ব্রহ্মদৈত্য ডট কম
ব্রহ্মদৈত্য ডট কম
১. অপদার্থের তকমা
সৌম্যর জীবনটা ছিল এক্কেবারে জগাখিচুড়ি। পড়াশোনায় সে সবার শেষে, ফুটবল মাঠে নামলে নিজের পায়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, আর পাড়ার মেয়ে টুপুরকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে গিয়ে সে ঘাবড়ে গিয়ে নিজের নামটাই ভুলে গিয়েছিল। তার বাবা রোজ সকালে খবরের কাগজ দিয়ে তার মাথায় মারতেন আর বলতেন, "তোর দ্বারা কিছু হবে না, তুই একটা জ্যান্ত আপদ!" মা-ও সারাদিন আফসোস করতেন। সৌম্যর মনে হতো, এই পৃথিবীতে তার কোনো দাম নেই।
২. একটি রহস্যময় ইমেল
একদিন রাতে মন খারাপ করে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকাকালীন সৌম্যর ইনবক্সে একটা অদ্ভুত মেইল এলো। সাবজেক্ট ছিল: 'Buy A Ghost - জীবনের সব সমস্যার সমাধান মাত্র এক ক্লিকে!' সে লিঙ্কে ক্লিক করতেই একটা ওয়েবসাইট খুলে গেল যেখানে নানা রকমের ভূতের তালিকা দেওয়া। সে ভাবল বন্ধুরা নিশ্চয়ই তার সাথে প্র্যাঙ্ক করছে। মজা করার জন্যই সে সবথেকে শক্তিশালী 'ব্রহ্মদৈত্য' অপশনটা সিলেক্ট করল। সাইন-আপ করার সময় ঝোঁকের মাথায় কিছু 'টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন' না পড়েই টিক মেরে দিল।
৩. ব্রহ্মদৈত্যের ভেলকি
বাবার পকেট থেকে টাকা সরিয়ে সে ব্রহ্মদৈত্যটি অর্ডার করে দিল। পরের দিনই ঘরে এক অদ্ভুত ধূপের গন্ধ আর খড়ম পায়ে হাঁটার শব্দ! হাজির স্বয়ং পৈতেধারী ব্রহ্মদৈত্য। তবে সে বেশ আধুনিক, পৈতে থেকে ব্লুটুথ বের করে গান শোনে। কিন্তু তার প্রভাবে সৌম্যর ভাগ্য রাতারাতি বদলে গেল। পড়াশোনায় সে ক্লাসে ফার্স্ট হতে শুরু করল, মাঠে নামলে রনিলদোর মতো গোল দিতে লাগল, আর টুপুর তো এখন সৌম্যর প্রেমে পাগল!
৪. ওঝা এবং সত্যের প্রকাশ
কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই সব বদলে যেতে লাগল। সৌম্য আয়নার সামনে দাঁড়ালে দেখত তার ছায়াটা তার মতো নয়, বরং বড় জটাধারী এক ভূতের মতো। ভয়ে সে এক ওঝাকে ডাকল। ওঝা এসে গম্ভীর মুখে সৌম্যর বাবা-মাকে সব জানিয়ে দিলেন— "আপনাদের ছেলে এক অপদেবতার পাল্লায় পড়েছে।" ওঝা সৌম্যকে ভয় দেখিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে বললেন। দৌড়াতে দৌড়াতে সৌম্য এক ভাঙা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখল আয়নায় কোনো মানুষ নেই, আছে শুধু সেই ব্রহ্মদৈত্য! আসলে কোনো ভূত আসেনি, সৌম্যর নিজের অবচেতন মনই নিজেকে ব্রহ্মদৈত্য ভেবে সব কাজ করছিল। ওঝা ছিলেন আসলে একজন ডাক্তার। সৌম্যর মনে হলো সে সুস্থ হয়ে গেছে। এরপর তার আর টুপুরের বিয়েও হলো।
৫. দশ বছর পর: চরম ক্লাইম্যাক্স
দশ বছর পর সৌম্য আর টুপুরের একটি ছেলে হলো, নাম অর্ক। অর্কও ঠিক সৌম্যর মতোই পড়াশোনা আর খেলাধুলায় অপদার্থ হতে শুরু করল। সৌম্য ভাবল এটাও হয়তো বংশগত। কিন্তু একদিন সে দেখল অর্কর ল্যাপটপে সেই একই ওয়েবসাইট খোলা— 'Buy A Ghost'। সৌম্যর বুক কেঁপে উঠল। সেই রাত থেকেই বাড়িতে আবার খড়মের শব্দ আর ধূপের গন্ধ পাওয়া যেতে লাগল। অর্কও হঠাৎ করে সবকিছুতে তুখোড় হয়ে উঠল।
সৌম্য এবার এক সত্যিকারের ওঝাকে ডাকল। ওঝা এসে অর্কর সামনে জাদুর আয়না ধরতেই দেখা গেল— সেখানে অর্কর কোনো প্রতিচ্ছবি নেই! সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই দশ বছর আগের ব্রহ্মদৈত্য। ওঝা চিৎকার করে বললেন, "অর্ক বলে এই পৃথিবীতে কেউ নেই!"
ব্রহ্মদৈত্যটি হো হো করে হেসে উঠল। সে সৌম্যর দিকে তাকিয়ে বলল, "সৌম্য, তুমি ভুলে গেছ? দশ বছর আগে যখন তুমি আমায় অর্ডার করেছিলে, তখন দাম হিসেবে তুমি লিখেছিলে— 'তোমার প্রথম সন্তানকে আমি আমায় দিয়ে দেব'। তুমি ভেবেছিলে ওটা মজা, কিন্তু আমি সেটাকে সত্যি ভেবেছিলাম। এই দশ বছর ধরে অর্ক সেজে আমিই তোমাদের সাথে ছিলাম। তোমাদের ভালোবাসা খেয়ে আমি বড় হয়েছি। আসলে তোমাদের কোনো ছেলেই হয়নি!"
মুহূর্তের মধ্যে অর্ক উধাও হয়ে গেল। সৌম্য আর টুপুর শূন্য ঘরে দাঁড়িয়ে রইল। সৌম্য বুঝতে পারল, দশ বছর আগে একটা ছোট্ট ভুলেই সে তার পুরো ভবিষ্যৎটা এক ব্রহ্মদৈত্যের হাতে তুলে দিয়েছিল।

