Sonali Basu

Drama


3  

Sonali Basu

Drama


নতুন দিনের আলো

নতুন দিনের আলো

6 mins 1.2K 6 mins 1.2K

       হ্যালো

অনলাইন গল্পের সাইটে একটা গল্প পড়ছিল অনন্যা। ওয়াটস আপে মেসেজ টিউন শুনে দেখলো এক অচেনা নম্বর থেকে মেসেজটা এসেছে। ও ভিউ কনট্যাক্টে গিয়ে দেখল কার নম্বর ওটা। তারপর লিখলো – হাই

- কেমন আছিস?

- ভালো। তুই বল তুই কেমন আছিস? আমার নম্বর পেলি কি করে?

উত্তর এলো – হু হু বাবা খুঁজে পেতে কি লাগে যদি মনে ইচ্ছে থাকে তো

- বেশ কি করছিস এখন?

- আর কি ছেলেরা যা করে থাকে চাকরি আর সংসারে ফাইফরমাশ খাটা

- সে কি এখনো বিয়ে করিসনি? এখনো বাবা মায়ের সংসারে দায়িত্ব পালন করছিস। ভালো

- আমি কি তাই বললাম। বিয়ে পরই তো ছেলেরা বিবিদের গোলাম হয়। বিবিদের যখন যা ফরমাশ থাকে তখনই তাই এনে হাজির করতে হয়। বাবা মা যদিও বা রেহাই দেয় বিবি দেয় না। বছরের তিনশো পয়ষট্টি দিন সকালে উঠেই শুরু হয় সব্জি আনো সাথে মাছ মাংস। মাসের প্রথমে প্রয়োজনীয় সব জিনিস দোকান থেকে নিয়ে আসার পরও সারা মাস ধরে শুনতে হবে এটা ফুরিয়ে গেছে নিয়ে এসো ওটা না আনলেই নয়। তারপর ছেলের স্কুলের নানা রকমের চাহিদা তো আছেই

- বাবাহ্ তুই তো দেখছি হেব্বি খেপে আছিস

- বিরক্ত হয়ে গেছি রে প্রতিদিনের এই এক ঘেয়েমিতে

- হুম তা তোদের কি দেখেশুনে বিয়ে নাকি ভালোবেসে?

- ভালবেসে। একই কলেজে পড়তাম একই বিষয় নিয়ে কমার্স। ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করে যতরকমের সরকারি চাকরির পরীক্ষা আছে সবেতে বসে শেষে এই ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়েছি। আর আমার উনি চাকরির বদলে শুধু মালা বদল করে আমার গৃহিণী হয়ে বসলো। কত বলেছি কমার্স নিয়েই যখন পড়লে তখন চাকরির চেষ্টা করো অন্তত, সংসারে সাহায্য হবে। বলে কি না আমি সংসারের ফাইনান্স সামলাতে কমার্স পড়েছি, আমার দ্বারা চাকরি হবে না

- হুম


অনন্যা বুঝতে পারছিলো শেখর খুব বিরক্ত নিজের বিবাহিত জীবন নিয়ে। কিন্তু এখানে সল্যুশন কি সেটা ও জানে না তাই খানিকক্ষণ আরও কথা চালিয়ে ও গুড নাইট বলে ফোন অফ করে শুয়ে পড়লো।

পরের দিন উঠে আবার সেই সকালে ওঠা মেয়েকে স্কুলের জন্য তৈরি করে বাসে উঠিয়ে দেওয়া তারপর অফিস দৌড়ানো। অনন্যার সারাদিন সময়ই হয় না ফোনে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটে গিয়ে আপডেট দেখার। আর দেখার ইচ্ছেও থাকে না। যখন থেকে সমীর ওর হাত ছেড়ে অন্য সংসার পেতেছে আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটে ওর স্যাটাস হয়েছে সিঙ্গেল তখন থেকেই বিবাহিত অবিবাহিত পুরুষেরা হামলে পড়েছে ওর সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য। ও বেশির ভাগের সাথই এড়িয়ে চলে শুধু যেটুকু হাই হ্যালো না বললেই নয় সেটুকুই। একলা মহিলা মানেই যেন বেওয়ারিশ মাল!

এই শেখরকেই দ্যাখো। ও আর অনন্যা তো একই কলেজের ছাত্রছাত্রী ছিল, তখন কদিন কথা হয়েছে হাতে গুণে বলে দিতে পারবে আর আজ দেখো! স্ত্রীর সঙ্গে যেই সম্পর্ক খারাপ হয়েছে ওমনি দ্বিতীয় কোন পন্থা আছে কি না জানার জন্য ছুটেছে। অনন্যা ওকে যতই এড়িয়ে যেতে চাক না কেন শেখর যেন ওকেই পেয়ে বসলো নিজের মনের কথা ঘরের কথা শেয়ার করার জন্য। সেই একই কথা শরীরের চাহিদা পুরণ হয় না স্ত্রীর সাথে। তার কারণে মনটা ওর সারাক্ষণ খারাপই থাকে। প্রতি রাতেই তাই ওয়াটস আপে টুংটাং মেসেজ আসতেই থাকলো আর ভদ্রতার কারণে তার উত্তর ও দিতে থাকলো। স্ত্রীকে সময় দেওয়ার কথা বলল, বেড়াতে যাওয়ার উপদেশ দিল তাতে মনের পরিবর্তন হবে ডাক্তার দেখাতে বলল আর উত্তর দেওয়ার কারণে শেখর ভেবে বসলো অনন্যা ওকে চায় তাই উত্তর দিচ্ছে। তাই এক রাতে সরাসরি বলেই বসলো – অনন্যা আমি তোমায় ভালোবাসি। তোমাকে না দেখে থাকতে পারছি না। একদিন সময় দাও দেখা করবো

- সে কি। তুমি তো বিবাহিত। তোমার স্ত্রী আছে ছেলে রয়েছে, তারা কি ভাববে

- তাদের ভাবার কি আছে। কেউ জানতেই পারবে না আমাদের এই দেখা করার কথা

অনন্যা থ হয়ে গিয়েছিল। ও বুঝতে পারছিলো শেখর কি বলতে চাইছে। রাগে আগুন হয়ে উঠলো ওর ভেতরটা। শেখর ভেবেছে কি ওকে? কিন্তু সেটা মুখে প্রকাশ করলো না ও বরং চেষ্টা করলো আসতে আসতে কথা কমিয়ে দেওয়া। এখন শেখর বলে তবে ও আর উত্তর দেয় না। এর মাঝে একদিন অনন্যার মেলে এলো একজনের চিঠি। কোন এক বিবেক দাশগুপ্ত ওর সাথে দেখা করতে চেয়েছে। ওর সম্পর্কে ম্যাট্রিমোনিতে সব জেনে ওর প্রতি আগ্রহী। তাই যদি ওরও মনোভাব একই হয় তাহলে কোন জায়গায় মুখোমুখি দেখা করতে ইচ্ছুক তিনি। অনন্যা বুঝতে পারলো না প্রথমে কে ওর প্রোফাইল বেঙ্গলী ম্যাট্রিমোনিতে দিয়েছে? ওর মনে হল কেউ যদি এ কাজ করে থাকে থাকে তাহলে ওর মা’ই করেছে। কিন্তু মা তো কম্পিউটার ব্যবহার করতেই জানে না। তবু মাকে জিজ্ঞেস করতেই মা স্বীকার করে নিলো কথাটা। খুব রাগ করেছিলো ও কিন্তু মায়ের একটাই কথা সমীর যদি সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আবার নতুন করে সংসার পাততে পারে তাহলে ও অন্তত একবার চেষ্টা করতেই পারে। তাছাড়া যে আগ্রহ দেখাবে সে তো দেখেশুনেই নিয়েছে তাহলে তার সাথে কথা বলতে অসুবিধে নেই। তারপর ইচ্ছে হলে এগোবে নাহলে পিছিয়ে আসতে কি লাগে? অনন্যার একটাই ভয় আছে ওর মেয়ে ঋদ্ধি ব্যাপারটা কি ভাবে নেবে! কিন্তু সে বিষয়ে মা একটাই কথা বলেছে আর সেটা খুব কঠিন সত্যি, কালের নিয়মে মেয়ে বড় হয়ে যাবে আর তার নতুন সাথী হবে চাকরি করবে আর অনন্যা বয়স্কা হবে ততদিনে, তখন কে থাকবে ওর পাশে?

অনন্যা রাজি হয় দেখা করতে, সেইমতো পাঠিয়ে দিলো উত্তর ইমেলে। নির্দিষ্ট এক বিকেলে পূর্বনির্দিষ্ট সময়ে শাড়ি আর ম্যাচিঙ্গ গয়না পড়ে অনন্যা উপস্থিত হল বিবেকের সাথে দেখা করতে। বিবেক আগেই উপস্থিত ছিল ওকে আহ্বান করে বলল – আসুন, বসুন আপনার অপেক্ষাই করছিলাম

- দেরী করিয়ে দিলাম কি?

- আরে না না, একদম ঠিক সময়ে এসেছেন। কি খাবেন চা না কফি সাথে কি অর্ডার দেবো?

- আমার জন্য শুধুই চা, আপনার যা ইচ্ছে খেতে পারেন

- ঠিক আছে (সেইমতো দু কপ চায়ের অর্ডার হল আর ওয়েটার দিয়ে যাওয়ার পর কথা শুরু হল)

- আমার বিষয়ে তো সব জেনেই এসেছেন। আপনার বিষয়ে কিছু বলুন আর আপনি আমার প্রতিই আগ্রাহ্নিত হলেন কেন যেখানে আমার থেকে হয়তো ভালো পাত্রীই পেতে পারতেন


- আগে প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিই। আমি প্রেসে কাজ করি। অবিবাহিত। একজনকে ভালবেসেছিলাম কিন্তু সে আর কাউকে ভালোবেসে তার হাত ধরলো। আমি মনে মনে ভেঙ্গে পড়ে ঠিক করেছিলাম আর বিয়েই করবো না। এতদিন বেশ ঘুরে বেরিয়েছি কিন্তু এখন বুঝতে পারি একটা সময়ের পর সব বন্ধুরাই দূরে চলে যায় আর খেয়াল করলাম নিজের বলার মতো কেউ নেই। আর তখনই একজন সাথীর খোঁজ শুরু করি। আপনার থেকে ভালো পাত্রী পেতে পারতাম হয়তো, তবে প্রোফাইল ঘাঁটতে গিয়ে আপনার প্রোফাইল আমার মনে ধরেছে

অনন্যা হাসলো – তা আমিই কি একেমদ্বিতীয়ম?

বিবেক হাসলো – সত্যি বললে, না। আপনি চতুর্থ। এর আগে যে তিনজনের সাথে কথা হয়েছে তাদের সাথে কথা বলে বুঝেছি তাদের চাহিদা আলাদা আর আমার আলাদা, তাই

- আপনি আমার আগের বিয়ে নিয়ে জানেন, আমার একটি মেয়েও আছে। যদি আমরা বিয়ে করি তার কি হবে

- কি আবার হবে সে আমার মেয়ের পরিচয়ে বড় হবে

- তার সাথে আলাপ করবেন না?

- হ্যাঁ অবশ্যই। তার মনের কথা তো আগে জানতে হবে। আমি আপনার বাড়ি যাবো তার সাথে দেখা করতে

- বেশ

এরপর বিবেক গেলো ওর বাড়ি। অনন্যার মা খুব খুশি ওকে দেখে। অনন্যার মেয়ে ঋদ্ধি প্রথমে লুকিয়ে গেলেও আস্তে আস্তে ওর সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। আপন করে নিলো ওকে ভালো কাকু বলে। বিবেক ওকে জিজ্ঞেস করেছে যদি ওর ভালো কাকু ওর বাবা হতে চায় ও রাজি কি না। প্রথমে কিছু না বললেও পরে ঋদ্ধি জানিএয়েছে ও ওর ভালো কাকুকে বাবা হিসেবেই দেখতে চায়। বিবেকের সাথে অনন্যার এই সম্পর্ক শেখর কোনভাবে জেনে গেলো। ও রীতিমতো শাসালো ওকে সময় না দিলে ও সব বিবেককে বলে দেবে। অনন্যা ঘাবড়ালো না। ও নিজেই সব জানিয়ে দিলো বিবেককে। বলল – সব খবর নিয়ে তারপরেই এগিয়ো নাহলে পরে মনে হতে পারে ভুল করলে

বিবেক বলল – তুমি চিন্তা করছো কেন। আমি তোমাকে যেটুকু চিনেছি তার বাইরে কারো কাছের থেকে কিছু জানার নেই।

আকাশের বুকে তখন নতুন দিনের আলো ছড়িয়ে পড়েছে।     

 

 



Rate this content
Log in