Tandra Majumder Nath

Romance


3  

Tandra Majumder Nath

Romance


ভালোবাসি

ভালোবাসি

26 mins 708 26 mins 708

পর্ব-১

-এই এই শ্রী একটু দাড়া না প্লিজ।বাড়ি থেকে বেড়োতেই শ্রীময়ী কে দেখে সায়ক দৌড়ে এলো।

শ্রীময়ী পেছন ঘুড়ে দাড়াতেই সায়ক সামনে এসে দাড়ালো। 

- আরে সায়ক, তুই আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কি করছিস?

-তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

-তুই কি ওয়াচম্যান?

-না

-তাহলে বাড়ির ভেতরেই তো যেতে পারতি।

বাইরে কেনো রে।

-না মানে তোকে একটা কথা বলার জন্য.......

-এই দ্যাখ সায়ক বেশি ক্যাবলামো করিস না বুঝলি। এমনি আজ আমার মাথা টা গরম হয়ে আছে।

-কেনো? কি হয়েছে?

-আজ আমার নবারুণের সাথে সন্ধ্যা সাতটায় ডেটিং ছিলো। এই স্বাধীন স্যার সব গন্ডগোল করে দিলো। ঠিক ছটায় টিউশনের স্পেশাল ক্লাসের জন্য যেতে বলেছে। ধ্যুত! ভাল লাগেনা।

-ও

-তাই এখন পড়তে যাচ্ছি, ওখান থেকে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে যাব। তুই আবার দেরী করে দিস না।

মোটা ফ্রেমের চশমাটা নাকের ডগা আসতেই চার আঙুল দিয়ে পেছনে ঠেলে দিয়ে, সায়ক বললো,

-শ্রী

-কি.....ই...রে, বিরক্তির সুরে বললো 

আর শ্রী শ্রী করছিস কেনো রে। আমার নাম শ্রীময়ী বুঝলি।

- শ্রী, সরি শ্রীময়ী তোর বেশী সময় নেবো না।  

একটা ছোট গোলাপের স্তবক শার্টের ভেতর থেকে বের করে সায়ক বললো

আজ ভ্যালেন্টাইন ডে তাই তোর জন্য নিয়ে এসেছি, এই নে বলে সামনে বাড়িয়ে দিলো।

শ্রীময়ী ফুলের স্তবক টা হাতে নিতেই সায়ক বললো

- হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে।

সায়কের ভীতু রকম মুখ টা দেখে শ্রীময়ী উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললো

- তুই একটা সত্যি আস্ত গাধা। ক্যাবলা তো ক্যাবলাই। এটা জানিস আজ ভ্যালেন্টাইন ডে। আর এটা জানিস না কোনো মেয়ে কে আজ গোলাপ দিয়ে কি বলতে হয়।

আবারো চশমাটা পেছন দিকে ঠেলে সায়ক বললো,

- সেটাই তো বললাম, হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে।

এটা শুনে শ্রীময়ী আবারো বিদ্রুপের হাসি হাসতে থাকে।

-আরে ক্যাবলা আই লাভ ইউ বলতে হয় বুঝলি।

-কিন্তু সেটা তো প্রোপোজ ডে তে বলে। 

শ্রীময়ী অনবরত বিদ্রুপের হাসি হাসতেই থাকে

 -ও বাব্বা তুই এটাও জানিস নাকি, যে প্রোপোজ ডেও আছে। যতটা তোকে বোকা ভাবি ততটা তুই নোস। 

সায়ক দাঁত বের করে একটা ক্যাবলামোর হাসি হাসে।

-এই তুই এখন যা, বলেই শ্রীময়ী হাঁটা দেয়।

সায়ক শ্রীময়ীর পিছু নেয়,

কিছুদূর যেতেই,

শ্রীময়ী পেছন ফিরে তাকিয়ে বিরক্তির সুরে বলে ওঠে,

-কি.....ই....রে, কি হোলো আবার আসছিস কেনো?

-না মানে, বলছি, তুই আজ হেঁটে যাচ্ছিস? স্কুটি টার কি কোন সমস্যা.......

সায়ক কে বাধা দিয়ে শ্রীময়ী বলে ওঠে,

এই জন্য আমি তোকে ক্যাবলা আর আহাম্মক বলি বুঝলি।

সায়ক আবারও নাকের ডগায় আসা চশমা টা ঠেলে দিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

শুনছিস যে আমার নবারুণের সাথে আমার ডেট আছে। আমি পড়া শেষ করেই আমি ওর সাথে দেখা করতে যাব, আমি স্কুটি নিয়ে গেলে অসুবিধে হবে।আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু না বলেই বলে উঠলো, 

ধ্যুত! তোর সাথে কথা বলাই বেকার।

মেইন রোডে এসে শ্রীময়ী ট্যাক্সির জানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

-ট্যাক্সি! ট্যাক্সি! 

 শ্রীময়ী ডাকতে থাকে, 

কোন ট্যাক্সিই দাঁড়ায় না।

অবশেষে একটি ট্যাক্সি দাঁড়ায়।

-দাদা, পি.সি. শর্মা মোড় যাবেন।

-না দিদি, ওদিক টায় যাব না। আর তাছাড়া আমি কেনো ওদিক টায় আজ কোন ট্যাক্সিই যাবে না।

-কেনো? যাবে না কেনো?

-আসলে আজ ওদিকটায় পথসভা হচ্ছে, তাই সাইকেল আর পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

-কি! কি বলছেন আপনি? 

ট্যাক্সি চালক কোন উত্তর না দিয়েই চলে যায়।

-ওহ গড, এখন কি হবে, ধ্যাত ভাল লাগে না। পড়তেই বা এখন যাব কি করে, আর না গেলেও তো......

ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং

হঠাৎ সাইকেলের বেলের আওয়াজে শ্রীময়ী পেছন ফিরে তাকায়।

-ওপস আবার তুই, তুই এখনো যাসনি।এই তোর জন্য, এই তোর জন্য বুঝলি তোর মুখ দেখলাম বলেই আমার সাথে এসব হচ্ছে বুঝলি।

শ্রীময়ী হাটতে থাকে।

সায়ক তার সাইকেলটা নিয়ে শ্রীময়ীর পিছু পিছু যেতেই,

-কি চাস বলতো তুই?

-না বলছি, তুই যদি কিছু না মনে না করিস আমি কি তোকে তোর স্যারের বাড়ির পৌছে দেবো।

-কি? কি বললি তুই? তোর তো সাহস কম না, তোর সাইকেলে আমি যাব? তোর কাছ থেকে গোলাপ টা নিয়েছি বলেই আমাকে তোর গার্লফ্রেন্ড ভাবছিস নাকি।

সায়ক চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

-না, মানে 

রাগ করিস না প্লিজ। সরি হ্যাঁ

শ্রীময়ী হাটতে থাকে,

নাহ এতোদূর হেঁটে যাওয়া সম্ভব না, আবার ট্যাক্সিও যাবে না। এখন যদি আবার বাড়ি গিয়ে স্কুটি আনতে যাই তবে মা তো বকা দেবেই আর আমার দেরীও হয়ে যাবে, আচ্ছা সায়কের সাইকেলে তো যাওয়াই যায়। ও তো হ্যাবলা একটা, কিন্তু ছেলে টা তো ভালোই, হুম ওকেই বলি নিয়ে যেতে, মনে মনে ভাবতে থাকে শ্রীময়ী।

পেছন ফিরে সায়ক কে ডাকবে, কিন্তু পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে, সায়ক নেই।

-যাহ ছেলে টা চলে গেলো।

যাও একটা আশা ছিলো তাও হারিয়ে গেলো।

ঠোঁট কামড়াতে থাকে শ্রীময়ী।

ক্রিং ক্রিং ক্রিং

শ্রীময়ী চমকে ওঠে আবার পেছন  ফিরতেই দেখে সায়ক দাঁড়িয়ে।

-তুই কি ম্যাজিক জানিস নাকি? এইতো আমার পেছনে ছিলিস, আবার সামনে গেলি কেমন করে।

-তোর পাশ দিয়েই তো গেলাম, তুই তো মাথা নীচু করে হাটছিস তো হাটছিস।

-ওহ, ঠিক আছে চল। 

-কোথায়?

-ওপস, মাথা মোটা স্যারের বাড়ি আর কোথায়।

-সত্যি, আয় তবে পেছনে বোস।

শ্রীময়ী সায়কের সাইকেলে চড়ে বসে।

 

পর্ব-২

-কি রে? এতো ধীরে চালাচ্ছিস যে? কোন মতলব আছে নাকি তোর?

-এ হে না না, ঠিক আছে, জোড়ে চালাচ্ছি। তুই ভয় পাবি না তো?

-এই শোন, এটা সাইকেল হ্যাঁ, মোটর সাইকেল নয় যে জোড়ে চালালে ভয় পাবো।

সায়ক জোড়ে সাইকেল চালাতে থাকে, শ্রীময়ী ভয় পেয়ে যায়, এই বুঝি পড়ে যাবে তার মনে হয়, কিন্তু কিছু বলা যাবে না তাই দাঁতে দাঁত চিপে চোখ বন্ধ করে থাকে, আর ডান হাত দিয়ে সায়কের শার্টটা আঁকড়ে ধরে থাকে।

-কিরে ভয় পাচ্ছিস না তো?

-ক...ই... না...হ

এই তুই চালাতো, আধভাঙা গলায় বলে ওঠে শ্রীময়ী।

একেবারে স্যারের বাড়ির সামনে শ্রীময়ীকে নিয়ে সায়ক এসে দাঁড়ায়। 

-কি রে থামলি কেনো?

চোখ বন্ধ করেই শ্রীময়ী বলে।

-আরে তোর স্যারের বাড়ি চলে এসছি তো।

এবারে শ্রীময়ী চকিতেই চোখ খুলে দেখে স্যারের বাড়ি চলে এসেছে।

-তুই দেখিস নি, তুই কি চোখ বন্ধ করে ছিলিস না কি?

-কি? আ..আ..মি..কো...থায় চোখ বন্ধ করেছিলাম। এই বেশী কথা বলিস না তো।

আবারও আমতা আমতা করে বলে ওঠে শ্রীময়ী।

তুই এখন যা তো, এখনই আমার বন্ধুরা চলে আসবে, তোকে দেখলে উল্টো পালটা কথা বলবে।

শ্রীময়ী স্বাধীন স্যারের পড়ার ঘরে চলে যায়।

সায়ক চুপ করে থাকে।

-এই শ্রীময়ী, বাইরে সায়ক দা কে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে। তোকে নিয়ে এলো নাকি রে? 

শ্রীময়ীর বন্ধবী মন্দিরা ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করে ওঠে।

ওপস ইডিয়ট টা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে মনে মনে বলে ওঠে শ্রীময়ী। 

-কি? সায়ক? ওই হ্যাবলাটা? আমি কি করে জানবো ও বাইরে কেনো দাঁড়িয়ে আছে।

-এমন করে বলিসনা শ্রীময়ী, সায়ক দা একটু আন স্মার্ট হতে পারে কিন্তু বড্ড ভালো ছেলে এটা তুইও জানিস। ও তোর কতো হেল্প করে বলতো, তুই যখনি সমস্যায় পড়িস এই সায়ক দাই কিন্তু তোকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে, আর তুই......

শ্রীময়ী মন্দিরা কে থামিয়ে দিয়ে বলে,

-ও, ও আমার হেল্প করে বলে কি তোর হিংসে হউ নাকি রে?

তোদের ওই ক্যাবলাটা কে নিয়ে এতো আদিখ্যেতা দেখলে না সত্যি বলছি আমার গা পিত্তির জ্বলে যায় একবারে।

বিরক্তির সুরে বলে ওঠে শ্রীময়ী। 

- যাহ বাবা, আমি আবার কি বললাম। 

অবাক হয়ে সুর টেনে মন্দিরা বলে ওঠে।

স্বাধীন স্যারের ক্লাস চলতে থাকা কালীন তার মাঝেই শ্রীময়ী পড়া থামিয়ে হঠাৎ বলে ওঠে,

-স্যার আমি আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি যাব?

-কেনো? 

-আসলে স্যার মায়ের শরীরটা খুব একটা ভালো নেই তাই....

-ওহ, তাই নাকি? ঠিক আছে যাও 

সাবধানে যেও।

সরি মা, তোমার নামে মিথ্যে বলতে হোলো, এই মিথ্যেটা না বললে তো আমি আজ নবারুনের সাথে দেখাই করতে পারবো না। 

মনে মনে শ্রীময়ী চোখ বন্ধ করে বলে ওঠে। । 

হন্তদন্ত হয়ে ক্লাস থেকে বেড়িয়ে এলো শ্রীময়ী।

বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে, সরু গলিপথ তাই খুব একটা জনমানব নেই। 

শ্রীময়ীর ফোনটা বেজে ওঠে। 

-হ্যালো, কি ব্যপার কি তুমি কখন আসবে?

-ওহ ডার্লিং, তুমি কি তৈরী একদম।

ফোনের ওপার থেকে নবারুন বলে ওঠে।

-আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, চলে এসো তাড়াতাড়ি। আমার খুব ভয় করছে কেউ যদি দেখে ফেলে। তুমি গাড়ি নিয়ে আসছো তো।

-আরে, প্যায়ার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া। ডোন্ট ওরি বেবস। আই অ্যাম জাস্ট কামিং। হ্যাঁ গাড়ি নিয়েই আসছি।

-ওকে, 

শ্রীময়ী ফোনটা রেখে দেয়।

এবার রাস্তার মধ্যেই পায়চারী করতে থাকে শ্রীময়ী।

  

 ক্রিং ক্রিং ক্রিং

শ্রীময়ী চমকে ওঠে,

পেছন ফিরতেই দেখে সায়ক দাঁড়িয়ে।

-কি রে তুই যাস নি এখনো? 

অবাক হয়ে শ্রীময়ী প্রশ্ন করে।

সায়ক নির্বাক হয়ে মাথা নাড়ায়।

-কেনো যাসনি সেটা কি জানতে পারি?

দাঁত কটমটিয়ে ওঠে শ্রীময়ী

-না, মানে,তুই তো স্কুটি আনিসনি, কি করে যা...বি...

সায়ক শ্রীময়ীর বড় বড় চোখ গুলির দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারে না।

-এই শোন তোকে না এতো ভাবতে হবে না। নবারুণ গাড়ি নিয়ে আসবে, আমি ওর সাথে গাড়িতেই যাব।

-ওহ, আমি তো বুঝতে পারিনি।

-তা বুঝবি কেনো? ঘটে বুদ্ধি থাকলে তো বুঝবি।

এখন যা। তুই এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে নবারুণ দেখলে খারাপ ভাবতে পারে।

-নাহ, যাব না, তুই এতোক্ষণ একা দাঁড়িয়ে  থাকবি নাকি। জায়গাটা খুব একটা ভালো না।

গাড়ি এলে আমি চলে যাব।

এটা কিন্তু সত্যি কথাই, আমারও কেমন যেন একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে না। কেউ নেই রাস্তায় গা টা ছম ছম করছে। সায়ক থাকলে একটু সাহস পাবো।

 ওপস ছেলেটা কে যতটা খারাপ ব্যবহার করি ও কিন্তু আমায় সবসময় হেল্প করে। 

নির্বাক হয়ে মনে মনে শ্রীময়ী বলতে থাকে।

সামনে তাকাতেই হঠাৎ দেখে সায়ক নেই।  

-সায়ক, এই সায়ক কোথায় গেলি? 

শ্রীময়ী ভীতস্বরে ডাকতে থাকে। 

ক্রিং ক্রিং ক্রিং

শ্রীময়ী দেখতে পায় সায়ক একটু দূরে অন্ধকারের দিকে দাঁড়িয়ে।

-ওখানে কি করছিস। এদিকে আয়।

-আরে চিন্তা করিস না, আমি এখানেই আছি। তোর বন্ধুর গাড়ি এলেই আমি চলে যাব।

শ্রীময়ী কোন উত্তর করে না, 

মনে মনেই সায়কের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করে।

কিছুক্ষণ পর আলো ছড়িয়ে একটি গাড়ি এসে দাঁড়ায়।

এতোক্ষণ যার জন্য অপেক্ষা করছিল শ্রীময়ী কিন্তু এখন সে যখন উপস্থিত তবুও কেনো যেন তার যেতে মন চাইছে না।

-ডার্লিং, প্লিজ কাম, বলেই নবারুণ গাড়ির দরজাটা খুলে দেয়।

শ্রীময়ীও পেছনে নবারুণের সাথে বসার জন্য গাড়িতে উঠতেই সে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সায়কের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। 

সায়ক তাকে হাত দেখায়, 

শ্রীময়ী গাড়িতে বসতেই, নবারুন ড্রাইভারকে গাড়ি চালানোর নির্দেশ দেয়।

ধোঁয়া উড়িয়ে যাওয়া গাড়িটির চলে যাওয়ার দিকে সায়ক নিষ্পলক দৃষ্টিতে   তাকিয়ে থাকে।

পর্ব-৩

-এতো দূরে কেনো বসেছো? কাছে এসে বোসনা ডার্লিং,নবারুণ শ্রীময়ীর হাত টা টেনে নিজের কাছে নেয়।

শ্রীময়ী হাত টা সড়িয়ে নিয়ে বলে, 

-দূরে কোথায়, এইতো কাছেই আছি।

-ওহ প্লিজ, গেয়ো মেয়েদের মতো ভাব কোরনা তো, ইউ আর আ মর্ডান গার্ল।

-তবুও নবারুণ, আমার এসব ভালো লাগে না।

-কি ভালো লাগে না ডার্লিং, আমরা তো লাভার তবে অসুবিধে কোথায়? আমি কি তোমাকে একটু টাচ করতে পারি না।

-কেনো টাচ করলেই কি ভালোবাসা হয় নাকি, ভালোবাসা তো মনের মিল তাই না?

-ওহ প্লিজ, ওই কাব্যের বাণী গুলো দিও না তো।

নবারুন একটু তিক্ত স্বরে বলে ওঠে।

-কেনো বাণী কেনো হবে। টাচ করা, বেশী গায়ে ঘেষে প্রেম এসব আমার একদম পছন্দ না নবারুণ।

-মানে? এগুলো নাহলে কি প্রেম হয় নাকি

তুমি দেখছি পোশাকেই মডার্ণ মন থেকে মডার্ণ হতে পারোনি।

বিরক্তির সুরে বলে ওঠে নবারুণ।

-সে যাই হোক, আমার এসব পছন্দ হয়না তো হয় না। ভালোবাসি তোমাকে, আর যা হবার বিয়ের পর, তার আগে কিচ্ছু নয়।

তুমি অনেক জোর করেছো বলেই আমি আজ অনেক কষ্ট করে আসতে বাধ্য হয়েছি।

এরপর এভাবে রাতে আমি বেড়োতে পারবো না।

কারণ সামনে আমার ফিউচার, আমাকে পড়াশোনা করতে হবে।

-হোয়াট রাবিশ, ডিসগাস্টিং গার্ল ইউ আর।

সো বোরিং, আমি তো ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে আমি প্রায়ই রাতে বেড়োবো।

-কি বললে? কি বললে তুমি?

-নাহ কিছু না ডার্লিং, আমাদের সম্পর্কের একমাস হোলো, তবুও তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছোনা দেখে খারাপ লাগছে।

-এক মাস, ওনলি একমাস নবারুণ। একবছরও হয়নি। আমি তোমাকে ঠিক করে চিনিও নি, আর তার মধ্যে তুমি আমাকে এমন অফার করবে ভাবো কি করে, যে আমি তোমার গা ঘেষে চলবো, রাতের বেলা ঘুড়তে বেড়োবো, আজ বেড়িয়েছি কারণ আজ একটা অন্যরকম দিন তাই, নইলে....

নবারুন কোন কথা বলে না, চুপ করে জানালা দিয়ে মুখ বের করে বাইরে তাকিয়ে থাকে।

-কি হোলো কিছু বলছো না যে? 

নবারুণ তবুও নির্বাক।

এবারে শ্রীময়ী নবারুণের কাঁধে হাত দিতেই নবারুণ হাত খানা সরিয়ে দেয়।

-কি হোলো?

-নাহ আমারই মেয়ে চুজ করতে ভুল হয়েছে। 

মুখ না ঘুড়িয়েই নবারুণ উত্তর করে।

-কি? কি বললে? ঠিক আছে ভুল যখন হয়ে গেছে তখন আমি নেমে যাচ্ছি। তোমার যোগ্য মেয়ে খুঁজে নিও।

আমি আর যাচ্ছি না তোমার সাথে।

ড্রাইভার গাড়ি থামাও।

-আরে কি হোলো কি রাগ করছো কেনো? সরি সরি ডার্লিং ভুল হয়ে গেছে। ঠিক আছে আমি তোমাকে টাচ করবো না ওকে, প্লিজ

শ্রীময়ী গাড়ি থেকে নামতে যাবে এমন সময় নবারুণ শ্রীময়ীর হাত টেনে ধরে।

শ্রীময়ী নবারুণের দিকে তাকাতেই, নবারুণ হাত টা ছেড়ে দেয়। 

-সরি, ডোন্ট মাইন্ড প্লিজ, ড্রাইভার চলো।

গাড়ি চলতে থাকে।

-কোথায় যাচ্ছি আমরা? 

শ্রীময়ী মুখ ভাড় করে প্রশ্ন করে।

-না না ডার্লিং, সেটাতো সারপ্রাইজ বলা যাবে না। 

-তবুও, 

-নাহ একদম না।

তুমি প্লিজ আমার কথায় রাগ কোরনা। সরি

শ্রীময়ী মাথা নাড়িয়ে সন্মতি জানায়।

কিছুক্ষন পর গাড়িটি একটি বড় হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ায়।

-একি কোথায় নিয়ে এলে আমাকে?

শ্রীময়ীর মনটা কেমন যেন করতে থাকে।

-ডার্লিং প্লিজ ওয়েট, 

ড্রাইভার তুমি গাড়িটা পার্কিংয়ে রেখে নিজের কোন কাজ থাকলে করতে পারো।  

আমাদের ফেরার সময় হলে তোমাকে ফোন করে নেবো।

দুজনেই গাড়ি থেকে নামতেই ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে যায়। 

–বলো না নবারুণ এখানে কেনো নিয়ে এলে?

-আরে তুমি তো বড্ড প্রশ্ন করো ডার্লিং।

তোমার সারপ্রাইজ টা তো এখানেই।

শ্রীময়ী লক্ষ্য করছিলো হোটেলের সবাই কেমন যেন তার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। শ্রীময়ী কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করছিলো।

-নবারুণ প্লিজ এখান থেকে চলো, আমার ভালো লাগছে না এখানে। 

শ্রীময়ী নবারুণের হাতটা আলতো করে ধরে নীচু স্বরে বলে ওঠে।

নবারুণ এবার হাতখানা ছাড়িয়ে তিক্ত ও সামান্য উচ্চস্বরে বলে ওঠে,

-ওহ প্লিজ, বেশী ক্যাবলামো কোরনা তো। ডিসগাস্টিং,

কথাগুলো যেন তীরের মতো গিয়ে শ্রীময়ীর বুকে বিদ্ধ হোলো। শ্রীময়ী লক্ষ্য করে সবাই ঘুরে ঘুরে তার দিকে তাকাচ্ছে।

চোখ দুটো তার ছলছল করে ওঠে, কলেজের সবথেকে সুন্দরী আর স্মার্ট মেয়ে কে যখন কেউ এমন কথা বলে সেটা যে কতো কষ্টের,

শ্রীময়ী ভাবতে থাকে সায়ক কে সে কতোবার ক্যাবলা হ্যাংলা বলেছে সেও নিশ্চই এমনই কষ্ট পেয়েছে।

-এক্সকিউজ মি, স্যার, বলছি যেমনটা করতে বলেছিলাম তেমনই করা আছে তো।

নবারুণ ফিসফিসিয়ে কথাটা বললেও  শ্রীময়ীর কানে সে কথা পৌছে যায়।

-ইয়েস স্যার, আপনার রুম রেডি, এই নিন চাবি।

-কি? রুম? রুম কেনো, না না আমি কোন রুমে যাব না। আমার দরকার নেই কোন সারপ্রাইজের।

শ্রীময়ী মনে মনে ভাবতে থাকে। 

নবারুণ শ্রীময়ীর চোখের সামনে তুড়ি মেরে বলে, 

-কি ডার্লিং কি এতো ভাবছো? চলো 

-না নবারুণ, অনেক দেরী হয়ে গেছে আমি বাড়ি যাব, প্লিজ

শ্রীময়ীর দিকে নবারুণ চোখ বড় বড় করে তাকায়, শ্রীময়ী কিছু বলতে পারে না।

-চলো বলছি, 

নবারুণ হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়।

শ্রীময়ী অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা বাড়ায়।

দুজনেই ওপরে ওঠে, এবং নবারুণ একটি রুমের সামনে গিয়ে শ্রীময়ীর উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে বলে, 

-এসো, ডার্লিং, ভেতরে এসো

শ্রীময়ী কোন উত্তর করে না।

ধীর গতিতে পা বাড়ায়।

নবারুণ দরজা খুলেই বলে ওঠে,

-ট্যান...টে...না, তোমার সারপ্রাইজ হাজির।

ভেতরে ঢুকেই শ্রীময়ী অবাক হয়ে যায়।

পর্ব-৪

...ভেতরে ঢুকেই শ্রীময়ী দেখতে পায়,চারিদিকে রকমারি বেলুন ছড়িয়ে আছে, ঘরময় আলোর রোশনাই, রংবেরঙের রিবন দিয়ে সাজানো। গোলাপ রজনীগন্ধার সৌরভ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

-ছিঃ, আমি এতোক্ষণ নবারুনের সাথে কতো খারাপ ব্যবহার করছিলাম, আর ও আমার জন্য কতো আয়োজন করেছে। আর শুধু শুধু.....

মনে মনে শ্রীময়ী বলে বলে ওঠে।

-ডার্লিং, সারপ্রাইজ কেমন লাগলো? 

উচ্চস্বরে নবারুণ বলে ওঠে।

-আমার খুব খুব পছন্দ হয়েছে নবারুণ। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ওঠে শ্রীময়ী।

এবার নবারুণ কাছে এসে শ্রীময়ীর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় আরও সামনে, 

-তোমার জন্য আরো সারপ্রাইজ আছে ডার্লিং।

-আরো? আরো সারপ্রাইজ?

আনন্দিত হয়ে ওঠে শ্রীময়ী।

-একদম, এসো

নবারুণ একটি বড় কেক সামনে রাখে। তাতে হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে লেখা।

-নাও, এবার এই কেক টা কেটে আমাদের প্রথম প্রেম দিবস ও আমাদের সম্পর্কের শুরু করো।

নবারুণ শ্রীময়ীর হাতে ছুড়ি টা দিয়ে বলে।

শ্রীময়ীও খুশি ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

দুজনে মিলে কেক কাটে, তখনই বেলুন ফেটে চারিদিকে রঙ বেরঙের কাগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।

সারা ঘরময় শ্রীময়ী ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে।

-এসো ডার্লিং, আজ আমরা কিছু স্পেশাল ডিশ খাবো, স্পেশাল দিনের জন্য।

নবারুণ শ্রীময়ী কে চেয়ারে নিয়ে গিয়ে বসায়।

টেবিলে নানা ধরণের খাবার সাজানো। 

নবারুণ শ্রীময়ীকে খাবার পরিবেশন করে। 

-ওয়াও, এত্ত খাবার, এ যে সব আমার প্রিয়,  

উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে শ্রীময়ী।

-ইয়েস ডার্লিং, আর একটা সারপ্রাইজ আছে,  

-কি? আরো সারপ্রাইজ

চোখ গুলো বড় বড় করে বলে ওঠে শ্রীময়ী।

- হুম, তুমি আমার গার্লফ্রেন্ড, আর তাই তোমাকে খুশি করতে আমি সব করতে পারি।

-ওহ, নবারুণ, আমি এসবেই অনেক খুশি হয়েছি। দারুণ কাটছে আমার আজকের সন্ধ্যা। নবারুণ নির্বাক হয়ে একটি মুচকি হাসে।

-কি হোলো হাসছো যে? সরি নবারুণ, তখন ওমন ব্যবহার করার জন্য। আসলে আমার...

-ইটস ওকে বেবি, 

নবারুণ শ্রীময়ীর কথায় বাধা দিয়ে বলে ওঠে।

কিছুক্ষণ পর

-সো, আমাদের কেক কাটা কমপ্লিট,

- হুম

-আমাদের সারা ঘরময় ঘুরে দেখা কমপ্লিট

- হুম

-আমাদের তোমার পছন্দের খাবার খাওয়া কমপ্লিট।

- হ্যাঁ বাবা হ্যাঁ, কেনো আর কিছু বাকি আছে নাকি?

শ্রীময়ী আনন্দিত হয়ে বলে।

-অব্বিয়েসলি ডার্লিং,

এতক্ষণ যা যা করেছি সবটাই তোমার পছন্দ মতো। 

শ্রীময়ী মাথা নাড়ায়।

এবার আমার পছন্দ মতো তোমাকে জাস্ট একটা কাজ করতে হবে।

রিকোয়েস্ট বলতে পারো।

-আরে এভাবে বলছো কেনো? বলো না কি করতে হবে?

-আগে বলো করবে?

-তুমি আমার জন্য এত্ত আয়োজন করেছো আর আমি তোমার জন্য কিছু করবো না তাই হয় কখনো। বলো না কি?

-কিছুই না, আমার পছন্দের পাইনঅাপেল জুস, শুধু তোমার জন্য, তোমাকে এটা খেতে হবে, প্লিজ না কোরনা।

-ওহ এই তোমার রিকোয়েস্ট?

এমন ভাবে বলছো না জানি কি?

-কেনো তুমি কি ভেবেছিলে? 

-না না কিছু ভাবিনি, এ আর এমন কি? দাও

হাসিমুখে শ্রীময়ী বলে। 

নবারুণ শ্রীময়ীর হাতে গ্লাস টা দেয়।

শ্রীময়ী চুমুক দেবে তখনই সে এক কেমন গন্ধ অনুভব করে।

-এটা কি নবারুণ?

ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে শ্রীময়ী।

-কেনো? পাইন আপেল জুস, আমার খুব পছন্দের। খাও না

-না নবারুণ তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে। এটা জুস নয় অন্যকিছু হবে।

-ওপস, ডার্লিং, বড্ড বেশী কথা বলো তুমি। আমার জন্য এইটুকু করতে পারবে না। এই ভালোবাসো তুমি আমাকে?

-এখানে ভালো না বাসার কথা উঠছে কেনো? আমার মনে হয় এটা জুস নয়।

এবারে নবারুণ নিজের রাগ সামলে মিষ্টি হাসি ঠোঁটে নিয়ে বললো,

-প্লিজ ডার্লিং, না কোরনা। আমার খারাপ লাগছে, অল্প খাও।

শ্রীময়ী আবারও চুমুক দিতে নেয়, কিন্তু পারে না।

-নাহ এ হবে না আমার দ্বারা।

সরি নবারুণ, খুবই বিশ্রী গন্ধ এটার থেকে।

-তুমি কি করে বুঝলে, এটা জ্যুস নয়? এই জ্যুসটার এমনই গন্ধ।

-অসম্ভব এটা জ্যুস নয়, কারণ গত কালী পূজোর রাতে সায়কের শরীর থেকে ঠিক এমন গন্ধই পেয়েছিলাম।

-সায়ক? কে সায়ক, মানে কি বলছো তুমি?

-হ্যাঁ নবারুণ, গতবার কালীপূজোর রাতে পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা জোর করে যেন কি খাইয়ে দিয়েছিলো, তারপর সায়কের সে কি অবস্থা, তখন ওর গাঁ থেকে এমনই গন্ধ পেয়েছিলাম।

-কিসব বলছো তুমি? কে এই সায়ক? কোন মাতাল নাকি?

-মানে? কি বলছো? সায়ক আমার বন্ধু।

-বন্ধু না অন্যকিছু... কে জানে

-কি? কি? কি বলছো তুমি, আর তুমি কি শব্দ বললে মাতাল?

মানে মাতাল কাকে বলছো? তার মানে এটা কি কোন....... 

-তুমি বড্ড বেশী মাথা ঘামাও ডার্লিং,

বলেই নবারুণ শ্রীময়ীর হাত টেনে নিয়ে গিয়ে ভেতরের একটি ঘরে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়।

-একি এটা কি করছো তুমি?

শ্রীময়ী অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।

-ওহ সরি, তোমার কোথাও লাগেনি তো?

নবারুণ দুঃখিত হবার ন্যাকামি করে বলে ওঠে।

নবারুণও ঘরে ঢুকেই দরজার ছিটকিনি তুলে দেয়।

-একি এ কি করছো তুমি?

এবার শ্রীময়ী লক্ষ্য করে নবারুণের আসল মুখোশ।

 -আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে ড্রিঙ্ক করিয়ে অজ্ঞান করে নিজের মনের স্বাদ মেটাবো। 

কিন্তু নাহ, এখন দেখছি তোমার সাথে যা করার জ্ঞান থাকতেই করতে হবে।

-কি? কি করবে তুমি? আর দরজা বন্ধ করলে কেনো তুমি? 

-তোমার একটা দোষ আছে , কি বলোতো? বড্ড বেশী কথা বলো তুমি।

আমি ভেবেছিলাম, তুমি একটা বোকা, সাধারণ মেয়ে, যাকে খুব সহজেই আমার বিছানা পর্যন্ত আনতে পারবো, তবুও একমাস আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তোমাকে এই জায়গায় আনতে। 

-কি বলছো এসব? নবারুণ আমি তো, আমি তো নিজের কানকে বিশ্বাসই করতে পারছি না।

কান্না জড়ানো গলায় বলতে থাকে শ্রীময়ী।

এ সমস্তই তোমার সাজানো চাল ছিলো।

-একদম, তা নয়তো কি, কি ভাবছো তুমি আমি তোমাকে ভালোবাসি? 

হা হা হা হা হা, উচ্চস্বরে হাসতে থাকে নবারুণ।

-কিন্তু আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করেছি। ভালোবেসেছি। তবে তুমি কেনো করছো আমার সাথে এমন, কি অপরাধ আমার?

কাঁদতে কাঁদতে শ্রীময়ী বলতে থাকে।

নবারুণ শ্রীময়ীকে ধরতে যায়, কিন্তু শ্রীময়ী সারা ঘরময় জিনিস ছুড়তে থাকে আর চিৎকার করতে থাকে,

-বাচাঁও, কে আছো বাঁচাও আমাকে।

-চিৎকার করে কোন লাভ হবেনা, ডার্লিং, আমি রিসেপশনে বলে এসেছি, আমাদের রুমের দরজায় যেন, 

"ডোন্ট  ডিস্টার্ব আস" একটি কার্ড ঝুলিয়ে দেয়। তাই কেউ আসবে না তোমায় বাঁচাতে।

-আমাকে ছেড়ে দাও নবারুণ, আমি তোমার সামনে হাত জোড় করছি।

শ্রীময়ী কাঁদতে কাঁদতে নীচে বসে পড়ে।

নবারুণ ক্ষুধার্ত হিংস্র পশুর মতো শ্রীময়ীর দিকে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে।

শ্রীময়ীর আর্তনাদ দেওয়াল ভেদ করে বাইরে এসে পৌছয়না।


পর্ব-৫

নবারুণ ধীরে ধীরে ক্রমশ শ্রীময়ীর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে,

নবারুণ শ্রীময়ীর ঘাড়ে হাত রাখতেই, শ্রীময়ী তার দু হাতের সর্বশক্তি দিয়ে নবারুণের বুকে সজোড়ে ধাক্কা মারে, নবারুণ টাল সামলাতে না পেরে, মেঝেতে পরে যায়, শ্রীময়ী দৌড়ে এসে ঘরের ছিটকিনি খুলে বেড়িয়ে আসে, কিন্তু সামনের ঘর তো লক করা। আর সেটার চাবি নবারুণের কাছেই।

শ্রীময়ী ক্রমশ দরজা টা খোলবার চেষ্টা করে কিন্তু সে ব্যর্থ হয়।

নবারুণ টলতে টলতে ভেতরের ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে। শ্রীময়ী কান্না জড়ানো গলায় চিৎকার করতে থাকে, নবারুণ ক্রমশ তার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। শ্রীময়ী পিছিয়ে যেতে থাকে একসময় তার দেওয়ালে গিয়ে পিঠ ঠেকে যায়।

-আমাকে ছেড়ে দাও নবারুণ, আমি আজকের কথা কেউকে বলবো না। 

শ্রীময়ী হাতজোড় করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে।

-আরে কাঁদছো কেনো, ডার্লিং, শুধু কিছুক্ষণ সময়ের ব্যপার তারপর তো তোমাকে ছেড়েই দেবো।

শ্রীময়ী চোখ বন্ধ করে কাঁদতে থাকে।

নবারুণ শ্রীময়ীর শরীরের দিকে হাত বাড়াতেই,

সেই হাত কেউ ধরে ফেলে,

আর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে হাত তার পেছন দিকে মুড়িয়ে দেয়। 

নবারুণ আর্তনাদ করে ওঠে।

-কে? কে আপনি? 

দেখছেন না বাইরে বোর্ড লাগানো আছে, "ডোন্ট ডিস্টার্ব আস"। 

আপনার সাহস কি করে হয় আমার ঘরে পার্মিশন না নিয়ে ঢোকার,  

ছাড়ুন ছাড়ুন বলছি আমার হাত, আমি কিন্তু এবারে চিৎকার করবো।

উচ্চস্বরে নবারুন কথা গুলো বলতে থাকে।

-নিশ্চই, চিৎকার করুন, তাতে আমারই সুবিধা।

আর আমি কে? সেটা এখনই বুঝতে পারবেন।

শ্রীময়ী, 

শ্রীময়ীকে ডাকতেই শ্রীময়ী চোখ মেলে তাকায় আর কান্না জড়ানো গলায় বলে ওঠে,

-সায়ক, তুই এসেছিস? তুই সত্যি আমাকে বাঁচাতে এসেছিস। 

শ্রীময়ী ছুটে সায়কের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

সায়ক নবারুণের হাত ছেড়ে দিতেই, নবারুণ সায়ককে পালটা আক্রমণ  করে।

কিন্তু সায়ক সজোড়ে নবারুণের গালে ঘুষি মারতেই সে মুখ থুবরে মেঝেতে পড়ে যায়।

-তোর লজ্জা করে না, একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে যাচ্ছিলি, তোর বাড়িতে মা বোন নেই, তারাও তো মেয়ে নাকি। 

সায়ক উচ্চস্বরে বলতে থাকে।

-আমি ওকে জোড় করে আনিনি, এতে তো ওর ও সায় ছিলো।

দোষ শুধু আমার নয়।

নবারুণও বলতে থাকে।

-আরে জানোয়ার, ও তো তোকে বিশ্বাস করে, ভালোবেসে তোর কথায় রাজি হয়ে যায়, কিন্তু তুই.... মানে.... জাস্ট কিছু বলার নেই।

মেয়েদের সন্মান করতে জানিস না।

-ওর মত মেয়েকে সন্মান, বাজে মেয়ে একটা।

সায়ক নবারুন কে মেঝেতে শুইয়েই আরো কয়েক ঘা বসিয়ে দেয়।

-তোর বাড়িতে মা বোন নেই। তাদের সাথেও কি এমন করিস নাকি রে। 

-আপনার এতো দরদ কিসের ওই বাজে থার্ড ক্লাস মেয়ের জন্য। আজ কি ও আপনাকে বেড শেয়ার করতো নাকি। কে হয় ও?

কথাগুলি শুনে সায়ক মাথা ঠিক রাখতে পারে না, আরো কয়েক ঘা এলোপাথারি ভাবে নবারুণকে মারতে থাকে,

আর চিৎকার বলে ওঠে,

-ও আমার জীবনের প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। আমি ওকে খুব ভালোবাসি আর বিশ্বাসও করি। তাই আজ আমি তোর মতো ওর সন্মান নষ্ট করতে আসিনি ওর সন্মান বাঁচাতে এসেছি।

কথাগুলো শুনে শ্রীময়ী যেন মূর্তিমান হয়ে যায়। 

-ভদ্র বাড়ির মেয়েরা কখনো চেনা নেই জানা নেই এক অন্য পুরুষের সাথে এককথায় রাতে ঘুড়তে যেতে রাজি হয়ে যায় না, মিস্টার.....

ও যদি এতোই ভালো মেয়ে হয়, তাহলে ও এক কথায় চলে এলো কেনো আমার সাথে।

সায়ক নবারুণ কে আবার মারতে গিয়েও মারে না, কিন্তু শ্রীময়ীর গালে সপাটে এক চড় কষায়।

শ্রীময়ী কোন উত্তর করে না, শুধু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে আসে।

নবারুণ দৌড়ে পালাতে যায়, কিন্তু তার পলায়ন ব্যর্থ হয়, কারণ ততক্ষণে হোটেলের ম্যানেজার আরো কয়েকজন স্টাফ ছুটে আসেন। 

-থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার সায়ক, আপনি আমাদের যা উপকার করলেন, তার জন্য......

হোটেলের ম্যানেজারের কথায় বাধা দিয়ে সায়ক বলে ওঠে,

-ইটস ওকে স্যার, এদের মত কীট গুলো যতদিন এই সমাজে আছে ততদিন মেয়েরা বোধহয় একটু স্বস্তির শ্বাস নিতে পারবে না।

-আমরা পুলিশে খবর দিয়েছি, পুলিশও এখনি চলে আসবে।

নবারুণ চিৎকার করে বলতে থাকে, এটা আপনি ভালো করলেন না মিস্টার, আমি এর বদলা নিশ্চই নেবো। আপনি আমার অনেক বড় ক্ষতি করলেন।

তার কথার কোন উত্তর কেউ করে না।

ম্যানেজার ও আরো কয়েক জন নবারুণ কে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার সময়, নবারুণ বলে ওঠে,

-ম্যানেজার বাবু, আপনার সাথে আমার কিছু জরুরী কথা ছিলো। 

আপনি যদি একটু সময় দিতেন....

-ওহ, হ্যাঁ বলুন না

- না মানে,

সায়ক কিছু ইঙ্গিত করতেই, ম্যানেজার বাবু স্টাফদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন,

-আপনারা সবাই এই শয়তান টাকে নীচে নিয়ে যান, আর খেয়াল রাখবেন কেউ যেন জানতে না পারে, পুলিশ কে আমি হোটেলের সামনে দিয়ে আসতে বারণ করেছি। ওকে পেছনের কোন ঘরে গিয়ে রাখবেন। যান, আমি আসছি।

নবারুণ কে নিয়ে সকলে চলে যায়।

-হ্যাঁ বলুন মিস্টার......

-সায়ক, আমার নাম সায়ক মুখার্জি। 

আর ও শ্রীময়ী আমার ফ্রেণ্ড।

আসলে আমার আপনার কাছে একটি বিশেষ অনুরোধ ছিলো।

-হ্যাঁ বলুন না, আপনি আমাদের এত বড় উপকার করলেন আর তার জন্য আমি আপনার জন্য কি করতে পারি।

-আসলে, বলছি যে আজ যা ঘটলো মানে এখন যা ঘটলো দয়া করে এর মধ্যে আপনি আমাদের নাম টা পুলিশের সামনে আনবে না। প্লিজ স্যার, বুঝতেই পারছেন শ্রীময়ী একটি মেয়ে আর ও এখন কলেজে পড়ছে, ওর নাম এভাবে জানা জানি হলে.....

-আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু মিস্টার সায়ক... পুলিশ যদি আপনাদের সাথে দেখা করতে চায়, আর আপনারা তো অনেক বড় একটা কাজ করেছেন, তারপরেও....

-নাহ, ম্যানেজার বাবু, আপনি এটা একটু ম্যানেজ করবেন, আর আমরা যে এখানে এসেছি এসব যেন কোনভাবেই মিডিয়ায় না প্রকাশ হয়, এই অনুরোধ আপনার কাছে।

এইটুকু উপকার করুন আমার।

-ঠিক আছে, ঠিক আছে, এইভাবে বলছেন কেনো, আমি সব সামলে নেবো, চিন্তা করবেন না। 

নমস্কার।

সায়কও নমস্কার জানায়।

ম্যানেজার ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যেতেই, 

শ্রীময়ীর দিকে সায়ক তাকাতেই দেখে, শ্রীময়ীর চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বয়ে চলেছে।

- না.... মা....নে.... সরি, শ্রীময়ী 

আসলে তখন আমার মাথা কাজ করছিলো না তাই তোকে তখন চর মেরেছিলাম।

সরি। 

-ইটস ওকে, খুবই অস্পষ্ট স্বরে বলে ওঠে শ্রীময়ী

-তুই রাগ করেছিস আমি বুঝতে পারছি। মার না তুইও আমাকে যতখুশি চর মার না। এই শ্রীময়ী।

-না আমি রাগ করিনি। আমি অন্য কথা ভাবছি।

-রাগ করিস নি বললেই হোল। এই কি এত চিন্তা করছিস বল না? আমার তোকে চুপচাপ দেখতে একদম ভালো লাগে না। 

-আমি ভাবছি, ম্যানেজার বাবুর কথাটা শুনে,

-কোন কথাটা?

-ওই যে বললেন আমরা ওনাদের উপকার করেছি? কি উপকার করলাম আমরা?

-ওহ, এই ব্যপার, চল যেতে যেতে বলছি। এখানে আর বেশীক্ষণ থাকা আমাদের পক্ষে ভালো নয়।

শ্রীময়ী দরজার দিকে যেতেই সায়ক বলে ওঠে,

-শ্রীময়ী, দাড়া একটু

শ্রীময়ী দাঁড়িয়ে বলে ওঠে কি হোলো,

সায়ক সামনে এসে, 

পকেট থেকে রুমাল বেড় করে শ্রীময়ীর চোখ মুখ মুছিয়ে দেয়, একটি ছোট চিরুনী সবসময় সায়কের কাছে থাকে, সেটা বেড় করে শ্রীময়ীর চুল সুন্দর করে আঁচড়ে দেয়, আর ভেতরের ঘর থেকে বইয়ের ব্যাগ টা এনে কাধে ঝুলিয়ে দেয়।

-নে এবার চল। অগোছালো ভাবে বেড়োলে লোকে খারাপ ভাবতে পারে।  

এতোক্ষণ নির্বাক হয়ে নিষ্পলক দৃষ্টিতে শুধুই সায়ক কে দেখে যাচ্ছিলো শ্রীময়ী,

সায়কের কথায় সম্বিত ফিরে পেতেই মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ বেড়িয়ে আসে,

- হুম, 

দুজনেই ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যায়।


পর্ব-৬

দুজনে হোটেলটি ছেড়ে বেড়িয়ে এসে হাঁটতে থাকে। বিশাল জায়গা নিয়ে হোটেল তাই মেইন রোডে উঠতে সময় লাগছিলো।

কিছুক্ষণ নিরবতা বিরাজ তাদের মধ্যে।

প্রথমে সায়কই নিরবতা ভাঙে।

-বলছি যে, শ্রীময়ী কিছু খাবি? না...মা..নে বলছি যে তোর মুখটা শুকনো লাগছে তো।

ধীরে ধীরে শান্তভাবে সায়ক বলে। কারণ শ্রীময়ীর এমন নিরবতাকে সে খুব ভয় পাচ্ছিলো। সে ভালো করেই জানে যে শ্রীময়ীর এমন নিরবতা বজায় রাখার পরের পরিণতি কি হয়, যেন এক বিধ্বংসী ঝড় তার দিকে ধেয়ে আসছে।

সায়কের কথা শুনে শ্রীময়ী কোন উত্তর করে না দেখে সায়ক আবার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে,

-বলনা? কি....ছু......খা.... 

সায়ক 'বি' কথাটা শেষ করতে পারে না অমনি যেন এক মহাপ্রলয় আছড়ে পড়লো সায়কের ঘাড়ে।

শ্রীময়ী চিৎকার করে বলতে থাকে,

-হ্যাঁ, খাবোই তো। আজ আমার জন্মদিন না, 

না না আমার বিবাহ বার্ষিকী না, এই জন্য তোর মনে তো আর আনন্দ ধরছে না। আমার যে মনের কি অবস্থা তুই কি করে বুঝবি। তোর তো ক্ষিদেয় পেট যেন জ্বলে যাচ্ছে রাক্ষস কোথাকার। মাথা গরম করানোর কথা বলবি না একদম বলে রাখলাম। 

সায়ক সামনে এগিয়ে গিয়ে শ্রীময়ীর মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে ওঠে,

-স...স....স.... মেরী মা চুপ কর। রাস্তার মধ্যে এমন চিৎকার করতে নেই। মাথা ঠান্ডা কর না।

এবার তো রাস্তার লোকে আমাকে ইভটিজার ভেবে ক্যালাবে। আমার কথা তো একটু ভাব।

-কেনো? তোর কথা ভাববো কেনো? তুই আমার কথা ভাবিস? বুঝিস? 

-নাও ঠ্যালা, কিছুক্ষণ আগে যে তোর আমি এত্তবড় হেল্প করলাম সেটা? ঠিক সময়ে না পৌছলে তো...

-এই শোন, বেশী ভাব নিস না বুঝলি, সে তো আমি তোকে হোটেলে ঢোকার সময় ম্যাসেজ করেছিলাম বলে, নাহলে তুই  মোটেও আসতিস না।

-তবুও সঠিক সময়ে পৌছে তো গেছি। নাকি?

- হুম তা গেছিস?

এবারে শ্রীময়ী উচ্চস্বর থেকে একেবারে নীচু স্বরে সন্মতি জানায়।

-তাহলে একটা ধন্যবাদ জানাবি তা না আমার ওপরই রাগ ঝাড়ছিস।

শ্রীময়ী কিছু বলে না শুধু মুখটা ব্যাজার করে রাখে।

-আচ্ছা, শ্রীময়ী তুই কখন বুঝলি যে নবারুণ সুবিধের নয়।

এবারে শ্রীময়ী স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দেয়,

-আসলে, স্যারের বাড়ির সামনে থেকে আমি যখন নবারুণের গাড়িতে উঠি, তারপর থেকেই নবারুণ যেন আমার সাথে কেমন করছিলো। আমাকে টাচ করার চেষ্টা করছিলো, আমি বাধা দিলে ও রেগে যায়, তখনই আমি নেমে যেতে চাই কিন্তু ও সরি বলে তারপর সব স্বাভাবিক হয়ে যায়।

-ওহ, তারপর

-তখনই আমার কিছুটা সন্দেহ হয়। কিন্তু ওতো টা গায়ে মাখিনি ব্যপারটা।

তারপর যখন আমি নবারুণের সাথে হোটেলে ঢুকি তখন খেয়াল করলাম সবাই কেনো যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছিলো, আমি নবারুণকে বললাম যে আমি বাড়ি যাব, তাতেই ও আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে, তখনই আমি তোকে ম্যাসেজ করি যে.....

- গোল্ডেন স্টার হোটেল, প্রবলেম, হেল্প, প্লিজ কাম। কি তাই তো?

-একদম, কিন্তু, তারপর দেখলাম ও আমার জন্য অনেক সুন্দর আয়োজন করেছে। তখন আমার মনে হোলো আমি বুঝি নবারুণ কে বুঝতে ভুল করেছি, তাই তোকে আবার ম্যাসেজ করলাম।

-'নো প্রবলেম। ইটস ওকে'। হ্যাভ প্রবলেম, কল লেটার, ওয়েট।

-হ্যাঁ তাই, কারণ আমি ওতো ডিটেইলস লিখতে পারছিলাম।

- হুম আমি বুঝতে পারছিলাম। তুই নবারুণ কে লুকিয়ে ম্যাসেজ করছিলিস। তারপর,

-তারপর আর কি ও আমাকে ভেতরের ঘরে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দেয় আর আমার দিকে হিংশ্র পশুর মতো থাবা বসাতে এগিয়ে আসছিলো তখন ওকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়েই দরজা খুলে সামনের ঘরে এসে তোকে ফোন লাগাই....

আরে ফোন টা লাগিয়ে তো আর কাটিই নি 

বলেই জিন্সের পকেট থেকে শ্রীময়ী ফোন টা বের করে।

-আরে ডোন্ট ওরি, আমি কেটেছি কিন্তু তার সাথে সাথে আমি নবারুণ আর তোর মধ্যে যা কথা হচ্ছিলো সব টা কল রেকর্ডে আছে।

যদি কখনো প্রমাণের প্রয়োজন পরে তাই রেকর্ড টা সেভ করে রেখেছি।

-বাব্বা, তোর তো অনেক বুদ্ধি রে।

-হি হি, 

নাকের ডগায় চলে আসা চশমাটা ঠেলে দিয়ে হেসে ওঠে সায়ক।

-এবার বল

-কি বলবো?

-মাথায় মারবো গাট্টা, কি জানতে চাইছি তুই ভালো করে জানিস,

দাঁত কটমটিয়ে শ্রীময়ী বলে ওঠে।

-ওহ, হ্যাঁ বলছি

তাহলে শোন,

তুই ম্যাসেজ করার পর খুবই চিন্তায় পড়ে যাই, আমি হোটেলে আসি আর রিসেপশনে তোর নাম বলি, কিন্তু রিসেপশন থেকে বলে যে শ্রীময়ী নামে কেউ সেখানে আসেনি। আমি এটাও জানাই যে তোর সাথে নবারুণও ছিলো, কিন্তু রিসেপশন পুরো ব্যপারটাই অস্বীকার করে।

-কিন্তু রিসেপশনে যিনি ছিলেন তিনি তো নবারুণের সাথে ভালোই কথা বলছিলেন,

-হ্যাঁ, আসলে সেই ছেলেটি নবারুণের চেনা লোক ছিলো, যে এই হোটেলেই কাজ করে, সে তোদের আসল নাম ইচ্ছে করে রেজিস্টার করেনি, 

-কিন্তু কেনো? এতো প্যাঁচালো ব্যপার কেনো সেটাই তো বুঝছি না।

-ওপস, তুই চুপ করলে তবে তো বলবো।

- তারপর রিসেপশন যখন অস্বীকার করলো তখন আমার সাথে তাদের অনেক কথা কাটা হচ্ছিলো তারা ম্যানেজার কে ফোন করে, 

হোটেলের ম্যানেজার এলে আমি তাকে সবটা বলি, তোর এখানে আসা এবং তোর ম্যাসেজের কথা।

তখন জানি না তিনি কি চিন্তা করলেন, আমাকে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন।

আর তারপর যা বললেন শুনে তো আমার মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল।

সায়ক কথা বলতে বলতে থেমে যায়।

-কিরে? থেমে গেলি কেনো? বল? 

সায়ক একটি দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করে..

  

 (অন্তিম পর্ব)

ম্যানেজার বাবু বললেন যে, কয়েক মাস হোলো একটি ছেলেদের গ্যাঙ বেড়িয়েছে, 

যারা কি না সুন্দরী মেয়েদের নানান ভাবে নিজেদের প্রেমের জালে জড়িয়ে নেয়।

ছেলেদের প্রত্যেকের বয়স ২২-৩০ বছর। এদের অবশ্য বড় মাথাও আছে।

গ্যাঙের প্রত্যেকটি ছেলে যথেষ্ট সুন্দর ও শিক্ষিত, যে কারণে যে কোন মেয়ে সহজেই তাদের প্রেমের পড়ে যায়।

তারা মেয়েদের নানান অছিলায় কোন না কোন হোটেলে নিয়ে যায়, এবং ভালোবাসার অধিকার দেখিয়ে তাদের শরীর নিয়ে খেলে। 

মেয়েরা যাতে বাড়িতে কিছু না বলতে পারে তার জন্য তাদের ওই সময়ের ভিডিও করে রাখে, সেই ভিডিও ভাইরাল করার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন তাদের ব্যবহার করতে থাকে, পরে তাদের বাধ্য করা হয় দেহ ব্যবসায় নামানোর জন্য। তারা বেছে বেছে সুন্দরী মেয়েদেরই টার্গেট করে, কারণ এতে তারা কমিশন খুব ভালো পেতো।

এমন করে বহু মেয়ে মুখ দেখানোর ভয়ে আত্মহত্যা করেছে, কেউ বা সমাজে মুখ দেখানোর ভয়ে বাড়ি ছেড়েছে, আবার কেউ বা ভিড়েছে দেহ ব্যবসায়, তুই হয়তো খবরে পড়ে থাকবি কিছুদিন আগেই আমাদের পাড়ার সনাতন কাকুর ভাইঝি সুসাইড করে মারা গেছে সেও এই রকম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলো।

আর প্রতিটা হোটেলেই কারো না কারো সাথে এই গ্যাঙের পরিচয় আছে, তারাই হোটেলের রুমে গোপন ক্যামেরা লাগিয়ে রাখে আর প্রয়োজনে নাম গুলোও অন্য দিয়ে রাখে যাতে কেউ সহজেই বুঝতে না পারে। 

এতে অবশ্য হোটেল ম্যানেজার বা মালিকের কোন হাত নেই, কারণ তাদের কোটি কোটির বিসনেস আছে তাই এই সামান্য ভুল তারা করবেন না।

আর নবারুণ হোলো এই গ্যাঙেরই একজন, আর তার শিকার ছিলিস তুই, তোর সাথেও এমনই কিছু ঘটতে যাচ্ছিলো, কিন্তু ভগবান তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

তুই হয়তো ভাবছিস শিক্ষিত ছেলেরা কেন এসবে এলো।

তাহলে শোন এরা হোলো সেই সমস্ত ছেলে যারা উচ্চশিক্ষিত হয়েও কোন রকম চাকরি পায়নি, যোগ্যতা দিয়ে তো নয়ই, এবং অনেকে এমনও আছে ঘুষ দিয়েও পায়নি, সংসারের খরচ টানতে হিমশিম খাচ্ছিলো। ঠিক তাদের এ সময়ের দুর্বলতার সু্যোগ নিয়ে বড় রাঘব বোয়ালেরা এসব কাজ করে থাকে।

তাই ম্যানেজার বাবু আমাকে জানালেন যে অনেক দিন ধরেই পুলিশ গোপনে এই গ্যাঙকে ধরবার চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না কারন কোন মেয়েই সাহস করে কেউ কে কিছু বলেনি, আর প্রমাণেরও অভাব ছিলো,ম্যানেজার বাবুর কাছে এও খবর ছিলো যে তাদের গোল্ডেন স্টার হোটেলেও এমন কিছু ঘটতে পারে, সে জন্য সতর্ক থাকতে।

তাই তিনি আমার সাথে আলাদা ভাবে এই নিয়ে গোপনে কথা বলেন কারণ তিনি চাইছিলেন না তার হোটেলের বদনাম হোক।

আর আজকের ঘটনার পর নবারুণ কে যেমন হাতে নাতে ধরা গেছে, তেমনই কল রেকর্ডও আছে। আমি অবশ্য ম্যানেজার বাবু কে বলেছি, যদি খুব প্রয়োজন পড়ে তবেই রেকর্ডটা যেন পুলিশ কে দেয় নচেৎ নয়।

তবে তুই অনেক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিস রে।

কিরে চুপ করে আছিস যে, কিছু বল।

শ্রীময়ী কোন উত্তর করে না।

কিরে কি হোল, এই শ্রীময়ী,

সায়ক শ্রীময়ীর ঘাড়ে হাত রাখতেই শ্রীময়ী চমকে ওঠে।

-কি রে কি ভাবছিস? কি চিন্তা করছিস এতো?.

-নাহ মা...নে... কি সাংঘাতিক! 

শ্রীময়ীর গলা ধরে আসে, 

ওরা শিক্ষিত হয়েও কেনো এমন অসৎ ও বিপজ্জনক কাজে পা বাঁড়ায়, এতে তো ওদের বিপদ পদে পদে তাই না?

-সে জানি না, তারা কেনো রাজি হয়। কেনো তারা সহজেই অসৎ এর কাছে মাথা নোয়ায়, হয়তো তাদের পরিস্থিতিই এমন হয়েছিলো।

নাহলে এই যে জঙ্গী, আতঙ্কবাদীরা এদের সংগঠনের প্রত্যেকেই তো কম বেশী ইঞ্জিয়ার, তুখোড় বুদ্ধি তাদের তাহলে কেনো তারা এমন কাজে যুক্ত হোলো? কোন উত্তর আছে তোর কাছে।

শ্রীময়ী কোন উত্তর করে না। 

-যাই হোক, তুই এখন বিপদ মুক্ত। কোন ভয় নেই তোর।

ভগবান তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

- হুম ঠিকই বলেছিস, ভগবানই বটে, 

আর সেই ভগবানটা হলি তুই...

-মানে?

-মানে তুই না থাকলে.....

-এই পাগলি, চুপ কর তো। 

ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং

দুজনেই প্রায় চমকে ওঠে আর পেছন ফিরে তাকায়।

দেখে একটি বেশ মোটাসোটা লোক কি যেন চিৎকার করে বলতে বলতে জোড়ে সাইকেল চালিয়ে আসছে।

রাস্তার আলো আর অন্ধকারে লোকটার মুখটা অস্পষ্ট থাকায় বোঝা যাচ্ছিলো না।

তবে এতো জোড়ে সাইকেল চালানোয় লোকটার ভুড়িটা এমন ভাবে নড়ছিলো যা সত্যিই হাস্যকর, শ্রীময়ী তো সে দৃশ্য দেখে ফিক করে হেসেই ফেলে।

কিছুক্ষণ পর লোকটা একেবারে সামনে চলে এলে সায়ক বলে ওঠে,

-ওহ, আপনি? আমি তো একদম ভুলে গিয়েছিলাম।

-তুই চিনিস ওনাকে?

-আরে, হ্যাঁ, মানে ওনার দোকানেই তো তখন....

লোকটা ততক্ষণে কাছে চলে এসেছেন, সাইকেল থেকে নেমেই সায়কের কথায় বাধা দিয়ে বলে ওঠেন

-কি মশাই, আপনার কি ব্যপার বলুন তো?

আপনি কি পাগল নাকি?

লোকটার মাথা প্রায় চটে আছে বলেই মনে হচ্ছিলো।

-কি হয়েছে? কাকা, আপনাকে তো ঠিক...

শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করে।

-আরে দিদিমণি, কি বলবো আপনাকে

সেই যে সন্ধ্যের সময় আমার চায়ের দোকানে এলো এই দাদা। তারপর থেকে, চা খেয়েই যাচ্ছেন খেয়েই যাচ্ছেন প্রায় পনেরো কাপ চা খেলেন। চায়ের দাম চাইতে উনি দুশো টাকার নোট দিলেন। আমার চায়ের দাম হয়েছিলো দেড়শো টাকা। পঞ্চাশ টাকা ফেরৎ দেবো এমন সময় দেখি উনি নেই, আর সাইকেলটাও আমার দোকানে ফেলে এলেন?

-আপনার দোকান টা কোথায়?

-এইতো কাছেই, বড় হোটেলটার সামনে।

-আমরা তো এখনই সেখান থেকে এলাম।

-হ্যাঁ তাই তো বলছি দিদিমণি, আপনারা তো হোটেল থেকে বেড়োলেন, আমি তো দাদা কে দেখেই ভাবলাম উনি বুঝি সাইকেল আর টাকাটা ফেরৎ নিতে আসবেন, কিন্তু এলেন না।

আমি কতবার দোকান থেকে ডাকলামও কিন্তু আপনারা শুনলেন না।

-আমার একবার অবশ্য মনে হয়েছিলো কিন্তু ভাবলাম এখানে কেই বা ডাকবে..

কিরে সায়ক তুই কী বলতো?

-না...মা...নে একদম ভুলে গিয়েছিলাম। আমরা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে আসছিলাম তাই খেয়ালই করিনি।

চারপাশ টা একবার তাকিয়ে নিয়েই সায়ক বলে ওঠে, ও বাব্বা এতদূর চলে এসেছি কখন বুঝতেই পারিনি।

-সে যাই হোক আপনি আপনার সাইকেল ধরুন, আর এই নিন আপনার পঞ্চাশ টাকা। আমার দোকানে খদ্দের দাঁড়িয়ে আছে।

আমি চললুম।

লোকটা বেজায় চটে গেছেন দেখে সায়ক বলে ওঠে, আরে কাকা ওই পঞ্চাশ টাকা দিতে লাগবে না। আপনি আমাকে সাইকেল টা ফেরৎ দিলেন তার জন্য এটা বকশিস। আমি খুশি হয়েই দিচ্ছি।

লোকটা বোধহয় এতে খুব খুশিই হলেন।

তিনি এবার পেছন ফিরে হাটা ধরলেন।

শ্রীময়ী সায়কের দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

সায়ক কি বলবে ভেবে পায়না।

-তার মানে তুই আমার পিছু নিয়েছিলি? তখন। আমি গাড়িতে ওঠার পর তুই আর ফিরে যাসনি? আমার পেছন পেছন হোটেলের সামনে এসেছিস?

হিঃ হিঃ হিঃ

একটা ক্যাবলামো হাসি হাসে।

সেই হাসি দেখে শ্রীময়ী আরো রেগে যায়।

-না....মা....নে....স.....রি...রে

আসলে আমার খুব চিন্তা হচ্ছিলো তোকে নিয়ে তাই.....

ভয়ে ভয়ে আমতা আমতা করে সায়ক বলতে থাকে।

-তাই বলে তুই আমার পিছু নিবি? শয়তান। তোর এত্ত বড় সাহস।

বলেই শ্রীময়ী কাঁধের ব্যাগটা দিয়ে সায়কের দিকে ছুড়ে মারার ভঙ্গি করতেই সায়ক ডান হাত চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়।

ব্যাগের আঘাত গায়ে না লাগায় সায়ক চোখ খুলে দেখে, 

শ্রীময়ী সামনে নেই।

ডান বাম তাকিয়েই নীচে তাকায়।

দেখে শ্রীময়ী তারই দেওয়া গোলাপ ফুলের স্তবক টা নিয়ে হাটু মুড়ে বসে আছে।

চোখ দুটো ছল ছল করছে। নবারুণ নয়, তুই আমার প্রথম প্রেম রে। আর সেটা বুঝতে আমার...

সাইকেল টা কে দাঁড় করিয়ে সায়ক বলে ওঠে,

-আরে কি করছিস কি? ওঠ বলছি? 

-নাহ রে উঠবো না। গোলাপ ফুলের স্তবকটা উচিয়ে বলে আই লাভ ইউ সায়ক।

সায়ক কি বলবে ভেবে পায় না।

-আচ্ছা ঠিক আছে। এবার ওঠ।

-নাহ আগে বল।

-আরে কি বলবো?

-মারবো একটা থাপ্পড়। তখন তো নবারুণের সামনে গলা ফাটিয়ে খুব বললি।

তুই আমাকে ভালোবাসিস। আর এখন ন্যাকামি মারছিস?

-আমার লজ্জা লাগছে? কিন্তু তুই তো নবারুণ কে ভা..লো... বা..

সায়ক কথাটা শেষ করতে পারেনা।

এবারে শ্রীময়ী উঠে দাঁড়িয়ে সায়কের জামার কলার ধরে হাবি জাবি বলতে শুরু করে। যার কোন মাথা মুন্ডু নেই।  

-তুই বলবি কি না?বল বলছি

-দাড়া দাড়া বলছি। 

জামার কলার টা ছাড়?

জামার কলার ছেড়ে দেয় শ্রীময়ী।

সায়ক গলা খাকাড়ি দেয়, 

বলছি হ্যাঁ, আবার খাকাড়ি দেয়,

এবার একটা ক্যাবলার হাসি হাসে।

চশমা আবার ঠেলে দেয়, ওই আমার না সত্যিই লজ্জা লাগছে বিশ্বাস কর?

-এইতো কিছুক্ষণ আগে বেশ স্মার্টলি কথা বলছিলি, হোটেলের ম্যানেজারের সাথে কথা বলছিলিস এখন কি হোলো রে?  

-না..? মা....নে.... ইয়ে...ইসে

ভালোবাসি,

-কি? কি বলছিস? কাকে বলছিস?

-আমি তোকে.....

-অ্যা...... শুনতে পাচ্ছিনা

-ছাড় না শ্রীময়ী।

-এই শ্রীময়ী শ্রীময়ী কিরে? 

শ্রী বলবি শুধু। বুঝেছিস? শুধু শ্রী বলবি।

হি হি হি

সায়ক আবার হাসে।

-নে এবার ঠিক করে সুন্দর করে বল।

-এই, শ্রী আমার না আসছে নারে।

এবারে শ্রীময়ী রেগে গিয়ে বলে ওঠে,

-ও বলবি না তাই তো? দাড়া

সায়কের সাইকেল টা নিয়ে শ্রীময়ী প্যাডেল মারতেই, 

সায়ক বলে ওঠে, 

অ্যাই কি করছিস? নাম বলছি।

শ্রীময়ী সায়কের কথায় পাত্তা দেয়না, অনেকটা দূর প্যাডেল মেরে চলে যায়।

- অ্যাই শ্রী দাড়া। দাড়া বলছি

সায়ক পেছন পেছন দৌড়তে থাকে।

শ্রীময়ী চিৎকার বলতে থাকে।

-না না থামবো না। যতক্ষণ না তুই ভালো করে বলবি তুই আমাকে ভালোবাসিস ততক্ষণ তুই এভাবেই আমার পেছনে ছুটবি।

শ্রীময়ী সাইকেল চালাতে থাকে আর সায়ক তার পেছন পেছন দৌড়তে থাকে।


Rate this content
Log in