয়ে কাটাতে হলো। শিল্পীর সত্তাকে তো লুকিয়ে রাখা যায় না, আর বাঁচতে গেলে অর্থের প্রয়োজন। আমার আঁকা বেনামে এবং কিছু শর্তে কিনে নেয় আমার ঐ শিল্পী বন্ধু। অবশ্য কিছু ছবির শুধু প্রদর্শনী হবে বিক্রি হবে না। আর সেই অর্থে রাস্তার কিছু অসহায় মেয়েকে আমি একটু আশ্রয় দিতে পেরেছি। কটা মেয়েকে সুস্থ আকাশের নিচে সুস্থ পরিবেশ দিতে পেরেছি। পরিচয় আজ আমার নিজেরই নেই। তোকে কোথা থেকে দেবো বল।"

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। ঐ নীল আকাশের থেকেও বড় হৃদয় আমার নীলদার। গেছিলাম সেদিন নীলদার সাথে তার ছোট্ট বাসায়। চারটা মেয়ে রয়েছে, সবাইকে কিছু না কিছু শেখাচ্ছে নীলদা। কেউ সেলাই শিখছে, কেউ পড়াশোনা করছে, কেউ আবার আঁকা শিখছে। আর এদের দেখাশোনা করছে পার্বতী মাসী। এই পার্বতী মাসিও একদিন ছিল ঐ অন্ধকারের রানী। আজ এই বিগত যৌবনাকে ঐ বাজার যখন ছিবড়ে করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে তাকেও আশ্রয় দিয়েছে এই নীলদা।

নিজের শিল্পী সত্তাকে বিক্রি করে এদের বেঁচে থাকার রাস্তা দেখাচ্ছে এই মানুষটা।

মনটা কেমন হয়ে গেছিল। এই মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেছিল হাজার গুন। একটা মানুষ নিজের ভালবাসাকে না পেয়ে, তার স্মৃতিতে এ ভাবে যদি একটা গোটা জীবন কাটাতে পারে আমিও আমার নীলদাকে দূর থেকে ভালবেসেই বাকি জীবনটা কাটাতে পারবো এই বিশ্বাস নিয়ে ফিরেছিলাম সেদিন। নীলদার মতো লোক এই সমাজে এখনো রয়েছে বলেই পৃথিবীটা এখনো বসবাস যোগ্য রয়েছে। সেদিন থেকে ওর আদর্শ এবং দেখানো পথেই আমিও জীবন কাটাবো পণ করেছিলাম।

 

সমাপ্ত


Rate this content
Log in

More bengali story from Drishan Banerjee

Similar bengali story from Inspirational