শেষ ট্রেনের শেষ সিটি
শেষ ট্রেনের শেষ সিটি
রাত ১টা ১৭ মিনিট।
শহরের শেষ ট্রেনটা তখন প্ল্যাটফর্ম ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাহাত দৌড়ে এসে উঠল শেষ বগিতে।
শ্বাস নিতে নিতে চারপাশে তাকিয়ে দেখল—পুরো বগি প্রায় ফাঁকা।
শুধু এক কোণায় বসে আছে একজন বৃদ্ধ।
সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টাক, আর চোখ দুটো অদ্ভুত স্থির।
রাহাত একটু স্বস্তি পেল।
কমপক্ষে একা নয়।
ট্রেনটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
হঠাৎই ভেতরের লাইটটা কেঁপে উঠল—একবার, দুবার… তারপর স্থির।
রাহাত মোবাইল বের করে সময় দেখল—১:১৭।
কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই।
ঠিক তখনই সে শুনল—
কেউ যেন ফিসফিস করে বলছে,
“এই ট্রেন… থামে না…”
রাহাত চমকে উঠে চারদিকে তাকাল।
বৃদ্ধ লোকটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
— “আপনি কিছু বললেন?”
— “আমি না,” বৃদ্ধ ধীরে বলল, “তুমি শুনেছো।”
রাহাতের গলা শুকিয়ে গেল।
ট্রেনটা হঠাৎ অস্বাভাবিক গতিতে ছুটতে লাগল।
জানালার বাইরে সবকিছু ঝাপসা।
— “এই ট্রেন কোথায় যাবে?” রাহাত জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বলল—
“যারা নামতে পারে না… তাদের জায়গায়।”
রাহাত বুঝতে পারল না।
ঠিক তখনই ট্রেনটা একটা অন্ধকার টানেলের মধ্যে ঢুকল।
সব আলো নিভে গেল।
পুরো বগি অন্ধকার।
রাহাত অনুভব করল—তার পাশ দিয়ে কেউ হাঁটছে…
কিন্তু সেখানে তো কেউ ছিল না!
তার কানে ভেসে এল—
“আমরা নামতে পারিনি…”
আলো ফিরে আসতেই রাহাত দেখল—
বগি ভর্তি মানুষ!
কিন্তু… তাদের কারও চোখ নেই।
শুধু ফাঁকা গর্ত।
সবাই একসাথে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
রাহাত চিৎকার করতে গেল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।
বৃদ্ধ তখন উঠে দাঁড়াল।
— “ভয় পেও না,” সে বলল, “প্রথমে সবারই এমন হয়।”
— “কী… কী হচ্ছে এটা?” রাহাত কাঁপতে কাঁপতে বলল।
বৃদ্ধ তার দিকে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি যেদিন স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলে… মনে আছে?”
রাহাতের মাথায় হঠাৎ ঝলক খেলল—
সেই দিন… সেই দুর্ঘটনা…
শেষ ট্রেন… আর একটা ধাক্কা…
তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
— “তুমি তো সেদিনই মারা গেছো,” বৃদ্ধ শান্তভাবে বলল।
রাহাতের হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গেল।
স্ক্রিনে তখনও সময় দেখাচ্ছে—
১:১৭।
ট্রেনটা আবার সিটি দিল।
হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল নিজে থেকেই।
বাইরে গভীর অন্ধকার।
বৃদ্ধ বলল—
“এবার নামার সময়।”
— “আমি নামতে চাই না!” রাহাত চিৎকার করল।
বগির সব মানুষ একসাথে বলল—
“আমরাও চাইনি…”
একটা অদৃশ্য শক্তি রাহাতকে টেনে নিয়ে গেল দরজার দিকে।
শেষ মুহূর্তে সে বৃদ্ধের দিকে তাকাল—
“আপনি কে?”
বৃদ্ধ হেসে বলল—
“আমি? আমি সেই লোক… যে প্রতি রাতেই নতুন যাত্রীদের স্বাগত জানাই।”
রাহাত অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করল।
পরের স্টেশনে দাঁড়াল।
প্ল্যাটফর্মে একজন নতুন মানুষ দৌড়ে এসে উঠল—
হাঁপাতে হাঁপাতে, ভয় না পেয়ে।
বগির ভেতরে বৃদ্ধ আবার বসে পড়ল।
মৃদু হাসল।
আর ফিসফিস করে বলল—
“এই ট্রেন… কখনও ফাঁকা থাকে না…”

