সন্ধ্যাপ্রদীপ
সন্ধ্যাপ্রদীপ
বেশ কিছুক্ষণ ধরে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। লোকাল বাস,কখন কোথায় দাঁড়াবে তার ঠিক নেই। দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করতে হয়। আমি দাঁড়িয়ে আছি রাস্তার এক কোনাচে। সন্ধ্যেবেলা থেকেই আকাশ মুখ বেজার করে আছে,এখন রাত হয়ে গেছে তাই বোঝার উপায় নেই। পুব দিক থেকে দমকা হাওয়া বইছে ক্ষণে ক্ষণে-তাতে রাস্তা থেকে ধুলোমাটি উড়ে এসে আমার চোখে মুখে লাগছে পানির ছিটের মত। আমি ঠোঁট,চোখ বুজে দঁড়িয়ে আছি। মাঝে মাঝে চোখ খুলে একটু দেখে নিচ্ছি বাস এলো কিনা। মেঘলা আকাশে বিজলি চমকাচ্ছে,তার কিছুক্ষণ পর ভেসে আসছে মেঘের ডাক। যেন মেঘের আড়ালে বসে থাকা কোনো দানবের অট্টনাদ। বাসের কোনো খবর নেই কিন্তু বৃষ্টি এই এলো বলে,যেন ধুলোর বর্ষণ কম পড়েছে। দূর্যোগের রাত। এমন রাতে কেউ নিতান্ত দায়ে না পড়লে বাইরে বেরোয় না।আমার দায় ছিল তাই বেরিয়ে ছিলাম। ঝিকাতলায় একটা টিউশানি করাই। এটা করেই পেটে ভাতে বেঁচে আছি। এটাও যদি না করি তবে ঝোলা থেকে বাটি বের করতে হবে এমন অবস্থা। পড়াশোনার পাট আগেই চুকিয়ে ফেলেছি। বাবা-মা বছর এক-দুই আমার চাকরির আশায় বসে ছিলেন। অবশেষে তারা সে আশা ঝেড়ে ফেলেছেন।আসল কথা হল,আমার মত অপদার্থ মানুষের সবই চুকে গেছে। গুড ফর নাথিং টাইপ। পেটের খিদে চুকিয়ে ফেলা যায় না,সেজন্য অসহায় হয়ে “ডিগ্রি” নামক অহং এক পাশে সরিয়ে রেখে যা পাওয়া যায়,তাই করতে হয়। ভদ্র ঘরের ছেলে বলে অন্যদিকের পথ মাড়াই নি। এই পথে চোখ-মুখ বন্ধ করে যা পাচ্ছি তাই করছি।
দূর থেকে বাসের হেডলাইটের আলো দেখতে পেলাম। পরক্ষণেই শুনতে পেলাম,”এ,সাইসল্যাব,নিউমার্কেট,শাবাগ,পেসকেলাব,
গুলিস্তান,মতিঝিল,আরামবাগ……,মামা কই যাবেন?”
যাক বাবা এল তবে।
বাসের ভেতর ঠেসে লোক ওঠানো হয়েছে; তার নতুন সংযোজন আমি। লোক বোঝাই করা বাসে আমি ওঠাতে অনেকেই বিরক্ত হলেন। কিছু যাত্রী আমার দিকে বিষ নজরে তাকালেন। একজন চড়া গলায় কন্ডাক্টর কে বললেন, ”এই ব্যাটা,আর কত উঠাবি?এই তোর সিটিং সার্ভিস!”
লোকটার কথায় সায় দিয়ে পুরো বাসে ছোটখাটো অসন্তোষের গুঞ্জন উঠল। কন্ডাক্টর সেদিকে কোনো গুরুত্বই দিলো না। আমাকে বলল,”যান,যান,পিছে সিট খালি আছে।” পেছন থেকে একজন বলে উঠল,”হ,তোর ইয়ে!”
দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে হাত দিয়ে ঠেলে,কত লোকের পা মাড়িয়ে “সরি,দেখতে পাই নি”, “মাফ করবেন” বলতে বলতে বিদ্ধস্ত অবস্থায় সিটের কাছে পৌঁছালাম।
সিটের কাছে গিয়ে বুঝলাম এটা কেন এখনো ফাঁকা।
সিটের গদি রডের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে ভেতরে দেবে গেছে। সিটের নিচে একটা পুরোনো চাকা রাখা। মোটামুটি বসার অযোগ্য। কিন্তু ক্লান্ত শরীর,নিরুপায় হয়ে হাঁটু ভাঁজ করে মাথার কাছে এনে বসে পড়লাম ওখানে। বসেও শান্তি নেই। পুরো বাস জুড়ে অসহ্য ভ্যাপসা গরম। মানুষগুলো জোরে জোরে কথা বলছে,ফেরিওয়ালা চিৎকার করে ফেরি করছে,রাস্তার গাড়িগুলো তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। কে বলবে দশটা বাজতে চলল রাতের। একদম অস্বস্তিকর পরিবেশ। বাসের ভেতর,এতগুলো মানুষের তপ্ত নিশ্বাসে দম বন্ধ করা অবস্থা। আমি আরো ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তবে স্বস্তির কথা হল-
আমার সিটের সাথেকার স্লাইডিং উইন্ডোটার চাকায় সমস্যা বোধ হয়। আমার দিকে খানিকটা হা হয়ে আছে। ওখান দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছে বেশ। চটচটে ঘামে লেপ্টে যাওয়া শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে। সারাদিনের খাটুনিতে শ্রান্ত স্নায়ু আর ধরে রাখতে পারলাম না, ধীরে হিমেল-শীতল এক ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলাম। বাইরে তখন অঝোর ধারায় বর্ষণ শুরু হয়েছে। উত্তপ্ত রাস্তার বুকে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখে মনে হলো যেন মালা ছিঁড়ে টপটপ করে পড়তে থাকা অজস্র মুক্তা। হঠাৎই ঘুম পেতে লাগল,দুর্বল শরীরটাকে এলিয়ে দিলাম পেছনে। কান থেকে আশেপাশের শোরগোল মিলিয়ে যেতে লাগল ধীরে ধীরে। দৃষ্টি ঝাপসা হতে হতে লুপ্ত হয়ে গেল একসময়। না,ঘুমিয়ে পড়িনি তখনো। আধো-ঘুম,আধো জাগরণের মাঝে একটা ঘোর লাগা মুহূর্ত। বাসের ঝাঁকুনিতে দুলতে দুলতে,চোখে নেমে আসা সোনালি-কালো আবছায়ায় মধুর কোনো সুরের লহরী বাজাতে বাজাতে চেতন-অচেতন হতে লাগলাম বারেবার। একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না ।ঘুম থেকে জেগে উঠলাম কন্ডাক্টরের ডাকে, ”এই মিয়া,আর কতক্ষণ ঘুমাইবেন? যাইবেন কই আপনে?”। কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। ঘুম ঘুম চোখে পুরো বাসে একবার নজর বোলালাম। হায় ! হায় ! একি কাণ্ড! বাস ভর্তি যাত্রী ছিল,এখন দেখি পুরো বাস ফাঁকা। শুধু সামনের দিককার সিটে দুজন বসে আছে। সর্বনাশ! লাফিয়ে উঠে জানালা দিয়ে ইতিউতি করে দেখার চেষ্টা করলাম কোথায় আছি এখন।
সেরেছে ! বাসের লাস্ট স্টপেজ ছিল তালতলা। আমার সেখানেই নামবার কথা। সে অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। বাস এখন যাচ্ছে মোহাম্মদপুর-বসিলার দিকে। সারাদিন শেষে বাসগুলোকে ওখানেই রাখা হয়। কাল সকালে আবার সেখান থেকেই ছাড়বে। আমি ধপ করে সিটে বসে পড়লাম। এখন কি করব,কি করব ! খুব দ্রুত চিন্তা করতে লাগলাম। ভাবলাম,এখনি যদি নেমে পড়ি তবে বাড়ি ফেরার একটা ব্যবস্থা হয়তো করা যাবে। এই ভেবে উঠে দাঁড়ালাম। ড্রাইভারকে বাস থামানোর কথা বলতে যাব,হঠাৎ করে চোখ চলে গেল সামনের সিটে বসে থাকা দুজন যাত্রীর দিকে। অল্প বয়ষ্ক দুটি মেয়ে,বছর ষোলো-সতেরক হবে। দরিদ্র,মলিন চেহারা। সাজপোশাকও তেমনি। তাদের সিটের পাশে পলিথিনের ব্যাগে রাখা খাবারের ক্যারিয়ার। হয়তো কোথাও চাকরি করে,নাইট-শিফ্্ট শেষ করে বাড়ি ফিরছে। সাধারণ দুজন যাত্রী। তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কন্ডাক্টরের দিকে তাকালাম। এতক্ষণ খেয়াল করিনি,এখন করলাম। আলোর বিপরীতে দাঁড়ানোয় ওকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ওর অবয়বটাকে দেখাচ্ছে একটা কালো ছায়ার মতোন। ক্ষণিকের জন্য বিভ্রমের মতো হলো। মনে হলো আমার সামনে যেন অশুভ কিছু দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ কি যেনো হয়ে গেলো আমার মধ্যে-একে একে মনে পড়ে যেতে লাগল পত্রিকায় পড়া কিছু বিভৎস ঘটনার কথা। যেগুলোর অবতারণা ঘটেছিল এমনি পরিবেশে, কোনো নিসংগ বাসে। আমার মনে পড়ে গেলো রূপার কথা। বাবা-হারা এক মেয়ে। বাড়িতে মা আর ছোট ভাই। মেয়েটার উপার্জিত অর্থেই চলতো সংসার। বাড়ি ফিরবার পথে একা-অসহায় অবস্থায় শিকার হয়েছিলো কিছু দানবের। ছোট ভাইয়ের প্রিয়,মায়ের স্নেহের, দু:খ ভুলে স্বপ্ন সাজানোয় বিভোর মেয়েটার শেষ পরিণতি হয়েছিল দানবদের হাতে ঘাড় মটকে নি:শেষ হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। ঘটনাটি আমাকে চরমভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি একজন মেয়ে জন্মাবে,বড় হবে কিছু দানবের হাতে ঘাড় মটকে মরে যাবার জন্য। এতটুকুই মূল্য সভ্যতা আদায় করতে পেরেছে মেয়েদের জন্য ! আমি রাগে,ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিলাম। কিছুই করতে পারিনি,কিছুই বলতে পারিনি। কারণ আপনাদের আগেই জানিয়েছিলাম। আমি অপদার্থ।আমার কিছু করার ক্ষমতা নেই।
কন্ডাক্টর আমাকে আবার জিজ্ঞেস করল, ”কি মিয়া,নামবেন না?” আমি জবাব দিলাম না। মেয়ে দুটোর দিকে তাকালাম আবার। আমি যদি এখন নেমে যাই, তাহলে মেয়ে দুটির কপালে কি দূর্দশা নেমে আসতে পারে,তা ভেবে শিউরে উঠলাম। আবার ভাবলাম,এও তো হতে পারে আমি যা ভাবছি তা অবান্তর কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু ভাগ্য তাদের দানে কি চেলে রেখেছে তা কেউ জানে না। জানালার ঘোলা কাচের ভেতর দেখা যাচ্ছে নিজেকে।বৃষ্টিভেজা নীল কাচ গড়িয়ে পড়ছে জল-তার মধ্যে আমি,অসহায়,ক্লান্ত মুখ,চোখের দৃষ্টি বহুদিন আগেই হারিয়েছে বিশ্বাস।ভেজা জানালা আজ আয়না হয়ে দাড়িয়েছে সামনে-পরাজিত এক জনকে দেখা যায়।ঠিক করলাম মেয়ে দুটো নিরাপদে গাড়ি থেকে না নামা পর্যন্ত আমিও নামবো না।
কন্ডাক্টর অসহিষ্ণু গলায় তাড়া লাগালো, ”আরেহ্,আর কতক্ষণ বইসা থাকবেন? নামেন না ক্যা?”
আমি বললাম, ”এইতো ভাই সামনে। সামনেই নেমে পড়ব।”
বলে জানালার দিকে মুখ করে বসে রইলাম। কিন্তু ভেতরে কি হচ্ছে তার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখলাম। কন্ডাকটর উশখুশ করতে করতে সামনের দিকে চলে গেল।ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আমাকে কিছুক্ষণ,তারপর দুই যাত্রীর দিকে।কিছুদূর যাবার পর কন্ডাক্টর আবার এলো আমার কাছে,
” আইলেন তো সামনে,আর কত?”
ওকে বললাম, ”এইতো ভাই এসে গেছি,আর একটু।”
এবার ড্রাইভার মুখ খুলল ।ফ্রন্ট গ্লাসের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে আমাকে প্রশ্ন করল, ”আপনি যাইবেন কই আসলে? গাড়ি তো এইডা সোজা যাইব বসিলা। হের পরে তো আর যাইবো না। হেনে গাড়ি ফালায় থুমু সকাল পন্ত।”
আমি বললাম, ”আমি সামনেই নেমে পড়ব। আপনি সামনে রাস্তা দেখে গাড়ি চালান,না হলে এক্সিডেন্ট করবে।”
মেয়ে দুটো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল সব ।হয়তো কিছু আন্দাজ করতে পেরেছে।হাসছিল আমাকে দেখে। হয়তো ভেবেছে লোকটা পাগল।
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে বসিলা যাবার পথে রাস্তার চারপাশে সারিবাঁধা একতলা,টিনশেড কিছু বাড়ি আছে। নিম্ন আয়ের মানুষদের থাকার জায়গা। মেয়ে দুটো সেখানে নেমে পড়ল। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে একটা বেজে সতেরো মিনিট। আমি হাঁটছি। বৃষ্টি থেমে গেছে। রাতটাকে আজ অনেক বেশি সজীব বলে মনে হচ্ছে। আকাশের অভিমান কেটে গেছে। কালো পিচঢালা পথে জমে থাকা পানিতে উঁকি দিচ্ছে চাঁদ। যেন আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে আমি একা নই। চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে চারপাশ। মেঘের আড়ালে এত সুন্দর চাঁদ লুকিয়ে ছিল কে জানত?
