পূর্ণবৃত্ত - ২
পূর্ণবৃত্ত - ২
হাইকোর্টের নির্দেশে আবার নতুন করে শুনানি শুরু হলো। আর সেটা আমার এজলাসেই হবে বলে চীফ জাজ পাঠিয়ে দিলেন।
আমি সেদিনই বিকেলে ওনার চেম্বারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে বললাম - স্যার, এত গুরুত্বপূর্ণ একটা কেস, আমার মতো একজন নবাগতের হাতে ছেড়ে দিলেন! একটু রিস্ক হয়ে গেলো না আমার জন্য? কোন সিনিয়র জাজ....
উনি হেসে বললেন - বসো, বসো। আমি তোমার জাজমেন্ট দেখেছি ভাই, তোমার অর্ডারগুলোও পড়েছি। বিশ্বাস করো, আজ পর্যন্ত কোন ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস থেকে এমন একটা কম্প্যাক্ট অর্ডার বেরোতে দেখিনি আগে। তুমি কি ভাবলে, আমি এমনি এমনিই তোমায় এই কেসের শুনানির দায়িত্ব দিয়েছি? আমি তো অনেক আগে থেকেই জানতাম, এই কেসটা রি-ওপেন হবেই।
আর তখন থেকেই মনে মনে ঠিক করেই রেখেছিলাম যে এবার হয় কোনো দায়িত্ববান জাজের কোর্টে কেসটা পাঠাবো, নয়তো নিজেই হিয়ারিং করবো। এরই মধ্যে তুমি এখানে ট্রান্সফার হয়ে আসলে, তাই তোমার কাছেই পাঠালাম।
তুমি চিন্তা কোরো না, আমি তোমার সঙ্গে আছি। যদি প্রয়োজন মনে করো আমার সাথে এই কেসের ব্যাপারে যেকোন সময় এসে খোলাখুলি আলোচনা করতে পারো। নো রেস্ট্রিকশন ফর ইউ।
এখন কেস ফাইলটা নিজের কাছে রেখে, ভালো করে স্টাডি করে রাখো। আরও মাস খানেক পরে হিয়ারিং স্টার্ট করবে যখন তত দিনে দেখো এর নাড়ি নক্ষত্র সব তোমার জানা হয়ে যাবে।
তুমি পরে পরে জানতেই পারবে সব। তখনই বুঝবে আমি কেন তোমার ওপর ভরসা রাখছি। আমি নিজেও চাই, আর এই কেসটারও সুবিচার হওয়াটা ভীষণ জরুরী।
কেসটার-
বাদী পক্ষঃ মিস মেহরুন্নেসা-র হয়ে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওয়াইজুর মুস্তাক।
বিবাদী পক্ষঃ জামানুদ্দিন, রফিকুল আলি, আরিফ সর্দার এবং বাবলু শেখ -দের হয়ে উকিল ধীরাজ শেঠ।
আমার এজলাসে প্রথম শুনানির দিন উভয় পক্ষই হাজির হলো কোর্টে। বিবাদী পক্ষের চারজনই তাদের সেই পুরানো উকিলকে নিয়েই হাজির হলো।
কিন্তু সরকারী উকিল যিনি কেসটা আগে হ্যাণ্ডেল করেছিলেন তিনি অসুস্থ হয়ে পি.জি.তে চিকিৎসাধীন হয়ে পড়ায়, নতুন একজন পি.পি. (সরকারী উকিল) -কে কেসটা হ্যাণ্ডেল করার অনুমতি দিতে হলো।
শুনানির প্রথম শমন গেলো - সেই প্রেমিকরূপী তরুণটির উদ্দেশ্যে, এই কোর্টে হাজির হবার জন্য। আর পরের ঐ শুনানির তারিখ দিলাম ঠিক চৌদ্দ দিন পর। বিবাদী পক্ষের উকিলের ক্ষীণ বিরোধিতা উপেক্ষা করলাম।
কিন্তু, পরের দিন, একজন সিনিয়র কাউন্সেল মারা যাওয়ায় সমস্ত উকিলরা কর্মবিরতি পালন করলেন বলে শুনানি করা গেলো না। তিনি নাকি আবার শুনি আগে সরকারী কাউন্সেল ছিলেন! খবর নিয়ে জানলাম - মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ যাতীয় সমস্যা নিয়ে, ভদ্রলোক পি.জি.-র উডবার্ণ ব্লকে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সকালে বাথরুমে পা হড়কে পড়ে যান এবং মাথাতেই ভয়ানক চোট পেয়ে ওখানেই মারা যান।
এখানে নতুন আসায়, আমার কোর্টে তখন পুরানো কিছু কেস ছাড়া বিশেষ চাপও ছিলো না। তার ওপর এই কেসটার জন্য চীফ জাজ সাহেব আমার সহায় ছিলেন। তাই শুনানির পরের তারিখটা দিলাম ঠিক এক সপ্তাহ পর।
কিন্তু সেদিনও কোর্টে এই কেসের শুনানি যে হবে না, তা বাড়িতে বসেই জেনে গিয়েছিলাম। সকালবেলা খবরের কাগজ খুলেই দেখি ভয়ানক এক দুর্ঘটনার ছবি। এক নেশাগ্রস্ত তরুণ ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যাবার সময়, কোনো যানবাহনের ধাক্কা খেয়ে ছিটকে রেল লাইনের ওভারহেডের তারে এসে পড়ে। সেই সময় ঐ লাইন দিয়ে মাতৃভূমি লোকালটা ঢুকছিল প্ল্যাটফর্মে। সঙ্গে সঙ্গেই, ঐ হাই ভোল্টেজ তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার মৃত্যু হয়! ফ্লাইওভারের রেলিং প্রায় সাড়ে চারফুট উঁচু হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে যে সেটা টপকে তরুণটি ছিটকে এসে নিচেয় পড়লো, সেটাই নাকি পুলিশের কাছে রহস্য লেগেছে।
খবরের কাগজে তরুণটির ছবি দিয়েছিলো, দেখলাম। বুঝলাম - আমার কোর্টে আজ আর হাজিরা দিতে আসা হলো বা তার। তবে এর চেয়েও বড় আদালতে তার শেষ বিচার হবে নিশ্চয়ই - এই ভেবেই মনকে সান্ত্বনা দিলাম।
বিবাদী পক্ষের উকিল কোর্টে এসে ঐ খবরের কাগজের কাটিং সহ তার সাক্ষীকে কোর্টে হাজির না করাতে পারার কথা জানিয়ে পরের তারিখ চাইলো। আমি আবার চৌদ্দ দিন পর কাের্টে হাজির হবার জন্য শমন দিলাম - রফিকুল আলি, আরিফ সর্দার এবং বাবলু শেখ, এই তিন অভিযুক্তকে!
কোর্টে, মূল অভিযুক্ত অর্থাৎ জামানুদ্দিনের ক্রস এগ্জামিনেশনের আগে বাকিদের বক্তব্যগুলো নিজের কানে শুনে নিতে চাইছিলাম আমি। তখনও জানতাম না - পরদিন কি সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে আমার জন্য!
(পরের পার্ট আসছে খুব শীঘ্রই।)

