Sanghamitra Roychowdhury

Romance Tragedy Classics

3.4  

Sanghamitra Roychowdhury

Romance Tragedy Classics

বিষের বাঁশী

বিষের বাঁশী

3 mins
377



আমার প্রিয় বাঁশীওয়ালা,


হ্যাঁগো, আছো কেমন? সেই কতদিনকার কথা, মনে পড়ে, তোমার বনবালাকে? তারপর তো দেখা নেই, সাক্ষাৎ নেই। চিঠি-চাপাটিও নেই। নেই কোনো খবরবার্তাও। এমনি করে কি চলে গো? কিন্তু দেখো, তাওতো চললো দিব্যি এই এতোগুলো বছর।


তোমার কথা ভাবলে আজও এই আটান্ন পার করেও নিজেকে তন্বী তরুণী মনে হয়। জানো বাঁশীওয়ালা, প্রেমিকা হয়ে থাকতে পারায় যে কত সুখ, কত সৌন্দর্য, কত রোমাঞ্চ... তা কেবল যারা প্রেমে পড়েছে কোনো না কোনোকালে, তারাই শুধু বুঝবে। বাকিরা বুঝবে না কোনোদিন। তুমি যে আমার সেই প্রেমিক গো, যে নিঃশর্ত নিঃস্বার্থ প্রেমে আকন্ঠ ডুবিয়ে রেখেছিলে আমায়। আমার দেওয়া আঘাতের দাগকে গায়ে জড়িয়ে নিলে নামাবলীর মতো। আর অলংকার হয়ে আমার শরীরে জড়িয়ে রইলো তোমার শর্ত-দাবীহীন ভালোবাসা। থেকে দূরে গিয়েও আমার হয়েই যে থেকে গেলে জীবনভর। তুমি তো জানলেই না, বুঝলেই না গো বাঁশীওয়ালা... জীবন ফুরোবার কালে আরো বেশি করে পুরনো আশ্রয় খোঁজে, ঠিক যেমনি করে জাহাজি বন্দর খোঁজে নোঙর করার জন্য। তবে আজন্মকালের জন্য নয়... সাময়িক নিশ্চিন্তে বিশ্রামের জন্য।



তা বাঁশীওয়ালা, তুমি ভাবছো তো, হঠাৎ ইচ্ছে করে হারিয়ে যাওয়া প্রাক্তন প্রেমিকা যৌবন পার করে এমন কাব্যি করে কেন? চিন্তায় পড়লে? নাকি বিরক্তিতে? সে তুমি যাইবা ভাবো না কেন... আমি কোন কালেই বা তোমার কোন ভাবনাটার ধার ধেরেছি বলো? আমার থেকে তোমারই তো বেশি ভালো জানবার কথা তা! অবিশ্যি তোমার কথায় সম্পর্কের জালে ফাঁসতে চাইনি। তবে কি আর অ্যাদ্দিন বাদে এমনি করে জ্বালাতে পারতুম আমার বাঁশীওয়ালাকে? তুমিই বলো।


তুমি দেখেছো চারপেয়ে মাংসাশী মায়েরা কেমন করে তার ছানাদের একজায়গা থেকে অন্যজায়গায় নিয়ে যায়? ছানার ঘাড়টা মুখে করে কামড়ে ধরে। দাঁত দিয়েই তার ছানার ঘাড় ধরে ঝুলিয়ে নিয়ে যায়। কী অসম্ভব সুন্দর মাপে চেপে ধরে বলো তো? মুখ থেকে ছানা পড়েও যায় না, আবার ছানার গলায় দাঁত বসে গিয়ে রক্তাক্তও হয় না। অর্থাৎ খুব জোরেও ধরে না, আবার আলগা করেও ধরে না। সেই ধরায় মায়ের মমতা এবং পাশবিকতার অনুপস্থিতি দুয়ে মিলেমিশে থাকে সঠিক মাত্রায়। সমস্ত সম্পর্কই তাই। সম্পর্ককে ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরলে মানুষ সেই আসক্তির দাঁতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। হারিয়ে যায় সম্পর্ক। আর যদি খুব আলগা উদাসীন হয়ে যাওয়া হয় সম্পর্কের প্রতি, চৌচির হয়ে ফেটে ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে যাবতীয় সম্পর্ক। এই কথাটুকু আমি বুঝেছিলুম তোমার সাথে উঠতে বসতে। তাইতো রোজকার ভাতের হাঁড়ি-সরার বাঁধনে বাঁধতে চাইনি তোমাকে। তোমাকে রেখেছিলুম আমার মনের মাঝখানটিতে... যাকে দেখা যায় না, তবে ছোঁয়া যায় মনে মনে। আর তো তোমার অভিমান থাকার কথা নয় এখন, বাঁশীওয়ালা!



তবে একটা কথা জানো তো বাঁশীওয়ালা... তোমার ভেতরেও যদি প্রেম না থাকতো, বিরহবেদনা না থাকতো, যদি তুমিও রোজ না জ্বলতে ফেলে আসা পুরনো সম্পর্কের মায়ায়... তবে আমিও কিছুতেই তোমায় এচিঠি লিখতুম না। এ তুমি নিশ্চিত জেনো। হতে পারে আমি তোমায় এককালে সরিয়েছিলুম দূরে, কিন্তু তাতো শুধু আজকের এই দিনটির জন্য কামনা করে। যেদিন আমার কোনো আশ্রয় থাকবে না, কোনো ঘাট থাকবে না, সেইদিন আমার নোঙর ফেলতে আমি যাবো আমার বাঁশীওয়ালার বন্দরে।


সেদিন যদি তোমায় না ফেরাতুম, তাহলে কি আবার একবার তুমি তোমার ঐ বিষের বাঁশীতে কালো যমুনার মাতাল ঢেউ তুলতে পারতে, বাঁশীওয়ালা? সত্যি করে বলো তো! আমরা যদি তখন এক হয়ে যেতুম, তখন এত কথা কি আমি বলতুম তোমাকে? না বলতে পারতুম? দিন মাস বছরভরের চাল ডাল তেল নুনের হিসেবনিকেশে আমার বাঁশীওয়ালাকে যদি আর খুঁজে না পেতুম তবে তো আমার ডুবে মরা ছাড়া অন্য পথ খোলাই থাকতো না গো? সে যে চির বিচ্ছেদ হতো। কোনো আশা থাকতো না, কোনো অপেক্ষা থাকতো না, কোনো মিলনপিয়াস থাকতো না। সে বড়ো খারাপ হতো। নাকি বলো?


এখন এই বেশ হয়েছে। তুমি যখন খুশি, যেমন খুশি আমাকে আবার তোমার বিষের বাঁশী শোনাবে। সেই বিষের যন্ত্রণায় আমার সর্বাঙ্গ নীল হবে ভালোলাগায় আর তুমি বাজিয়েই যাবে, বাজিয়েই যাবে... থামবে না। শুধু আমি একলা বসে শুনবো, বনপথে ঘুরবো, যাতে তুমি আমার সেই সুখী মুখ দেখে... একা একা স্বাধীনভাবে বাঁশীর সুরে আমাকে শান্ত করে রেখে একলাই আবার চলেও যেতে পারো।


এসো তবে বাঁশীওয়ালা। যেকোনো দিন, যেদিন তোমার ইচ্ছে, যেদিন তোমার সুবিধে। যখন খুশি এসো, যতক্ষণ খুশি থেকো, আবার যখন খুশি চলেও যেও। আটকাবো না। আসলে আমি যে আমার বাঁশীওয়ালাকে কক্ষণো কিছুতেই হারাতে চাইনা গো।


তোমার বিষের বাঁশীর সুরেই হবে আমার চিঠির উত্তর। অপেক্ষায় রইলুম গো বাঁশীওয়ালা।


ইতি,

তোমার বনবালা


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Romance