Maheshwar Maji

Inspirational

3  

Maheshwar Maji

Inspirational

বিষ

বিষ

5 mins
822


বাবনের একদম ভাল লাগেনি।...কী সুন্দর সে বন্ধুদের সাথে খেলছিল।সূয্যিমামা পূব আকাশটা পরিস্কার করে হেসে উঠলে,সেও উঠত।পাশের বাড়ির মৌ,চারু,বিল্টু,পাপাই সব জুটে যেত ছাদের উপরে।তারপর একসাথে খেলা আর খেলা।..কত রকম খেলা!!.. চোর,পুলিশ,ঘোড়া,ঘোড়া,ডিগবাজি দেওয়া,মিথ্যে, মিথ্যে সংসার পাতা।ওরা সবাই প্রায় সমবয়সি।চার,পাঁচ বছরের।

..একসময় তারা চলে যেত মায়ের থানে।ওখানে আগডুম,বাগডুম খেলতো।এক,দু সময় ঝগড়াও হয়ে যেত।..ফড়িং ধরা,বাঁদর তাড়ান।সারাটা দিন হৈ হৈ করে কেটে যেত।তার বাবাটা মস্ত বদ।মাকে আর তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এল এত্ত লোকের মাঝে।..এটা নাকি কোলকাতা।..এত উঁচু আবার বাড়ি হয় নাকি?...বাবন যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে। গ্রামে এসব জিনিস চোখেও দেখেনি।একটু একটু ভয়ও করছে।তাই সে মায়ের কোল ঘেঁষে বসে আছে।..ট্রেন কেমন হয় সে জানত না। ওর খেলার সাথিরাও জানে না। ওদের সঙ্গে দেখা করে এই কথা বলতে বেশ লাগত।এই ভেবে বাবনের মনে কষ্ট হচ্ছে।ইচ্ছে করছে দৌঁড়ে পালায়।..ও জানে পারবে না।এখানে কত লোক।সবার মুখের দিকে মাঝে মাঝে চেয়ে দেখছে।এক,দু জনের মুখ তো রাক্ষসের মত।..হঠাৎ বাবনের মনটা ওর ঠাকুমার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।

---বাবা, তুমি ঠাকুমাকে আনলে না কেন?

----তোর ঠাকুমা আসবে না।

---তাহলে মাকে আর আমাকে কেন আনলে?

---কতবার একটা কথা ঘুরে ঘুরে বলব?..ওখানে থাকলে তোর পড়াশুনোর বারোটা বেজে যাবে।..পাঁচ বছর বয়স হয়ে গেছে তোর।..এখনো ভাল করে নিজের ঠিকানাটা পর্যন্ত ইংরেজিতে লিখতে পারিস না।..এভাবে চলবে?শেষে আমার মত কারখানায় দিন-রাত পচে মরবি যে বাবা।

বীনা এতক্ষণ চুপ করে ঘরের কথাই চিন্তা করছিল।এবার সে একটু রাগ করে বলে উঠল

---তুমি চুপবে?..এইটুকু ছেলেকে এখন থেকে সংসারের কথা শোনাতে লেগে গেলে?...বলি এতটুকুও কী কান্ডজ্ঞান তোমার নেয়?

পরেশ একটু হাসল।

---তুমিই তো বার বার বলতে ছেলেকে তুমি নিয়ে যাও।...কাউকে এতটুকু ছুঁয়ে যায় না। পড়াশুনো কেন লবডঙ্গা হবে।..আমিও হিসেব করে দেখলাম।এই তালে আমার পেন্ডিং ভালোবাসার একটা হিসেবও চুকে যাবে।


বীনা মিথ্যে রাগ দেখিয়ে বলে উঠল,

---সোহাগে রোদ ঝরছে!..তোমার জন্য আমাকেও কতজন কত কী কথা শোনাবে?

---কথা শোনাবে কেন?..বাবা তো বিয়ের পরই বলেছিল।তোমাকে সাথে নিয়ে যেতে।তুমিই তখন মা,বাবাকে ছেড়ে আসতে চাওনি।..মনে আছে সে কথা?

---আসিনি তো।এখনও আসতাম নাকি?..বাবনটা সারা দিনে এতটুকুও পড়তে বসছে না। শেষে তুমি আমাকে দোষ দিতে?..তোমার কাছে থাকলে ওর পড়াশুনোটা তো হবে?..বছর দুই অভ্যেসটা হয়ে যাক।তারপর আমি আবার চলে যাব।

পরেশ হাসল।

--এটা কিন্তু ঠিক হবে না।.. তুমি তাহলে ছেলের জন্য স্বামীর সাথে আসছো?..তারপর আমার কী অবস্থা হবে একবারও ভেবেছ?

---সংসারে অনেককিছু ছেড়ে থাকতে হয়।...ফূর্তি করলে হবে?..এখানে থাকার অনেক খরচ।তাছাড়া মা,বাবার বয়স হচ্ছে। লোকে কথা শোনাবে না?...মানে মানে দুটো বছর কেটে যাক।আর বাবনটাও একটু পড়ার অভ্যেসটা ধরে ফেলুক।ব্যাস।

পরেশ ট্যাক্সি চালককে বলে উঠল,

---ব্যাস..ব্যাস দাদা।আমরা এখানেই নেমে যাব।


বাবনের খুব ঘুম পাচ্ছে।পরেশ ওকে টেনে বিছানা থেকে উঠালো।

---গাধার মত এত ঘুমলে চলবে বাবা?..এবার একটু ওঠে বস।

বাবনের চোখদুটো তবু ছাড়ে না।পরেশ এক আঁজলা জল এনে বাবনের মুখে বুলিয়ে দিল।

---এবার ঠিক চোক খুলে যাবে।

বাবন চোখ কঁচলে দেখল।এ জায়গাটা তার গ্রামের নয়।এতক্ষণ তাহলে সে স্বপ্ন দেখছিল।মনটা খারাপ হয়ে গেল।এখানে কেউ খেলার সাথী নেই।এইটুকু ঘর।দাদু নেই,দিদা নেই।গাছপালা,গায়,ছাগল কিচ্ছু নেই।

পরেশ টুথব্রাশটা বাবনের মুখে ঢুকিয়ে দিল।

---আয় আমার সাথে।

পরেশ ওর হাত ধরে পাশের দরজায় নিয়ে গেল।

একটা চার,পাঁচ বছরের মেয়েকে দেখিয়ে বলল,

---কাল থেকে এর সাথে সামনের স্কুলে যাবি।..তোর মাও যাবে।ভয় নেই।

বাবন মেয়েটার দিকে ভালভাবে চাইল।একটু লজ্জা লাগছে।মেয়েটা গট গট করে এসে ওর একটা হাত ধরে বলল,

--হয়াট ইজ ইওর নেম?

বাবন অবাক চোখে মেয়েটার দিকে তাকাল।

---ইউ ডোন্ট নো ইংলিশ?..তোমার নাম কী?

বাবন দাঁতে আঙুল কেটে বলে উঠল।

---বাবন

---বাবন তুমি কাল থেকে রোজ আমার হাত ধরে স্কুলে যাবে। ম্যামরা খুব ভাল।কেউ বকেন না। আমি মানা করে দেব কেমন?

জাসমিনের কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।

বাবনের মনটা হঠাৎ খুব ভালো হয়ে গেল।তাড়াতাড়ি মুখটা ধুয়ে জাসমিনের সঙ্গে খেলার জন্য ছুটে গেল।জাসমিনকে দেখতে পেল না। ওর মা বলে উঠল

---জাসমিন স্কুলে গেল যে বেটা।কাল থেকে তুমিও যাবে কেমন?

বাবনের খুব ইচ্ছে হচ্ছে। স্কুলে যেতে।ওখানে সে ওর মত অনেক বন্ধু পাবে খেলার জন্য ।


---হ্যাঁ গো শুনছ?

---আমার ঘুম পাচ্ছে ।

---তুমি বড্ড ঘুম কাতুরে!..এদিকে লোকে ভাবছে,বউ-এর পীরিত খেতে তুমি আমাকে এনেছ?...তা দুটো কী কথাও শুনতে নেয়?

--শুনছি তো বলো না।

--হ্যাঁ গো ওই রফিউলদা আর ওর বউ সাবিনাদি কত ভালো মানুষ বলো?

---এটা তো সবাই জানে।এই কথাটা শোনার জন্য আমাকে জেগে থাকতে হবে?

---ওদের মেয়েটা জাসমিন ও কত ভাল!!

---খারাপ শুধু আমি।তাই তো?

---তুমি তো চিরদিনের হিংসুটে।...হ্যাঁ গো ওরা আর বাচ্চা নেয়নি কেন?

----চাইলে তো চার,পাঁচটা এসে যেত।..ওরা নেয়নি।ভালবাসাটা কী ছেলে,মেয়ের সংখ্যার উপর নির্ভর করে গো?

----তাহলে যে সবাই বলে।মুসলমান বউরা প্রতি বছর পোঁয়াতি হয়।

---আগে আমাদের মধ্যেও তাই ছিল।..এখন সবাই বুঝতে শিখেছে।ওরাই বরং সারাক্ষন আমাকে বলে।আর একটা নিতে।উল্টে আমি বললে তখন কত হিসেব শুনিয়ে দেয়।


পরেশের আজ পুরো দিন ছুটি।বাবন এক মাসের মধ্যেই অনেক কিছু শিখে গেছে।স্কুলে ম্যামদের মুখে সারাক্ষণ ইংরেজি কথা শুনে এখন বাড়িতে এসেও দু,একসময় ইংরেজিতে প্রশ্ন করে বসে।বীনা আমতা আমতা করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে।পরেশ কিন্তু খুব গুছিয়ে স্পষ্ট করে ইংরেজিগুলো উচ্চারণ করে ছেলের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেয়।আজ বাবনের মুখে একটা প্রশ্ন শুনে উত্তর না দিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেল।

  গতকাল বাবন আর জাসমিন একসাথে স্কুলের বেঞ্চে বসে টিফিন খাচ্ছিল।বাবন নিজের টিফিনের সুজিমাখাটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল।তার স্বাদ নাকি বিচ্ছিরি।তাই জাসমিনের বিরিয়ানিটা দুজনে মিলে খাচ্ছিল।তাই দেখে একজন ম্যাম চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করে

---তোমরা একসাথে কেন খাচ্ছ?

তাই শুনে জাসমিন উত্তর দেয়

----ইজ ওকে ম্যাম।...ইট সাফিসেন্ট ফর আশ্।

----বাট ইউ আর এ মুসলিম গার্ল।...বাবন ইজ এ হিন্দু বয়।ইজ রঙ্গ।ইউর মেনু ডিফারেন্ট টু হিম।...ইন ফিউচার ..ডোন্ট ইট।

জাসমিন ঘাড় নেড়ে সাই দিল। তারপর বাবনকে বলল

----আমরা আর সবার সামনে একসাথে খেতে পারব নারে।

বাবন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল

---কেন?

----আমি একজন মুসলমান আর তুমি হিন্দু।

বাবন তৎক্ষনাৎ মুখের উপর উত্তর দিয়েছিল

----নো আই এ্যম বাবন..এন্ড ইউ জাসমিন।

----বুদ্দু।...ওগুলো তো আমাদের নাম।আমাদের রিলিজেন ডিফারেন্ট।

বাবনের মাথায় কিছু ঢোকে না

----রিলিজেন মানে কী?

-----ধর্ম

-----ধর্ম মানে?

---তোমার ড্যাডকে জিজ্ঞেস করবে বুঝিয়ে দেবেন।

ওই প্রশ্নটাই বাবন তার বাবাকে আজ পড়তে বসে সকালেই জিজ্ঞাসা করেছে

---ধর্ম মানে কী?... আমি কেন জাসমিনের টেষ্টি খাবার ভাগ করে খেতে পারব না?

পরেশ মনে মনে ভাবছে।এবার তার ছেলে সত্যি সত্যিই শিক্ষিত হতে চাইছে।পরেশ কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না।... কিন্তু আজকাল বাবন তার প্রশ্নের উত্তর না পেলে আরও বেশি জিদ ধরে।তাই এড়িয়ে গেল না।

----ধর্ম মানে ভগবান।

---কিন্তু ভগবান একজন?

পরেশ কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। মনে মনে ভাবল।এ ছেলেকে আল্লার দোহায় দিয়ে বোঝান শক্ত ।তাই সোজা ভাবে বলে উঠল

----শোন বাবা।ও সব কিচ্ছু না।..তোদের ওই ম্যামটির বিরিয়ানি খেতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল।..তাই তোদের দেখে হিংসে হচ্ছিল।নিজে খেতে পাবে না। তাই তোদের ওভাবে মানা করছিল।...শোন, বাইরে সবাই না খুব হিংসুটে।তাই বাইরে সবাইকে দেখিয়ে খাওয়ার কোন দরকার নেই।..তোর যখন চাচির হাতের রান্না খেতে ইচ্ছে করবে সোজা চলে যাবি জাসমিনদের বাড়ি।..ওরা তোকে নিজের ছেলের মত করে খাওয়াবে।যত খুশি খেয়ে আসবি।..ওকে?..ক্লিয়ার?

বাবনের চোখে,মুখে একটা পরিতৃপ্তির হাসি ছলকে উঠল।..তাই দেখে পরেশ ভাবল।বাঁচা গেল।এইটুকু ছেলে এখন থেকে ধর্মের বিষ গিললে...শিক্ষিত আর কোনদিনও হবে না।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Inspirational