একটি ভূতুড়ে বাড়ি
একটি ভূতুড়ে বাড়ি
ছোটো থেকেই আমার ভূত দেখার ইচ্ছা ছিল আর এডভেঞ্চার করার। যেই বাড়ির থেকে বেরিয়ে যেতে বলল অমনি বেরিয়ে পড়লাম এডভেঞ্চার এ। কোথায় যাব আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। ট্রেন থেকে নেমে সোজা বনের পথ ধরে হাটতে থাকলাম ,ফোনের ম্যাপ লোকেশন দেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
ঘন বনের মধ্যে যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি ততই যেন বন আরও গভীর ও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। কখন থেকে বনের মধ্যে হেঁটে চলেছি ঠিক নেই! ক্রমেই সন্ধ্যা নেমে এলো। বনের পথে নিজের পায়ের চলার আওয়াজ ও বন্য প্রাণীর ডাক ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। ফোনের চার্জও প্রায় শেষ হয়ে আসছে। যে বাড়ির খোঁজে এখানে এসেছিলাম সেই বাড়ির কোথাও নাম চিহ্ন খুঁজে পেলাম না।
মনে মনে ঠিক করলাম বনের মধ্যে এভাবে ঘোরা ঠিক হবে না ,কোনো একটা পাথরের জায়গা দেখে সেখানেই রাতটা কাটাতে হবে।
সামনের দিকে এগোতেই ভয়ংকর আওয়াজে আমার পা কেঁপে উঠলো। পেছন দিকে এক নেকড়ে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। ক্রমে সেই ডাক আমার কাছে এগিয়ে এলো। ফোনের ফ্ল্যাশ নিয়ে যখন পেছন দিকে ঘুরে তাকায় তখন দেখি , একটা ক্ষুধার্ত নেকড়ে শেয়াল আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার হিংস্র দাঁত বেরিয়ে আছে ,শেয়ালটা মুখের লালা ঝরাতে ঝরাতে আমার দিকে এগোতে থাকলো। আমি আর বিন্দু মাত্র সময় নষ্ট না করে দৌড়াতে শুরু করলাম। আমার সাথে সাথে শেয়ালটাও আমার পেছনে তাড়া করতে শুরু করল।
আমি নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে দৌঁড়াতে শুরু করলাম। অন্ধকারের মধ্যে ঝোপ ঝাড় ভেঙে দৌঁড়াতে দৌড়াতে এক সময় হাঁফিয়ে উঠলাম।
পেছন দিকে ঘুরে দেখি কোনো শেয়ালই আমার পেছনে নেই। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম যেন। ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সামনের দিকে এগোতে গিয়ে দেখি একটা এক তলা বাড়ি।
বাড়ি দেখতেই মনটা আমার আনন্দে নেচে উঠলো। তারাতারি বাড়িটার কাছে গিয়ে দেখি বাড়িটার অবস্থা পুরো জরাজীর্ণ। বনের লতা বাড়িটার দেয়ালকে গুলোকে নিজেদের বশে করে নিয়েছে। জায়গায় জায়গায় ফাটল ধরেছে। আস্তে বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে ডাকলাম," কেউ কী আছেন বাড়িতে? "
কোনো জবাব এলো না। বেশ অনেকক্ষণ ডাকার পর যখন কেউ দরজা খুলল না তখন দরজাটা একটু ধাক্কা দিলাম। ধাক্কা দেওয়ার সাথেই দরজাটা অদ্ভুত আওয়াজ করে খুলে গেলো। দরজা খুলে যেতেই আমিও বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করি।
বাড়িতে প্রবেশ করার সাথেই দরজাটা আচমকা বন্ধ হয়ে গেলো। বাড়িটার মধ্যে বিরাজ করছে অন্ধকার , ফোনের চার্জ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। বলতে না বলতেই ফোন সুইচ অফ হয়ে গেল।
ফোন বন্ধ হওয়ার সাথেই বাইরে ঝড় বৃষ্টি শুরু হতে শুরু করেছে। আমার যত দূর মনে ছিল আকাশে কোনো মেঘ ছিল না তাও আচমকা ঝড় বৃষ্টি হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না।
সামনের দিকে এগোতে যাবো তখনই কিছুতে আমার ওয়া বেধে যায় আর আমি মুখ থুবড়ে পড়ে যাই। হঠাৎ বাড়িতে থাকা সমস্ত আলো জ্বলে উঠলো । আলো গুলো বারবার নিভছে আর জ্বলছে । বাইরে পর পর বাজ পড়ছে। সামনের জানলার দিকে তাকাতেই দেখি কেউ একজন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আস্তে আস্তে সে আমার দিকে আসতে থাকে। আলো নেভা জ্বলার মাঝেই মেয়েটিকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম। মেয়েটির এক পাশ সম্পূর্ণ আগুনে ঝলসে গেছে, সেই ঝলসে যাওয়া জায়গা থেকে মাংস গলতে শুরু করেছে। চোখ দুটো অসম্ভব সাদা। ঠোঁটে অজস্র কাটার দাগ, এক হাত কাটা পা দুটো উল্টো ভাবে ঘোরানো। পরনে থাকা সাদা ফ্রকটা জায়গায় জায়গায় রক্তে লাল হয়ে আছে। মেয়েটি এগিয়ে আসতে আসতে একদম আমার মুখের সামনে এসে দাড়ালো। মেয়েটি আমার কাছে দাঁড়িয়ে আমার গলা টিপে ধরলো।
" আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি!! ছেড়ে দাও আমাকে !"
মেয়েটি আচমকা আমাকে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিলো। মাথায় কিছুতে একটা আঘাত লাগার ফলে আমার চোখের সামনে ঘোর ঘোর হতে শুরু করে। মেয়েটি আমাকে ছেড়ে দিয়ে যন্ত্রণায় ভরা এক চিৎকার করে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলো। আস্তে আস্তে সেই আগুনে সম্পূর্ণ বাড়ি পুড়তে শুরু করলো। সাথে হয়তো আমিও......
জ্ঞান ফিরতেই দেখি আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। আমার জ্ঞান ফিরে আসতেই ডাক্তার এসে বললেন:- এখন কেমন আছো?
" একটু ভালো। আমি এখানে কী করে এলাম?"
ডাক্তার:- তোমাকে গ্রামের কয়েকজন মানুষ এখানে এনেছে। তোমাকে তারা বনের ঠিক মাঝখানে থেকে তুলে এনেছে।
" ওই বাড়িটা!!"
ডাক্তার:- তুমি যে বাড়িটার কথা বলছো , সেটা অনেক বছর আগেই পুড়ে গেছে। ওই বাড়িতে একটা পাগল বিজ্ঞানী থাকতো, ও বনের পশু পাখির ওপর পরীক্ষা করতেন সেই পরীক্ষা বদলে গেলো লোভে। পশু পাখির থেকে এবার মানুষ নিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করে। তুমি কাল রাতে যে মেয়েটাকে দেখেছিলে ওকে দিয়েই প্রথম পরীক্ষা শুরু করেছিল। আর ওটাই শেষ ছিল, মেয়েটিকে অজ্ঞান করে ওখানে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটির জ্ঞান ফিরতেই মেয়েটি ফিরে আসার জন্য ছটফট করতে থাকে কিন্তু ওই বিজ্ঞানী তাকে ছাড়ে না। মেয়েটির মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারে, চোখ দুটো খুবলে নেয়, পো দুটো কেটে ফেলে ,একটা হাতও কেটে নেয়। মেয়েটি আর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
" কী করে?"
ডাক্তার :- বিজ্ঞানী কিছু করার জন্য গরম জল করছিল এটা দেখেই মেয়েটি নিজের গায়ে কেরোসিন তেল দিয়ে আগুনের কাছে চলে যায় আর সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ে আগুন ধরে যায়। মেয়েটির গায়ে আগুন ধরার সাথেই সম্পূর্ণ বাড়িতে আগুন ধরে পুড়ে যায়। এর আগে যতজন ছেলে মেয়ে ওই বাড়িতে গিয়েছে তাদের কোনো আর হদিস পাওয়া যাই নি। তুমিই একমাত্র মেয়ে যে ওখান থেকে নিজের প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছ। তুমি এখন একদম ঠিক আছো, একটু পরেই তোমাকে ছেড়ে দেবো তখন তুমি বাড়ি চলে যেও।
জানলার দিকে একমনে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবতে থাকলাম।
সমাপ্ত
কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন।

