শ্রদ্ধাঞ্জলি
শ্রদ্ধাঞ্জলি
শ্রদ্ধাঞ্জলি ভোরের আকাশে লাল আভা। শীতের শেষ স্পর্শ লেগে আছে বাতাসে। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। শোভন ধীরে ধীরে হাঁটছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। হাতে সাদা ফুলের স্তবক, কাঁধে একটি ব্যাগ। শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে যাবে সে। হঠাৎ তার কানে এল কারও কান্নার শব্দ। রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধা বসে আছেন, কাঁদছেন নিঃশব্দে। শোভন এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে দিদিমা?" বৃদ্ধা তাকালেন তার দিকে, চোখে একরাশ কষ্ট। বললেন, "বাবা, আজকের দিনে ওদের কথা খুব মনে পড়ছে।" শোভন অবাক হয়ে বসে পড়ল বৃদ্ধার পাশে। জানতে চাইল, "কার কথা বলছেন?" বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, "তখন আমি তরুণী, মাত্র বিয়ে হয়েছে। আমার স্বামী, দেবর, আর কয়েকজন বন্ধু ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। ওরা দিনের পর দিন মিছিল করত, পোস্টার বানাত, স্লোগান দিত—'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!' আমি রান্না করে তাদের খাবার দিতাম, চোখের জল ফেলতাম, কিন্তু বাধা দিইনি।" তিনি একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর বললেন, "সেই দিনটা... একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। ওরা সকলে বেরিয়ে গেল মিছিলের জন্য। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। তারপর গুলির শব্দ এলো। আমি দৌড়ে গেলাম রাস্তায়। দেখলাম, লাশ পড়ে আছে... আমার স্বামীর রক্তে ভেসে গেছে পথ।" শোভনের গলা শুকিয়ে গেল। বৃদ্ধার কাঁধে হাত রাখল সে। বৃদ্ধা বললেন, "আমরা ভাষার জন্য কী না করলাম, আর আজকের প্রজন্ম সেই ভাষাটাই বিকৃত করে কথা বলে। বাংলা শব্দের মাঝে ইংরেজি ঢুকিয়ে দেয়, মাতৃভাষার মর্যাদা কজনই বা রাখে?" শোভন লজ্জায় মাথা নিচু করল। ভাবতে লাগল, আজ সত্যিই আমরা ভাষা শহীদদের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি তো? ভাষার জন্য যারা জীবন দিল, আমরা কি সেই ভাষাকে যথাযথ সম্মান দিতে পারছি? সে নিজের ব্যাগ থেকে একটি খাতা বের করল। তার নিজের লেখা কিছু কবিতা ছিল সেখানে। বৃদ্ধার হাতে খাতাটা দিয়ে বলল, "দিদিমা, আমরা যারা সত্যিই বাংলা ভালোবাসি, তারা চেষ্টা করছি ভাষার মর্যাদা রাখতে। আমি প্রতিদিন আমার কবিতায় বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি।" বৃদ্ধার চোখে অশ্রু ঝিলিক দিল। তিনি শোভনকে আশীর্বাদ করলেন, "তোমাদের মতো তরুণরাই পারবে বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে, গৌরব দিতে।" শোভন মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়াল। এবার সে শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে গেল আরও দৃঢ় প্রত্যয়ে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি আর সাহিত্যকে কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেবে না। শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না, বাংলা ভাষা চিরকাল জ্বলজ্বল করবে, সেই আগুনের মতো, যা একদিন রক্তের বিনিময়ে জ্বলে উঠেছিল।
কলমে
ইন্দ্রানী পালিত কর্মকার
