Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

JAYDIP CHAKRABORTY

Inspirational


3  

JAYDIP CHAKRABORTY

Inspirational


নষ্ট সময়

নষ্ট সময়

12 mins 617 12 mins 617

(১)

ডানাদের ফ্ল্যাটে প্রথমবার এলো চন্দ্রিমা। ডানা অবশ্য অনেকদিন ধরেই একসাথে পড়াশোনা করার জন্য চন্দ্রিমাকে ওদের ফ্ল্যাটে আসতে বলছিল। কিন্তু নানা কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি।

-কিরে, আসতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো?

- না, তবে তোদের ক্যাম্পাসে ঢুকে কয়েকজন বয়স্ক লোককে তোদের ফ্ল্যাটটা কোথায় জিজ্ঞাসা করাতে, ওনারা আমাকে উল্টো যেভাবে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, যে আমিই কোনোরকমে পালিয়ে এলাম। আর যেভাবে ওনারা আমাকে দেখছিলেন, মনে হচ্ছিল চোখ দিয়েই গিলে খাবেন।

ঐ বুড়ো গুলো তো। একেবারে অসহ্য। আমাদের ঝারি মারে, আবার আমার মাকেও ছাড়ে না। একদিন এমন ঝাড় দেবো না….., যাক তুই ইংলিশ নোটটা টোক। আমি ততক্ষন স্নান করে আসি। তারপর একসাথে অঙ্ক করবো। 

চন্দ্রিমাকে একটা নোট টুকতে দিয়ে স্নানে গেল ডানা। সকাল সকালই স্নানের অভ্যাস ওর। ডানা বাথরুমে ঢুকলে চন্দ্রিমা নোট টোকা ছেড়ে, তিন কামরার ফ্ল্যাটটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। ফ্ল্যাটের প্রতি কোনায় কোনায় একটা রুচি-বোধের পরিচয় লেগে রয়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে নামী কোনও ইন্টেরিয়র ডেকরেটর দিয়ে সাজানো।

কিরে, নোট টোকা ছেড়ে সারা ফ্ল্যাট ঘুরে ঘুরে হা করে কি এতো দেখছিস চন্দ্রিমা?বাথরুম থেকে বেরিয়ে ড্রায়ার দিয়ে চুল শোকাচ্ছে ডানা।

-        ডানা, ফ্ল্যাটের ইন্টেরিয়রটা তোরা কাকে দিয়ে করিয়েছিস রে ?

-        স্ফূর্তি মজুমদার।

-         অফিস কোথায়? ওনার চার্জ কেমন বল না। আমাদের নতুন ফ্ল্যাটটা ওনাকে দিয়েই তাহলে ইন্টেরিয়র করাবো।

-        ওনার নিজস্ব কোনও অফিস নেই। সল্টলেক সেক্টর ফাইভে একটা কন্সট্রাকশান কোম্পানিতে চাকরি করার ফাঁকে ফাঁকে…..।আর চার্জ? উনি আমাদের থেকে কোনও চার্জ নেননি।

-        কেন রে? তোদের পরিচিত? তা কোথায় থাকেন উনি? 

-        হ্যাঁ, খুবই পরিচিত। উনি এই বাড়িতেই থাকেন। সম্পর্কে আমার মা হন।

-        বলিস কি রে, কাকীমা নিজে এই ফ্ল্যাট সাজিয়েছে! অসাম। উনি কি কোনও আর্কিটেক্ট?

-        না। গ্র্যাজুয়েট, ইংলিশে অনার্স। শুধু ফ্ল্যাটের ইন্টেরিয়র নয়, মা হোম ম্যানেজমেন্টটাও খুব ভালো করে।

-        সেটা কিরকম?

-        উই আর ওয়েল অরগানাইজড। আমাদের ফ্ল্যাটের প্রতিটি জিনিষের একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে। প্রতিটি জিনিষ সেই জায়গাতেই রাখা হয়। ছোটবেলায় এর জন্য খুব বকা খেয়েছি। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। কোনও জিনিষই একটুও এদিক ওদিক থাকে না। এইজন্য আমারা সব কিছু খুব সহজে পেয়ে যাই। তাই খোঁজার জন্য কোনও সময় নষ্ট হয় না।

-        ঠিক বলেছিস রে। আমাদের বাড়িতে তো কোনও জিনিসই সময় মতো খুঁজে পাওয়া যায় না। একে অপরকে দোষারোপ করে। তর্কাতর্কি চলে। খুব প্রয়োজন থাকলে ওটা আবার কিনে আনা হয়। সময় নষ্ট, পয়সা নষ্ট। সব দরকার মিটে যাওয়ার পর বেশীর ভাগ সময়ই সেই জিনিষটা আবার পাওয়া যায়।

-        আমাদের সংসারে কোনও কিছুই ইলেভেন্থ আওয়ারে দরকার হয় না। কোনোদিন দেখিনি মা রান্না করতে করতে বলেছে নুন লাগবে, হলুদ ফুরিয়ে গেছে, ইত্যাদি। মায়ের রান্নার সকল মশলা-পাতি আনাজ দুটো জায়গায় থাকে। একটা রোজকার ব্যবহারের, আর একটা রিজার্ভ। কোনও জিনিষের জন্য রিজার্ভে হাত পড়লেই সেটা নিয়ে আসা হয়।

-        বাঃ, তোর মা বেশ গুছিয়ে সংসারটা করেন তো!

-        শুধু সংসার? বাবা মারা যাবার পর বাবার অফিসেই মা ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারের প্রাইভেট অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে জয়েন করেছে। অফিস, বাড়ি দুটোই সমান ভাবে সামলাচ্ছে। এক বছর হতে চলল বাবা নেই। এই এক বছরে মা যথা সম্ভব বাবার অভাবটা বুঝতে দেয়নি। চল আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। পড়াশোনা শুরু করা যাক। যে কাজে তোর এখানে আসা।

-        হ্যাঁ তাই চল। সামনেই এইচ. এস। অথচ মনে হচ্ছে কিছুই প্রিপারেশন হয়নি। যা পড়ছি তাই যেন ভুলে যাচ্ছি।

স্নানের পরের বিভিন্ন প্রস্তুতি পর্ব সেরে চন্দ্রিমাকে নিয়ে স্টাডি রুমে গিয়ে অঙ্কের খাতা বই খুলে বসল ডানা। বেশ খানিকক্ষণ ধরেই চলল ওদের পরীক্ষা কালীন প্রস্তুতি। স্ফূর্তির ফোন হঠাৎ সেই প্রস্তুতির ব্যাঘাত ঘটাল।

-        চন্দ্রিমা এসেছে?

-        হ্যাঁ, অনেকক্ষণ।

-        অঙ্ক করছিস তো? নাকি দুজনে মিলে ফাঁকা ফ্ল্যাটে আড্ডা মারছিস!

-        কি যে বল মা। টাইম ইজ রিসোর্স। সেটা নষ্ট করতে আছে? দুটো চ্যাপ্টার শেষ হয়ে গেল।

-        তোদের দুজনের জন্য খাবার আলাদা আলাদা করে ফ্রিজে রাখা আছে। মাইক্রো-ওভেনে গরম করে ঠিক সময়ে লাঞ্চ করে নিস। 

-        ঠিক আছে। তুমি চিন্তা কর না।

ফোন রেখে ফ্রিজ থেকে খাবার বের করল ডানা। ভাত, মাছ, ডাল তরকারী সব আলাদা আলাদা বাটিতে রাখা আছে। মাইক্রো ওভেনে ওগুলো গরম করে চন্দ্রিমাকে নিয়ে খেতে বসল ও। 

-        প্রত্যেকটা আইটেম বেশ ভালো হয়েছে। সব রান্না কি কাকীমাই করেছে?

-        হ্যাঁ। মাছ, ডাল, তরকারি সব কাল রাতের। ভাতটা আজ সকালে করা।

-        বাজার হাটও কি কাকিমা করেন?

-        হ্যাঁ। আমার সামনে পরীক্ষা। তাই আমাকে কোনও ভাবে সংসারের কোনও কাজে ইনভলভ করে না মা।

-        উনি বাজার হাট করেন কখন?

-        শনি, রবি বা ছুটির দিনে। আর টুকটাক প্রয়োজন মা অফিস থেকে ফেরার পথে নিয়ে আসে। মুদি সদাই ফোন করলে চলে আসে। অ্যাপসের মাধ্যমেও অনেক কিছু আনা হয়।

-        সত্যি, এমন প্ল্যানড মহিলা আমি কখনো দেখিনি।

-        আমার মা বলে, যাদের অনেক সময়, তারাই সময় পায় না। আমরা যদি সময় নষ্ট বন্ধ করতে পারি, তবে অনেক কাজ করতে পারি। মা ভালো ছবি আঁকে। জীবনে এত বড় ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরও মা আজও চাকরি করে, সংসার সামলে ছবি আঁকে। একদিনের জন্যও সখ, ভালোবাসার সাথে কম্প্রোমাইজ করেনি কখনও। আমি যখন খুব ছোটো, তখনও মা আমার সব কিছু সামলে, সংসারের সবার খেয়াল রেখে, নিজের আঁকা চালিয়ে গেছে। কখনও প্রফেশনালি আঁকেনি। ভালবেসে এঁকেছে। তবে মায়ের আঁকা অনেক এক্সজিবিশনে স্থান পেয়েছে।

-        আঁকাগুলো আছে?

-        প্রতিটি আঁকা সুন্দর করে, মায়ের সই আর তারিখ সমেত, সযত্নে রাখা আছে।             

খাওয়া শেষ করে থালা বাসন রান্নাঘরের সিঙ্ককে রেখে, ডাইনিং টেবিল পরিষ্কার করে ডানা ও চন্দ্রিমা আবার পড়াশোনায় ফিরে গেল।  

(২)

 জীবনের মাঝ গগনে একটা বড় ধাক্কা খেলেও সেটাকে সামলে এগিয়ে চলেছে স্ফূর্তি। সময় সব কিছু ভুলিয়ে দিলেও কিছু মানুষ যেন তা ভুলতে দেয় না। সদ্য স্বামী হারা একজন মহিলা নিজের অতীত ভুলে জীবনটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছে, রুচিশীল অথচ আধুনিক পোশাক পরছে, বন্ধু সুলভ কলিগদের সাথে কাজের ফাঁকে আড্ডা মারছে, অফিস পিকনিকে তাদের সাথে নাচছে, এটা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। স্ফূর্তির পেছনে নানারকম সমলোচনায় মেতে উঠছে তারা। কিন্তু বুঝেও না বুঝে, সব কিছুকে অগ্রাহ্য করে নিজের পথেই হেঁটে চলেছে ও।   

 স্ফূর্তির বস, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার অনিকেত রায় আজ প্রতিদিনের তুলনায় বেশ দেরীতে অফিসে ঢুকলেন। চেম্বারে বসেই স্ফূর্তিকে নিজের চেম্বারে ডেকে নিলেন। বেশ সমস্যায় পড়েছেন উনি। অনেকগুলো জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ একসাথে এসে দরজায় কড়া নাড়ছে। কোনটাই বাদ দেওয়া বা পরে করার মত নয়।

-         কি করি বলতো স্ফূর্তি? আজ আমার ছেলে ইউ.এস.এ থেকে ফিরছে। এক মাস আগের কথা যে আমি ওকে এয়ার পোর্টে রিসিভ করতে যাবো। এদিকে ইতালি থেকে ক্লায়েন্ট আসছে। আজ থেকে মিটিং শুরু হচ্ছে। আমাকে সেখানে থাকতেই হবে। তার ওপর আজ সকালে মায়ের একটা কার্ডিয়াক অ্যাটাক করেছে। নার্সিং হোমে ভর্তি করে এলাম। ডঃ ব্যানার্জীর আন্ডারে ভর্তি হয়েছে। ওনার সাথে কথা বলতে বিকেলে নার্সিং হোমে যেতে হবে। একগাদা মেল রয়েছে, তার রিপ্লাই দিতে হবে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটা খুব জরুরী। আমি যে এখন কি করব, কিছু ভেবে পাচ্ছি না।

-        কোনও সমস্যা নেই স্যার। ইতালির ক্লায়েন্ট এলে ওনাদের সাথে মিট করে এফিসিয়েন্ট কারোর ওপর আজকের মিটিং-এর দায়িত্ব দিয়ে আপনি একটা ক্যাব বুক করে নার্সিংহোমে চলে যান। ক্লায়েন্টদের বলে যান যে আপনি ওনাদের সাথে কাল মিট করবেন। এয়ারপোর্টে আপনার ডাইভারকে পাঠিয়ে দিন। ড্রাইভার যেন আপনার মায়ের ঘটনা বলে আপনার ছেলেকে নার্সিংহোমে নিয়ে যায়। গাড়িতে বসে, বা সময় পেলে নার্সিংহোমের ওয়েটিং রুমে বসে মেল গুলোর উত্তর দিন।

-        হ্যাঁ এরকমটাই করতে হবে। ধন্যবাদ। চাপের মধ্যে আমার মাথা ঠিকমত কাজ করে না।

স্ফূর্তির পরামর্শ মত চলে অনিকেত রায় সে যাত্রায় চাপ থেকে উদ্ধার পেল। তবে বহু চেষ্টা করেও ওর মাকে বাঁচানো গেল না। সৌজন্য ও সামাজিকতা রক্ষার্থে স্ফূর্তিকে বেশ কয়েকবার ওর বসের বাড়ি যেতে হল। অনিকেতের ছেলে ইউ.এস.এ তে ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পূর্ণ করে ওখানেই একটা চাকরিতে ঢুকেছে। ভারতে এসে কয়েক দিনের ছুটি কাটিয়ে সে তার মাকে নিয়ে ফিরে গেল ইউ.এস.এ। অনিকেত আবার একদম একা হয়ে গেল। স্ফূর্তি অনিকেতের কর্মজীবনটা অনেক গুছিয়ে দিয়েছে। পরিকল্পনা করে কাজ করায় এখন আর ওকে বেশি রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হয় না। অফিসের কাজ বাড়িতেও নিয়ে যেতে হয় না। বেশ কয়েক বছর আগে থেকে এমন জীবন-যাত্রা বজায় রাখতে পারলে হয়তো স্ত্রীর সাথে অনিকেতের ডিভোর্সটা হত না। কিছুটা একাকীত্বের জন্য, কিছুটা স্ফূর্তির পরামর্শের গুণে, অনিকেত স্ফূর্তির ওপর বেশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ল।     

শুধু নিজের বসকেই নয়। অফিস কলিগ অনেককেই স্ফূর্তি নানারকম পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে। অল্পদিন জয়েন করেই অফিসে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ও। একদিন স্ফূর্তিকে অনিকেত ডেকে বলল,

-        সময়ের অপচয় বন্ধ করে সেটাকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করা, তোমার থেকে সবার শেখা উচিৎ। আমি জানি তুমি অনেককেই টুকটাক পরামর্শ দিয়ে থাকো। তবে আমি চাই তুমি এই পরামর্শ সঠিক পদ্ধতিতে সবাইকে দাও। তুমি টাইম ম্যানেজমেন্টের ওপর একটা প্রেজেন্টেশন তৈরি কর। আমি একটা ট্রেনিং অ্যারেঞ্জ করছি। এই অফিসের অনেকেরই টাইম ম্যানেজমেন্টের ওপর ট্রেনিং-এর প্রয়োজন আছে।

-        কিন্তু অনিকেত দা, আমি কি পারবো?

-        আলবাত পারবে। তোমাকে এই অফিসে অনেক আগে দরকার ছিল। অফিস পিকনিক, ফ্যামিলি গেট-টু-গেদার বা কোনও অফিস স্টাফের ম্যারেজ পার্টিতে তোমার হাজবেন্ড, সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার অর্ধেন্দু মজুমদারের সাথে তোমাকে দেখেছি। একটা ফর্মাল পরিচয়ও হয়েছে। তবে তোমার ট্যালেন্টটা আমরা কেউ জানতে পারিনি। নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলে কেন? অনেক আগে তোমার এই প্রফেশনে আসা উচিৎ ছিল।

-        না, তখন সংসারটাই মন দিয়ে করতাম। আমি চাকরি করি, সেটা অর্ধেন্দু পছন্দ করত না। এখন তো বাধ্য হয়ে চাকরিতে ঢোকা।

-        আসলে অর্ধেন্দুর একটা আলাদা পারসোনালিটি ছিল। বড় ব্যক্তিত্বের পাশে, তুলনায় কম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, চোখেই পড়েনা। ঠিক যেমন বড় গাছের নীচে ছোট গাছপালা টেঁকে না। কারণ, এক তো বড় গাছের ডালপালার নীচে রোদ-বৃষ্টি আসে না, তার ওপর কিছু বড় গাছের শেকড় থেকে জাগলন নামক একরকম রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয় যা ছোট গাছপালাগুলিকে শেকড় ছাড়তে দেয়না। যার ফলে ছোট গাছগুলির বাড় যায় কমে।

-         হবে হয়তো। তখন সংসার আর আমার আঁকা ছাড়া আর কিছু ভাবার প্রয়োজনই পড়েনি। ঠেকায় পড়ে মানুষ কি না করে?

-        তুমি আঁকতেও পারো? বেশ তাহলে নিজের আঁকা দিয়ে ভালো করে একটা প্রেজেন্টেশন বানাও তো। সামনের মাসেই আমি একটা ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করছি।

-        ঠিক আছে। আমি রেডি করে আপনাকে আগে দেখিয়ে নেবো।

-        ডেফিনিটলি।

এক মাস ধরে ট্রেনিং ও প্রেজেন্টেশনের প্রস্তুতি পর্ব চলল। যেকোনো কাজ যখন কেউ প্রথম করে, তখন তার মধ্যে একটা ভয় কাজ করে, আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে। স্ফূর্তির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। স্বাভাবিক ভাবেই অনিকেত রায়ের সহযোগিতার প্রয়োজন হল ওর। এই প্রয়োজনের তাগিদে দুজনের যোগাযোগ বাড়ল। ছুটির দিনে ছবি এঁকে সেটা হোয়াটস-অ্যাপে পাঠিয়ে অনিকেতের মতামত জানছে স্ফূর্তি। অনিকেত ফোন করে তার মতামত ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। দুটো নিঃসঙ্গ একা মানুষ একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করছে। মনের শূন্যতা পূর্ণ করার চেষ্টা করছে। আর অনিচ্ছাকৃত, অপরিকল্পিত ভাবেই দুটি মন হয়ে উঠছে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।

নির্ধারিত তারিখে একটা পূর্ণ দিন ধরে টাইম ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং দিলো স্ফূর্তি।সবার সাথে বসে অনিকেতও ট্রেনিং নিলো। দিনের শুরুতে বা আগের দিন রাত্রে কাজের পরিকল্পনা একটা ডায়রিতে লিপিবদ্ধ করতে হবে। প্রতিটি কাজকে চারটি ভাগে ভাগ করতে বলল ও। এক, জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দুই, জরুরী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন কাজ। তিন, জরুরী নয় তবে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু কাজ। চার, জরুরী বা গুরুত্বপূর্ণ কোনটাই নয় এমন সব কাজ। কাজের পরিকল্পনায় প্রথমেই থাকবে এক নম্বর তালিকাভুক্ত কাজ। তারপর দুই ও তিন। চার নম্বর তালিকাভুক্ত কাজ প্রয়োজনে বাদ দিতে হবে। একই কাজের পুনরাবৃত্তি ও কাজের ভুল-ত্রুটি কমাতে হবে। প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে কাজটা নিয়ে ভেবে নিতে হবে দু-পাঁচ মিনিট। যেকোনো কাজ তাড়াতাড়ি করার চেষ্টা করলেও, তাড়াহুড়ো করা যাবে না। যখন কেউ কোনও কাজ করবে, তখন সেটাই তার একমাত্র কাজ মনে করতে হবে।অন্য কাজ যেন কোনভাবেই সেই কাজে নাক না গলাতে পারে।

ছোটো ছোটো গল্প বলে, বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে, নানারকম অনুপ্রেরণা মূলক ভিডিও দেখিয়ে স্ফূর্তি ওর বক্তব্য পরিবেশন করল। প্রশ্ন উত্তরে, হালকা হাসি মজার মধ্যে দিয়ে সময় ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ সুসম্পন্ন হল।


(৩)    

                                                                                                    

অফিস থেকে বেড়িয়ে একটু হেঁটে বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালো স্ফূর্তি। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই অনিকেত গাড়ি নিয়ে বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়ে ওকে তুলে নিলো। ইদানীং রোজ এমনি ভাবেই বাড়ি ফেরে স্ফূর্তি। পাছে লোকে কিছু বলে, সেইজন্য অফিস থেকে ওরা একসাথে বের হয় না। কিন্তু এতটা হেঁটে এসেও রক্ষে নেই। প্রায়ই কারও না কারো চোখে ঠিক পড়ে যায় ও। দেখেও না দেখি ভাব করে থাকে স্ফূর্তি। তবুও নানারকম ব্যঙ্গ টিটকিরি কানে চলেই আসে ওর। 

তুমি পাশে থেকেও যেন আমার থেকে কত দূরে আছ, সিগনালে গাড়ি দাঁড়ালে কথা বলতে বলতে ডানহাত স্টিয়ারিং-এ রেখে, বাঁহাত স্ফূর্তির ডানহাতের ওপর রাখল অনিকেত।

সিগনাল রেড আছে। যখন যেটা করবে, তখন সেটাই একমাত্র কাজ মনে করতে হয়। ট্রেনিংটা মন দিয়ে করনি দেখছি। স্ফূর্তি মৃদু হেসে বাঁহাত দিয়ে অনিকেতের ডান হাতটা আবার স্টিয়ারিং ওপর রেখে দিল।

অনিকেত ঘাড় ঘুরিয়ে একবার স্ফূর্তিকে দেখে নিয়ে সিগনালে চোখ রাখল। সিগনাল গ্রিন হলে অ্যাকসেলেটারে চাপ দিল। গাড়ি ছুটছে। কারও মুখে কোনও কথা নেই। অনিকেতই নীরবতা ভঙ্গ করল।

-        প্রতিদিন বাড়ির সামনে পৌঁছে দিচ্ছি। ভদ্রতার খাতিরেও তো মানুষ একদিন চা অফার করে বাড়িতে আসতে বলে।

-        নিজের লোককে কেউ নেমন্তন্ন করে ডাকে না। আজই চল না। কে বারণ করেছে?

-        থাক, আমি সেধে নিমন্ত্রণ নেই না।

স্ফূর্তি কোনও উত্তর না দিয়ে ভাবছে। ডানার এইচ.এস পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখতে গেছে ও। খেয়ে-দেয়ে রাতে ফিরবে। ফাঁকা ফ্ল্যাটে অনিকেতকে নিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে? চারিদিকে কৌতূহলী চোখ উঁকি মারছে। পরমুহুর্তেই ভাবনা ইউ টার্ন নিলো। কতদিন আর ‘পাছে লোকে কি বলে’ ভেবে নিজের মনকে ঠকাবো? বহুদিন এই শরীরটা কোনও পুরুষের ছোঁয়া পায় না। শেষের দিকে অর্ধেন্দুও নমাসে ছমাসে একদিন শারীরিক ভাবে মিলিত হত। স্ফূর্তির মনের মধ্যে একটা যুদ্ধ চলছে। আর এই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণের আগেই স্ফূর্তিদের কমপ্লেক্সের সামনে গাড়ি দাঁড় করাল অনিকেত।

-        আরে এখানে দাঁড় করালে কেন? পার্কিং প্লেসে গাড়ি রেখে আমার সাথে ওপরে চল। এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যাও।

-        এক কাপ চা খাওয়ার জন্য ওপরে ওঠার কোনও ইচ্ছে নেই আমার।চা তো অফিসে দিনের মধ্যে কতবারই খাচ্ছি। অন্য কিছু খাওয়ালে যেতে পারি।

আগে তো ঘরে চল, তারপর দেখছি। স্ফূর্তির গলা ধরে আসে।  

গাড়ি পার্ক করে দুজন মিলে ওপরে উঠল। পার্কিং প্লেসের সামনে বসে কয়েকজন বয়স্ক লোক আড্ডা দিচ্ছিল। স্ফূর্তিদের দেখে ওদের আড্ডার বিষয় পরিবর্তন হয়ে গেল। কিছু তীর্যক উক্তিও স্ফূর্তির কানে এলো। শুনেও না শুনে ওপরে উঠে গেলো ও। কিছুটা পাপবোধ আর অনেকটা ভয়ের সাথে অনিকেতকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকল স্ফূর্তি।

তুমি একটু বস, আমি চায়ের জল বসিয়ে আসছি। কাঁধের ব্যাগটা যথা স্থানে রেখে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল স্ফূর্তি। কিন্তু যেতে পাড়ল না। শাড়ির আঁচল টেনে বাঁধা দিল অনিকেত। তারপর হাত ধরে টেনে সোফায় নিজের পাশে বসাল।

-        সময় নষ্ট করার সময় নেই। টাইম ম্যানেজমেন্টের কোর্স করেছি সদ্য। নির্দিষ্ট সময়ে একটা কাজের ওপরই ফোকাস করতে শিখেছি। গরম চায়ের বদলে অন্য গরম কিছু খাওয়াও প্লিজ, হাতে সময় কম।

-        আচ্ছা, আসা মাত্রই শুরু হয়ে গেল। মাত্র ঘরে ঢুকলাম। একটু ফ্রেস হতে দেবে তো। নইলে গরম কিছুর বদলে ধুলো-বালি পেটে যাবে।

-        যাক, ক্ষতি নেই। শরীরের আনাচে কানাচে অলি-গলিতে বয়সটাকে লুকিয়ে রেখেছ কিভাবে গো?

 অনিকেতের গায়ে গা লাগিয়ে বসে স্ফূর্তি। বুকের আঁচল সরে গিয়ে ওর পড়ন্ত বিকেলের যৌবন উঁকি দিচ্ছে। নিজের অধর ও ওষ্ঠ দিয়ে স্ফূর্তির ওষ্ঠ চেপে ধরল অনিকেত। দুচোখ বন্ধ করে উষ্ণতা, আর ঘ্রাণের সাথে অনিকেতের ঘামের গন্ধ শুষছে স্ফূর্তি। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলল ও। জানালার কাঁচ টপকে নজর গেল নিচতলার পার্কিং প্লেসে। বয়স্ক লোকগুলোর সাথে উত্তেজিত ভাবে কথা বলছে ডানা। কথা-বার্তার ধরন দেখে চিন্তা হয় স্ফূর্তির।

ট্রাফিকে আটকে গিয়ে সিনেমার হলে পৌঁছতে দেরী হয়ে গেছে ডানাদের। তাই সিনেমা দেখা আর হয়ে ওঠেনি। গল্প-গুজব আর খাওয়া দাওয়া করে একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি চলে এসেছে ডানা। বাইকে করে ওর এক বন্ধু ওকে ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছে দিয়েছে। ওদের দুজনকে দেখে পার্কিং প্লেসে বসে থাকা বাবা-জ্যাঠার বয়সী লোকদের মন্তব্যে মাথা গরম হয়ে যায় ডানার।

-        আরে দ্যাখ, মা-মেয়ে দুজনেই ছেলে ধরে নিয়ে এসেছে। ফ্ল্যাটটাতে মধু-চক্র খুলে বসল দেখছি।

-        জেঠু, একজন নাতনীর বয়সী মেয়েকে শুনিয়ে এই কথাগুলো বলতে আপনার ঠোঁটে আটকালো না। নিজেদের মত সবাইকেও এতো নোংরা মনের মনে করেন কেন? মেয়েদের তো একদলা মাংসপিণ্ড ছাড়া কিছুই ভাবতে পারেন না। মেয়ের বয়সী, নাতনীর বয়সী মেয়েদের তো পারলে চোখ দিয়েই …..। এই বয়সে এসব বলতে বা করতে একটুও লজ্জা করে না?

-        এই বেশী বকবি না। বিধবা হয়ে তোর মা একটা পুরুষ মানুষ ফ্ল্যাটে নিয়ে এসে এন্তার ফুর্তি করবে, আর আমরা বললেই দোষ?

-        ও বিধবা হলে তার সব কিছু শেষ হয়ে যায় বুঝি? তার আর কোনও ভবিষ্যৎ চিন্তা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকবে না? সে আবার নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করতে পারবে না? অথচ আপনারা, পুরুষেরা বাড়িতে বৌ থাকা সত্ত্বেও অন্য মেয়ে নিয়ে যা খুশি করতে পারবেন! একবারের বেশী বিয়ে করতে পারবেন! পাবলিক প্লেসে মেয়েদের নোংরা কথা বলতে পারবেন! কোনও কিছুতেই বাধা নেই।

স্ফূর্তি ও অনিকেত তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এসেছে। মেয়ের প্রতিবাদ স্ফূর্তির মনে হয়েছে থামিয়ে দেওয়া উচিৎ। ডানা বৃথাই সময় নষ্ট করছে। পরক্ষনেই ওর মনে হয়েছে, এই সময়টাই তো নষ্ট, নষ্ট সময়কে কি আর সঠিক বেঠিকের গন্ডিতে ফেলা যাবে? এই সময়টার, এই ঘুনধরা সময়টার পরিবর্তনের প্রয়োজন। শোধনের প্রয়োজন। তবেই একে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে শিখে বা শিখিয়ে লাভ হবে। নইলে পুরো সময়টা দুঃসময় হয়েই থাকবে।

বলুক ডানা, ওর উঠুক প্রতিবাদের ঝড়। নিজের অজান্তেই স্ফূর্তির হাত অনিকেতের হাতের মধ্যে আশ্রয় নেয়।  










Rate this content
Log in

More bengali story from JAYDIP CHAKRABORTY

Similar bengali story from Inspirational