STORYMIRROR

Fardousi Mousumi

Fantasy

4  

Fardousi Mousumi

Fantasy

চাঁদের ডায়েরি

চাঁদের ডায়েরি

5 mins
11


রাত ১২ টা। শহরের সব আলো নিভে গেছে। কিন্তু নীলার জানালার পাশের বেলি গাছটার পাতা কাঁপছে — যেনো কেউ ফিসফিস করে কিছু বলছে।নীলা বিস্ময়ে জানালা খুলল, তখনই তার হাতে এসে পড়ল একটা ছোট ডায়েরি। ডায়েরির মলাটে লেখা — "চাঁদের ডায়েরি"।

ভেতরে লেখা প্রথম লাইন:“যখন তুমি একা থাকবে, আমি আলো হয়ে তোমার পাশে থাকব।”

নীলা অবাক! কে লিখল এই কথা? পরদিন রাতেও জানালার পাশে বসে ছিল নীলা। হঠাৎ এক ঝলক আলো এসে পড়ল তার মুখে — আর দেখা গেল ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে একটা ছেলেকে। সাদা পাঞ্জাবি, নীল চোখ।

“তুমি কে?” – চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল নীলা।

ছেলেটি মৃদু হেসে বলল, “আমি সেই ছায়া, যাকে তুমি প্রতিদিন চাঁদের আলোয় খোঁজো।”

তারপর প্রতিদিন রাতে তারা দেখা করত, কথা বলত। কিন্তু ছেলেটি কখনো সকালে থাকত না।নীলা একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করল, “তুমি মানুষ তো?”ছেলেটি কিছু বলল না, শুধু একটা চিরকুট দিয়ে চলে গেল। সেখানে লেখা ছিল:

“আমি চাঁদের রাজ্যের দূত, ভালোবাসা পৌঁছে দিই, কিন্তু ফিরে যেতে হয়... সূর্য ওঠার আগে।”

নীলা ডায়েরি বন্ধ করল। নীলার ঘুম আসছে না। সে ডায়েরির প্রতিটা পৃষ্ঠা পড়ে আর নতুন করে সেই ছেলেটির কথা ভাবে, যার নামও সে জানে না। ছেলেটি যেনো রাতের হাওয়ায় মিশে যায়, আবার একঝলক আলোয় ফিরে আসে।

একদিন ডায়েরির পেছনের পাতায় একটা রহস্যময় চিহ্ন খুঁজে পেল সে—একটা অর্ধচন্দ্র আর তার ভেতরে লেখা এক শব্দ:“অলিন্দ”

নীলা সিদ্ধান্ত নিল, এই অলিন্দ যেখানেই হোক, খুঁজে বের করতেই হবে।

ইন্টারনেটে সার্চ করে, পুরনো বই ঘেঁটে, একদিন সে জানতে পারল — "অলিন্দ" একটা পুরনো রাজবাড়ির নাম, যেটা শহরের শেষ প্রান্তে একটা জঙ্গলের ভেতরে পড়ে আছে।

স্থানীয় লোকেরা বলে, ওখানে নাকি আলো-ছায়ার মানুষদের দেখা মেলে, যারা আসলে স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি এক দুনিয়ার বাসিন্দা।

নীলা এক বিকেলে সাহস করে বেরিয়ে পড়ল। পুরনো ভাঙা দরজার ভেতর দিয়ে ঢুকেই সে অনুভব করল ঠান্ডা বাতাস, পেছন থেকে কারও কাঁধে হাত রাখার মতো স্পর্শ। চমকে পেছনে তাকাল—কেউ নেই।হঠাৎ এক ঘরের দরজা খুলে গেল আপনাআপনি। ভিতরে সেই ছেলেটি দাঁড়িয়ে—চোখে জল, গলায় কণ্ঠনালীর কম্পন।

“তুমি... চলে আসবে ভাবিনি,” বলল ছেলেটি।

“তুমি কি আসলেই চাঁদের কেউ?” – গলার কাঁপন সামলে জিজ্ঞেস করল নীলা।

ছেলেটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নীলার হাতে একটা সাদা পাথরের দুল দিল। বলল—“যদি একদিন হারিয়ে যাই... এই দুলটা ধরে রাখো। এতে আমার সব স্মৃতি জমা আছে। তোমার চোখের জল দিয়ে যদি স্পর্শ করো, আমি ফিরে আসব।”এরপর হঠাৎ করেই ঝড় উঠল, চোখের সামনে ছেলেটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেল চাঁদের আলোয়।

নীলা এখনো রোজ রাতে সেই দুল হাতে জানালার পাশে বসে থাকে। কারও প্রতীক্ষা করে।

সেই রাতে অদ্ভুত কিছু ঘটল। জানালার পাশে বসে থাকা নীলা হঠাৎ অনুভব করল, গলা ছুঁয়ে রাখা সেই সাদা পাথরের দুলটা হালকা গরম হয়ে উঠছে। ঘরের বাতাস ভারি হয়ে আসছে, যেন চুপচাপ কেউ কিছু বলছে না বলে অভিমান করছে।

হঠাৎ এক ঝলক নীল আলো ঘর ভরে গেল।নীলা চোখ মেলল, আর দেখল — সে তার নিজের ঘরে নেই। তার চারপাশে এক অদ্ভুত জগত, যেখানে মাটিতে নীল রঙের ঘাস, আকাশে সোনালি তারা, আর একটা বিশাল চাঁদ একেবারে কাছ থেকে তাকিয়ে আছে।কিন্তু আশ্চর্য বিষয়, সেও আর “নীলা” নেই।

একটা স্বচ্ছ চাদর পরে, চুলে রুপালি ফুল গুঁজে, সে যেনো চাঁদের দূতী হয়ে উঠেছে। আর তার সামনেই দাঁড়িয়ে সেই ছেলে — এবার আর ছায়ার মতো নয়, বরং এক রাজপুত্রের মতো! তার গায়ে চাঁদের আলো ছড়ানো পোশাক, কপালে একটুকরো তারা।

ছেলেটি এবার নাম বলল —“আমার নাম সায়ন। আমি চাঁদের তৃতীয় স্তরের পাহারাদার। আমাদের কাজ মানুষের স্বপ্ন পাহারা দেওয়া। কিন্তু তোমার স্বপ্নগুলো আমার হৃদয়ে ঢুকে পড়েছিল। আমি জানি, তোমার পৃথিবী থেকে এইখানে আসা নিষেধ ছিল। তবুও তুমি এলে...”

নীলার গলা বুজে আসে।“তোমার চোখে আমি আমার জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছি।”

কিন্তু তখনই এক কণ্ঠস্বর আকাশ ফাটিয়ে বলে উঠল —“মানুষ ও চাঁদের বাসিন্দার প্রেম স্বপ্নভঙ্গ ডেকে আনে।”

চাঁদের রাণী আবির্ভূত হলেন। বললেন,“তুমি চাইলে এখানে চিরদিন থাকতে পারো, তবে তোমার পৃথিবীর সব স্মৃতি মুছে দিতে হবে।”

সায়নের চোখে জল।নীলা চুপ করে আছে। মনের ভেতর চলছে ঝড় — থাকবে? না ফিরে যাবে?

নীলা ধীরে ধীরে হাত বাড়াল। দুলটা খুলে দিল সায়নের হাতে।বলল,

“ভালোবাসা যদি সত্য হয়, তবে সেটা শুধু এই জগতেই নয়, পৃথিবীতেও টিকে থাকবে। আমি ফিরে যাব, কারণ আমার মায়ের অপেক্ষা, আমার জীবনের দায়িত্ব আছে। কিন্তু জানো, প্রতিদিন রাতে তোমার চাঁদকে ছুঁয়ে দেখব।”

সায়নের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,“তবে প্রতিটি পূর্ণিমার রাতে তোমার স্বপ্নে দেখা হবে। চাঁদের ডায়েরির নতুন পৃষ্ঠা তখন খুলে যাবে।”

নীলার চারপাশে আলোর ঝলকানি শুরু হল। সে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল…

পরদিন সকালে নীলা ঘুম থেকে উঠে দেখল… তার টেবিলে সেই ডায়েরিটা খোলা। নতুন একটি লাইন লেখা:“স্বপ্নভূমির পথ বন্ধ হয় না, যদি ভালোবাসা সত্য হয়।“

পূর্ণিমার রাত। আকাশে একটিও মেঘ নেই।নীলা জানালার পাশে বসে সেই সাদা পাথরের দুলটিকে চেপে ধরে রেখেছে। চোখ বন্ধ করে বলছে—“সায়ন... তুমি আছো তো?”

হঠাৎ বাতাস কাঁপল, মেঝেতে একচিলতে আলো পড়ল, আর কাচের জানালায় ধরা পড়ল এক ছায়া।

“তুমি কি এখনও অপেক্ষা করো?” – কানে ভেসে এল সেই পরিচিত কণ্ঠ।

নীলা ছুটে জানালার দিকে গেল। কেউ নেই।কিন্তু তার বিছানার পাশে পড়ে আছে এক পৃষ্ঠা—ঠিক সেই ডায়েরির কাগজের মতো। তাতে লেখা—

“পূর্ণিমা রাতে আমি এসেছিলাম, কিন্তু তোমার কান্না দেখে ফিরে গেলাম। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমার চোখে আর অশ্রু দেখতে চাই না।”

নীলার চোখে জল আসে, কিন্তু এবার সে হেসে ফেলে। কারণ এখন সে জানে—সায়ন ঠিক আছে। আর তাদের ভালোবাসা এখনও কোথাও লুকিয়ে আছে।

পরদিন সকালে নীলা খেয়াল করল, তার ড্রয়ারের ভেতর হঠাৎ একটা চাবি পড়ে আছে।চাবিটার মাথায় খোদাই করা —“স্বপ্নদ্বার”সে জানে, এটা সাধারণ চাবি নয়।

রাতে দুলটা পরে সে আবার সেই পুরনো অলিন্দ রাজবাড়ির পথ ধরে রওনা দিল। গিয়ে দেখে — সেই ভাঙা দরজার পেছনে আরেকটা ছোট কাঠের দরজা, যেটা আগে সে দেখেইনি! চাবিটা দিয়ে দরজা খুলতেই সামনে এক অদ্ভুত আলোয় ভরা পথ। সেই পথের শেষে দাঁড়িয়ে আছে সায়ন।কিন্তু এবার তার চোখে অভিমান।

“তুমি কি আবার ফিরে যাবে?” — সায়নের গলা কাঁপছে।

নীলা এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে বলল —

“এইবার আমি ফিরব না। আমার স্মৃতি তোমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে এসেছি।”

সায়নের হাতের ছোঁয়ায় নীলার শরীর থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ল। একটা পাথরের ঘড়ির মধ্যে তাদের দুইজনের ছায়া জমে গেল — যেনো সেই ভালোবাসা এবার সময়কে ছুঁয়ে গেল।


# সমাপ্ত



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Fantasy