Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

AYAN DEY

Drama


3  

AYAN DEY

Drama


নও তুমি ছবি

নও তুমি ছবি

17 mins 1.9K 17 mins 1.9K

অর্পণ বিশ্বাসের কথা আপনাদের আগেই জানিয়েছি । সব বোঝাবুঝির পর সম্পূর্ণা আর অর্পণের শুভ পরিণ​য় সম্পন্ন হ​য়েছিলো । আজ আমি অর্পণের এক বন্ধুর কথা বলবো । নাম রজত বোস । ছবির সম্পর্কে অর্পণের মতই ইন্টারেস্ট । কিন্তু বিদেশ ফেরত হওয়ায় অর্পণের যে যশ ও খ্যাতি হ​য়েছিলো তা রজতের হ​য়নি । তবে সে পোর্ট্রেট আঁকাতে ছিলো ভীষণ দক্ষ । ছোটোখাটো হলেও প্রদর্শনীতে যেত তার ছবি । অর্পণ নিজে তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো ফ্রান্সের আর্ট কলেজে যেখানে সে প​ড়েছে । তার বাবা ইনফ্যাক্ট রজতের বাবার সাথে কথা বলে নিয়েছিলো কিন্তু নিয়তি সকলের সাথে একই ব্যবহার করেনা । ভিসা রেডির পরদিনই রজতের বাবা হার্টের অসুখ নিয়ে শয্যাশায়ী হলেন । ব্যাস সব বাতিল । 


রেগুলার ভিডিও চ্যাটে কথা হতো দুজনের । এমনকি শান্তিনিকেতনে সেই নেচার অ্যান্ড বিউটি এর উপর সেই প্রদর্শনীতে রজতের দুটো ছবি গিয়েছিল । তবে চিত্রিতা দেখার পরে আর কোনোদিকে কারোর নজর সরতে চায়নি । তবে কি অর্পণ ছবিটা নিলামে দেয়নি । কারণ তার প্রেমকাহিনী ওতেই আঁকা । 

রজতের অনেকদিনের ইচ্ছা ওই চিত্রিতার মতোই জীবন্ত কিছু একটা আঁকতে । নিজের মন থেকেই সে শুরু করলো একটি নারীমুখ স্কেচ করতে । একরাতে স্কেচটা যখন কম্প্লিট হ​য়ে আসছে তখন কোথা থেকে একটা নারীকন্ঠে প্রশ্ন এলো , " আপনি আমায় চেনেন নাকি ? "

একমন দিয়ে আঁকার সম​য়ে ঘরে একা থাকে রজত , এমনকি মাকেও আসতে দেয় না সে । বন্ধ ঘরের মধ্যে কে এমন কথা বলে উঠলো । কই ঘরে তো কেউ নেই । ফের প্রশ্ন , " কোথায় দেখছেন রজতবাবু , এদিকে এই ক্যানভাসের দিকে তাকান ? "

রজতের পিঠ দিয়ে কেমন ঠান্ডা স্রোত ব​য়ে গেলো ছবির দিকে তাকাতে । এ কি ছবির নারীমূর্তি যেন আগের চেয়ে বেশী হাসছে !

ভ​য়ের মধ্যেও রজত বোস কম্পিত স্বরে বললো , " চি...চিনি মানে আপনি কে ? মানে আপনি তো...তো । "

আবার শান্ত নদীর স্রোতের মতো নারীকন্ঠে উত্তর এলো , " আচ্ছা আচ্ছা , অত ভ​য় পেতে হবে না । আপনি মন থেকে ভেবে এঁকেছেন আমাকে তাই তো ? "

রজত বললো , " হ্যাঁ । কিন্তু আপনি কে কোত্থেকে বলছেন ? আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন ? "

একটা উল্লসিত হাসি ঘরম​য় গমগম করতে লাগলো । এমন সম​য় দরজায় ঠকঠক , " রজত , বাবা খেতে আয় এবার ! অনেক রাত হলো যে ! "

রজত বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে বললো , " হ্যাঁ মা আসছি । "

দরজা খুলে বাইরে আসতেই প্রথম প্রশ্ন , " কী রে বাবা , একটু নিজের খেয়াল রাখ ! আর একা একা কার সাথে কথা বলছিলি । আর একটা মেয়ের হাসির শব্দ শুনছিলাম , কী রে বাবু চুপ করে কেন ? "


রজত বললো , " মেয়ের গলা , আ..হ হাহা , ও মনে হয় সরস্বতী পুজোয় ক্লাবপ্রাঙ্গণে কোনো অনুষ্ঠানে কেউ ঘোষণা করছে হবে । "

মা বললেন , " কিন্তু বাবা ... সে যা হোক , তুই এতো ঘামছিস কেন ? "

রজত বললো , " ছবিটাকে ভালো করে দাঁড় করানোর টেনশন আরকি ... " চট করে নিজেকে মায়ের চোখের আড়াল করে নিলো ।

রজতের মা নিরুপমা দেবী ঘরের দরজা বন্ধ করার সম​য় হঠাৎ ঘরের মধ্যে কোনো উগ্র সুগন্ধির গন্ধ পেলেন । ছেলে তার এমন কিছু ব্যবহার করে বলে তো তিনি কোনোদিন জানেন না ।সম্পূর্ণ অচেনা এক গন্ধ । রজতকে জিজ্ঞেস করতে তার মনে হোলো , সত্যি তো ওই নারীকন্ঠ শোনার খানিক আগেই তো একরকম চড়া , যেমনটা তার মা বলছেন , তেমন এক গন্ধ নাকে এসে লেগেছিলো । 

তবে মাকে সে আপাততো বললো , " উগ্র সুগন্ধি কই না তো । "

রজতের বিষয়টা মোটেও ভালো লাগলো না । মা বাবাকে খাওয়াতে গেলে পরে মন ভালোর জন্য অর্পণকে ফোন করলো ।

কথায় কথায় অর্পণ তার নতুন ছবির ব্যাপারে জানতে চাইলো । রজত বললো , " শোন ভাই অর্পণ , তোর সাথে এই ব্যাপারে সামনাসামনি কথা বলতে চাই । "

অর্পণ বললো , “ কোন বাধা , মানে ছবি শেষ করার জন্য কিছু শেষ হয়ে গেছে , তাই ছবি আটকে রয়েছে এমন কিছু ব্যাপার ? ”

রজত বললো , “ ধুর ধুর তা নয় | সে হলে তো আমি তোকে ফোনেই বলে দিতাম | আজ এক অদ্ভুত ব্যাপার আমার সাথে ঘটেছে | এই দেখা করাটা মাস্ট | "

অর্পণ বললো , “ কাল ঠাকুর ভাসানের পর বাড়িতেই থাকবো | চলে আয় সন্ধ্যের দিকে | সম্পূর্ণাও বলছিল সেদিন যে অনেকদিন তোর খোঁজ পায়নি , এই রবিবার যাবে | ভালোই হলো কালকে তুই আসছিস , ও থাকবে বাড়িতে | কাকিমা আসছেন তো ? ”

রজত বললো , “ না আমি একাই যাবো | মাকে নিয়ে আর একদিন যাওয়া যাবে | কাল সন্ধ্যে সাতটা ওকে ? ”

অর্পণ সম্মতি দিলে ফোনটা কাটল রজত |


গোটা রাত আর কিছু না ঘটে থাকলেও বিষ​য়টা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলো না রজত । বারে বারে মনে হতে লাগলো যেন অলখে কোনো নারীমূর্তি হেসেই যাচ্ছে । ব​ড়ো গায়ে লাগে সে হাসি । একটা ছেলেকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য তা যথেষ্ট । ঘুম এলো না রজতের । পরের দিন আর সেই আঁকার ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করলো না ।

বেলার দিকে যেন অনুভব করলো একটা প্রবল টান সেই ঘরের দিকে যাবার । সাথে সেই উগ্র সুগন্ধির গন্ধ । মা সেই মুহূর্তে মন্দিরে গিয়েছিলেন । বাবা অন্য ঘরে শুয়ে । সে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই ঘরের দিকে যেতে লাগলো । কিন্তু একবারের জন্য চকিত হ​য়ে সে নিজেকে বিরত করলো ওই ঘরে যাওয়ার থেকে । তবে তাতে কি , তাকে যেন কেউ নিঃশব্দ স্বরেই বলে চলেছে , " কই ছবিটা শেষ করবেন না ! আসুন আসুন ! ওই তো প্রতিদিন ওইটুকু সম​য় , তাও দেবেন না আমাকে ? "

সে নিজেকে যেভাবে হোক বোঝাতে লাগলো , না সন্ধ্যাবেলা অর্পণের সাথে দেখা করা অবধি সে কিছুতেই ওই ঘরে যাবে না । চেয়ারে বসে সে জোর করে চোখ বুজে বসে রইলো । 

হঠাৎ শুনতে পেলো অর্পণের গলা । দরজায় করাঘাত করছে আর বলছে , " রজত রজত , কী রে আসবি বললি যে ! কীরে খোল দরজা । "

চোখ খুলে দেখে সন্ধ্যে ৭ টা , এ কী ? সে তো দুপুরের দিকে চোখ বুঝে চেয়ারে ঘুমিয়ে প​ড়েছিলো ! এতক্ষণ ধরে ঘুমিয়ে ? আর কিছু না ভেবে দরজা খুলে অর্পণকে ঘরে নিয়ে এলো । 

তাকে গতকাল থেকে শুরু করে তার সাথে ঘটা সমস্ত ঘটনা বলতে শুরু করলো । অর্পণ ওই ঘরে গিয়ে ছবিটা দেখতে চাইলো । এরপর যেটা ঘটলো সেটার জন্য রজত প্রস্তুত ছিলো না । অর্পণ না অর্পণের মূর্তি বলাই ভালো , সেটা ক্রমে মিলিয়ে গিয়ে নারীকন্ঠের সেই হাসিতে ঘরটা গমগম করতে লাগলো । সেই সুগন্ধিতে ঘর পুরো ভরে গেলো । হাওয়ায় প্রশ্ন এলো , " আরে আরে ভ​য় পাবেন না মিস্টার বোস । আপনার সঙ্গে প্রচুর কথা বলার আছে । উফরন্তু ছবিটার স্কেচ হ​য়েছে সবে , রঙও তো দেবেন ! আজ আপনার অনেক প্রশ্নের উত্তর দেবো । "

হঠাৎ মায়ের গলা সব মোহাচ্ছন্নতা ঘুচিয়ে কানে ভেদ করলো রজতের । " বাবু , বাবু ! আয় প্রসাদ নিয়ে যা । "

প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো রজত । একনজর ঘ​ড়ির দিকে তাকিয়ে সে রীতিমতো ভ​য় পেয়ে গেলো । ঘ​ড়ি তো বলছে দুপুর সবে গ​ড়িয়েছে তবে তখন সন্ধ্যেবেলার আবহে ৭ টা বাজার কী অর্থ ? কেই বা তখন অর্পণের রূপে এসেছিলো । দুদিন ধরে তার সাথে কী কী হচ্ছে তার বিচার বিশ্লেষণ কেউ কি করতে পারবে ? এসব ভাবতে ভাবতে মাথা গরম হ​য়ে উঠলো । মায়ের কথাতে হুঁশ ফিরলো তার । 

" নে বাবু প্রসাদ নে । কি রে এরকম বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন ? "

রজত বললো , " ও কিছু ন​য় , দাও দাও প্রসাদ দাও । " 

মায়ের থেকে প্রসাদটা কোনোরকমে নিয়ে শোওয়ার ঘরে চলে গেলো । মা খাওয়ার কথা বলতে এলে বললো , " খাওয়ার ইচ্ছে নেই মা । " 

মা বললেন , " তোর কী হ​য়েছে বলতো বাবু ? দুদিন ধরে এইরকম অন্যমনস্কতা দেখছি । "

" কিছু না মা , একটু বিশ্রাম দরকার । " বলে রজত পাশ ফিরে শুয়ে প​ড়লো ।

ঘুম ভাঙ্গতেই রজতের মনে হলো মাথার কাছে কেউ বসে আছে । চোখ না চেয়েই সে জিজ্ঞেস করলো , " কে ? "

কোনো উত্তর না আসায় জোরে প্রশ্ন করলো , "কে ? "

মা প্রায় হতচকিত হ​য়ে বললেন , " আমি রে আমি । দুপুরে তোর শরীরটা ভালো ছিলো না দেখে আমি মাথার কাছেই বসেছিলাম , কখন চোখ লেগে গেছে জানি না । হ্যাঁ রে বাবা এখন কেমন লাগছে ? "

ভরসা পেয়ে চোখ তুলে বলে , " হ্যাঁ মা এখন ঠিকাছে । তা তুমি খেয়েছো তো নাকি ? "

মা বললেন , " তোর এদিকে শরীর খারাপ আমি ওদিকে বসে খাবো । তোর বাবাকে খাওয়ানোর পর অবধি আমি এখানেই আছি । চ বাবু এখন কিছু খেয়ে নিবি চল । "

রজত কোনোরকমে কিছু মুখে দিয়েই মাকে বলে অর্পণের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো । অর্পণ এলো একটু পর । সম্পূর্ণা আর অর্পণের মা ছিলেন বাড়ি । ওরাই গল্প করতে করতে খানিক পরে অর্পণ ফিরলো । " আর বলিস না ভাই কী ভিড় , সব মনে হ​য় আগে ভাসান দেবে বলে এসেছে । হ​য়েছে কি সকলেই জমা হ​য়ে গেছে বিকেলের মধ্যে ফলে প্রচুর ভীড় । কতক্ষণ এসেছিস ? "

রজত খানিক অন্যমনস্ক হ​য়ে গিয়েছিলো , একবার " কী রে " বলায় সম্বিত ফিরে পেলো । সে বললো , " হ্যাঁ , তা ভাসান হলো ! কতক্ষণ লাগলো ? "

এতক্ষণের কথা যে রজতের কানে কিছুমাত্র প্রবেশ করেনি তা বুঝে সম্পূর্ণার চোখের দিকে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকালো অর্পণ । সম্পূর্ণা " কী হ​য়েছে কে জানে ? " ধরণের ইঙ্গিতে কুঞ্চিত ভ্রু নিয়ে অর্পণের দিকে তাকালো ।

যেন কিছুই হ​য়নি এই ভাব নিয়ে অর্পণ ফের সবকথা পুনরায় বলে সম্পূর্ণাকে বললো , " চা দিয়েছো ওকে ? "

রজত বললো , " হ্যাঁরে চা টা সব হ​য়েছে , এখন তুই বস দেখি ! "

অর্পণ খদ্দরের একটা পাঞ্জাবি প​ড়েছিলো । সেটাকে খুলে গেঞ্জি গায়ে সোফায় বসলো । এবারে সে বললো , " এবারে বল তোর কী জরুরী কথা । "

রজত প্রস্তুতই ছিলো । অর্পণের জানতে চাওয়াতেই সে গতকাল থেকে নিয়ে আজ আসা অবধি সব ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিলো ।

সব শুনে অর্পণ বললো , " তুই যা বলছিস তার ব্যাপারে এর আগে কোথাও কেউ শুনেছে বলে মনে 

হ​য় না । আমায় ছবিটা একবার দেখাবি ? "

রজত বললো , " অবশ্যই এক্ষুণি চল । "

সম্পূর্ণাকে বলে অর্পণ আর রজত দুজনেই রজতের বাড়ির দিকে চললো । ঘরে ঢুকতে যাবে এমন সম​য় চৌকাঠে জোর হোঁচটে মুখ থুবড়ে প​ড়লো । থুতনি কেটে গেলো । রজত হাঁ হাঁ করে এগিয়ে এলো অর্পণকে তুলতে । পা গেছে মুচকে , থুতনি ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে - যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে অর্পণ । ব্যতিব্যস্ত হয়ে রজত ডেটল , তুলো আর গজ এনে অর্পণের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে লাগলো । ফাটল যে বেশী ন​য় এই বাঁচোয়া , নইলে এক্ষুণি স্টিচ করতে হতো ।

ছবিটা দেখানো আর হলো না । রজতের মা নিজে যখন ব্যাপারটা জানলেন তখন আগে ডাক্তার জয়নাথ মিত্রকে ডেকে পাঠালেন । চোটের জন্য এক্সরে রিপোর্ট দরকার জানালে দ্রুত তাকে নিয়ে এক ক্লিনিকে ছোটে রজত । চোট গুরুতর ন​য় । বাড়িতে ছেড়ে গভীর দু়ঃখ প্রকাশ করে ফেরত আসে রজত ।

রজত সারাসন্ধ্যে নিজের শোওয়ার ঘরেই একটা কথা ভাবতে লাগলো । অর্পণের সঙ্গে আজ যেটা হলো সেটার সাথে কি ওই ছবির কিঞ্চিৎ যোগও আছে নাকি বিষয়টা সম্পূর্ণই কাকতালিয় ? 


অলস মনে সবটা ভাবতে ভাবতে আচমকা বাতাসটা সেই সুগন্ধির গন্ধে ভরে উঠলো । গন্ধটা যখনই ওঠে অত্যন্ত তীব্রভাবে মননকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জ​ড়িয়ে ফেলে । রজতকে বাধ্য করে তার আঁকার ঘরে যেতে ।

অর্পণ আজ নিজের মনকে জোর করে বশে রাখার চেষ্টা করলো । আজ যত গন্ধই উঠুক সে যাবে না । দমবন্ধ করে পারলে তাকে শেষ করে দিক ওই মেয়ে ... না না মেয়ে কোথায় ... মানুষ তো ন​য় ... না কোনো সূক্ষদেহী প্রেতযোনির বাসিন্দা । কে কে কে ? এই অদ্ভুত অস্তিত্ব কার ? তার মাথা গরম হয়ে উঠলো ।

সমস্ত রকম টান অস্বীকার করে সে এক জায়গায় বসে রইলো । 

" কি আমাকে এড়িয়ে চলছেন ? " সেই মাদকতা মেশানো নারীকন্ঠে মেরুদন্ডে মনে হলো ঠাণ্ডা একটা স্রোত খেলে গেলো ।

রজতের মনে হলো ওই মেয়েলি কন্ঠস্বর এখন তার পাশে খুব কাছ থেকে আসছে । বলছে , " সে আপনি আমায় এড়িয়ে যাবেন এটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমার যে ছোট্ট আবদার আছে সেটা আপনি ছাড়া তো কেউ পূরণ করতে পারবে না ! আপনার বন্ধুটিও না । "

" আপনার অস্তিত্বটা ব​ড় অস্বস্তিকর , আ-আপনি সেটা বোঝেন না ।আর আমার বন্ধুর ক্ষতি হয়েছে আপনারই জন্য । সেই অবাস্তব অলীক যার জন্য জীবন বিপন্ন হ​য় তার কোনো আবদার আমি অন্তত রাখতে পারবো না । " বললো রজত ।

জবাব এলো , " দেখুন আমি কোনোভাবেই আপনার বন্ধুকে জড়াতে চাই না । আমার জীবনের অঙ্ক শুধু আপনি সমাধান করতে পারেন , তাই আসা । "

রজত এবার কিছুটা শান্তস্বরে বললো , " আপনি আমায় সবটা পরিষ্কার করে বলুন তারপরে আমি ভেবে দেখবো ও ছবি আমি শেষ করতে পারি কি না ? "

একটুক্ষণ কোনো কথা হলো না । হঠাৎ নারীকন্ঠে তুমি কি কেবলই ছবি রবীন্দ্রসংগীত শুনে রজতের চমকিত ও একই সঙ্গে ভ​য় বোধ হলো । সে কি কন্ঠ আহা ! যেন প্রাণের অন্তস্থল হতে সবদু়ঃখ নির্গত হচ্ছে । তার মনে হলো সে যেন এই গান আগে শুনেছে মানে একই কন্ঠে শুনেছে । যত গানের মর্ম তার মনের তারগুলো ধরে নাড়া দিতে লাগলো তার তত মনে হতে লাগলো এ গলা তার চেনা । কোথায় কোথায় শুনেছে সে ?

ওই গানের সাথে হঠাৎ করে আরও অনেক গলার স্বর শোনা গেলো । তারা গাইছে আজি দখিন দুয়ার খোলা , নীল দিগন্তে আরও কত বসন্তের গান । এ তো শান্তিনিকেতনে দোল উৎসবের সম​য়কার । হ্যাঁ হ্যাঁ শান্তিনিকেতনই বটে । গত বছরের দোলের কথা । কিন্তু সেই গান এখন শুনতে পাচ্ছে কেন সে ? 

" আর পারছি না অসহ্য এই আওয়াজ । কে কে কে আপনি ? " আর্ত চিৎকার করে উঠলো রজত ।

" এখনও চিনতে পারছেন না ? মনে পড়ে বিশ্বভারতীর গেটের বাইরে একটি মেয়ে নগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায় একদিন ? দিনটা বসন্তের রঙে ছিলো ভরে । আপনি আর আপনারা আমায় বাঁচাতে চেষ্টা করেছিলেন অনেক কিন্তু শেষরক্ষা হ​য়নি । মেয়েটা শুধু তার ছবি আঁকাবে বলে রজত বোসের খোঁজ করেছিলো । কয়েকজন তাকে ভুল স্থানে আপনি আছেন বলে নিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে খেয়েছিলো । ওরা ধরা পড়েনি , আমি চাই আমার এই ছবি দিয়ে আপনি সত্যিটাকে শান্তিনিকেতনেই তুলে ধরেন । "


রজত ততক্ষণে নিজের উপর রাশ হারিয়েছিল । সে বললো , " পারবো । কিন্তু একটা কথা আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে আপনি আমায় চিনলেন কী করে ? "

স্বল্প হেসে জবাব এলো , " দেখুন , কম জায়গায় তো আপনার ছবি যায় নি । অর্পণবাবুর মতো না হলেও হয়েছে তো কমবেশী অনেকই প্রদর্শনী হয়েছে । সেসব থেকেই জেনেছি । সেদিন আপনাকে খুঁজতেই বিশ্বভারতীর গেট অবধি এসেছিলাম , সাথে গাইছিলাম তুমি কি কেবলই ছবি । মনে হয়েছিলো আপনি আপনার বা আপনার আঁকা ছবির বাইরে হয়তো আমার সামনে আসবেনই না । "

রজত কোনো কথা বলতে পারলো না । দুঃখ ও প্রচণ্ড রাগে তার ভেতর তোলপাড় করতে লাগলো । ঘটনাটা তার সম্পূর্ণ মনে এসে গেলো । যদিও সে মেয়েটিকে হাসপাতাল অবধি পৌঁছে দিয়েছিলো ও সেদিনটায় তার খোঁজ রেখেছিলো । কিন্তু পরে আর খোঁজ রাখেনি । এমনকি কাছ হতে মুখটাও স্পষ্ট দেখেনি । তাই তার মনে হতে এত দেরী হলো । 

সে এবার বললো , " আপনি ... "

কথা থামিয়ে , " এবার তুমি বলুন আর নামটা ধরেই বলুন । আমার নাম শতাব্দী দাস । "

রজত বললো , " তা ঠিকাছে কিন্তু শতাব্দী তোমার জন্য আমার মতো শিল্পীর যা করার থাকতে পারে আমি করবো । "

শতাব্দীর কন্ঠে শোনা গেলো বেশ আশ্বাসের সুর । সে যেন রজতকেই এই দুনিয়ায় এখন চেনে একমাত্র । বললো , " আপনি আমার মুখের একটু অ্যাঙ্গেল চেঞ্জ করে একটি শারীরিক নিপীড়নের চিত্র যাতে পরিষ্কার তিনজন পুরুষের মুখ ভেসে উঠবে , এমন একটি ছবি আঁকবেন । "

রজত বললো , " পারবো তবে ওই ছেলেগুলোকে আমি চিনবো কীভাবে ? "

উত্তর এলো , " যেভাবে আমাকে না চিনেও এঁকেছেন সেভাবেই আঁকবেন । আমি চিনিয়ে দেবো । "

শুরু হলো এক অদ্ভুতের , এক অস্বাভাবিকের যার কথা এর আগে কেউ কোনোদিন ভেবেছে কি ? মনে হয় না । রজত নিজেরই মনে এঁকে চললো সেই ঘটনার চিত্র । তার মনে আপনা আপনি সেই ছেলেগুলোর মুখ ভেসে উঠলো । অর্পণ ফোন করলে সবটা তার মনের ভুল বলে কাটিয়ে দিলো সে । মা এসে মাঝে মাঝে দেখেন এবং বোঝেন ছেলে তাঁর কোনো অসামান্য ছবি আঁকছে । তবে তাঁর মনে ওই সুগন্ধি দ্রব্য নিয়ে মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন জাগতো । ছেলে যখন বলতো সে নতুন সেন্ট ব্যবহার করছে তখন কিছু বলতেন না । ছবিটা শেষ করতে পাক্কা দেড়মাস সম​য় লাগলো । ১০০০ ঘন্টা শেষে ছবিটা সম্পূর্ণতার চেহারা নিলো । গা শিউরে ওঠার মতো এঁকেছে সে ছবিটা । এই কদিনে সে প্রায় ১০টা প্রদর্শনী ক্যান্সেল করেছে শুধু এই দোলে শান্তিনিকেতনের প্রদর্শনীতে এই ছবিটা পাঠাবে বলে । এদিকে অর্পণও এঁকেছে অনন্য কিছু ছবি । সে জানতো রজত প্লেন কোনো পোর্টরেট পাঠাবে প্রতিবছরের মতো ।

রজতের সাথেই তার যাওয়ার কথা । সে এসে ছবিটা দেখলে রীতিমতো শিউরে ওঠে । রজতকে প্রশ্ন করলে সে বলে , " যথাসময়ে সব জানবি । "

ওরা নিজেদের ছবিগুলো নিয়ে যাওয়ার আলাদা ব্যবস্থা করে নিজেরা গাড়িতে রওনা দিলো । গাড়িতে যাওয়ার সম​য় অর্পণ বললো , " কীসের একটা সুগন্ধ আসছে বলতো ? নতুন সেন্ট ? "


রজত খানিক থতমত খেয়ে বললো , " হ্যাঁ হ্যাঁ । "

বাচ্চু সব বারের মতই এবারও ছবিগুলো নিয়ে ম্যাটাডরে বেরিয়ে প​ড়লো । গাড়িতে অর্পণ , রজত আর সম্পূর্ণা । 

যথাসময়ে প্রদর্শনী শুরু হলো । অর্পণ ছবিটা দেখে শিউরে উঠেছিলো বটে কিন্তু একবারেই সে ছবির মেয়েটিকে চিনতে পারে নি । প্রদর্শনী চলাকালীন চিত্রিতার মত এবারও বাচ্চুই প্রথম বিষ​য়টা অর্পণের নজরে আনে । সে বলে , " আরে অর্পণ দা ছবিটা রজত দা যেটা এঁকেছে দেখেছো ভালো করে ? "

অর্পণ বললো , " হ্যাঁ দেখেছি ভাই এবং রীতিমতো অবাক হয়েছি । "

বাচ্চু গলার স্বর নামিয়ে বললো , " শুধুই অবাক ? আর কিছু ? "

অর্পণ বললো , " মানে কী বলছিস ? "

বাচ্চু বললো , " গতবারের দোলের সেই বীভ​ৎস ঘটনার কথা মনে পড়ে ? "

অর্পণ বললো , " হ্যাঁ ? তাইতো তাইতো । ওটা তো ওই ওই মেয়েটাই । রজত কী করে ... রজত এই রজত । "

রজত সামনে এসে বললো , " কী রে বল ? "

অর্পণ বললো , " ছবিটা আমার কাছে এতক্ষণে আরও পরিষ্কার হয়েছে । কিন্তু আমার এটা ভেবে বেশ চমক লাগছে যে এই ঘটনার এতো ডিটেলিং তুই জানলি কী করে ? "

রজত বললো , " সব বলবো ভাই , আগে আসামি ধরা প​ড়ুক । ওরা যে এখনও ... "

কথা শেষ হলো না হলভর্তি লোকের মধ্যে হঠাৎ জোর চিৎকার শোনা গেলো , " রজত বোস কে আছেন ? কে আছেন ? তাঁর সাহস হ​য় কী করে আমার ছেলের ছবি এইভাবে আঁকার ? "

রজত সামনে এসে দাঁড়ায় । বলে , " আপনাকে তো ঠিক ... "

" আমি হিরণ মহাপাত্র , এই এলাকার সবাই হিরু দা বলেই চেনে , প্রোমোটার আমি । আমার কথায় বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায় । "

" বিষ​য়টা খুলে বলবেন । "

" ওই যে ওই ছবিটার নীল জামার ছেলেটা ওটা আমার , আমার ছেলে । আপনি কী আক্কেলে এঁকেছেন ? ওকে আপনি চেনেন কেমন করে ? "

" ও তাহলে আপনারই সুপুত্র ওদের একজন । আজ আপনাদের সব্বাইকে একটা সত্য ঘটনা বলবো , জানি না সবটা বিশ্বাসযোগ্য করে বলতে পারবো কি না । আমি আগে শুধু বিভিন্ন নারীমুখ আঁকতাম । হঠাৎ কিছু অদ্ভুত ঘটনা আমার জীবনকে বদলে দেয় । " সব ঘটনা বললো গত কিছুদিনে যা ঘটেছে ।

রজত বললো , " আপনারা এখন এর বিচার করবেন । হিরুদার ভয়ে চুপ থাকবেন না পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেবেন অপরাধীদের । বাকি দুজনের পরিচ​য় হিরণবাবুর ছেলেই বলে দেবে । "


হিরণ মহাপাত্র বললেন , " এ এ এই আর্টিস্ট বেশী বাড় বাড়িস না । তুই মনে হ​য় চিনিস না আমি কে । তুই যে বলছিস এসব তার প্রমাণ দে । কই দে । "

" প্রমাণ তো এই ছবি । এই ছবি সবই বলে দেবে । " বললো রজত ।

হো হো করে হেসে উঠলো হিরণ মহাপাত্র । " এ দেখ শিল্পী পাগল হয়ে গেছে । সামলা রে ওরে । নইলে পাগলা কুকুরের মতো ... "

কথা শেষ হলো না জনতা ক্ষেপে হিরণবাবুকে ঘিরে ধরে হলের বাইরে বার করে হিরণবাবুর বাড়ির উদ্দেশ্যে একজোট হয়ে চললো । বাড়ি থেকে হিরণবাবুর ছেলে সঞ্জ​য়কে টেনে বার করে গণধোলাই দিতে দিতে থানায় নিয়ে গেলো । পুলিশ ক্ষণিক আটক করলেও প্রমাণের অভাব ও হিরণবাবুর ভয়ে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো ।

রাত্রে অর্পণের বাড়িতে রজত বসে খাবার খাচ্ছে এমন সম​য় হঠাৎ চিৎকার । " কি বে রজত বোস কোথায় গেলি রে ? কিচ্ছু করতে পারলি না তো । "

ভেতর অবধি এলে পড়ে রজত চেঁচালো , " গণেশ এই গণেশ কোথায় গেলি রে । "

হিরণবাবু বললো , " ও চাকর দেখ মাটিতে কোঁকাচ্ছে । শোন আমার পেছনে লাগিস না । ছেলেকে শুধু শুধু মার খাইয়ে অ্যারেস্ট করলি কিন্তু লাভ হলো না । প্রমাণ দিতে পারিস নি । সাবধান করে দিলাম ভবিষ্যতে কোনোদিন আর আমার পেছনে লাগতে এলে শেষ করে দেব । "

অর্পণ চিৎকার শুনে যতক্ষণে বাইরে এলো ততক্ষণে হিরণ মহাপাত্র বেরিয়ে গেছে । অর্পণ রজতকে শান্ত করলো । বাইরে এসে গণেশকে তুলে ভেতরে নিয়ে গিয়ে শুশ্রুষা করলো দুইবন্ধু ।

পরদিন সকালে বেলা অবধি ঘুমিয়েছিলো দুইবন্ধু । ঝামেলার জন্য কর্তৃপক্ষ আপাতত প্রদর্শনী বন্ধ রেখেছিলো । হঠাৎ দরজায় করাঘাত ও বিপুল জনতার আওয়াজ শুনে অর্পণ দরজা খোলে । একজন তার গলায় মালা পরায় ও রজত এলে তাকেও পরিয়ে দেয় ।

লোকটি বলে , " বাবু আপনাদের জন্যই অপরাধী শেষমেশ শাস্তি পাবে । আমার মেয়েটার আত্মা বোধহয় এইবারে শান্তি পাবে । "

রজত ভীষণ অবাক হয়ে বললো , " কিন্তু সে তো ছাড়া পেয়েছিলো । "

ভীড় থেকে একজন সধবা মহিলা বেরিয়ে এসে বললেন , " ওর যেন ফাঁসি হ​য় সেটা দেখবেন । আমি ওর হতভাগিনী মা । কাল রাতে ওর জোর আর্তনাদ শুনি । পাগলের মতো ও ঘর থেকে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে যায় । পিছু নিয়ে দেখি ও থানার দিকে যাচ্ছে । ওখানে আড়ালে থেকে শুনি ও সব অপরাধের কথা স্বীকার করে এবং সাথে দুই বন্ধুরও নাম নেয় । ওর যেন ফাঁসি হ​য় । "


ঘটনাটা জেনে স্বস্তি পেলেও একটা কিছু অজানা থেকে গেলো বলে মনে হলো রজতের । এমন কী হলো যে সঞ্জ​য় নিজে আত্মসমর্পণ করলো ।

রাতে বারান্দায় বসে একা এসব ভাবছে । ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সেই গন্ধ । রজত বললো , " এসো এসো তোমারই প্রতীক্ষায় ছিলাম । এবার খুশি তো ? "

সে বললো , " হুম । শ​য়তানটাকে এমন ভ​য় দেখিয়েছি যে ও ভ​য়ে সব স্বীকার করে নিয়েছে । "

রজত বললো , " তাই বলুন নইলে এটা সম্ভব হতো কীভাবে । আচ্ছা একটা প্রশ্ন এই একটা বছর কেন চুপ ছিলে ? "

উত্তর এলো , " ভেবেছিলাম কোনো দেহ নিয়ে তোমার সামনে ধরা দেবো । তবে কি জানো ইহজগতের মতো পরলোকেও ধর্ষিতাদের নীচুচোখেই দেখা হতো তাই কোনো দেহতেই আমার ঢোকার পারমিশন ছিলো না । তাই এইভাবে ... "

রজত বললো , " একটা শেষ প্রশ্ন করবো ? ওই গন্ধটা ... "

উত্তর এলো , " মনে পড়ে তোমাদের পাড়ায় এক কাকু বিদেশ থেকে সেন্ট নিয়ে আসতেন ? আমার মামা তোমাদের ওই কাকু । সেই ছোটোবেলায় একটা সেন্ট পেয়েছিলাম সেটা ব​ড় ব​য়স অবধি চলেছে । আমার প্রিয় সেন্ট । ভেবেছিলাম তুমি এই গন্ধে চিনতে পারবে আমায় ? কিন্তু না । হলো না । "

রজত ত​ড়াক করে কেদারা থেকে উঠে শূন্যে চেয়ে বললো , " মনোহর কাকার ভাগনি শতাব্দী ? সেই শতাব্দী যে আমার প্রথম প্রেম । কখন কোথায় হারিয়ে গেছিলে তুমি ? হাঃ ঈশ্বর তুমি এত কেন নিষ্ঠুর ? কি পরিস্থিতিতে তোমার সাথে ফের ... , হায় কপাল । " কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে প​ড়লো রজত ।


Rate this content
Log in

More bengali story from AYAN DEY

Similar bengali story from Drama