প্রাক্তন
প্রাক্তন
এদিকটায় আসা হয় না অনেক দিন। সবকিছু পাল্টে গেছে কেমন যেন। পুরোনো আসবাবের দোকানগুলো এখন আর নেই,নেই সেই ছোট দোকানগুলো।মাটিতে পাতা আতর,পাঁচ টাকা মূল্যের সর্বরোগ নিরাময়ের শিশির দোকানগুলো।বিকেলের দিকে জমজমাট হয়ে উঠতো বেচাকেনা।এখন কেমন নির্জন হয়ে পড়েছে এলাকাটি। প্রাণচাঞ্চল্য নেই,কোলাহল মিশে গেছে কোথাও।
কাছেই একটা পার্কে এসেছি।এখানে একা আসা যায় না। পূর্বে যার সংগ পাবার লোভে আসতাম,সে আমার সংগ ছেড়েছে বহুদিন।তাই আমার এই বিরতি। বিরতি ভাঙার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।তবে ভাঙলাম কেন?
শফিক।
গতরাতে মেসঘরের তিনতলায় এসে নিজ থেকেই ধরণা দিলো,সাথে করে এনেছিল এক টুকরো কাগজ। আমি তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম।
আমার মত খুবই সাধারণ যাপিত জীবন যাদের,তাদের জীবন ভীষণ ম্যাড়মেড়ে। সেখানে বোশেখ মাসের দমকা হাওয়া এসে খুব কমই আলোড়ন তোলে। কাগজের ভাঁজ খুলে লেখাটি পড়বার প্রয়োজন হয়নি।শফিক বলছিল,মোহিনী তোর সাথে দেখা করতে চায়। কাল বিকেল পাঁচটায়,লেক সার্কাস পার্কে।
সে কি! এত দিন পর! কথাটি শুনবার পরমাত্রই বদ্ধ ঘরে আটকে পড়া শব্দের মতো আমার মনে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।
লেক সার্কাস পার্কটি বেশ সাজানো গোছানো।সূর্য অস্তে যাবার প্রাক্কালে নানান বয়সের মানুষের ভীরে, ছোটো ছোটো ছেলেপেলের কলরবে মৃতপ্রায় স্থানটি প্রাণ ফিরে পায়। আমার রঙিন সময়গুলোতে আমি এবং মোহিনী প্রায়শই বেড়াতে এতাম এখানে।
অনেক দিন পর এসে মনটা অন্যরকম হয়ে গেল আজ। দীর্ঘদিন ছেদ পড়ার কারণেই কিনা জানি না,অচেনা ঠেকছে জায়গাটা। ছেলেপেলেদের আনাগোনা এখন তেমন আর নেই। কিছু বুড়ো মানুষ ঝিম ধরে বসে পরিবেশটা আরো ভারাক্রান্ত করে রেখেছে।
আমি আমাদের পুরোনো জায়গাটি খুঁজে পাবার চেষ্টা করলাম। প্রায় নিভে আসা আলোতে খুব বেশি গতি করতে পারলাম না,অন্ধকারের মধ্যেই আমি আন্দাজ করতে লাগলাম কোথায় হতে পারে। হঠাৎই ল্যাম্পপোস্ট গুলো জ্বলে উঠলো। তখনই চোখে পড়ল…
১২৯ নম্বর পিলার।এইতো সেই জায়গা। মাথার উপর সবুজ আলো টিম টিম করে জ্বলছে, নিচেই একখানা বেঞ্চ। আমার এবং মোহিনীর প্রিয় জায়গা। আমাদের ছোট্ট কিন্তু বিচিত্র কিছু মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিলারটি। আমি আস্তে করে বেঞ্চটায় বসে পড়লাম। চারদিক নিরবতায় স্তব্ধ হয়ে আছে। জরাগ্রস্ত দিবস কর্মব্যস্ত সময় পার করে স্থাণুর মত নিশ্চুপ হয়ে আছে। শীত চলে গেছে,কিন্তু শীতল হাওয়া শাড়ির আঁচলের মত স্পর্শ করে যাচ্ছে শেষবারের মতন।
পরিবেশ বিচারের কারণেই হয়তো মনে ভাবালুতা পেয়ে বসলো। কৃত্রিম আলোর ছায়াতলে,মায়াময় এই সন্ধ্যায়,বিজনে বসে নিজেকে শুধচ্ছিলাম, কেন এসেছি আজ? কিসের আশায়? মোহিনীকে পাবার প্রত্যাশা,সে বহুকাল পূর্বেই জলাঞ্জলি দিয়েছি। তবে আজ কেন তার খুব সামান্য আহ্বান কে প্রত্যাখান করতে পারিনি? কেন কাঙালের মতো ছুটে এসেছি?
আমি মহা কর্মবীর নই। এখানে না এলে হয়তো অন্য কোথাও গিয়ে সময় বেচে ফিরতাম। কিন্তু বিস্মিত হলাম,এখানে কেন এলাম? মোহিনীর এক ঝলক সাক্ষাত লাভের প্রত্যাশায়? নিজেকে ধিক্কার দিলাম। আমি তো কম ইতর নই! জীর্ণ দীন হীন ভিখারিকে “মাফ করেন” বলার পরও সে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকলে বিরক্তি অনুভূত হবেই।
আত্মগ্লানি বয়ে আনা চিন্তাগুলো করতে আর ভালো লাগছিলো না। আমার চোখ পড়ে গেলো সামনের পিলারটার দিকে। ১২৯ নম্বর পিলার। এই পিলার এর সামনেই মোহিনী প্রথমবার আমাকে চুমু খেয়েছিলো। পিলারের গায়ে প্রেমিকযুগল তাদের নাম লিখেছে।আমি আমাদের নামটা খুঁজলাম,পেলাম না। নতুন প্রেমিকযুগলের আড়ালে আমাদের নাম হারিয়ে গেছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। পরমুহূর্তেই বেশ হাসি পেল আমার ছেলেপনা দেখে।
বেশ কিছু সময় পেরিয়ে গেল।মোহিনীর আসার নাম নেই। একাকী আর কতক্ষণ বসে থাকা যায়? একসময় আমার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটল। বারবার ঘড়ির সাথে ফোনের সময় মেলাবার চেষ্টা করলাম। ডান হাতের মুঠোয় মোহিনীর পাঠানো চিরকুটটি। অভিমান ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।তবে কি মোহিনী কি আমার সাথে রসিকতা করল? এত নিষ্ঠুর রসিকতা করা কারো পক্ষে সম্ভব?
অস্থির চিত্ত কে কাবু করতে না পেরে আমি আর একটু হলে উঠে চলেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু একটা অপূর্ব কণ্ঠস্বর আমাকে পেছন থেকে টেনে ধরল।
-কেমন আছো?
মোহিনীর কণ্ঠ। যেন দীর্ঘ দিন খরায় পরে থাকা বিদীর্ণ প্রান্তরে আকস্মিক বর্ষণ হল।
বিস্ময়ের জোয়ার কাটতে না কাটতেই দেখলাম,কখন যেন সে আমার পাশে এসে বসেছে। সবুজ-আকাশ রাঙা ইষৎ রক্তিম আলোয় দেখলাম তাকে। মৃদু হাওয়ায় দোদুল্যমান কেশগুচ্ছ মুখের উপর থেকে সরিয়ে মুচকি হাসি দিল সে। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলাম ওকে। ব্যথিত হচ্ছিলাম আরো একটি ইন্দ্রিয় না থাকার জন্য। মনে হচ্ছিল,মোহিনীর রূপকে ধারণ করার জন্য পাঁচটি ইন্দ্রিয়ই যথেষ্ট নয়। আমার তন্ময় ভেঙে গেল ওর গলার আওয়াজে।
-কেমন আছো?
-হুম! কিছু বললে?
খিলখিল করে বাচ্চা মেয়ের মত হেসে ফেলল সে। হাসতে হাসতেই শুধালো,
-আরে বাবা,প্রশ্ন করলাম যে কেমন আছো? চমকে যাচ্ছো কেন? আমাকে আগে দেখ নি কখনো?
বলে আবার সেই হাসি। আমি বিব্রত হয়ে মাথা নামিয়ে ফেললাম। প্রশ্ন করলাম,
-কেমন আছো মোহিনী?
-এইতো বেশ।তুমি?
আমি মোহিনীর চোখের দিকে তাকালাম।
-ওহ! বুঝেছি।
বলেই মোহিনী গম্ভীর হয়ে গেল। আমার খুব বলতে ইচ্ছা হল,আর একটু হাসো না? এইতো বেশ লাগছিল।কিন্তু সাহসে কুলালো না।
মোহিনী পাশ থেকে কিছুক্ষণ আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করল।কণ্ঠে অবজ্ঞার ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
-বাহ! তুমি দেখছি আগের মতোই আছো।
এবার আমার আরো একবার বিব্রত হবার পালা। জোর বিহীন হাসি হেসে বলার চেষ্টা করলাম, দূর কি যে বলো… কথাটা চাপা পড়ে গেলো মোহিনীর আরেকটি প্রশ্নে,
-পায়ে এটা কি পরে এসেছো?
আমি চকিতে পায়ের দিকে তাকালাম। বহু ব্যবহারে মলিন একজোড়া স্যান্ডেল।আমি তড়িঘড়ি করে এই দৈন্যতা ঢাকবার জন্য পা দুটো গুটিয়ে নিলাম।
-থাক থাক,হয়েছে!
ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকালাম মোহিনীর দিকে।একসময় যার হৃদয় দেখে প্রেম নিবেদন করেছিলাম,সে এমন হৃদয়হীনা হল কবে!
পরবর্তী কিছুক্ষণ কারো মুখেই কোনো কথা ফুটলো না। অস্বস্তিকর মুহূর্তে পড়ে গেলাম। না পারি কিছু বলতে, না পারি উঠে চলে আসতে।মোহিনীর সামনে থেকে চলে আসার মত অহং আমার কখনো ছিল না। রাত্রি বিদায় পূর্বে যেমন চাঁদ বিদেয় নিতে পারে না,আমিও চুপচাপ বসে রইলাম। নিস্তব্ধতার মাঝেই অনুভব করলাম,কোথায় জানি সুরটা কেটে গেছে। জড়তা কাটাবার জন্যই বললাম,
-আজ তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।
ভাবান্তরিত না হয়ে গম্ভীর মুখে সে বলল,
-আজ তোমাকে কিছু বলার জন্য ডেকেছি।
আমি জানতাম কি অপেক্ষা করছে।
-কি বলবে?
-দেখো,মানুষ জীবনে অনেক সময় ভুল করে।সেই ভুলগুলো আঁকড়ে ধরে থাকলে আরো বড় ভুল হয়।তাই মানুষের উচিত ভুলগুলো শুধরে নিয়ে,নতুন করে শুরু করা।
-কি বলতে চাইছো?
-তখন আমার বয়স অল্প ছিল। জীবনকে ভেবে দেখি নি। তোমার কথায় মজে গিয়ে,তোমার সাথে জড়িয়ে গিয়েছিলাম।এটা আমার ভুল ছিল।
-এটা তোমার ভুল ছিল?
-হ্যাঁ,শাহেদ! এটা আমার ভুল ছিল।
কেনো? প্রশ্নটা করতে গিয়ে মাঝপথেই আটকে গেলাম।ঠিকই তো বলেছে সে। আমার পাশে বসে আছে সদ্য পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করা শিক্ষক মোহিনী রহমান। এবং তার পাশে আমি?
আচাভুয়ো একজন মানুষ। কোনোরকমে পড়াশোনার পাট চুকানো একজন বেকার। নবীন রজনীর ছড়িয়ে পড়া আঁধারে উজ্জ্বল মোহিনীর পাশে আমার শ্রীহীনতা বড্ড বেমানান।
যথাসম্ভব নিজেকে সংযত করে প্রশ্ন করলাম,
-এটা বলার জন্যই ডেকেছিলে?
-না,এটার জন্য।
মোহিনী একটা কার্ড আমার হাতে ধরিয়ে দিলো।
মোহিনী রহমানের পাশেই,অন্য একজনের নাম লেখা।
মোহিনী বলতে লাগল,
-আমাদের ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র।আমাকে অনেক পছন্দ করে।পারিবারিকভাবেই প্রস্তাব এসেছিল। আমি আর অমত করি নি।
আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম।মোহিনীকে খোঁচা দেবার জন্যই বললাম,
-ভালো করেছ,ভুলটা শুধরে নিয়ে।
ঝংকার শোনা গেল একটা,
-জীবনটাকে শুধু আবেগ দিয়ে মেপে দেখলেই হয় না শাহেদ।আবেগ নিয়ে চলতে গিয়ে দেখো আজ তোমার কি হাল!
আমি প্রতিবাদ করতে পারলাম না।
মোহিনী বলে যেতে লাগল।বলার মতো ওর ছিল অনেক কথা।আমি চুপচাপ শুনে গেলাম।না,না ভুল বললাম।শ্রোতা হবার ভান করেছি মাত্র।মোহিনীর বলা কথাগুলোর সিকিভাগও আমার কানে পৌঁছায় নি।
আমার ঘোর কেটে গেল,যখন সে বলল,
-আমার ওপর কোনো রাগ রেখো না শাহেদ।তোমার জীবনটাও নতুনভাবে শুরু করো।বিয়েতে এসো কিন্তু।উনি অনেক ভালো মনের মানুষ।তোমার কথা বলেছি। তোমার সাথে পরিচিত হলে উনি অনেক খুশি হবেন। আসি তাহলে।ভালো থেকো।
ভালো থেকো?
মোহিনী চলে যাবার পর এক রাশ শূন্যতা ভর করলো আমাকে। কতক্ষণ সেখানে বসে ছিলাম এবং কিভাবেই বা মেসে ফিরে এলাম সেটা একটা প্রহেলিকা বটে।
মেসে এসেই বয় জহিরকে দেখলাম।ওকে বললাম,
-এক কাপ দুধ চা খাওয়া জহির।
-দুধ চা হইবো না বাই।
-সে কিরে! কেনো?
জহির বলল,
-দুধ নাইগা বাইসাব।ডেট শ্যাষ।
কথাটা শুনে আমি হো হো করে হেসে উঠলাম।
