ব্যস্ত শহর , মৃত হয়
ব্যস্ত শহর , মৃত হয়
ব্যস্ত শহর , মৃত হয়
অভিজিৎ হালদার
শহরের নামটা জরুরি নয়। কারণ সব ব্যস্ত শহরের গল্পই এক—কংক্রিটের হাড়গোড়, ধোঁয়ার দীর্ঘশ্বাস আর যান্ত্রিক কোলাহল। কিন্তু এই শহরের একটা বিশেষত্ব ছিল; ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে এখানে মানুষের রক্ত চলাচল করত।
অর্ক ছিল এই শহরের এক প্রান্তিক পর্যবেক্ষক। প্রতিদিন বিকেলে সে একটি পরিত্যক্ত ফ্লাইওভারের ওপর দাঁড়িয়ে নিচের পিঁপড়ের মতো সারি সারি গাড়ি আর মানুষের স্রোত দেখত। তার মনে হতো, এই শহরটা একটা বিশাল দানব, যার পেটে কয়েক কোটি ছোট ছোট স্বপ্ন প্রতিদিন হজম হয়ে যায়।
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। অফিস ফেরত মানুষের ভিড়, বাসের কন্ডাক্টরের চিৎকার আর সিগন্যালের লাল-সবুজ বাতির লুকোচুরি—সবই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু রাত আটটা বাজতেই শহরটা অদ্ভুত আচরণ শুরু করল।
প্রথমে নিভে গেল রাস্তার সব বাতি। কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ নয়, যেন শহরটা নিজেই চোখ বুজে ফেলল। এরপর থামতে শুরু করল শব্দেরা। চলমান গাড়ির ইঞ্জিনগুলো হঠাৎই নিস্তেজ হয়ে পড়ল, যেন কেউ তাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষের চিৎকার, মোবাইলের রিংটোন, এমনকি বাতাসের শব্দটাও হঠাৎ উধাও।
অর্ক দেখল, তার চোখের সামনে এই বিশাল মহানগরীটা ধীরে ধীরে একটা মস্ত বড় লাশে পরিণত হচ্ছে।
মানুষগুলো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কাউকে ধাক্কা দিচ্ছে না, কেউ ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে গালি দিচ্ছে না। সবাই যে যার জায়গায় পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ। বহুতল ভবনগুলোর কাঁচের গায়ে চাঁদের আলো পড়ে এক ভুতুড়ে আভা তৈরি করছে। অর্ক যখন ফ্লাইওভার থেকে নিচে নামল, সে নিজের পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠল। এত নিঃশব্দ এই শহর আগে কখনো ছিল না।
অর্ক ফুটপাতে বসা এক বৃদ্ধ ভিখারির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বৃদ্ধের চোখে কোনো জ্যোতি নেই, কিন্তু তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি। অর্ক তাকে জিজ্ঞেস করল, "সবাই এমন স্থির কেন? শহরটা কি থেমে গেল?"
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "না রে পাগল, শহরটা থামেনি। শহরটা আসলে আজ মৃত। এতদিন যা দেখেছিস তা ছিল লাশের ওপর মেকআপ। এই শহরটা অনেক আগেই মারা গিয়েছিল যখন মানুষ পাশের মানুষের কান্না শোনা বন্ধ করেছিল। আজ শুধু তার আনুষ্ঠানিক শেষকৃত্য চলছে।"
অর্ক খেয়াল করল, রাস্তার পিচের বুক ফেটে ছোট ছোট ঘাস আর বুনো ফুল ফুটে উঠছে। কংক্রিটের শরীর চিরে প্রকৃতি তার অধিকার ফিরে নিতে শুরু করেছে। লোহার রডগুলোতে মরচে ধরছে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। শহরটা যত বেশি 'মৃত' হচ্ছে, ততই যেন সে আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে অন্য এক রূপে।
গভীর রাতে অর্ক শহরের মাঝখানে শুয়ে পড়ল। কোনো হর্ন নেই, কোনো তাড়া নেই। সে অনুভব করল, ব্যস্ত শহর যখন মৃত হয়, তখনই কেবল মাটির ঘ্রাণ পাওয়া যায়। নীল গ্রহের ধমনীতে তখন অন্য এক বিপ্লব শুরু হয়—এক আদিম শান্তির বিপ্লব।
ভোরবেলা যখন সূর্য উঠল, শহরটা আর আগের মতো ছিল না। পিচঢালা রাস্তাগুলো ধুলোয় মিশে গেছে, আকাশছোঁয়া ভবনগুলো ঢেকে গেছে সবুজ লতায়। ব্যস্ততা যেখানে শেষ হয়, জীবনের আসল গল্প বোধহয় সেখান থেকেই শুরু হয়।
