পরিনীতা পর্ব ২
পরিনীতা পর্ব ২
অনেক ভেবে...... কিছুদিন বাদে পরিনীতার কথা কৌশিক বুঝতে পারে । যে সত্যি...বাবা মনের অনেক কথাই বলতে পারে না।
কৌশিক-- " বাবা আমি পরিনীতার কাছে তোমাদের বন্ধুত্ব..... সবই....
কৌশিকের কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌমেনবাবু বলে ওঠেন -- " ওসব কথা রাখ...বল কেমন চলছে তোর চাকরি?? সারাক্ষণ তো ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকিস । তোর চোখ এখন ঠিক আছে??"
কৌশিকের চোখের সমস্যা হয়ে গেছিল কিছুদিন আগে । সকাল ৮ থেকে রাত ৯ টা অব্দি কাজে ব্যস্ত থাকে কৌশিক ।
কৌশিক -- " কথা পাল্টাচ্ছ কেন?? মনের কথা তুমি কতো চেপে রাখবে?? আমার দিকে তাকাও। বন্ধুত্ব খারাপ কি?? তুমি কথা বলতেই পার । খালি ভাবছো আমি তোমায় খারাপ ভাববো.. তাই তো ??
কখনোই না।
কাল আমরা সাউথ সিটি মল এ একটু যাব । তুমি তোমার বান্ধবীকে আসতে বলো । "
সৌমেনবাবু-- " রাজু এসব কি করছিস???? বাদ দে না। তোরা চলে যা।"
সৌমেনবাবু কৌশিককে রাজু বলে ডাকত ।
কৌশিক -- " আমরা চলে যাবো.... আর তুমি একা থাকবে??? এ হয়না । আর কোন কথা নয়,,, তুমি না গেলে..... আমরা ও যাবো না ।"
পরের দিন পরিনীতা আর কৌশিকের কথা অনুজাই সোমেনবাবু ওনার বান্ধবী মধুরিমা দে''কে নিয়ে সাউথ সিটি মল এ আসনে ।
সবার সাথে মধুরিমা দে''র আলাপ হয় । মলে আনন্দ করে ফিরছিল সবাই ।
পরিনীতা তখন মধুরিমা দে''কে বলে -- " আন্টি একটা কথা বলবো.... যদি আপনি কিছু না মনে করেন??"
মধুরিমাদেবী তখন বলে ওঠেন-- " এইভাবে বলছিস কেন?? তুই তো আমার মেয়েরই মতন বল কি বলতে চাস ।"
পরিনীতা-- " যদি আপনার সাথে একটু ওয়াটস্যাপে কথা বলি.... আপনি কিছু মনে করবেন না তো??"
মধুরিমাদেবী-- " আমার সাথে গল্প করলে,, আমার কতো ভালো লাগবে বলতো । ঈশ্বর বন্ধু জুটিয়ে দিচ্ছে আমায় ।"
পরিনীতা মাঝে মধ্যে মধুরিমাদেবীর সাথে কথা বলত । পরিনীতা টিউটার, তাই বেশি কথা বলার ওর সময় থাকতো না ।
পরিনীতা একদিন মধুরিমাদেবীকে বলেন--" আন্টি,
বাবা আর আপনি কি খুব প্রিয় কলেজ ফ্রেন্ড ছিলেন?"
মধুরিমাদেবী-- " হ্যারে মনা,, আমাদের খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল । আরো দুজনের সাথে বন্ধুত্ব ছিল । ওরা একজন ছেলে একজন মেয়ে । আমরা মজা করতাম । একই সিনেমা হলে যেতাম, একই মলে ঘুরতে যেতাম একসাথে । আর তোর বাবা আমায় রাগাত । কিছু কথা তো আজও ভুলতে পারিনি । এখন হাশি পায়,, তখন খচে যেতাম ।"
পরিনীতা-- " কি কথা?? কৌশিক ও তো কখনো রাগায় আমায় । "
মধুরিমাদেবী-- " ওই বাবারই তো ছেলে। একই রকম হয়েছে।
আর বলিস না, তখন কলেজে পড়তাম,, একদিন বলছিলাম তোদের বাবাকে " জানিস আমি হাতিদের খুব ভালোবাসি ।" কি পাজি জানিস, বলে মোটারা তো হাতিদের ই ভালোবাসে । আমি মোটা বল??"
পরিনীতা-- " বাবা এরম করত?? বিশ্বাসই হচ্ছে না। "
মধুরিমাদেবী-- " এটা তো কম বললাম, আরো শুনলে, আরো হাশবি তুই ।
ওইসব শোনার পর তো,, আমি খচে বোম হয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। আর তোদের বাবা জানত আমি icecream খেতে খুব ভালোবাসি,, তারপর corneto নিয়ে চলে এসেছিল আমায় মানাতে ।
আর খালি বলতো,, গ্রিন টি খা, ডায়েট কনেট্রাল কর । কি বলবো বল । এখনই রাগ উঠে যাচ্ছে বলতে গিয়ে ।"
পরিনীতা-- "সত্যি আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, আপনি যে বাবার কথা বলছ । বাবা আর আপনি সবসময় এরম মজা করতেন??"
মধুরিমাদেবী-- " হমম্ করতাম । পড়াশোনায় তবে ও অনেক হেল্প করত । যেটা বুঝতে পারতাম না । আমায় বুঝিয়ে দিত ।
আর বলিস না । একদিন তো ফ্রেন্ডসিপ ডে ছিল । তোদের বাবা দেখি গোলাপ ফুল দিচ্ছে । দেখে আমি তখন বলি " গোলাপ ফুল?? বন্ধুকে গোলাপ ফুল দেয় নাকি??
কি করল তারপর জানিস ।
বললো না তোর জন্য গিফ্ট ও এনেছি । বললাম দেখা ।
বলে -- " এই নে ।"
দেখি একটা সুন্দর ছোট প্যাক করা বক্স । খোলার পর তোদের বাবাকে আমার ঝাঁটা তুলে পেটাতে ইচ্ছা করছিল ।
বক্স খুলে কি দেখি জানিস???
ফিজিক্সের কিছু নোটস লেখা । বাক্সটা তো ওর দিকে ছুড়েছিলাম।
তারপর হাসতে হাসতে বলে-- "রাগিস না। এইনে ।"
দেখি আমার জন্য সুন্দর ছোট লকেটের সেট এনেছে, একটা গোলাপ ফুলের লকেট, তার সাথে দুল আর আংটি ও ছিল।
তারপর তো বলি-- " আগে দিতে পারলিনা? তার জায়গায় ফিজিক্সের নোটস। খুব সুন্দর ।"
তোদের বাবা তারপর জিজ্ঞেস করে আংটি কেমন হয়েছে,, বললাম সব ভালো ।
আবার বলছিল আংটিটা পরতে । সুন্দর ছোট আংটি । তবে নিতে গিয়ে আমার হাত থেকে হঠাত্ পরে যেতে তোদের বাবা বল্ল -- " তোর দারা কিছু হয়না । দে আমি পড়িয়ে দিচ্ছি ।"
এরমই বন্ধু ছিলাম আমরা। কখনো মজা করতাম,, কখনো মারামারি করতাম ।"
পরিনীতা-- " কলেজ লাইফের পর আর কি বন্ধুত্ব ছিল না আপনাদের??"
মধুরিমাদেবী -- " এই আপনি বলবি না একদম । তুমি বলবি ।"
পরিনীতা -- " আচ্ছা ঠিক আছে ।"
মধুরিমাদেবী-- " হ্যা,,, কি অদ্ভুত,, একই অফিসে চাকরি পেয়েছিলাম । ওর প্রমোশন হতে,, ওকে স্যার বলতে হতো । বলতে তো আমার হাশি পেয়ে যেত,, আর ও খচে যেত ।
বলতে গিয়ে এখনই হাশি পাচ্ছে দেখ।"
পরিনীতা -- " তারপর??"
মধুরিমাদেবী -- " তারপর আমার হঠাত্ করে বিয়ে ঠিক হয়ে যায় । এতো ভালোবাসা দিচ্ছিল মন থেকে,, আমি আর বলতে পারিনি ,,, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না ।"
পরিনীতা -- " বাবা কি করছিল??"
মধুরিমাদেবী-- " তোদের বাবা কথা বলছিল না তখন অতো । অবাক লাগতে, আমি ওর সাথে একদিন একটা ক্যাফেতে গিয়ে জিজ্ঞেস করি এরম করছিস কেন ।
কি অদ্ভুত দেখ ,, বলছিল-- তোর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, আমার সাথে অতো কথা বলিস না । লোকে খারাপ বলবে ।
তখন বলি, আমরা তো বন্ধু
বলে-- বাকিরা সেটা মানবেনা ।
মনে হলো সত্যিই তাই, কেউ মানবেনা ।
তারপর তো আমার বিয়ে হয়ে সংসার ।"
পরিনীতা -- " তোদের সন্তান হয়নি??"
মধুরিমাদেবী -- " না রে। এইটা একটু খারাপ লাগে। ডাক্তার দেখিয়েছিলাম । কিন্তু হলো না ।"
পরিনীতা -- " এতে খারাপ কি আছে । এরম হতেই পারে । এডপ্টও নাও নি??"
মধুরিমাদেবী -- " আমার স্বামীর অসুবিধা ছিল না, যে সন্তান হয়নি । বললাম না, পরিবারটা খুব ভালো ছিলো ।"
পরিনীতা-- " তোমার স্বামী মারা গেছেন অনেক বছর হয়ে গেছে??? "
মধুরিমাদেবী-- " হ্যা রে । তারপর থেকে একলা লাগতো খুব । ফেসবুকের বন্ধু, আমার স্বামীর কলিগের বউ,, কিছু বন্ধুর সাথে ওই একদিন বেরতাম কথা বলতে, কিছুক্ষণের জন্য। তারপর একদিন তোদের বাবার নাম হঠাত্ ফেসবুকে এড এস এ ফ্রেন্ডে দেখে অবাক লাগছিল । নাম পরে মনে হচ্ছিল চিনি । কিন্তু কিছুতেই মনে আসছিল না। তারপর ছবি দেখে মনে এলো।
পরিনীতা-- "আচ্ছা আন্টি বাবা আর তুমি তো এতো প্রিয় বন্ধু । তোমরা কখনো তো এবার বেরিয়ে, কথা বলতে পার, কোন ক্যাফেতে , ঠিক আগের মতন। তুমিই তো বল্লে, তোমরা বন্ধু । তা বয়স হয়ে গেছে বলে বন্ধুত্ব ভেঙেই দেবে। এতো বছর বাদে, আবার দেখা হলো । জানি তুমি ও বলবে ,,,,, ' কিন্তু এখন '। এখন বলে সেই বন্ধুত্ব একেবারে জলে ফেলে দেবেন?? এটা কি ঠিক??
(ক্রমশ প্রকাশ্য)

