মূর্তির ছায়া
মূর্তির ছায়া
প্রায় দশমিনিট হতে চললো।একটা লম্বা চওড়া ছায়ামূর্তি আমার আসে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার ডানদিক,একবার বাঁদিক আবার কখনো কখনো আমার বিলম্বিত ছায়াটার সাথে মিশে যাচ্ছে কিছুক্ষনের জন্য।একটা অদ্ভুত অনুভূতি ঘিরে ধরে আছে। পাঁচটা ইন্দ্রিয়কে নাকানি চোবানি খাওয়ালেও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় এখনও বিদ্রোহ করে বলছে -"কেউ একটা আছে। একদম আমার পিছনে। "।
আজ একটা সাইট ভিসিট ছিল। সব কাজ সেরে বেরোতে বেরোতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। প্রায় রাত সাড়ে এগারোটার সময় আমারই এক কলিগ, সুধাংশু দা ,আমাকে বাড়ির কাছের একটা রাস্তার মুখে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আমাকে বাড়ি অবদ্ধিই পৌঁছে দিতে চেয়েছিলো, কিন্তু আমিই বারণ করেছিলাম।প্রথম কারণ,রাস্তার মোড়টা থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। হাঁটা পথ। তাড়াতাড়ি হাঁটলে দশ মিনিটেই বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া যায়। আর দ্বিতীয়ত, গলিটা অবধি আমার আর সুধাংশু দার পথ এক। তারপরে আমাকে বাড়িতে নামাতে গেলে উল্টো পথে আসতে হতো অনেকটা। এত দূর অবধি একটা ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মানুষকে টেনে এনে,তাকে বাড়ির সামনে থেকেই বিদায় করে দেওয়াটা কেমন যেন লাগে।আবার এতো রাতে একটা মেয়ের বাড়িতে একটা ছেলেকে একটু জল খাওয়ানোর জন্যও নিমন্ত্রণ করা যাবে না। সমাজ রে রে করে তেড়ে আসবে। সুতরাং সেই দোলাচালেই গেলাম না। মোড়ের মাথায় নেমে বিনম্র ভাবে সুধাংশু দাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চলে আসলাম।
"আর ইউ সিওর? আমি কিন্তু পৌঁছে দিয়ে আসতেই পারি।আমার অসুবিধা হবে না।"
"না না। আমি যেতে পারবো। অনেক ধন্যবাদ।"
"ওকে। তুমি যা মনে করো। তবে সাবধানে যেও।অনেকটা রাত হয়ে গেছে কিন্তু। "
"রাতের অন্ধকার নিয়েই তো আছি সুধাংশু দা। আর সত্যিই ভয় করে না। "- হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম কথাটা।অন্ধারকার নিয়েইতো পড়ে আছি। যা নিয়েই আমার জীবন তাকে আর ভয়টা পাবো কীকরে?ব্যপারটা তাহলে সেই ঘোড়ার ঘাসকে ভালোবাসার মতো হতো।
"পৌঁছে একটা ম্যাসেজ করে দিয়ো। "
"আচ্ছা। তুমি সাবধানে যেও। "- আমি কথাটা বলার পরেই বাইকের হ্যান্ড স্টার্টটা ঘুরিয়ে, বাইকে স্টার্ট দিয়ে আবার আমার দিকে তাকিয়ে -"আসছি "- বলেই বেরিয়ে গিয়েছিলো।
কিছুক্ষন সুধাংশু দার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে,একটা জোরে শ্বাস নিয়ে , পিঠের ব্যাগের হাতাটা আরেকটু চেপে ধরে হাঁটা শুরু করেছিলাম।
তবে আজকে সারাদিন অনেক ঘোরাঘুরি, খাটাখাটনি গেছে, খুব ক্লান্ত লাগছিলো নিজেকে, তাই আর জোরে জোরে হাঁটতে ইচ্ছে হলো না। আসতে আসতে ধীর গতি অবলম্বন করে যতটা সম্ভব নিজের উপর অতিরিক্ত প্রেসার না দিয়ে হাঁটছিলাম।
সেই ছায়ামূর্তি দূরত্ব কমাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি কিন্তু কিছু বলতে পারছি না। একবার চট করে পিছনে ঘুরে দেখলাম।না।কোত্থাও কেউ নেই। একদম গড়ের মাঠের মতো খাঁ খাঁ শূন্যতা। একটা টিমটিমে সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্প, কিছুটা দূরে অশরীরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।কমলাটে আলোটা কিরম ছোটবেলার গল্পে পড়া পিশাচের চোখের মতো জ্বলে আছে,ঢ্যাংঢ্যাঙা সিলভার রঙ করা সরু দেহটার উপর।
ছোটবেলা থেকেই ভূত-পেত্নী নিয়ে আমার গবেষণার শেষ নেই। খুব ভালোবাসতাম ভূতের গল্প পড়তে। তবে এখন বড্ড হাস্যকর লাগে। "লম্বা লম্বা হাত এসে চট করে ঘাড়টা ধরে মট করে মুচকে দেবে" -এসব শুনলে এখন হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার উপক্রম হয়। তবে "ডার্ক "-এ বিশ্বাস আমি করি।সো কল্ড ভূতে বিশ্বাস না করলেও অপদেবতা কিংবা অপক্ষমতার উপর বিশ্বাস আমার ষোলো আনাই আছে। তাই বেছে বেছে একটা যথাযথ প্রোফেশন ও খুঁজে বের করেছি। প্যারানরমাল সায়েন্টিস্ট। হ্যাঁ। শুনতে অন্যরকম লাগলেও আমার কাজ, কর্ম, ধর্ম সবটাই ওই "তেঁনাদের " নিয়ে। তাই রাতটা আমার বড্ড আপন। সেটাকে আর ভয় করে না।
পিছনের ছায়ামূর্তিটা ক্রমশ আমার আরো কাছাকাছি চলে আসছে। সরীসৃপের মতো আমার ছায়াটাকে নিজের জালে পেঁচিয়ে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। কোনোদিকে না তাকিয়ে নিজের গতিটা বারিয়ে নিলাম। বড় বড় পায়ে হাঁটতে হাঁটতে, আমার পিঠে ঝুলে থাকা ওড়নার অংশটাকে সামনে নিয়ে আসলাম, গলায় আরেক প্যাঁচ পেঁচিয়ে। মাথার পনিটেলের ক্লিপটা এক ঝটকায় খুলে হাতে নিয়ে নিলাম ,চুলটাকে একপাশে সামনে এনে। আসতে আসতে আমার গতি আমি বাড়িয়েই যাচ্ছি। তবে দৌড়াইনি।কাঁধের ব্যাগটা সামনে এনে, ব্যাগের মধ্যে ডান হাতটা ঢুকিয়ে দিয়ে, বাঁ হাত দিয়ে খাঁমচে ধরে আছি ব্যাগটাকে।পিছনের সেই ছায়ামূর্তি এখনো এগিয়েই চলেছে।
আমার বাড়িটার থেকে আমার দূরত্ব আর মাত্র একটা গলি। সামনের গলিটায় ঢুকে প্রথম বাড়িটা পেরোলেই আমার বাড়ি।আসলে আমার মাসি-মেসোমশাইয়ের। চাকরি সূত্রে দুজনেই এখন কোলকাতার বাইরে। কবে আসবে, আদৌ আর কোনোদিনও কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে থাকবে কিনা জানা নেই। আমাকে দুজনেই খুব ভালোবাসে। তাই যখন ভাড়া বাড়ি বা ফ্ল্যাট খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়েও পেলাম না, সবাই আমার প্রফেশনটা শুনেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠে মুখের উপর দরজাগুলো বন্ধ করে দিতে থাকলো তখন আমার মাসি মেসোমশাই দেবদূতের মতো এসে আমাকে ওদের বাড়িতে থাকার অনুমতি দিয়েছিলো।তারপর থেকে এই বাড়িতেই আমার বাস।বাড়িটা আগে ফাঁকাই পড়ে ছিল।এখনো অধিকাংশ দিনই ফাঁকা পড়ে থাকে,এই আজকের মতো কয়েকটা দিন ছাড়া। আসলে আমার চাকরিটাই এমন। রাতে বেশির ভাগ সময়ই বাড়ির বাইরে কাটাতে হয়। তবু যতটুকু সময় থাকি একটু গুছিয়ে, ঝেড়ে মুছে রাখার চেষ্টা করি। এতে অবশ্য দু পক্ষেরই লাভ হয়েছে। আমারতো হয়েছেই, আর আমার মাসিকেও আলাদা করে কেয়ারটেকারের ভরসায় বসে থাকতে হয় নি।একজন অচেনা অজানা লোকের হাতে বাড়ির দায়িত্ব তুলে দেওয়ার থেকে আপনার দিদির মেয়ের হাতে সেই দায়িত্ব তুলে দিয়ে দুজনেই এখন বেশ নিশ্চিন্তে আছে।
আমার পিছনের ছায়ামূর্তিটা আমার থেকে হয়তো আর মাত্র হাত পাঁচেক দূরে। কোনোরকমে গলিটায় ঢুকেই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে লুকিয়ে পড়লাম। পাঁচিল আর ফুলের টবগুলোয় নিজেকে আড়াল করার জন্য নীচু হয়ে মাটির উপরেই উবু হয়ে বসে আছি।রাস্তার আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলাম সেই ছায়ামূর্তি দুলে দুলে, কিছুটা ছুটে এগিয়ে এসে কাছেই থমকে দাঁড়ালো। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনেরো মিনিট ওখানেই দাঁড়িয়ে থেকে, আবার দুলে দুলে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
ওখানে আরও কিছুক্ষন চুপটি করে বসে, তারপর আসতে আসতে আওয়াজ না করে বাড়ির পিছনের দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে, চাবি দিয়ে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকেই আবার দরজাটা লাগিয়ে দিলাম।
হাতড়ে টিউব লাইটের সুইচটা জেলে কাঁধের আর পিঠের ব্যাগটা ধপাস করে টেবিলের উপর রেখে নিজেও একটা চেয়ার দখল করে বসে পড়লাম।বুকটা ইতিমধ্যে দারুণ বেগে ধুকপুক ধুকপুক করছে। নিজেই যেন নিজের হার্টবিট শুনতে পাচ্ছি, স্টেথোস্কোপ ছাড়াই। ঢক ঢক করে প্রায় পুরো বোতলের জলটাই গিলে নিয়েছি। নিজেকে বাইরে থেকে যতই শক্ত দেখানোর চেষ্টা করিনা কেন, আমার শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গে অ্যাড্রিনালিন হরমোনের প্রভাব স্পষ্ট।
ব্যাগের মধ্যে ফোনটা বেজে উঠতে, ব্যাগের চেইনটা খুলে মোবাইলটা বার করে নাম না দেখেই ফোনটা তুলে নিলাম তাড়াহুড়োয়।
"বাড়ি ফিরেছিস? "
ফোনের ওপারে মায়ের গলাটা শুনে দেহে যেন প্রাণটা ফিরে এলো।
"হ্যাঁ এই ঢুকলাম "
"হাঁপাচ্ছিস কেন? "
"কই নাতো ...... "
"কী হয়েছে স্পষ্ট করে বল মাম্মাম। "
দোনোমোনো করে নীচু গলায় বলেই দিলাম মাকে সবটা -"একটা ছায়ামূর্তি...... আমার পিছনে...... "
"আবার?!অনেক হয়েছে আর ওই উৎপটাং কাজ তোকে করতে হবে না। বাড়ি ফিরে আয়। কবে থেকে বলছি। পৃথিবীতে এতো রকমের চাকরি থাকতে, কী মরতে যে তোকে এইটা করতে দিলাম। ভগবান জানেন! সব সময় ঐসব নিয়ে থাকিস। কবে কখন কী হয়ে যাবে......? "
ক্ষাণিকটা হেসে উত্তর দিলাম -"আবার শুরু করলেতো?! রাখো রাখো।ফোনটা রাখো। অনেক রাত হলো এবার গিয়ে আরাম করে একটু ঘুমাও। "
"হ্যাঁ সেতো বলবিই। ভালো কথাতো আর কানে ঢোকাবি না!খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়িস, বেশি রাত করিস না। রাখছি "
"টাটা "
ফোনটা কেটে দিলাম আর কথা না বারিয়ে নয়তো সেই এক কথা ভাঙা টেপরেকর্ডের মতই মা বলেই যেত। ভূতের ভয়টা মার এখনো গেল না!
হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায় সুধাংশু দাকে একটা মেসেজ করলাম -"পৌঁছে গেছি "
কিছুক্ষন পরে ওপার থেকে প্রশ্ন এলো -"কোনো অসুবিধা হয়নি তো? "
"না শুধু..."
বাকিটা লেখার আগেই উল্টোদিকে থেকে সুধাংশু দা লিখলো -"আবার ছায়ামূর্তি?!"
হাসলাম বটে তবে সেটা সুধাংশু দা শুনতে পেল না। শুধু লিখলাম -"হ্যাঁ।জীবন্ত মূর্তির ছায়া....... "
ভূতের সাথে বাস করতে করতে এখন ভূতের ভয়টাই কেমন যেন কেটে গেছে কিন্তু এই সমাজেরই কিছু লোককে এখনো ভয় হয়। এতো বছর একই সমাজে আছি, তবু কেন জানিনা,তাদের যেন ঠিক চিনে উঠতে পারলাম না!
ছায়া শব্দটাকে যতই অন্ধকারের সাথে রেসোনেট করানো হোক না কেন আলো ছাড়া যেমন ছায়ার কোনো অস্তিত্ব নেই, তেমনই এই ধরণের নিঝুম রাতে
লোলুপ বিকৃত মস্তিষ্কের পুরুষালি হাত ছাড়া ধর্ষণের কোনো অস্তিত্ব নেই।
[লেখাটিতে কোথাও গল্প কথকের নাম না জানানোর একটাই উদ্দেশ্য- এই গল্পটি কোনো একটি মাত্র মেয়ের জীবনের ঘটনা নয়। পেশায় শুধু প্যারানরমাল সায়েন্টিস্টরাই নয়, ডাক্তার, পুলিশ, প্রফেসর, টিচার, ইঞ্জিনিয়ার,উকিল, হাউস ওয়াইফ সবাই কখনো না কখনো এমন জীবন্ত মূর্তির ছায়া দেখেছেন। কেউ হয়তো পার পেয়েছেন আবার কেউ হয়তো পাননি। সকল নারী জাতির প্রতীকী এই গল্পের গল্প কথক।]
--------নলিনী

