ডাক ১
ডাক ১
বর্ষাকালের বিকেল, থমথমে পরিবেশ, চারিপাশ পানিতে থৈথৈ করছে। সারাদিনের শ্রান্তসফর শেষে পাখিরা তার নিজ বাসস্থানে ফিরছে, পাখির কিচিরমিচির শব্দে ভরে গেছে চারপাশ। মাঠের কর্মব্যস্ততা শেষে নিজ বাড়িতে ফিরছে মানুষ জন। আকাশে হালকা মেঘ, দেখতে ছোট ছোট তুলোর টুকরোর মতো লাগছে, দেখে মনে হচ্ছে না যে আজ বৃষ্টি হবে। বাতাস বইতেছে মনে হচ্ছে মেঘ কেটে যাবে পরিবেশটা অনেক ঠান্ডা। মাগরিবের নামাজের আগে কাজ শেষে সরকারি মিয়া এবং ইউনুস পুকুরপাড়ে বসে গল্প করছে। সরকার মিয়া মাসিক বেতনে কাজ করে একজনের বাড়িতে, ইউনুস আলী কিছু জমি আছে তাই চাষবাস করে তার ছোট্ট সংসার চলে যায়। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে দুজনে গা এলিয়ে দিয়েছে পুকুরপাড়ের দূর্বা ঘাসের ওপর। আকাশে মেঘ থাকায় ঠান্ডা বাতাস সারা দিনের ক্লান্তিতে ঘুম চলে এসেছে চোখে। সূর্য প্রায় ডুবন্ত, সূর্য কে কুসুমের মত দেখাচ্ছে। অবশ্য তার অর্ধেক ডুবে গেছে।
ইউনুস আলী; আচ্ছা আজকে কি বার?
সরকার মিয়া; সোমবার
চলো সামনের শুক্রবারে মাছ ধরতে যাই, মামুনের বাড়ির পাশ দিয়ে পশ্চিম পাশে যে বড় বাঁশঝাড় টা আছে না, ওর পিছনে একটা বিশাল পুকুর আছে পুকুর এ নাকি অনেক মাছ পুকুরটা ঘাস দিয়ে ঢেকে গেছে, জানোই তো ওখানে যেতে সকলে ভয় পায়, তাই ওখানে মাছের ছড়াছড়ি, তুমি আবার ভয় করো নাকি? তুমি ভয় করলে তোমার যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আমি একাই যেতে পারব আর যদি চাও আমার সাথে যেতে পারো, আগামী শুক্রবার এশার নামাজ পর.......
আরে না আমিও যাব তোমার সাথে সরকার মিয়া রাজি হলো তার কথায়।
মাগরিবের আজান হচ্ছে, পাশের বাড়ির একজন বুড়োলোক ওযুর জন্য গড়গড় করে কুলি করছে তার শব্দ পাচ্ছি সরকার এবং ইউনুস, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সহ তাহাজ্জুদের সময় এরকম করে কুলি করে বুড়ো লোকটি। তারা দুজন দুজনের বাড়িতে চলে গেল।
সরকার মিয়া অজু গোসল করে মাগরিবের নামাজ পড়ে নিল এমন সময় ফোন এলো গৃহস্থ বাড়ি থেকে; সরকার মিয়া যে বাড়িতে কাজ করে সে তার প্রতিবেশী। সরকার মিয়ার বাড়ি থেকে তার গৃহস্থ বাড়ির দূরত্ব হেঁটে গেলে তিন থেকে চার মেয়ের মত লাগবে। গৃহস্ত ফোন দিয়ে বলল ভাই একটু আয় মাছের খাবার এসেছে, তুই তো জানিস আমি বুড়া হয়ে গেছি এতগুলো বস্তা বাড়ীর ভেতরে নিয়ে যেতে পারবো না, ভ্যানওয়ালা টাও বুড়োর মত, একটু আয় ভাই কষ্ট করে। সরকার মিয়া বিরক্তির স্বরে বলল আপনার এসব কাজ শুধু রাতেই হয় দাঁড়ান আসছি।
সরকারি মিয়া বাড়ি থেকে বের হলো দুপাশে বুকের মাঝে দিয়ে রাস্তা একটু সামনে মসজিদ তার সামনে গৃহস্থ এর বাড়ি। সরকারি মিয়া মিনিটের মধ্যে চলে আসলো। এসে দেখে ভ্যান ওয়ালা টা বেশ বুড়ো, ঘন দাড়ি ময়লা পোশাক তাকে দেখে তার খুব দয়া হলো। সে তাকে সালাম দিল, ভ্যানওয়ালা সালামের উত্তর দিতেই সরকার মিয়া বস্তা গুলো একে একে ভিতরে নিয়ে দিতে শুরু করলো।
কাজ শেষ হয়ে গেছে এখন রাত প্রায় দশটা ত্রিশ মিনিট, গৃহস্থ বলল চল আমি তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি, সরকার মিয়া বলল তার কোন প্রয়োজন নেই আমার বাড়িতো পাশেই আমি একাই যেতে পারবো। সরকার মিয়া একা একা হাঁটছিলো 20 কদম এগোতেই মসজিদ, মসজিদ পার হয়ে গেল, সামনে বিশাল আকার একটি বটগাছ, লোকমুখে প্রচলিত আছে এখানে নাকি একটা জিন থাকে, একদিন দুপুর বেলা কারো সামনে মোটা একটি ডাল ভেঙ্গে ফেলেছিল, কোনো অপবিত্র ব্যক্তি এ রাস্তা দিয়ে হেটে গেলে সেই জিন তাকে চড় দিত। এ কথা মনে হতেই তার হাঁটার স্পিড কেন প্রায় থেমে গেল সে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। তোর যাতে ঘাম জমতে শুরু করেছে যদিও পরিবেশটা ঠান্ডা বাতাস বইছিল। ধীরে ধীরে বটগাছ তলা পার হলো। তার সাথে এমন কিছুই করলো না, সে এগুচ্ছে দু পাশে পুকুর, মাঝের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে সে, বামপাশের পুকুরটা ছোট হওয়ায় পাশে ছোট্ট একটি বাঁশ ঝাড়। সে দেখল বাজারের পাশে কে যেন বসে আছে, সে প্রথমে মনে করলো হয়তো ঠাণ্ডা হাওয়ায় কেউ বসে আছে কিন্তু পরক্ষনেই মনে হলো এত রাতে গ্রামের পরিবেশে কারো তো বসে থাকার কথা নয়। তা আবার বাঁশ ঝারের কাছে, যেখানে মাগরিবের পর কেউ যায় না, তার গায়ে হিম শীতল বাতাস বয়ে গেল মনে হলো পা যেন আটকে গেছে, আর এগোচ্ছে না কি করবে ভেবে পাচ্ছে না সে দৌড় দেবে তাও পারছে না, সে মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করছে সে চোখ বুজে আছে এই বুঝি ওই ব্যক্তিটি আমার দিকে এগিয়ে আসবে, ঠিক সেই মুহুর্তে বাড়ির কাজের লোকটির উঠে দাঁড়ালো এবং সে এগুচ্ছে................

