মৌমাছি
মৌমাছি
পর্ব এক :
"মা.......বাবার একটা হালকা মাফলার আর তোমার একটা শাল নিয়ে নিও। প্রয়োজন হলে পড়বে নয়তো খুলে রেখে দিয়ো। "
"বিয়ে বাড়িতে যা ভীড়.....গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা হবে। এখন ঠান্ডাটাও তেমন নেই। তোমার বাবার ঠান্ডার বাতিক জানোইতো, এর মধ্যে ওই মোটা সুট প্যান্ট পড়লে গরম লাগবে না বলো? কিন্তু না...... ওনার ঠান্ডা লাগছে।কিছুতেই বোঝাতে পারছি না। "
মৌমিতা হেসে উত্তর দিলো -"আচ্ছা ঠিক আছে আমি দেখছি। "
বছর দুই হলো মৌমিতার বিয়ে হয়েছে।মিশুকে না হলেও মিশতে খুব একটা অসুবিধা হয়না ওর, তাই এ কদিনেই সবাইকে একেবারে আপন করে নিয়েছে। বাড়ির জনসংখ্যা অবশ্য কম। মাত্র চার। মৌমিতা, ওর হাসব্যান্ড শুভ্র এবং শুভ্রর বাবা, মা। দু তরফের যৌথ উদ্যোগে আজ দু তরফ মিলেলিশে একাকার হয়ে গেছে। মাঝের অচেনা, অপরিচিত পরিবেশের দূরত্বটুকু কমতে কমতে শূণ্যে বিলীন হয়ে গেছে অজান্তেই। এর কৃতিত্ব কিন্তু দু তরফেরই প্রাপ্য। এক তরফা দায়িত্ব, ভালোবাসায় পৃথিবীতে আজ অবধি কোনো সম্পর্ক টেঁকে নি, আর ভবিষ্যতেও টিঁকবেনা। দু দিকের সমান দায়িত্ব বোধ, এবং মানিয়ে ও মেনে নেওয়ার মানসিকতার জয় হয়েছে বারে বারে।
মৌমিতা এবং শুভ্র দুজনেই চাকরিজীবি।সেই সক্কাল বেলায় বেরিয়ে যায় দুজনেই। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে। কখনো মৌমিতা আগে ফেরে তো কখনো শুভ্র আবার অনেকসময় একসাথেই। যেদিন যেমন পরিস্থিতি। বাড়িতে শুভ্রর মা এবং অবসরপ্রাপ্ত বাবা একাই থাকেন প্রায় সারাদিন।শুধু রাতটুকু জমজমাট। চার সদস্যের ছোট্ট এই পরিবারে এই সময়টাই যেন সবথেকে আনন্দের।বাড়ি ফিরতি পথে মৌমিতা বা শুভ্র এক একদিন সুবিধামতো বাজার হাট সেরে নেয়, আর বাকি কাজের জন্য একজন বেতনপ্রাপ্ত মহিলা আছেন। ওই দশটা-সাড়ে দশটা নাগাদ এসে সব কাজ সেরে আবার বেরিয়ে যায় ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই।
এইভাবেই বেশ কেটে যাচ্ছিলো দিনগুলো। হাসি, মজা, ভালোবাসার মাঝে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিল সকলে। দেখতে দেখতে প্রায় দু বছর কেটে গেছে । সামনের মাসের এগারো তারিখেই দু বছর পূর্ণ হবে। দু বছরে, এতটা আপন হওয়া যায়? কেজানে?হয়তো যায়, আবার হয়তো না।
শুভ্রর এক দূরসম্পর্কের মাসতুতো বোনের বিয়ে উপলক্ষে আজ মৌমিতাদের বাড়িতে হৈহৈ কান্ড।একটু টিপটপ হয়ে যাওয়াটা বাঞ্চনীয়, নয়তো শুভ্রর মায়ের মুখ ছোটো হবে। বাঙালি বিয়ে বাড়িগুলো ক্ষাণিকটা এরকমই। অধিকাংশ লোক পাত্র পাত্রী কে আশীর্বাদ করতে নয় বরংচ অনেকদিন পরে নিজের চেনা জানা লোকজনদের সাথে আলাপ করার হেতুই বিয়ে বাড়ি মুখো হয়। এর মধ্যে আবার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপারটাই বাদ গেল। নিজেদের বর্তমান পরিস্থিতি। কখনোই কাউকে বলতে শোনা যাবে না 'ভালো আছি', সবসময় শুধু 'ওই চলছে ', কিন্তু কাজে কর্মে, সাজগোজে, হাবভাবে ভালো থাকার পরিমানটা দেখানো আবশ্যক।
রাত সাড়ে আটটার সময় বিয়ে বাড়ির গেটের মুখে এসে পৌঁছলো মৌমিতারা। লাল ফুল, গোলাপি ফিতে দিয়ে গেটটা সাজানো। গেটের একদম মধ্যিখানে, মাথার দিকে একটা বিশাল বড়, লাল চকচকে কাগজে মোরা ,হার্ট আকারের পিচবোর্ডের উপর দুটো নাম লেখা।আজকের বর-কনে।এক ঝলক বোর্ডটার দিকে তাকালো মৌমিতা। সোনালী অক্ষরে স্পষ্ট করে লেখা 'SRILEKHA WEDS BIPRODIP' । নামগুলো পড়ে সামান্য হেসে, শুভ্র আর বাকিদের সাথে ভীতরে চলে গেল।
ভীতরে ঢুকতে না ঢুকতেই শুভ্রর মায়ের বয়েসী একজন মহিলা এসে শুভ্রর মাকে জড়িয়ে ধরলেন।
"এতক্ষনে আসার সময় হলো?তা না এলেই পারতিস। বোনঝির বিয়েতে এতো রাত করে কেউ আসে? কোথায় ভেবেছিলাম সকাল বেলাতেই দেখা পাবো,তা না ...... যাক গে যাক......জামাইকে দেখেছিস? কথা হয়েছে? "
"শুভ্র আর মৌমিতার তো অফিস ছিল। ওরা এসে একটু বসবে, ফ্রেশ হবে তবে না আসবো? আর একা আসার কথা ছেড়েই দে। হাঁটুতে যা ব্যথা...... তোর জামাইবাবুকে তো চিনিস,ছেলে বৌমা ছাড়া একপা নড়বে না।কী করবো?একটু দেরি হয়ে গেল।বিয়ে কদ্দুর? বসে পড়েছে? "
"বসে পড়েছে মানে? কখন হয়ে গেছে সবকিছু...... "
"এ বাবা....... "
"এখন আর এবাবা ওবাবা করতে হবে না। যা গিয়ে মেয়ে জামাইকে দেখে আয় আগে......... "- বলেই ওই মহিলা শুভ্রর বাবার দিকে ফিরে একগাল হেসে জিজ্ঞেস করলেন -"ভালো আছেন জামাইবাবু? "
শুভ্রর বাবাও হেসে উত্তর দিলেন -"হ্যাঁ ওই চলছে..... বয়েস হচ্ছে,এখন যেমন থাকে সকলে সেরমই আছি।তোমাদের খবর সব ভালোতো? "
"আর ভালো..... এতো দেরি করে এলে কী আর ভালো থাকা যায়? "- জোর করে বিকট একটা শব্দ সহযোগে হাসলেন দুজনেই।
"এইতো আমাদের শুভ্রর বৌ? সেই বৌভাতের পর আজকে দেখলাম। চিনতে পারছোতো এই মাসিমনিকে? "
চিনতে না পারলেও মাথাটা হ্যাঁবাচক নাড়াতে হবেই। নয়তো বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতে হবে। মৌমিতাও তাই ডানদিক বাঁদিক মাথা নাড়িয়ে হেসে উত্তর দিলো -"হ্যাঁ। চিনতে পারবো না কেন? খুব পেরেছি। আপনারা সবাই ভালো আছেন তো? "
"ওই চলছে মা....... " - আর কথা বাড়ালেন না মহিলা। বিয়ে বাড়ির ভীতর দিকে একবার তাকিয়ে শুভ্রর মাকে ভীতরে আসার আরো একবার নিমন্ত্রণ জানিয়ে নিজেও ভীতরে চলে গেলেন।আজ উনি বড় ব্যস্ত। মেয়ের বিয়ে বলে কথা!
খানিকক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে মৌমিতারাও ভীতরে চলে গেল।চারিদিকে শুধু চাকচিক্য। কোথাও সরলতার একটুও জায়গা নেই। শুভ্র এবং মৌমিতাকে নিয়ে শুভ্রর মা বর-কনের বসার জায়গার দিকে এগিয়ে গেলেন। শুভ্রর বাবা একটু দূরত্ব বজায় রেখে,দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখলেন।
"মাসীমণি ভালো আছো? "-কনে প্রণাম করতে করতে জিজ্ঞেস করলো।
"ভালো আছি মা...... বাহ্ কী সুন্দর লাগছে..... "- কথাটা শেষ করতে করতেই বরটিও টুপ করে শুভ্রর মাকে প্রণাম করলো।শুভ্রর মা এবার জামাইয়ের দিকে ফিরে তাকালেন। বেশ লম্বা, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ গায়ের রঙ। দেখতে খারাপ নয়। ভালোও বলা যায়।
"কী সুন্দর মানিয়েছে..... সুখে থাকো, ভালো থাকো।"- হাতের গিফটটা কনের হাতে দিয়ে দিলেন শুভ্রর মা। কনে সেটি নিয়ে পাশে বসে থাকা মেয়েটির হাতে দিয়ে দিলো।
এরপরে শুভ্রও খানিকক্ষন ওর বোন এবং বোনের বরের সাথে কথা বলে,মৌমিতাকে আলাপ করিয়ে দিলো বিপ্রদীপের সাথে। বিপ্রদীপ ডান হাত টা করমর্দনের জন্য বারিয়ে দিলে, মৌমিতাও হেসে করমর্দন করে।তবে এ হাসি প্রাণখোলা নয়, কিরম যেন ফেকাশে। জোর পূর্বক হাসি। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে মৌমিতা বেশ অনেকটা সময় বিপ্রদীপের দিকে তাকিয়ে রইল। সেটা হয়তো কেউ খেয়াল করে নি, কিন্তু মৌমিতার হঠাৎ এই বদলটা চোখ এড়ায়নি শুভ্রর।হঠাৎ করে মৌমিতার এই চুপ করে যাওয়াটা শুভ্রর মা বাবাও খেয়াল করেছেন। তবে বিয়ে বাড়িতে এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন কেউ করেনি। সবটা বাড়ির জন্যে তুলে রেখেছে।
মোটামুটি সকলের সাথে দেখা করে, খাওয়া দাওয়া সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা বেজে গেল মৌমিতাদের। সকলেই ক্লান্ত। কোনোক্রমে জামাকাপড় পাল্টে, মুখ হাতটা ভালো করে ধুয়েই সকলে বিছানায় গাটা এলিয়ে দিলো।সেই রাতেই ঘুমাতে যাওয়ার আগে শুভ্র মৌমিতাকে প্রশ্ন করে - "তোমার হঠাৎ কী হলো বলতো? "
"কী হলো? "- ভ্রু কুঁচকে মৌমিতা শুভ্রর দিকে তাকায়।
"তখন শ্রীর বরের সাথে দেখা করে ওরম চুপ হয়ে গেলে কেন? তুমি কী ওকে চেন নাকি? "
"জানি না। আমার ঘুম পেয়েছে। "- বলেই পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো মৌমিতা। শুভ্র খানিকক্ষণ মৌমিতার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেও পাড়ি দিলো ঘুমের রাজ্যে।
পর্ব দুই :
ফোনের অ্যালার্মটা বন্ধ করতে খাট থেকে নেমে টেবিলের কাছে উঠে গেল মৌমিতা।ওর ঘরে অর্থাৎ ওর এবং শুভ্রর ঘরের এক কোনে একটা ছোটো স্টাডি টেবিল আছে। তার উপরে শুভ্র এবং ওর দুজনেরই কিছু বই, ফাইল রাখা সাইড করে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে এই টেবিলে ফোনটা রেখে যায় রোজ রাতে।
আওয়াজ করে করে ফোনটা কাঁপছে টেবিলের উপর। ফোনটা হাতে নিয়েই অ্যালার্মটা নিভিয়ে দিল মৌমিতা।সকাল সাড়ে ছটা। বাঁ হাতটা ঘাড়ে ক্ষাণিক ঘষে, মাথাটা একবার পিছনে,একবার ডানদিকে, একবার বাঁদিকে নাড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে জানলার কাছে সরে দাঁড়ালো। পর্দাটা অল্প একটু ফাঁক করে একবার নীল আকাশটার দিকে তাকানোর চেষ্টা করলো। যদিও স্বচ্ছ, প্রানোচ্ছল আকাশটাকে এখন ইচ্ছে হলেই দেখা যায় না। বাঁধ সাজে আশপাশের অতিকায় পাহাড় সমান লম্বা বাড়িগুলি।তবু রোজ সকালে উঠে আকাশটাকে একটু দেখতে ইচ্ছে করে। সূয্যি মামাকে, রাঙা জামা পড়ে দেখতে ইচ্ছে করে ছোটবেলার মতো।
ছোটবেলায় মর্নিং স্কুলে পড়তো মৌমিতা। স্কুল যাওয়ার পথে রোজ একবার করে আকাশের দিকে তাকিয়ে সূর্যকে দেখাটা অভ্যেস ছিল।এখনও হয়তো সে অভ্যেসটাই রয়ে গেছে।
হঠাৎ সময়ের কথা মনে পড়তেই মৌমিতা ঝটপট পর্দাটা আবার টেনে দিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে নিয়ে, রান্নাঘরের টুকটাক জলখাবারের কাজটা সেরে, দু কাপ চা খাবারের টেবিলের উপর এসে রাখলো। শুভ্রর মা এবং বাবা একে একে নিজেদের কাপ হাতে তুলে নিলেন।
এক হাতে আনন্দবাজার পত্রিকাটা ধরে, অন্য হাত দিয়ে চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে এনে সশব্দে একটা চুমুক বসালেন শুভ্রর বাবা।শুভ্রর মাও চায়ের কাপে চুমুকটা দিয়ে, শুভ্রর বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন - "জামাই বেশ ভালোই হয়েছে বলো?কী সুন্দর কথাবার্তা...... মিশুকে আছে। দেখতে শুনতেও ভালো। শ্রীর সাথে বেশ মানিয়েছে। "
শুভ্রর বাবা কাগজের দিকে তাকিয়েই কোনো উৎসাহ না দেখিয়ে, শুষ্ক উত্তর দিলেন - "হুম"।
এদিকে শুভ্রর মা বলেই চলেছেন -"বাড়িটাও ভালো পেয়েছে। বেশ পরিষ্কার পরিছন্ন....... খাবার গুলোও ভালোই ছিল বলো? শুধু মাংসটা একটু শক্ত। কিন্তু খেতে ভালো........ "
"হুম"
আবার একটা বেরসিক উত্তরে, শুভ্রর মা এবার একটু ক্ষুন্ন হলেন।মুখটা নীরব শ্রোতা,মৌমিতার দিকে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন -"কাল খাবার ভালো লেগেছিলো? "
মৌমিতা মাথাটা নাড়িয়ে উত্তর দেয় -"হ্যাঁ ভালোই ছিল "
মনমতো একটা উত্তর পেয়ে শুভ্রর মা এবার নড়েচড়ে বসে।হেসে মৌমিতাকে জিজ্ঞেস করে -"কাল শ্রীর গলার হারটা, দেখেছিলে?ও বাড়ি থেকে দিয়েছে শুনলাম। "
"লম্বাটা? "
"হ্যাঁ........ "
মায়ের একের পর এক গয়না সংত্রান্ত কথাবার্তায় অতিষ্ট হয়ে, বাবা চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরে চলে গেলেন খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে।কিন্তু তার ভ্রুক্ষেপ মাত্র করলেন না মা। নিজের তালে বলেই চলেছেন। মৌমিতাও মাঝে মাঝে যোগ দিচ্ছে তবে সেটা একেবারেই সৌজন্যতার খাতিরে। গয়নাগাটি সংক্রান্ত কথায় ওরও খুব একটা মাথা ব্যথা নেই।তবে মারও তো বয়েস হয়েছে, সারাদিন প্রায় একা একা থাকেন। কথা বলার মানুষের সংখ্যাও কম।তাই যতটা সম্ভব ওনাকে অ্যাকম্পানি করার চেষ্টা করে।
ঘড়ির ছোটো কাঁটাটা আটটার ঘরে যেতেই মৌমিতা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।শুভ্রও ইতিমধ্যে ঘুম থেকে উঠে, চা খেয়ে বাথরুমে গেছে স্নানে। ও বেরোলেই মৌমিতা স্নানে ঢুকবে।সাড়ে নটার মধ্যে বেরোতে হবে অফিসের জন্যে।ঘরে গিয়ে জামা কাপড় বের করতে করতেই, শুভ্র বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে।মৌমিতা ঢুকতে যাবে ঠিক তখনই শুভ্র প্রশ্ন করে -"মন ভালো হয়েছে? "
বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, শুভ্রর দিকে তাকায় মৌমিতা।
"মন আবার খারাপ কবে হলো, যে ভালো হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করছো? "
"কাল যা মুখ বানিয়ে রেখেছিলে বিয়ে বাড়িতে! মন ভালো থাকলে নিশ্চই ওরম ভাবে ঘুরে বেড়াতে না।"
মৌমিতা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে।
"ম্যাডামের মন খারাপের কারণটা জানতে পারি কী?"
মৌমিতা হেসে উত্তর দিলো -"অপমানিত হয়েছি তাই "
"কে করেছে? কই আমিতো কিছু বুঝতে পারিনি। আমাকে আগে বলা উচিৎ ছিল তোমার। "
"আরে তুমি যেমন ভাবছো সেরম কিছু নয়। এতো হাইপার হচ্ছো কেন? কাম ডাউন। কেউ কিছু বলেনি। "
"এই মাত্র বললে অপমান করেছে,আবার এখন বলছো কেউ কিছু বলেনি! তুমি ঠিক আছো তো? "
"কিছু না বলাটাই অপমানজনক। তুমি বুঝবে না।ছাড়ো "
শুভ্র ভ্রু কুঁচকে মৌমিতাকে জিজ্ঞেস করলো -"আমি বুঝবো না তো,কে বুঝবে শুনি? আচ্ছা কার কিছু বলার কথা ছিল,সেটাতো বলবে?"
অস্ফুটে শুধু -"বিপ্র" নামটা উচ্চারণ করলো মৌমিতা। কিন্তু নামটা হয়তো শুভ্রর কান অবধি পৌঁছালোনা।
পর্ব তিন :
চোখ বন্ধ করে,হাত জোর করে একদল ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে, স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে সকালের প্রার্থনা সঙ্গীত গাইছে। যদিও প্রার্থনা সংগীতটি ইংরেজি ভাষায়;কনভেন্ট স্কুল।
মাঠটা বেশ বড়। মাঠের তিন দিকে সারিসারি ঝোপ। মাঝে মাঝে কিছু ফুলের গাছ। গাছের গোড়াগুলো জাল দিয়ে ঘেরা। কুড়িটা বাহারি ফুলের এক একটা বড় বড় গাছের দায়িত্ব এক একটা ক্লাস কে দেওয়া আছে ।সপ্তাহের পাঁচ দিন,সোম থেকে শুক্র, এই গাছের দায়িত্ব সেই ভারপ্রাপ্ত ক্লাসের। বাকি দুটো দিন স্কুল ছুটি থাকে। ওই দিনগুলোর জন্য আলাদা মালির ব্যবস্থা করে রেখেছে স্কুল কতৃপক্ষ।
........দা পাওয়ার অ্যান্ড দা গ্লোরি,
ফর এভার অ্যান্ড এভার.......
চোখটা আসতে আসতে খুললো মৌমিতা। ওর ক্লাস অর্থাৎ ক্লাস ফাইভের লাইন,মাঠের গেটের কাছে দাঁড়িয়েছে। ওরাই সবার থেকে জুনিয়র। ক্লাস যত উঁচু হয়েছে, মাঠে তাদের দাঁড়ানোর জায়গাটা আরো ভীতর দিকে চলে গেছে।
চিরকালের শান্তশিষ্ট মেয়ে মৌমিতা। লেখা পড়াতেও ভালো। কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকাই ওকে অপছন্দ করে না।সবারই গুড বুকে ওর নাম বিরাজমান।
বসন্ত ঋতুর, উষ্ণ স্পর্শে, ফুল গুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে তখন । চতুর্দিকে রঙ বেরঙের বাহারি ফুল। ভ্রমর, মৌমাছিদের আনন্দের সীমা পরিসীমা নেই। ভন ভন করে এ ফুল থেকে ও ফুলে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে মনের সুখে।
মাঠের ফুলের গাছগুলোতেও বেশ কয়েকটা মৌমাছি এসে বসেছে। মাঝে মাঝে উড়ছে। এর ওর তার নাকের ডগার কাছ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা দুটো , আর বেশির ভাগেরই শরীরটা এক অজানা আতঙ্কে কম্পিত হচ্ছে। কিন্তু কেউ তা স্বীকার করে না। পাছে বন্ধুদের কাছে মজার পাত্র হয়ে উঠতে হয়, সেই ভয়ে। মৌমাছি চট করে তার হুল ফোঁটায় না, কিন্তু ঠাট্টা তামাশা যখন তখন তার হুলটা ফুঁটিয়ে দিতেই পারে।মানুষের জিহ্বার হুলের জ্বালা-যন্ত্রণা মৌমাছির হুলের তুলনায় অনেক বেশি।
চোখটা খুলতেই নাকের কাছে একটা মৌমাছি দেখে, ছিটকে পিছনে চলে যেতে চায় মৌমিতা। কিন্তু হায়!ওর পিছনে যে লাইন দিয়ে আরো অনেকে দাঁড়িয়ে আছে প্রার্থনার জন্যে, সেটা সে মুহূর্তে ও ভুলেই গেছিলো।দু পা পিছনে যেতেই, ওর পিছনে দাঁড়ানো ওরই এক ক্লাসমেটের পায়ের সাথে পা জড়িয়ে, হুমড়ি খেয়ে মাটির উপর পড়ে দুজনেই ।সাথে একটা শব্দ -"আঃ..... "। তবে সে শব্দ তখন চাপা পড়েছে, আশপাশের সকলের অট্টহাস্যে।সকলে, বিশেষ করে ওর ক্লাসের ছেলেরা,দুলে দুলে হেসে উঠছে।মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। মুখ টিপে হাসছে অনেকেই। পাশের ক্লাস সিক্সের লাইনের দিদিরাও হাসছে, হাসি চাপতে না পেরে।
মৌমিতা এবং ওর পিছনের মেয়েটি তখনও ভেবাচেকা খেয়ে মাটির উপর বসে আছে। লজ্জায় দুজনেরই মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। কিছুতেই তাকাতে পারছে না কারোর দিকে। সে মুহূর্তে ওদের উদ্ধার করতে ওদের ক্লাস টিচার এগিয়ে আসেন।
"হোয়াট হ্যাপেনড?ওয়াই ইস এভরিওয়ান লাফিং ইন দা অ্যাসেম্বলি ?"- বেশ কড়া স্বরে ছেলেদের উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলেই মৌমিতাদের দিকে ফিরে তাকান উনি।
"ওহ.....গেট আপ মাই গার্লস "
কনুইটা ঘষতে ঘষতে মৌমিতা উঠে দাঁড়ায়। ওর পিছনের মেয়েটিও উঠে দাঁড়িয়ে, স্কার্টটা থেকে ধুলো ঝেড়ে নেয়।
"হাউ ডিড ইউ ফল ডাউন? ইস ইওর হেলথ ফাইন? "
কাঁপা কাঁপা স্বরে মাথা নীচু করে মৌমিতা উত্তর দেয় -" ইয়েস ম্যাম। আই ওয়াস টেররিফায়েড বাই আ বি। আই স্ট্যাম্বলড আপন হার ওয়াইল এসকেপিং অ্যান্ড উই বোথ ফেল ডাউন। আই অ্যাম ভেরি সরি ফর মাই ডিড। "
উনি এবার পিছনের মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করেন -"আর ইউ অল রাইট?"
"ইয়েস ম্যাম" - মেয়েটি উত্তর দেয়।
মৌমিতাদের ম্যাডাম এবার মুচকি হেসে মৌমিতাকে বলেন -" সো অ্যাফ্রেইড অফ আ বি?! ইট উইল নট হার্মা ইউ মাই চাইল্ড, অনলেস ইউ ডু সো। "
মৌমিতা মাথা নীচু করে সবটা শুনে যায়। মাথা তুলে তাকাবার ক্ষমতা ওর নেই। ম্যাডামের কথায় ছেলেরা সামান্য হেসে উঠলে উনি ছেলেদের -"সাইলেন্স আই সে!" - বলেই আবার নিজের জায়গায় ফিরে যান।
মৌমিতার জীবনের সবথেকে লজ্জাজনক ঘটনাগুলোর তালিকায় এই ঘটনাটি এখনও জ্বলজ্বল করে।সেদিনকার সেই ছোট্ট বয়েসের লজ্জাজনক ঘটনাটা এখন মনে পড়লে অবশ্য হাসি পায় মৌমিতার। কী ভীতুটাই না সে ছিল!ওর এই উদ্ভট কাণ্ডর জন্য, বন্ধুদের কাছে কম কথা শুনতে হয় নি ওকে। মজার পাত্র তো হতেই হয়েছে এমন কী ওর নামটা পর্যন্ত বন্ধুরা রেখে দিয়েছিলো 'মৌমাছি '। 'মৌমিতা' নামটার সাথে 'মৌমাছি' শব্দের সাদৃশ্য এবং সেদিনের সেই ঘটনাই এর মূল কারণ।
কিন্তু এই 'মৌমাছি' নামটার পিছনেও একজন নাটের গুরু আছে।মৌমিতার এক সহপাঠী ছাত্র। 'মৌমাছি' নামটা তারই দেওয়া। পরে সেই নাম দাবানলের মতো সকলের মুখে মুখে ঘুরে বেরিয়েছে।
প্রথম প্রথম শুনতে খুব খারাপ লাগতো, কষ্ট হতো, লজ্জায় মাথাটা হেঁট হয়ে যেত কিন্তু যত সময় এগিয়েছে এই নামটার মধ্যেই বন্ধুত্ব, ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছে সকলে।আসতে আসতে 'মৌমাছি' নামটাই কেমন যেন আপন হয়ে গিয়েছিলো মৌমিতার।
তারপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে মাঝে। মৌমিতা এখন চাকরি করছে, বিয়েও হয়ে গেছে কিন্তু 'মৌমাছি' নামটাকে এখনো ভুলতে পারেনি।মনের মধ্যে এই নামটা জলজ্যান্ত থাকলেও, এই নামে ওকে ডাকার লোকগুলো সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে নিজের নিজের জগতে।কারোর সাথেই এখন আর তেমন যোগাযোগ নেই। কথাও হয়না। দেখা সাক্ষাৎ অনেক পরের ব্যাপার।
বাড়ি ফিরতি পথে রাস্তার ধারে, ফুটপাথের কটা শুখনো ফুল দেখে কথাগুলো মনে পড়লো মৌমিতার। পুরোনো, ছোটবেলার মধুর স্মৃতিগুলো একের পর এক পাল্টাতে পাল্টাতে যখন বাস্তবে এসে পৌঁছালো, যখন বুঝতে পারলো 'মৌমাছি' নামটা ওর চিরতরে হারিয়ে গেছে,তখন একটা ক্লান্ত দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়া আর কোনো কথা মুখ দিয়ে বেড়োলো না।
শীতকাল প্রায় শেষের দিকে।কিন্তু ফুটপাথের গাছগুলো এখনও ন্যাড়া। কিছু মরশুমি ফুল ফুটে আছে গাছে, তবে হালকা উষ্ণতায় শুকিয়ে গেছে কয়েকটা। অল্প অল্প ঘাস গজিয়েছে মাটিতে। এবার তবে বসন্তের পালা!দূরে আড়ালে অবাধ্য ছেলের মতো লুকিয়ে পরে,বসন্ত উঁকি মারছে যে মাঝে মাঝে!
পর্ব চার :
যুগ পাল্টেছে। সাথে সাথে পাল্টেছে মানুষের ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষা,ভালোলাগা।তবে বদলায়নি উৎসব,পাল্টায়নি ঋতুচক্র।
চারিদিকে হলুদ,সবুজ,লাল আরো কত রঙ। শীতের শেষে জেগে ওঠা ছোটো ছোটো কুঁড়িগুলো এখন সসম্মানে প্রস্ফুটিত।আকাশে বাতাসে মিষ্টি গন্ধের ছড়াছড়ি।প্রজাপতিগুলো সদ্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘুম ভাঙ্গা শিশুর মতো আনন্দে আত্মহারা।আবিরের গন্ধ যেন কোথা থেকে ভেসে আসছে নাকের কাছে।
আকাশটা আজ স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ।ছেঁড়া ছেঁড়া তুলোর মত কিছু ধপধপে মেঘ, আকাশের বুকে ভেসে আসছে ঢেউয়ের মতো,ওই দূরদিগন্তের সংবাদ নিয়ে।এক শালিক দেখে নিমিষেই চোখটা বন্ধ করে, দু শালিকের খোঁজে মন চলে যাচ্ছে অনেকের।শান্তিনিকেতন একটু একটু করে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে। ফুল, রঙ, আনন্দের উৎসবে মেতে উঠেছে বিশ্বভারতী।পলাশ ফুলে ছেয়ে গেছে গাছের ডাল। মৌমাছিরা আনন্দের তরঙ্গে ভেসে ভেসে চলেছে তাদের নিত্য সন্ধানে।
চারিদিকে শুধু, শুধুই রঙের মেলা।শুধুই মনের বন্ধ, বদ্ধ অন্ধকার কূপগুলো নানা রঙে রাঙিয়ে নেওয়ার পালা।
কাল দোল পূর্ণিমা।মৌমিতার দু বাড়িতেই অর্থাৎ বাপেরবাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি, দু জায়গাতেই, পূর্ণিমায় সত্য নারায়ণ শিলার, পূজার চল আছে। বিয়ের পর থেকে নিজের বাড়ির পুজোতে যাওয়া আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ বাড়ির কাজকর্ম, পুজো শেষ করে ও বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে, ও বাড়ির পুজো শেষ! সকাল বেলাটা তাই এ বাড়িতেই কাটিয়ে,বিকেল বিকেল মৌমিতা এবং শুভ্র পাড়ি দেয় ও বাড়ির উদ্দেশ্যে। সারাটা সন্ধ্যে মৌমিতার বাপের বাড়িতে কাটিয়ে, রাত্রের ডিনার সেরে, রাতের দিকে আবার বাড়ি ফিরে আসে।অনেক সময় শনি-রবি পড়লে থেকেও যায় এক রাত।তবে পরেরদিন অফিস থাকলে ফিরে আসতেই হয়।
অফিস ফেরতা পথে দশকর্মার জিনিসগুলো কিনে মিষ্টির দোকানে ঢুকলো মৌমিতা।কালকের পুজোর মিষ্টি এবং কিছু ওবাড়ি নিয়ে যাওয়ার। কাউন্টারের একজন কর্মচারী টপাটপ কটা তালশাঁস আর নরম পাকের সন্দেশ, দুটো আলাদা আলাদা চৌকো প্যাকেটে পুরে, নিখুঁত ভাবে ইলাস্টিক রাবারব্যান্ড দিয়ে বাক্সগুলো এঁটে, এপারে চালান করে দিলেন। সাথে একটা মুখ সিল করা প্লাস্টিকের অথচ বড় কাঁচের গ্লাসের মতো দেখতে একটা পাত্র। তাতে বেশ কিছু রসে চোবানো নরম তুলতুলে রসগোল্লা দেখা যাচ্ছে।মাটির ভাঁড়ের রসগোল্লার প্রচলন সেই কবেই উঠে গেছে। এখন এটাই রসগোল্লার নতুন ডেস্টিনেশন ও ডেসটিনি। মৌমিতা খসখসে দুশো টাকার একটা নোট বার করে ধরিয়ে দিল ওনাকে। কিছু ফেরত পেল ওতরফ থেকে। ফেরত পাওয়া টাকাটা পার্সের মধ্যে ঢুকিয়ে, কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বার করে তার মধ্যে মিষ্টির প্যাকেটগুলো ভরে সোজা হাঁটা লাগালো বাড়ির উদ্দেশ্যে।
দোকান থেকে বেরিয়ে সাত আট পা এগিয়েছে কি এগোয়নি,অমনি ব্যাগের ভেতর থেকে ফোনের রিংটোনটা কানে ভেসে এলো। ডান হাতের প্যাকেটটা বাঁ হাতে ধরে,একহাতে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে কানের কাছে ধরলো।
"হ্যাঁ মা..... বলো...... "
"তুমি কী বাড়ির কাছে এসে গেছো? "
"না। এই মিষ্টির দোকান থেকে বেরোলাম। এবার বাড়ির দিকেই যাচ্ছি। কেন? বাড়িতে কিছু হয়েছে? "- বেশ উৎকণ্ঠিত শোনায় মৌমিতাকে।
শুভ্রর মা ওপার থেকে উত্তর দেন -"না না। অনিতা দির মেয়ে আর জামাই আসবে আজকে। ফোন করেছিল। তুমি মিষ্টির দোকানের কাছেই আছো তো? "
"হ্যাঁ....... "
"তাহলে আসার সময় দু রকমের, দুটো দুটো চারটে মিষ্টি নিয়ে এসো, কেমন? "
"হ্যাঁ ঠিক আছে। কিন্তু..... কে আসবে বললে? "
"অনিতা দির মেয়ে জামাই। ওই ক'দিন আগে যাদের বিয়েতে গিয়েছিলাম না? "
" ও শ্রীলেখা আর বিপ্র..... দীপ। "
"হ্যাঁ হ্যাঁ..... শ্রী আর ওর বর। "
"আচ্ছা ঠিক আছে। দু রকমের মোট চারটে মিষ্টি নেবো তাহলে আরো।রাখছি এখন।"
"হ্যাঁ সাবধানে এসো "
"আচ্ছা"
মৌমিতা ফোনটা কেটে দিলো। মুখের উপর ভেসে থাকা পাতলা হাসির রেখাটাও ফোন কাটার সাথে সাথে মিলিয়ে গেল।মনে মনে একটা হতাশা ওকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।সবটাই বিপ্রর জন্য।যদি ওই কাজটা ও না করতো,তাহলে হয়তো এতো দোটানা,এতো হতাশার কোন প্রশ্নই উঠতো না। সত্যিটা আজ না হোক কালকে সবাই জানবেই। তখন সবটা সামলানো যাবে তো? নিজেকে সামলাতে পারবে তো?তবে আদতে সত্যি কোনটা? যেটা ও এতগুলো বছর ধরে বিশ্বাস করে এসেছে অনুভব করে এসেছে সেটা? না যেটা প্রচলিত, সেটা?
জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে উল্টো পথে হাঁটা শুরু করলো মৌমিতা।আশে পাশে ফুটপাতে অনেক অস্থায়ী দোকান মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।হরেক রকমের আবির,জল রঙ, পিচকিরি আর রাক্ষসের মত দেখতে মুখোশ নিয়ে নাড়াচাড়া করছে, হঠাৎ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়া পথচলতি মানুষ। কিছু কিছু দোকানে সিল করা প্যাকেটে, আয়ুর্বেদিক স্কিন ফ্রেন্ডলি আবির উঁকি মারছে।তবে ও আবির আমজনতার ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের সান্ত্বনা সেই লুজ,চকচকে আবিরেই।
বাড়ি পৌঁছে মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলের উপর রেখে, মৌমিতা শুভ্রর মাকে উদ্দেশ্য করে বললো -"ছোটো বাক্সে শ্রীলেখাদের মিষ্টিগুলো আছে। বাকিগুলো ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিও। "
শুভ্রর মা টেবিল থেকে মিষ্টির প্যাকেটটা হাতে তুলে নিলেন। ভীতর থেকে বড় প্যাকেটটা বার করে ফ্রিজে ঢোকাতে ঢোকাতে মৌমিতার দিকে না তাকিয়েই বললেন -"এখন একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও। ওদের আসতে একটু দেরি আছে। "
বোতলের ছিপিটা খুলে বেশ অনেকটা জল ঢক ঢক করে ঘিটে নিয়েছে মৌমিতা। জল খেয়ে বোতলটা আবার যথাস্থানে রেখে মার দিকে তাকালো।
"কখন আসবে? "
"সন্ধ্যের পরেই.... "
"কিছু করতে হবে? "
"না ওরাতো সকালেই ফোন করেছিল, মিনি রান্না বান্নাটা করে দিয়েই গেছে।" - মৌমিতাকে একবার আপাদমস্তক দেখে আবার বললেন -"অনেক ঘুরে ঘেরে এসেছো, এবার রাস্তার জামাকাপড় ছেড়ে, হাত পা ছড়িয়ে একটু বসো তো। একটু পরেই সবাই চলে আসবে, তখন কিন্তু চাইলেও উঠে যেতে পারবে না। যতটুকু যা আছে আমি করে নেবো। এ ভাবে বসিয়ে রাখলে তো জং ধরে যাবে কল কব্জায়।নাকি? "
মৌমিতা হেসে উত্তর দিল -"ঠিক আছে যাচ্ছি। কিছু দরকার হলে বলো। "
জামাকাপড় ছেড়ে, চোখে মুখে জল দিয়ে, মাকে একবার উঁকি মেরে দেখে এসেই বিছানায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিল মৌমিতা। চোখটা বন্ধ করে কপালের উপর বাঁ হাতটা রেখে যথাসম্ভব আরাম পাওয়ার চেষ্টা করলো।
সারাদিনের পরিশ্রমের পর দেহটা ক্লান্ত কিন্তু মস্তিষ্কটা এখনও যথেষ্ট সজীব। সকল আলোচনা, চিন্তার মধ্যেও আজকে বারবার একটাই নাম মাথার মধ্যে ভেসে আসছে। সেই নামটাকে কেন্দ্র করে সকল স্মৃতী, সকল হাসি-ঠাট্টা-রাগ-দুঃখের মুহূর্তগুলো চোখের সামনে ছায়াছবির মতো ফুটে উঠছে একে একে। আর তার সাথে সাথে অতীত আর বাস্তবের মধ্যেকার গন্ডিটা উচ্চ থেকে উচ্চতর হয়ে উঠছে। এতো হাসাহাসি, এতো কথা বলাবলির কী তবে এই শেষ পরিণতি? অজান্তেই মুখ থেকে 'বিপ্র' নামটা বেরিয়ে গেল মৌমিতার।
উল্টোপাল্টা চিন্তা ভাবনা থেকে নিজেকে বিরত রাখার সবথেকে সহজ পদ্ধতি,গানের সুরে নিজেকে হারিয়ে ফেলা। মৌমিতাও তাই করলো। ফোনটা খুলে প্রথম যেটা চোখে পড়লো ইউ টিউবে, সেটাই টিপে দিল। একটার পর একটা রবীন্দ্রনাথের বসন্ত পর্যায়ের গান বেজে চলেছে মৌমিতার ফোনে। আওয়াজটা খুবই ক্ষীণ। পাশের ঘরের কারোর সেটা শুনতে পাওয়ার কথা নয়। রবীন্দ্রসঙ্গীত ক্ষীণ আওয়াজেই যেন শুনতে বেশি ভালো লাগে। চোখ দুটো বন্ধ করে, আসতে আসতে কানে ভেসে আসা রবীন্দ্রসঙ্গীতের আওয়াজটা প্রত্যেকবারই মৌমিতার মনটাকে শান্ত করে দেয়।
আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি.........
.........চিনি তোমায় চিনি, নবীন পান্থ........
ঘরের দরজার কাছে একটা আওয়াজ হতে মৌমিতা চোখ মেলে তাকালো।
"এই সময় শুয়ে আছো যে? শরীর ঠিক আছে তো? "
মৌমিতা বিছানার উপর উঠে বসে উত্তর দেয় -"একটু টায়ার্ড লাগছিলো। এই ফিরলে? "
হাতের ঘড়িটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে, শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে আয়নায় মৌমিতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে শুভ্র।
"তোমার এই রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি ফ্যাসিনেশনটা খুব আনকমন।এখন যেখানে লোকে লগ্নজিতার 'বসন্ত এসে গেছে ' নিয়ে মাতামাতি করছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তুমি............. তবে ব্যপারটা আমার বেশ ভালোই লাগে।পুরোনোদিনের ঐতিহ্য আর গাম্ভীর্যপূর্ণ প্রেমের স্বাদটা কিছুটা হলেও তো অনুভব করতে পারি। "-শুভ্রর মুখের হাসিটা দেখে মৌমিতাও খিল খিল করে হেসে উঠলো।
পর্ব পাঁচ :
একটুকু ছোঁয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি....
তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী........
শুভ্র হাত মুখ ধুয়ে, জামা কাপড় ছেড়ে বিছানাতে বসতেই মৌমিতা ফোনে বাজতে থাকা গানটা নিমেষে বন্ধ করে দিল।সোজা হয়ে বসে পিঠের উপর পরে থাকা লম্বা,ঘন কালো কেশরাশিকে একত্রিত করে একটা হাত খোঁপা করে নিলো।
"বন্ধ করে দিলে কেন?"
"এমনি....... "
"আমার ভালো লাগছিলো "- বলেই মৌমিতার ফোনটা চোঁ মেরে টেনে আবার গানটা চালিয়ে দিল শুভ্র।
মৌমিতা শুভ্রর দিকে ফিরে তাকাতেই ঠোঁটের কোনে একটা স্মিত হাসির রেখা ঝিলিক দিয়ে উঠলো।একটা হাত মাথার নিচে রেখে, আধ শোয়া হয়ে, খাটের মাথাটায় হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখ দুটো বন্ধ।খুব মন দিয়ে গানটাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে হয়তো।এ স্বভাবটা শুভ্রর আগে ছিল না, তবে ইদানিং হয়েছে।
"এই স্বভাবটা কী আমার সাথে থেকে থেকে পেলে নাকি? "- মৌমিতা হাসি মাখা কণ্ঠে প্রশ্ন করলো শুভ্রকে।
শুভ্র ভ্রু উঁচিয়ে মৌমিতার দিকে তাকালো, যার অর্থ -"মানে? "
শুভ্রর নীরব প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে শুধু মৌমিতার হাসিটা শোনা গেল। শুভ্র একবার চোখ মেলে , মৌমিতার দিকে তাকিয়েই আবার চোখ বন্ধ করে নিলো পরক্ষনে।
"কত স্বভাবই তো পাল্টে গেল..........এইটুকু শুধু চোখে পড়লো তোমার?"- শুভ্রর চোখগুলো এখনো বন্ধ। ভাবলেশহীন ভাবে, কোনো নড়াচড়া না করেই মৌমিতাকে উদ্দেশ্য করে বললো।
"হুম.... আগের স্বভাব সম্বন্ধে খুব একটা ওয়াকিবহাল নই কিনা....... "
গানটা বন্ধ করে তেড়েমেড়ে খাটের উপর উঠে বসলো শুভ্র।
"দিলেতো গানটার বারোটা বাজিয়ে......."
"আমি আবার কী করলাম? "
"না কিছু না...... কিছুই করোনি। শুধু একটু মিথ্যে বলেছো। "
"মিথ্যে? "
"তুমি আমাকে ক'বছর চেন? বিয়ের আগেও তো চিনতে। স্বভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই মানেটা কি?"
"ওই ক'বছরে কী সব জানা যায়?দশ বারো বছরেও মানুষকে চিনতে পারা যায় না!আর এতো কটা মাত্র বছর....... "
"চেনা যায় না বলছো?তাহলে আমি এক্সসেপশনাল তাইতো? "
মৌমিতা হেসে মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো।
"আমি কিন্তু শ্রীর বিয়ের দিন দেখেই বুঝেছিলাম ম্যাডামের মন খারাপ...... কিন্তু কারণটা....... "
শ্রীলেখার বিয়ের সমস্ত ঘটনা একের পর এক মাথার মধ্যে তার সুপ্ত অস্তিত্ব জানান দিতেই, মনটা আবার ভার হয়ে গেল মৌমিতার। মুখে হাজার না মেলা অঙ্কের হিসেব, তার কালো ছায়া বিস্তার করে চলেছে অবিরত।
"আবার কী হলো?"
মৌমিতা নিরুত্তর। ওতরফ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে, শুভ্র অধৈর্য হয়ে আবার প্রশ্ন করলো।
"কী হলো? শ্রীর বিয়ের কথা শুনলেই অমন আনমনা হয়ে যাও কেন বলতো? "
"প্রেম, ভালোলাগা, আসক্তি এসব কী বন্ধুত্বে বাঁধা দেয় শুভ্র?কখনো কী সেটা সম্ভব?"
"মানে? হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন ? "
মৌমিতার ক্লান্ত দীর্ঘনিঃশ্বাসে ঘরের পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠলো।
"শ্রীলেখার হাজব্যান্ড বিপ্র মানে তোমাদের বিপ্রদীপকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনি শুভ্র......"
"তুমি শ্রীর হাজব্যান্ডকে চেন? কিন্তু সেদিন তো কিছু....? তোমরা দুজনেই তো কিরম অপরিচিতর মতো.......... তোমার কোনো ভুল হচ্ছে না তো মৌমিতা?
"উঁহু "
"কীকরে? মানে কিভাবে চেন? "
"সে বলতে গেলে এখন অনেক কিছু বলতে হয়.......এখুনি ওরা চলে আসবে। সে সময় কোথায়? পরে বলবো।কত কথা, কত স্মৃতী, কত ছেলেমানুষি.......কিন্তু সেটার শেষটা যে এরম হবে, ভাবতে পারিনি। তাই হয়তো মনটা খারাপ হয়ে গেছিলো......"
"সেদিনকে বিপ্রদীপই তাহলে কিছু বলেনি বলে....? "
"হুম। খুব অপমানজনক। "
শুভ্র অনেক্ষন মৌমিতার দিকে নীরবে তাকিয়ে থেকে আসতে আসতে বললো -"তোমাদের মধ্যে কী কিছু......? "
তিলমাত্র সময় নষ্ট না করে মৌমিতা উত্তর দিল -"না। আর থাকলেও এতদিনে তুমি.......... "
"নিশ্চই জানতাম। তাহলে ? "
"জানিনা...... আমি নিজেও জানিনা শুভ্র। ওকে মনে প্রাণে বন্ধু মেনেছিলাম কিন্তু ও কী ভেবেছিলো আমি জানিনা। বন্ধুত্বে ছেলে মেয়ে হয় নাকি? আমার ওপেন বেহাভিওরকে হয়তো অনেকেই ভুল বোঝে। তবে ভুলটা কী সত্যিই আমার শুভ্র? আর প্রেম যদি এসেও থাকে তবে বন্ধুকে কী সেটা সাহস করে বলা যায় না? আর .........." - অভিমানগুলো এখন শুকিয়ে গিয়ে তার অস্তিত্ব ভুলেছে। পরে আছে শুধু আফসোস। তাই গলাটা ধরে আসছিলো মৌমিতার।
"বলতে চাইছো বিপ্রদীপ তোমাকে ভালোবাসতো তাইতো?"
"জানি না। কটা ইললজিকাল অ্যাস্যাম্পশনের উপর ভিত্তি করে এটা কী বলা যেতে পারে? আর সত্যিই আমি চাই না এই নিয়ে কোনো ঝামেলা হোক। বিপ্রকে আমি যতদূর চিনি কাউকে ভালোনাবাসলে তার সাথে সারা জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত ও নিতো না। শ্রীলেখাও অবশ্যই এটা বুঝবে। তবে সবাই কী বুঝবে?আগের দিন আমিও কথা বলতে চেয়েছিলাম তবে বলিনি তার প্রথম কারণ রাগ। আমাকে না বলে আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য, আর দ্বিতীয় কারণ সমাজ.......... একটার পিঠে একটা কথা উঠলে অনেক কথা উঠতো।তাই......."
"ভালো করেছো। দরকার নেই সবার জানার। আমাদরে চার জনের ভেতরেই থাক।ছোটবেলার একটা সামান্য বিষয়......"
"হুম। আমারও তাই মত। যেখানে সত্যিইটাই ঝাপসা সেখানে এটা নিয়ে কথা বাড়ানোর কোনো অর্থ নেই।"
দরজায় বেলের আওয়াজটা ঘরের ভীতরে বসেও শুনতে পেল মৌমিতা এবং শুভ্র। একে অপরের দিকে একবার মুখ চাওয়া চায়ি করে শুভ্র আসতে আসতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে, মৌমিতাকেও আসতে বলে গেল তাড়াতাড়ি। না দেখলেও ওরা দুজনেই জানে দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা সত্য।
"তোমরা সবাই কেমন আছো মণি? "
"আর চলছে রে মা..... তোরা সবাই ভালো তো?মা বাবার শরীর কেমন আছে?"
"ভালো আছে মণি....... দাদাভাইইই......... " - বলেই একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে শুভ্রর দু হাত চেপে ধরলো শ্রীলেখা। চোখে মুখে ছেলেমানুষি ভরা হাসি।ছোটবেলায় এই ভাই বোনে মিলে কতই না একসাথে সময় কাটিয়েছে, আনন্দ করেছে, সারা বাড়ি দাপিয়ে বেরিয়েছে কিন্তু আজ সবই কেমন যেন ম্লান; চাকচিক্য হীন।বড় হতে হতে ছোটবেলার আচরণগুলো সব বদলে গেছে। এখন শুভ্রর থেকে কান মোলা কিংবা চাঁটি উপহার পাওয়া আর সম্ভব নয়। একে অন্যের ঘাড়ের উপর উঠে মারামারি করাও সম্ভব নয়।আমাদের সমাজের চোখে ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে যতটুকু শোভনীয়, যতটুকু মার্জনীয় ততটুকুই আগলে ধরে রেখেছে দুজনে।
"কীরে তোর কী ব্যাপার বলতো? পাত্তাই পাওয়া যায় না বাবুর!"
"আমার আর কী ব্যাপার? আপনাদের নিউলি ওয়েডস দের কথা বলুন। কী কেমন চলছে বিপ্রদীপ?"
"একদম পারফেক্ট "
কথাটা শেষ হতে হতেই বিপ্রদীপ এবং শুভ্র উভয়েই সশব্দে হেসে উঠলো।খুব স্বল্প সময়ের পরিচয়েই বেশ গভীর হৃদ্যতা তৈরী হয়েছে দুজনের মধ্যে।সু-ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বলাই বাহুল্য।চিরকালের মিশুকে বিপ্রদীপের কাছে এ অবশ্য খুবই সাধারণ ঘটনা ।কথা বলতে এবং লোকের সাথে মিশতে বিপ্রদীপের জুড়ি মেলা ভার।তার পরিচয় মৌমিতা ওর জীবনে এর আগেও পেয়েছে।তবে আজকে শুভ্র আর বিপ্রদীপকে জড়াজড়ি করে হাসতে দেখে কোনো এক অজানা আনন্দে ওর মনটা দুলে দুলে উঠছে।ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা তার প্রমাণ বহন করে বেড়াচ্ছে অবিরত।
সবটা দূরে থেকে, আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখেছে মৌমিতা।আনন্দিতও হয়েছে, কিন্তু সামনে গিয়ে কথা বলার অভিপ্রায় হয়নি।বিপ্রর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তির ন্যায় ব্যবহার করার মতো ক্ষমতা কিংবা ইচ্ছা কোনোটাই ওর নেই। যতটা সম্ভব এড়িয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করছে।তবে সামনে তো যেতেই হবে।অতিথি বলে কথা!বাড়ির শোভনীয়তা বজায় রাখা বাঞ্ছনীয়।
জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে দ্রুত রান্নাঘরে ঢুকে গেল মৌমিতা।টুং টাং শব্দ সহকারে কিছু কাঁচের থালা, বাটি, গ্লাস বের করে তাতে মিষ্টি আর বাড়িতে ভাজা নিমকি সাজিয়ে, ট্রেতে রেখে বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।মনের মধ্যে অনেক দোলাচাল, অনেক অভিমান কে পাশে ঠেলে মুখে একটা মিষ্টি হাসি টেনে আনলো, ঘরে ঢোকার আগে।
"ভালো আছো তো শ্রীলেখা? " - ট্রেটা সেন্টার টেবিলে রাখতে রাখতে মৌমিতা বললো।
"হ্যাঁ ভালো আছি গো।তুমি কেমন আছো? "
"আমি দিব্বি আছি। " - আড়চোখে অজান্তেই বিপ্রর দিকে চোখটা চলে গেল ওর। সোফার হ্যান্ডেলে বাঁ হাতটা রেখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। মুখে অস্বাভাবিকতার কোনো ছাপ নেই। একেবারে নিখাদ আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠছে ওর বসার ভঙ্গিমায়। মুখে বিদ্রুপপূর্ণ হাসি।জানিনা এটাকে কী বলা চলে তবে বিপ্রর মুখের ওই বিদ্রুপপূর্ণ হাসি দেখে সর্বাঙ্গ রাগে রিরি করে উঠলো মৌমিতার। কিছুটা অস্বস্তি, কিছুটা অস্বাভাবিকতা থাকলে সেটা অন্তত মৌমিতার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হতো বলে মনে হলো।
"এখন কলকাতাতেই আছো তো? নাকি অন্য প্ল্যান আছে?" - শুভ্র বিপ্রদীপকে প্রশ্ন করলো।
"আপাতত তো এখানেই আছি। শ্রীর চাকরিটাও এখানেই। সুতরাং শিফটিং এর কথা এখন ভাবছি না। যদি ভালো অফার পাই ভবিষ্যতে তখন ভেবে দেখবো। শ্রী যদি চাকরি ম্যানেজ করতে পারে, যদি ট্রান্সফার নিতে পারে একই শহরে তবেই........নয়তো এখানেই ভালো আছি।"
"হ্যাঁ সেই........দুজনেই চাকরি করলে এটার তো একটু খেয়াল রাখতেই হবে।এখানে তবু তোমার বাবা মা আছেন।অন্তত ভবিষ্যতে তোমাদের ছেলে মেয়েরা দাদু-ঠাকুমার সান্নিধ্যটাতো পাবে।" - শুভ্রর মা বললেন।
"এখন তো সব চাকরি নিয়ে বাইরে.... একা একা। বাবা মা বেরিয়ে গেলেই বাচ্ছাদের সেই ক্রেস কিংবা আয়াই ভরসা। ফ্যামিলি কালচার, আইডেন্টিটি বলে আর কিচ্ছু থাকবে না বুঝলে বিপ্রদীপ? সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। কাছে পিঠে থাকলে তবু মা বাবার একটা বল ভরসা থাকে। বিদেশে থাকলে কী আর খোঁজখবর নেওয়া যায় সবসময়?" - শুভ্রর বাবার স্বরে ক্ষোভ স্পষ্ট প্রকাশিত।কিছু মাস আগে অস্ট্রেলিয়ায় একটা ভালো অফার পায় মৌমিতা। শুভ্রও হয়তো ট্রান্সফার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় যেতে পারে কিছু বছরের জন্য।সাধারণতই একটু খারাপ লাগলেও ছেলে বৌমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে সবটা মেনে নিয়েছিলেন দুজনে। এভাবেই হয়তো নিজের বক্তব্যটা শুভ্রর সামনে রাখার চেষ্টা করলেন উনি।
"ভালোই তো। যদি আমাদের নেক্সট জেনারেশন সমস্ত কালচারকে সমান দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শেখে, তাহলে তাতে তো সমগ্র মানব জাতির মঙ্গল। আর মেসোমশাই......বাবা মাকে যে দেখবে সে দেখবেই। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসে থাকলেও ঠিক দেখবে। আর যে দেখবে না, সে একই বাড়িতে একই ছাদের নিচে থেকেও দেখবেনা। তার মানে আমি অবশ্য অন্য কিছু বলতে চাইছি না। মানে আমি সাপোর্ট ও করছি না আবার বিরোধিতাও করছি না। সবেরই তো ভালো খারাপ থাকে তাই না? "
শুভ্রর বাবার মুখে অবজ্ঞা ভরা হাসি ফুটে উঠলো।এ হাসিতে বিষাদ, কষ্ট, ভালোলাগা সবই মিশে আছে।
কিছুক্ষন এইভাবেই এলোমেলো কথা আর পুরোনো স্মৃতিমন্থনের মধ্যেই কাটলো সকলের। শুভ্র আর শ্রীলেখার ছোটবেলার ঘটনাগুলো শুনে মৌমিতা হেসে উঠলো মাঝে মধ্যে। বিপ্রদীপকেও নব বিবাহিতা স্ত্রীর বাল্যকালের গল্পে বেশ উৎসাহী দেখালো।কিন্তু এতো হাসাহাসি, ঠাট্টার মধ্যেও একটা চাপা উত্তেজনা ঘিরে ধরে আছে ঘরে বসে থাকা দুই ব্যক্তিকে। হয়তো বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব হচ্ছে না,তবে ভীতরে ভীতরে দুজনেই চাইছে চিৎকার করে নিজেদের মনের কথাটা বলে উঠতে। কথার ফাঁকে ফাঁকে বিপ্র বারবার মৌমিতাকে দেখেছে। হয়তো মেলানোর চেষ্টা করেছে ছোটবেলার সেই বব কাটের চুল ওলা শান্ত গম্ভীর মেয়েটার মুখটার সাথে বাস্তবের মুখটাকে মেলাতে। দুই মুখের মধ্যে ফারাক বিস্তর তবে মনটা একই রয়ে গেছে।নয়তো এখনও বাচ্ছাদের মতো এতো অভিমান মৌমিতার!এখনও এতটা রেগে আছে ওর উপর?!এতো বছর পরেও? সবটা ছেলেমানুষি বলে এখনও উড়িয়ে দিতে পারেনি!
শ্রীলেখার আওয়াজে হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেল বিপ্র।
"দাদাভাই..... বাড়ির পিছনে এখনো সেই লাল পলাশের গাছটা আছে রে? ছোটবেলা কত ফুল কুড়িয়েছি দুজনে মনে আছে? "
"সে আর মনে নেই....... খুব মনে আছে। "
"হ্যাঁ সে তো থাকবেই। নিজে বেশিরভাগ টপাটপ কুড়িয়ে নিতিস আর আমাকে একটাও দিতিস না। "
"সত্যিই দিতাম না? " - শুভ্র ভ্রু কুঁচকে শ্রীর দিকে তাকালো।
"কত কাকুতিমিনতি করতে হতো আমাকে.... আমি না তোর ছোটো বোন। "
মৌমিতা হেসে উঠলো সশব্দে।
"সে গাছ এখনও আছে শ্রীলেখা। দেখবে? "
মৌমিতার প্রস্তাবে শ্রীলেখার চোখগুলো জ্বলজ্বল করে উঠলো হঠাৎ।
"হ্যাঁ অবশ্যই দেখবো। চলো চলো।মণি, মেসো আমরা একটু ছাদ থেকে আসছি হ্যাঁ? " - বলেই মৌমিতার হাত ধরে টানতে টানতে ছাদে নিয়ে আসলো শ্রীলেখা। শুভ্র আর বিপ্রও পিছন পিছন আসলো ওদের।
"ছাদের এই দিকটায় রেলিং কবে বসলো রে দাদাভাই? "
"সে অনেকদিন। যেটা করতে এসেছিস আগেতো সেটা কর। নাহলে কিন্তু আমি আবার সব কুড়িয়ে নেবো। "- শুভ্র হাসতে হাসতে শ্রীলেখার দিকে এগিয়ে গেল। দুজনে নীচু হয়ে পলাশ ফুল কুড়োচ্ছে। মৌমিতা আর বিপ্রদীপ কাছেই দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে আর হাসছে।হঠাৎই বিপ্র গলা নামিয়ে বললো -
"মৌমিতা....."
চকিত হয়ে মৌমিতা বিপ্রর দিকে ফিরে তাকালো। চোখে এক রাশ প্রশ্ন।
"চিনতে পারছিস আমাকে? "
খুব গম্ভীর স্বরে মৌমিতা উত্তর দিল -"হুম "
উত্তরটা শুনে বিপ্র হয়তো ক্ষাণিকটা দমে গেল। বেশ খানিকক্ষণ পরে নীরবতা কাটিয়ে আবার প্রশ্ন করলো- " কেমন আছিস? "
"ভালো "
পরপর দুটো নিরস উত্তর পাওয়ার পরে মৌমিতাকে আর প্রশ্ন করার সাহস হলো না বিপ্রদীপের। কিন্তু ক্ষাণিকটা আবেগপ্রবণ হয়েই বলে ফেললো -"বিয়ের দিন কত বছর পর তোকে দেখলাম মৌমিতা। কিন্তু ঠিক করে কথাও বলতে পারলাম না তোর সাথে।"
"কথা বলার ইচ্ছা থাকলে,ঠিকই পারতিস। ইচ্ছে ছিল না তাই পারিসনি।কিছুক্ষণ আগে তুইই বললি না কথাটা? "
লজ্জায় নিজের মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো বিপ্র।
"এখনও রেগে আছিস আমার উপর? "
বিপ্রর এই প্রশ্নে আগুনে ঘি পড়লো একপ্রকার। মৌমিতা চিরকালের শান্ত,ভদ্র তবে সহ্যেরও কিছু সীমা আছে।
রাগত দৃষ্টি নিয়ে একবার বিপ্রর দিকে তাকালো,পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বললো -"সেটাই কী স্বাভাবিক নয় বিপ্র?কী ভেবেছিলিস?তোর ওই স্টুপিড ডিসিশনে আমি খুব খুশি হবো?আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবো? "
" আই অ্যাম রিয়েলি সরি মৌমিতা। বিলিভ মি আমার মনে হয়েছিল তুই এমব্যারাস্ড ফিল করছিস। তাই আমি....... "
"তাই তুই বিনা নোটিসে বেপাত্তা হয়ে গেলি, আমাকে ইগনোর করতে শুরু করলি,আমার সাথে দূরত্ব তৈরী করা শুরু করলি। কী তাই তো?"
"একদম ঠিক "
"তোর একবারও মনে হলো না,আমার মতামতটা তোর নেওয়া প্রয়োজন?একবারও আমার ভাবনাটা জানার প্রয়োজন বোধ করলি না? চারটে বাইরের লোক কী বললো না বললো তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না বিপ্র।লোকে বলতেই পারে।লোকের স্বভাব বলা। একটা ছেলে একটা মেয়ের সাথে আলাদা করে কথা বললেই সেখানে প্রেমের গন্ধ পায় সকলে। আমাদের সমাজটাই এমন। কিন্তু আমরা তো জানতাম আমরা একে ওপরের কাছে কী। তাহলে? আমার কতটা খারাপ লেগেছিলো তোর কোনো ধারণা আছে?নিজেই যেন নিজের কাছে হেরে যাচ্ছিলাম। একটা সময়তো আমারও মনে সন্দেহ হচ্ছিলো যে লোকের কথাগুলোই হয়তো ঠিক।তুই হয়তো সত্যি সত্যিই আমাকে শুধুমাত্র বন্ধুর চোখে দেখতিস না....... "
"না মৌমিতা বিশ্বাস কর। আমি সত্যি বলছি। এমন কোনো অনুভূতি আমার ছিল না।থাকলে আমি অবশ্যই তোকে বলতাম।"
"তাহলে তোর ওই হঠাৎ ইরি হয়ে যাওয়ার কারণটা বোঝাবি আমায় দয়া করে? " - মৌমিতার চোখ দিয়ে অভিমান ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
"আমাদের সব বন্ধুরাই ভাবতো আমরা একটা অ্যাফেয়ারে আছি।হয়তো তুই বিশ্বাস করবি না কিন্তু শ্রীলেখা কে চেনার পরেও আমাকে কৌস্তভরা তোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে ছাড়েনি।এমনকি আমার মা আর দিদিও ভাবতো যে আমরা..... তোকে যখন তখন ডিসটার্ব করতো সকলে।বন্ধুদের মাঝে অপ্রস্তুতে পরতে হতো।আমি চাইনি আমার জন্য তোকে কেউ ডিসটার্ব করুক। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই........ "
"কী? বাধ্য হয়ে আমার সাথে মেশা বন্ধ করলি, লোককে এটা প্রমাণ করার জন্য যে আমি তোর প্রেমিকা নই।ঠিক বললাম তো? "
"হুম........ "
মৌমিতার ক্লান্ত দীর্ঘনিঃশ্বাসের আওয়াজে পরিবেশটা থমথমে হয়ে উঠলো।
"সে মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই!"
"অনেকটা ওই রকমই বলতে পারিস " - বিপ্রর উত্তর।
মৌমিতা মাথাটা ডানদিক বাঁদিকে নাড়িয়ে অসম্মতি প্রকাশ করল।
"একবারও আমার সাথে এই বিষয়ে কথা বলা যেত নাকি বিপ্র? আমরা দুজনে মিলে ঠিক একটা না একটা সমাধান বার করে নিতাম।আর লোকে কী বলছে তাতে কী যায় আসে? আমাদের বন্ধুত্বের থেকে লোকের কথাকে বেশি দাম দিলি শেষমেশ?"
"ভুল করেছি। অনেক বড় ভুল করেছি।আমি জানি ব্যপারটা অন্যভাবে সামলানো যেত, কিন্তু তখন কী আর ওতো শত বুঝেছি ? তখন মনে হয়েছিল যেনোতেনো প্রকানরেনো এই ইস্যুটা সল্ভ করা প্রয়োজনক। কতই বা আর বয়েস ছিল? সবেমাত্র আঠেরো।ঝোঁকের মাথায়,রাগের মাথায় যেটা ঠিক মনে হয়েছিল করেছিলাম।ওই বয়েসে পিয়ার প্রেসার আর রিউমারের ওয়েইটটা হয়তো বেশি ছিল তখন।একবার প্লিজ ক্ষমা করে দে মৌমিতা।আর রেগে থাকিস না প্লিজ।একদিনের একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের এতো বছরের বন্ধুত্বটা নষ্ট করে দিস না। আমি জানি তুই এটা চাস না।"
"একদিনের ভুল সিদ্ধান্ত? আচ্ছা....... তাহলে তোর বিয়ের দিনের আচরণটা ভুলেই গেলি দেখছি! তোর বিয়েতে আমাকে কনেপক্ষের নিমন্ত্রিত হয়ে যেতে হবে আমি স্বপ্নেও এটা কল্পনা করতে পারিনি । তার উপর তুই সেদিন আমার সাথে যা ব্যবহার করলি তারপরে তোর সাথে এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলা তো দূর, আমার তোর সাথে দেখা করাই উচিৎ নয়। শুধুমাত্র তুই আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় বলে সবটা সহ্য করে যাচ্ছি এখনও। আমাকে চিনতেই পারলি না! একেবারে স্ট্রেঞ্জার বানিয়ে দিলি আমাকে?!"
মৌমিতার এতগুলো অ্যাকুইজিশনে বিপ্রর ঘাবড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল তবে তাতো হলোই না উপরন্তু জোরে জোরে হেসে সারা বাড়ি মাথায় তোলার উপক্রম করলো বিপ্রদীপ।ভাই বোন জুটি দু মুঠো পলাশ ফুল তুলে ওদের দুজনের কাছে এসে দাঁড়ালো।
"পাগলের মতো হাসছো কেন? কী হলো? " - শ্রীলেখা চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করলো।
"তোমার বৌদি খুব রেগে গেছে আমার উপর শ্রী......."
বিপ্রদীপের এমন উত্তর শ্রীলেখা মোটেও আশা করেনি।কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে।
"কী হয়েছে মৌমিতা? " - শুভ্ররও প্রায় আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা।
"কিছু না"
"আমি বলছি শুভ্র দা।আমি বলছি।" - হাসির চোটে সারা শরীর দুলছে বিপ্রর।
"মৌমাছিকে অনেকদিন ভনভন করার সুযোগ দিইনিতো। তাই দারুণ রেগে গেছে।"- কথাটা শেষ করে বিপ্র, মৌমিতার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।
" আর শোন আগের দিন আমার তোকে ফেস করতে ভয় করছিলো, বুঝলি?যা রেগে আছিস আমার উপর!সবার সামনে তখন প্রেস্টিজের ব্যাপার হয়ে যেত।তাই চেপে গেছিলাম।"
বিপ্রর এতগুলো কথার মধ্যে একটা শব্দ শুনেই মৌমিতার কানটা আঁটকে গেছে।'মৌমাছি'।নামটা শুনে চট করে বিপ্রর দিকে ঘুরে তাকালো মৌমিতা।
"তোর মনে আছে বিপ্র? "
"মনে আবার থাকবেনা? তোর সেই প্রেয়ারে মৌমাছি দেখে চিৎপটাং হওয়াটা!আমিই তোর নাম দিয়েছিলাম মৌমাছি, আর আমিই ভুলে যাবো? "
মৌমিতা হেসে উঠলো আনন্দে।মুখের অভিমান আর রাগগুলো সব হয়তো 'মৌমাছির' ভয়ে পালিয়ে গেছে দূরে কোথাও।এখন আসে পাশে আর একটুও অস্বস্তি নেই, ভুল বোঝা বুঝি নেই।যতটুকু অভিমান নিজের বুকের মধ্যে পুষে রেখেছিলো মৌমিতা আজ সেই সবকিছুই চুকেবুকে গেছে নিজের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্বটা খুঁজে পাওয়ার আনন্দে।
মানুষের জীবনে কত মানুষ, কত পরিস্থিতি আসে যায়। তবে থেকে যায় কিছু স্মৃতী,কিছু মুহূর্ত আর কিছু নাম। অপরিচিত সেই নামের ভিড়ে চেনা নামগুলো, চেনা অস্তিত্বগুলো বড্ড আপন, বড্ড প্রিয়। সেগুলোকে আঁকড়ে ধরেইতো মানুষ বেঁচে আছে সব দুঃখ কষ্ট ভুলে।
*******সমাপ্ত*******
[এই গল্পে 'বন্ধুত্ব' নামক সম্পর্কটাকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি মনে প্রাণে। ব্যাকগ্রউন্ডে আরো অনেক সম্পর্ক এসেছে গল্পের নিরিখে।
বর্তমানে দাঁড়িয়ে প্রেম প্রণয় ব্যাতিত ছেলে-মেয়ের সম্পর্কগুলো কেমন যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। সবেতেই প্রেম প্রেম ভাব। চেয়েছিলাম অন্যরকম স্বাদ দিতে গল্পটিতে কারণ সব সম্পর্কেরই একটা গুরুত্ব, একটা অধিকার কিছুটা প্রয়োজন জীবনে থেকেই যায়।]
