Sucharita Das

Romance Inspirational


1  

Sucharita Das

Romance Inspirational


সময়ের স্রোতে

সময়ের স্রোতে

5 mins 425 5 mins 425

"মা প্লিজ একটু একা ছেড়ে দাও আমাকে।ফর গডস শেক, প্লিজ লিভ মি অ্যালোন"। রিম এর এই কথার পরও এলা ওকে কাছে টেনে সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিল। কিন্তু মেয়ের বিরক্তিকর মনোভাব দেখে আর সাহস করলো না এলা ওর কাছে যেতে। সত্যি আজকালকার ছেলে মেয়েদের মন, মর্জি, মেজাজ কোনোটাই বাবা, মায়েরা বুঝতে পারে না। কথায় কথায় এদের মুড অফ হয়ে যায়। এই ভালো তো এই খারাপ।অথচ হাজার বিরক্তি হলেও এলা মুখে কিছুই বলতে পারছে না রিম কে। একমাত্র মেয়েকে নিজের মতো করে থাকতে দিচ্ছে এলা। তার মুড অনুযায়ী চলতে হচ্ছে এলাকেও। অথচ এলার মনে আছে তাদের ছোটবেলায় পান থেকে চুন খসলেই উত্তম মধ্যম মার খেত মায়ের কাছে। কত বড়ো বয়স অবধি মায়ের হাতে মার খেয়েছে তারা ভাইবোনেরা। মাধ্যমিকের টেস্টে অংকে ১০ পেয়েছিল বলে, মায়ের হাতের সেই মার ভুলতে পারবে ও কোনোদিন? সেদিন কাঁদতে কাঁদতে মাকে কথা দিয়েছিল ও , অংকে ভালো নাম্বার পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করবে।তারপর মায়ের সেই মারের কথা মনে করে, সারাদিন রাত পরিশ্রম করেছিল ও । অংকে ভালো নাম্বার পেয়ে মাকে দেওয়া সেই কথা ও রেখেওছিল। অথচ এখন কি যুগ পড়েছে। হামেশাই নিউজ পেপারে পড়ে, খারাপ রেজাল্টের জন্য বাবা , মায়ের বকা খেয়ে, ছেলে মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আগে কার দিনে তো মারের ভয়ে ই ওরা শোধরাতো।আর এখন ছেলে মেয়ে হাজার দোষ করলেও কিছু বলতে পারবে না।সব মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই বাবা মায়ের কাছে। শাসন করবার ও উপায় নেই, কারণ এতে ছেলেমেয়ের মুড আরও অফ হয়ে যাবে। কখনও কখনও তারা ডিপ্রেশনে চলে গিয়ে কোনো ভুল পদক্ষেপ ও নিতে পারে ,এই ভয়ে কিছু বলতেও ভয় হয়।


আর ওদের সময়ে ,শাসনেই ছেলে মেয়ে ঠিক হতো। আসলে ভয় বলে একটা জিনিস ছিলো ওদের মনে।যেটা এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভীষণ ভাবে অনুপস্থিত। ব্যতিক্রম কিছু আছে অবশ্যই। । এলা ভাবে ওরা তো টেলিভিশনে সিনেমা দেখা ই প্রথম শুরু করেছিল মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার পর‌‌‌।তার আগে টিভির সামনে বসতো ওই বাংলা দূরদর্শনে চিচিং ফাঁক, হরে কর কমবা এইসব অনুষ্ঠান হলে আর হিন্দি দূরদর্শনে রামায়ণ, মহাভারত এইসব হলেই।তখন তো আর এতো হাজারো রকমের চ্যানেল ছিলো না। দূরদর্শনে চিত্রহার বলে একটা হিন্দি গানের প্রোগ্ৰাম হতো তখন। সেটা দেখতে বসলেও বাবার বকুনি শুনতে হতো।ওইসব দেখার নাকি বয়স হয়নি ওদের। বাবার অফিস থেকে ফিরতে যেদিন দেরি হতো একটু। সেদিন ওদের ভাইবোনেদের কপাল খুলে যেত।চিত্রহার দেখতে পাব আজ এই আনন্দে। আর এখন কোন্ যুগে পৌঁছে গেছি আমরা।জন্মের পর থেকেই বলতে গেলে বাচ্চাদের হাতে মোবাইল ধরিয়ে দিই আমরা। এটা সত্যি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে , বাবা মায়েদের এটা করতেই হবে। নইলে যা যুগ পড়েছে। ওই বাচ্ছা ই বড়ো হয়ে বাবা মাকে দোষারোপ করবে ,যে কেন তাকে শেখালাম না ,কেন তাকে দিলাম না।



এই তো সেদিন এলা কে ওর বান্ধবী নীতা ফোন করে বললো, ওর ছেলের স্কুল থেকে গার্জেন কল করেছে। ওর ছেলে আর তার কয়েকজন বন্ধু মিলে নাকি লুকিয়ে মোবাইলে ব্লু ফিল্ম দেখছিলো। সেটা জানাজানি হতে প্রিন্সিপাল স্যার সব গার্জেন কেই ডেকে পাঠিয়েছেন। নীতা তো কথা বলতে বলতে বারবার বলছিলো,শেষে এই দিন দেখা বাকি ছিলো। এলা মনে মনে ভাবছিল, আসলে দোষটা কিছুটা হলেও আমাদের ই। একটা বয়ঃসন্ধি ক্ষণের ছেলের এইসবের প্রতি আগ্ৰহ অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। টিভি তে যখন স্যানিটারি ন্যাপকিনের অ্যাড দেখায়, এখনও পর্যন্ত অনেক বাড়িতেই চ্যানেল চেঞ্জ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেটা না করে যদি আমরা মা , বাবা , ঘরের লোকজন সেই ছেলেটিকে এটা বুঝিয়ে বলি যে,এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা ঘটনা। তোমাদের যেমন বড়ো হলে কিছু শারীরিক পরিবর্তন হয়, ঠিক তেমনি একটি মেয়েরও বড়ো হলে প্রত্যেক মাসে একটা ব্লিডিং ডিসচার্জ হয়। আর তখনই তাদের স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রয়োজন হয়। ব্যস্ এইটুকু কথা একদিন বলে দিলেই আর অতটা ঔৎসুক্যতা থাকবে না ছেলেটার। আগেকার দিনে এসব ভাবাটাই অন্যায় বলে মনে করা হতো। কোনো মেয়ের পিরিয়ডস হলে ই তো তাকে অচ্ছুৎ এর মতো রাখা হতো। আচার ছোঁয়া যাবে না, রান্নাঘরে যাওয়া যাবে না,আরো কত কি।আর পিরিয়ডস যে হয়েছে সেই কথাটা ই তো সবার থেকে লুকিয়ে রাখা হতো।যেন মেয়েটির পিরিয়ডস হয়েছে নাকি সে কোনো খুন করে ফেলেছে কাউকে।যে জিনিসের সঙ্গে মানুষের জন্ম রহস্য জড়িয়ে আছে, সেটা এতো আড়াল করবার কোনো প্রয়োজন আছে কি। তবে সময়ের চাকা ঘুরেছে,আর তার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে আমাদের মানসিকতার ও। যেটা খুব বেশি প্রয়োজন ছিল।পিরিয়ডস নিয়ে ভুল ভ্রান্তি যেমন অনেকটাই কেটেছে। তেমনি কেটেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অজ্ঞতাও। আজকাল মানুষ নিজেদের ইচ্ছায়, নিজেদের সময়মত তার বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনছে। নিজেদের শারীরিক, অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কটা সন্তান হওয়া উচিত সেটাও ঠিক করছে আজকের মা,বাবা।




"মা আমাকে কিছু খেতে দাও" ছেলে রিমাশের কথায় এলার সম্বিত ফিরল। বললো," হ্যাঁ চল্ দিচ্ছি"। তারপর ছেলেকে খেতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,"হ্যাঁ রে বোনের কি হয়েছে কিছু জানিস। সকাল থেকে তার মুড অফ হয়ে আছে কেন? কিছু তো বলছেও না।" ছেলে বললো জানে না সে।এলা আবার মেয়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মেয়ে নীচু গলায় কারুর সঙ্গে কথা বলছে। এলা ভাবলো কিছু খাবার নিয়ে এসে রিমের সঙ্গে কথা বলবে। কিন্তু হঠাৎই এটা কি শুনলো ও? কাকে বলছে রিম ওর পিরিয়ড মিস হয়েছে এ মাসে। আর সেজন্যই রিম ভীষণ টেনশন করছে। কথাটা শুনে এলার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল মনে হলো। তবে কি রিম? না আর ভাবতে পারছে না এলা।ওর পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে গেছে। কি হবে এবার? সত্যি যদি রিম কিছু ভুল কাজ করে ফেলে তাহলে কি করবে ও? দৌড়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে আসে এলা। ওকে দেখে রিম তাড়াতাড়ি ফোনটা কেটে দিলো। তারপর অপ্রস্তুত হয়ে বললো,"মা তুমি কি করছো এখানে"?

এলা এতটুকুও ভণিতা না করে রিমকে বললো,"সব ঘটনা খুলে বল্ আমাকে।"

রিম তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল তার এই মাসে পিরিয়ডস হয় নি , সেজন্য সে টেনশন করছে।এলা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললো , তাতে এত টেনশনের কি আছে। তারপর মেয়েকে খোলাখুলিভাবে জানতে চাইলো সে কোনো ভুল করেছে কিনা। মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল ,"না মা এরকম কোনো কাজ আমি করিনি।" এলার বুকের উপর থেকে একটা পাথর সরে গেল মনে হলো। রিমকে জড়িয়ে ধরে, ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,"কদিন আরও দেখি, নাহলে একজন গাইনোকলজিস্ট এর সঙ্গে কনসাল্ট করবো।" রিম আরো ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে বললো,"না মা যদি কিছু হয়ে যায় আমার।ও মা আমার কিছু হয়ে যায়নি তো? "এলা মেয়েকে দেখলো ।কি সুন্দর নিষ্পাপ শিশুদের মতো মুখ রিমের। গোলগাল একটা পুতুলের মতো।এই মেয়ে কখনও কোনো ভুল করতে পারে? অথচ ভুল না করেও কত ভয় পেয়েছে ও। আচ্ছা রিম যদি এখন এলাকে বলতো যে ও কনসিভ করেছে, তাহলেও কি এলা ওকে এতটাই কাছে টেনে নিতে পারতো? হয়তো এর উত্তর এলার নিজের ও জানা নেই।হয়তো এক্ষেত্রে এলা এখনও অন্য পাঁচটা মায়ের মতই ওভার রিঅ্যাক্ট করতো। পাশ্চাত্যে তো এ ধরণের ঘটনা হামেশাই ঘটছে। কিন্তু আমরা হয়তো মনের দিক থেকে এখনো ঠিক অতটা আধুনিক হয়ে উঠতে পারিনি। আসলে সময় যতই এগিয়ে যাক, সংস্কার বলে একটা কথা আছে তো।এলা জানে রিম কখনও এ ধরণের ভুল কাজ করবে না।ওর সংস্কার ওকে বাধা দেবে ঐ ধরণের কোনো ভুল কাজ করতে।




আসলে সময় পাল্টায়, যুগ পাল্টায়, মানুষের ধ্যান ধারণা পাল্টায়। কিন্তু মায়ের মমতা, সংস্কার এগুলো হয়তো একই থাকে। শুধু চিন্তা ধারার পরিবর্তন হয়। দিন বদলের সাথে সাথে, সময়ের স্রোতে আমরাও হয়তো আরো এগিয়ে যাব সব দিক থেকেই। হয়তো বা এরই নাম আধুনিকতা।


          


Rate this content
Log in