শেষ ট্রেনের অজানা যাত্রী
শেষ ট্রেনের অজানা যাত্রী
রাত তখন ১২টা পেরিয়ে গেছে।
ঘন কুয়াশা চারপাশ ঢেকে ফেলেছে। আকাশে চাঁদ নেই, তারা নেই—শুধু একটা অদ্ভুত চাপা অন্ধকার।
বেলতলা জংশন স্টেশনটা দিনের বেলা যতটা সাধারণ লাগে, রাতের বেলা ততটাই ভয়ংকর হয়ে ওঠে। পুরনো লাইটপোস্টগুলো কাঁপতে কাঁপতে জ্বলে-নিভে, প্ল্যাটফর্মে জমে থাকা ধুলো আর শুকনো পাতা বাতাসে উড়তে থাকে। যেন বহুদিন কেউ এখানে আসে না।
অর্ণব হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেশনে পৌঁছাল।
শেষ ট্রেনটা ধরতেই হবে।
সে চারদিকে তাকাল।
কেউ নেই।
না কোনো টিকিট কাউন্টার খোলা, না কোনো যাত্রী, না কোনো শব্দ।
শুধু দূরে কোথাও একটা কুকুরের হাহাকার।
অর্ণবের বুকের ভেতর অস্বস্তি জমতে লাগল।
হঠাৎ…
দূরে একটা হুইসেল।
তারপর অন্ধকার ভেদ করে একটা আলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
ট্রেন।
কিন্তু কিছু একটা ঠিক নেই।
ট্রেনটা যত কাছে আসছে, ততই অর্ণবের মনে হচ্ছে—এটা যেন স্বাভাবিক না।
কোনো শব্দ নেই।
চাকা চলছে… কিন্তু শব্দ নেই।
হুইসেল বাজছে… কিন্তু যেন দূর থেকে ভেসে আসছে।
ট্রেনটা এসে থামল।
দরজা খুলে গেল।
কেউ নামল না।
কেউ উঠল না।
অর্ণব এক মুহূর্ত দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো—না উঠলেই ভালো।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই ভেতর থেকে একটা ঠান্ডা হাওয়া বেরিয়ে এল।
সেই বাতাস যেন তাকে টেনে নিল।
সে উঠে পড়ল।
🚪 নীরব যাত্রা শুরু
ভেতরে ঢুকেই অর্ণব বুঝল—এটা সাধারণ ট্রেন না।
কামরাটা অদ্ভুতভাবে ফাঁকা।
কয়েকজন যাত্রী বসে আছে, কিন্তু সবাই মাথা নিচু করে।
কেউ নড়ছে না।
কেউ কথা বলছে না।
অর্ণব একটা সিটে বসে পড়ল।
তার শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেছে।
সে পাশের লোকটাকে বলল—
—"ভাই, এই ট্রেনটা কোথায় যাবে?"
কোনো উত্তর নেই।
সে আবার বলল—
—"শুনছেন?"
ধীরে ধীরে লোকটা মাথা তুলল।
অর্ণব জমে গেল।
লোকটার চোখে কোনো মণি নেই—পুরো সাদা।
লোকটা ঠান্ডা গলায় বলল—
—"এখানে প্রশ্ন করা হয় না…"
তারপর আবার মাথা নিচু করে বসে গেল।
🕯️ অদৃশ্য উপস্থিতি
ট্রেন চলতে শুরু করল।
জানালার বাইরে তাকিয়ে অর্ণব বুঝল—কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
না কোনো আলো, না কোনো গ্রাম, না কোনো রাস্তা।
শুধু কুয়াশা আর অন্ধকার।
হঠাৎ আলো নিভে গেল।
পুরো কামরা অন্ধকার।
সেই অন্ধকারে অর্ণব অনুভব করল—তার খুব কাছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
তার গায়ে ঠান্ডা নিশ্বাস লাগছে।
সে নড়তে পারছে না।
হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল।
কেউ নেই।
কিন্তু তার সামনে সিটে এখন একজন বসে আছে—যে আগে ছিল না।
লোকটা ধীরে বলল—
—"নতুন যাত্রী…"
⏳ সময়হীন যাত্রা
অর্ণব ফোন বের করল।
সময়—১২:২০।
সে কয়েক মিনিট পর আবার দেখল—
একই সময়।
তার হাত কাঁপতে লাগল।
হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বলল—
—"এখানে সময় থেমে থাকে…"
অর্ণব পেছনে তাকাল।
একজন বৃদ্ধ।
চোখে গভীর শূন্যতা।
—"যেখানে তুমি আছো… সেটা জীবিতদের জায়গা না…"
🚉 প্রথম স্টেশন—ভুল নাম
ট্রেন থামল।
অর্ণব জানালা দিয়ে তাকাল।
স্টেশন।
কিন্তু সাইনবোর্ডের নাম বারবার বদলাচ্ছে।
একবার বাংলা, একবার ইংরেজি, তারপর অচেনা অক্ষর।
একজন যাত্রী উঠে দাঁড়াল।
তার চলার কোনো শব্দ নেই।
তার ছায়া নেই।
সে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
দরজা খুলল।
সে নামল।
আর নামার সময় তার শরীর ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল।
অর্ণব চিৎকার করতে চাইল—
কিন্তু তার গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।
😨 ফিসফিস শব্দ
ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
হঠাৎ অর্ণব শুনতে পেল—
চারদিক থেকে ফিসফিস শব্দ।
—"ফিরে যেও না…"
—"নামতে হবে…"
—"সবাই নামে…"
সে কান বন্ধ করে বসে পড়ল।
কিন্তু শব্দগুলো তার মাথার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।
🩶 ভয়ঙ্কর সত্য প্রকাশ
অর্ণব সাহস করে বলল—
—"আমি এখানে কেন?"
বৃদ্ধ ধীরে বলল—
—"কারণ তুমি সময়ের আগে চলে এসেছো…"
—"আমি তো বেঁচে আছি!"
বৃদ্ধ হালকা হাসল।
—"তুমি কি নিশ্চিত?"
🩸 স্মৃতি ফিরে আসা
অর্ণবের চোখের সামনে হঠাৎ দৃশ্য ভেসে উঠল—
সে দৌড়ে ট্রেন ধরতে যাচ্ছে…
পা পিছলে গেল…
একটা তীব্র আলো…
একটা বিকট শব্দ…
তারপর অন্ধকার।
অর্ণব নিজের হাতে তাকাল।
তার হাত ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।
🚪 শেষ স্টপ—অন্ধকার প্ল্যাটফর্ম
ট্রেন আবার থামল।
এইবার পুরো স্টেশন অন্ধকার।
কোনো আলো নেই।
শুধু ঠান্ডা বাতাস।
একটা কণ্ঠ—
—"শেষ স্টপ…"
সব যাত্রী একসাথে মাথা তুলল।
সবাইয়ের চোখ সাদা।
সবাই অর্ণবের দিকে তাকিয়ে।
—"নেমে যাও…"
🌫️ সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য
অর্ণব দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
সে বাইরে তাকাল…
প্ল্যাটফর্মে একটা শরীর পড়ে আছে।
চারপাশে লোকজন।
—"দুর্ঘটনা!"
—"ছেলেটা ট্রেনের নিচে পড়েছে!"
অর্ণব ভালো করে তাকাল।
ওটা তার নিজের শরীর।
😱 শেষ সত্য
তার বুক ফেটে যাচ্ছে।
সে চিৎকার করতে চাইল—
কিন্তু সে আর মানুষ না।
তার কাঁধে একটা হাত পড়ল।
বৃদ্ধ।
—"সবাই প্রথমে এভাবেই বোঝে…"
👁️ চিরন্তন যাত্রীদের অভিশাপ
বৃদ্ধ বলল—
—"এই ট্রেন শেষ না। এটা ঘুরতেই থাকে…"
—"আমরা কারা?"
—"আমরা তারা… যারা শেষ মুহূর্তে কিছু বুঝতে পারিনি…"
অর্ণব কাঁপতে কাঁপতে বলল—
—"আমরা কি কখনো নামতে পারব?"
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়ল।
—"না…"
🚆 শেষ রূপান্তর
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ট্রেন চলতে শুরু করল।
অর্ণব ধীরে সিটে বসে পড়ল।
তার চোখ ধীরে ধীরে সাদা হয়ে গেল।
তার মুখে এক অদ্ভুত ঠান্ডা হাসি।
🧍 নতুন যাত্রী
ট্রেন আবার থামল।
একটা নতুন ছেলে উঠল।
ভয়ে কাঁপছে।
—"ভাই… এই ট্রেনটা কোথায় যাবে?"
অর্ণব ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখ এখন ফাঁকা।
সে ফিসফিস করে বলল—
—"এখানে কেউ প্রশ্ন করে না…"
🔚 শেষ সতর্কতা
লোকেরা বলে—
রাত ১২টার পর বেলতলা জংশনে একটা ট্রেন আসে।
যারা দেখে… তারা ভুলে যায়।
যারা ওঠে… তারা আর ফেরে না।
তারা হয়ে যায়—
শেষ ট্রেনের অজানা যাত্রী। 😨

