দুর্গা সহায়
দুর্গা সহায়
তারিখ: ৮ই মার্চ, ২০২৪।
সময়: রাত ১০:৩০ মিনিট।
দুর্গা ছিল আরজি কর বা নীলরতনের মতো কোনো এক হাসপাতালের শেষ বর্ষের নির্ভীক মেডিকেল ছাত্রী। গলায় স্টেথোস্কোপ আর হাতে একগাদা ডাক্তারি বই নিয়ে সে যখন ফিরছিল, তখন তার চোখে ছিল আগামীর স্বপ্ন। তার পরনে ছিল একটি সাধারণ নীল রঙের কুর্তা আর কপালে সেই বিখ্যাত লাল টিপ—যা তাকে এক শান্ত অথচ তেজস্বী রূপ দিত।
১. অতর্কিত আক্রমণ
পুরানো জুটমিলের সেই নির্জন মোড়টায় পৌঁছাতেই রাস্তার একমাত্র ল্যাম্পপোস্টটা কেঁপে উঠে নিভে গেল। অন্ধকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল চারটে জানোয়ার—যাদের সর্দার ছিল স্থানীয় প্রোমোটারের ডান হাত রতন। তারা শুধু তাকে লুট করতে আসেনি, তারা এসেছিল এক শিক্ষিত, স্বাধীন মেয়ের দম্ভ ভেঙে চুরমার করতে।
২. দুর্গার প্রতিরোধ (সিংহের মতো লড়াই)
দুর্গা ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলেনি। যখন রতন তার হাত ধরল, দুর্গা তার ভারী বইয়ের ব্যাগটা দিয়ে সজোরে রতনের নাকে আঘাত করল। রতনের নাক ফেটে রক্ত ছুটল। অন্য দুজন যখন তাকে জাপটে ধরল, দুর্গা নিজের নখ দিয়ে একজনের গাল চিরে দিল—সেই ক্ষতচিহ্ন আজও সেই লোকটার মুখে কলঙ্ক হয়ে আছে। সে চিৎকার করেছিল, কিন্তু সেই পরিত্যক্ত মিলের মরচে পড়া দেয়ালগুলো সেই চিৎকার গিলে নিয়েছিল।
৩. সেই অন্ধকার দুই ঘণ্টা
পশুগুলো দুর্গাকে হিঁচড়ে জুটমিলের ভেতরে নিয়ে গেল। সেখানে মেঝেতে পড়ে ছিল পুরোনো তেলের ড্রাম আর ভাঙা যন্ত্রপাতি। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা সেই পৈশাচিক অত্যাচারে দুর্গার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। তারা তার গলার ওড়নাটাকেই ব্যবহার করেছিল তার মুখ চাপা দিতে। যে স্টেথোস্কোপ দিয়ে সে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর স্বপ্ন দেখত, সেই জানোয়ারগুলো সেটা দিয়েই তাকে আঘাত করেছিল।
৪. শেষ মুহূর্ত ও দুর্গার শপথ
মরার আগে দুর্গা যখন শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছিল, তার চোখে জল ছিল না—ছিল এক জ্বলন্ত ঘৃণা। রতন যখন তার গলায় ওড়নার ফাঁসটা শক্ত করছিল, দুর্গা তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সেই অপলক চাহনি দেখে রতনও এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠেছিল।
দুর্গা মারা যাওয়ার ঠিক আগে জুটমিলের ভাঙা চাল দিয়ে আসা চাঁদের আলোর দিকে একবার তাকিয়েছিল। তার শেষ নিশ্বাসের সাথে সাথে যেন একটা নীরব অভিশাপ সেই জুটমিলের বাতাসে মিশে গিয়েছিল—"আমি আবার আসব।"
৫. বিচারের প্রহসন
পরদিন সকালে যখন দুর্গার নিথর দেহ উদ্ধার হয়, সারা শহর ফুঁসে উঠেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব আর টাকার জোরে রতনরা ঠিক সাত দিনের মাথায় জামিন পেয়ে গেল। সিসিটিভি ফুটেজ উধাও হয়ে গেল, আর সাক্ষীরা ভয়ে মুখ বন্ধ করে নিল। রতনরা ভেবেছিল তারা জিতে গেছে। তারা জানত না যে, ৮ই মার্চ দুর্গার মৃত্যু হয়নি—বরং এক সংহারক শক্তিদু-বছর পরের সেই অভিশপ্ত রাত
৬.আবার ফিরে এল ৮ই মার্চ।
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। অফিস থেকে ফিরছিল সায়ন্তনী। বাস না পেয়ে সে ভুলবশত জুটমিলের সেই ছোট রাস্তাটা ধরেছিল। হঠাৎ চারটে ছায়া তার পথ আগলে দাঁড়াল।
"কি রে? মনে পড়ছে আজকের দিনটা?" দলের সর্দার বিকট হাসি হাসল। সায়ন্তনী চিনতে পারল—এরাই সেই চারজন, যারা দুর্গাকে শেষ করেছিল। ভয়ে তার চিৎকার গলার কাছে আটকে গেল। নির্জন রাস্তায় কেউ নেই তাকে বাঁচানোর মতো।
৭.মহামায়ার আবির্ভাব
ঠিক যখন লোকগুলো সায়ন্তনীর দিকে হাত বাড়িয়েছে, হঠাৎ চারপাশ অদ্ভুতভাবে ঠান্ডা হয়ে গেল। রাস্তার নিবু নিবু ল্যাম্পপোস্টগুলো কাঁপতে কাঁপতে নিভে গেল। অন্ধকার চিরে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ—পুজোর ঢাকের আওয়াজ!
জুটমিলের ভাঙা ফটক দিয়ে কুয়াশার মতো কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসতে লাগল। আর সেই ধোঁয়ার মাঝখান থেকে হেঁটে এল এক নারীমূর্তি। পরনে তার রক্তবর্ণ লাল শাড়ি, আলুলায়িত কেশ। তার গায়ের রং ফ্যাকাশে সাদা, কিন্তু চোখ দুটো জ্বলন্ত আগুনের মতো টকটকে লাল।
পিশাচগুলো ভয় পাওয়ার বদলে হাসল। "কে রে তুই? দুর্গার অতৃপ্ত আত্মা নাকি?"
মূর্তিটি কোনো কথা বলল না। তার হাতের আঙুলগুলো হঠাৎ তলোয়ারের মতো লম্বা আর ধারালো হয়ে উঠল। আকাশের বুক চিরে এক তীব্র চিৎকার শোনা গেল—যা কোনো মানুষের কন্ঠ হতে পারে না।
৮.রক্তাক্ত বিচার
এরপর যা ঘটল, তা কোনো মানুষের কল্পনার অতীত।
প্রথম লোকটা যখন সায়ন্তনীকে ধরতে গেল, এক অদৃশ্য শক্তি তাকে শূন্যে তুলে আছাড় মারল। তার হাড়গোড় ভাঙার মটমট শব্দে বাতাস ভারি হয়ে উঠল।
বাকি তিনজন পালাবার চেষ্টা করতেই দেখল, মাটি থেকে শত শত কালো হাত বেরিয়ে তাদের পা আঁকড়ে ধরেছে।
সেই ছায়ামূর্তি ধীরপায়ে এগিয়ে এল। তার মুখটা এক মুহূর্তের জন্য ঠিক সেই মৃত দুর্গার মতো হয়ে গেল, যাকে তারা মেরেছিল। কিন্তু সেই মুখে এখন কোনো করুণা নেই, আছে শুধু সংহার রূপ।
দুর্গা তার হাত বাড়াল সর্দারের বুকের দিকে। ছোঁয়ামাত্রই সেই লোকটির শরীর কালচে হয়ে কুঁচকে যেতে লাগল। সে আর্তনাদ করার সুযোগটুকুও পেল না। দুর্গার অশরীরী কন্ঠ গমগম করে উঠল—"মাভৈঃ! অন্যায়ের শেষ আজ এই ভিটেতেই হবে!"
৯.শেষ রক্ষা
সায়ন্তনী দেখল, জুটমিলের সেই ধুলোবালি আর রক্তের মাঝে দাঁড়িয়ে সেই অগ্নিচক্ষু নারীমূর্তি। বাকি তিনজন পিশাচ তখন ভয়ে পাগল হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, তাদের চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। দুর্গা সায়ন্তনীর দিকে তাকাল। সেই পলকের দৃষ্টিতে ভয় ছিল না, ছিল দিদির মতো এক অদ্ভুত আশ্বাস।
পরক্ষণেই এক দমকা হাওয়া এল, আর চারপাশ আগের মতোই শান্ত হয়ে গেল। সেই ছায়ামূর্তি বা সেই কুয়াশা—কিছুই আর নেই। শুধু পড়ে আছে চারটে অর্ধমৃত শরীর, যারা কোনোদিন আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে না।
সায়ন্তনী কম্পিত পায়ে বাড়ির দিকে ছুটল। তার কানে তখনো বাজছে সেই ঢাকের শব্দ আর একটা চাপা ফিসফিসানি— "ভয় পাস না, বোন। দুর্গা আজও আছের জন্ম হয়েছে।

