অপ্রকাশিত ভালোবাসা
অপ্রকাশিত ভালোবাসা
বসন্তের সন্ধ্যা। আকাশ পরিষ্কার, তাই তারাগুলি আজ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তবে সবথেকে উজ্জ্বলভাবে বোঝাচ্ছে পশ্চিমের সেই শুকতারাটি। গরম আজ একটু কম হলেও বাতাসের প্রায় দেখা নেই।
এই আকাশ দেখতে দেখতে কিছু একটা ভাবছিল সুমন। নবম শ্রেণির ছাত্র, আগামীকাল অঙ্কের টিউশন তাই আজ সন্ধ্যা থেকে সে অঙ্ক নিয়ে বসেছে। খাতাখানি টেবিলে ফেলে রেখে সামনের জানালা থেকে আকাশের তারা দেখছিল আর কিছু ভাবছিল সে।
হঠাৎই তার মা বকা দিয়ে বলল,"কী রে, বাইরে কী দেখছিস ? কাল যদি আবার অঙ্কের মাস্টার অভিযোগ জানিয়েছে..."
সুমন তাড়াতাড়ি করে খাতা নিয়ে অঙ্ক করতে বসল। অঙ্ক বিষয়টা সেই পছন্দ করে না, তাই সে অঙ্কে খুব দুর্বল। সে বারবার একটা অঙ্ক করছে আর কেটে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে খাবারের জন্য মা ডাক দেয় বাবাও বাড়ি ফেরে। খাওয়ার পরে সুমন আর পড়তে বসে না, কিছুক্ষণ পরে ঘুমিয়ে দেয়।
পরের দিন একটা জরুরী কাজের জন্য অঙ্কের মাস্টারমশাইকে বাইরে যেতে হয়েছে তাই টিউশন ছুটি। এই সুযোগে আজ সুমন তাড়াতাড়ি স্কুল যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। দূরে টিউশনের ঝামেলার জন্য তার প্রতিদিন স্কুল যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সপ্তাহে দু-একদিন স্কুল যাওয়া হয় তাও আবার দেরির জন্য প্রত্যেকবার বকা খেতে হয়। অবশ্য এখন তাকে আর বকা খেতে হয় না, হয়তো তাকে বকতে বকতে স্যারই বিরক্ত হয়ে গেছেন।
ঠিক আধঘন্টা আগে সুমন বেরিয়েছে স্কুলের দিকে। ঠিক সময়ে পৌঁছানোর জন্য তার বন্ধু-বান্ধবেরা তাকে দেখে চমকিত হয়েছে। এমনকি ব্যাপারটা সূর্য পশ্চিম দিকে ওঠার কথা পর্যন্তও চলে গেছে।
যাই হোক, সে ব্যাগটা নিজের ক্লাসরুমের থার্ড বেঞ্চের ধারে একটা ব্যাগের পরে রেখে দিল। ওই ব্যাগটা ছিল তার বন্ধু রাহুলের। রাহুল আর সুমনের বন্ধুত্ব ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। রাহুল ছিল মোটা আর সুমন ছিল অপেক্ষাকৃত রোগা।
টিফিনের সময় রাহুল আর সুমন একটা গাছের তলায় বসেছিল। তারা গল্প করেনি, শুধু এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল।
হঠাৎ একসময় সুমনের চোখ বিশ্বটাকে ধীরে চলতে দেখল। সবকিছু যেন তার কাছে স্থির হয়ে গেল। আর তার আধভেজা চোখের দৃষ্টি একজনের ওপর খুব গভীরভাবে পড়তে লাগল। সে দেখল, একটা মেয়ে, খুব সম্ভবত 8 ক্লাসে পড়ে, লুকোচুরি খেলছিল তার বন্ধুদের সাথে। আর তার খোলা চুল বারবার তার চোখের ওপর পড়ছিল। সুমনের মনে হচ্ছিল সে যেন তার চুলগুলো নিজের হাতে করে সরিয়ে দিয়ে আসে। সুমনের মনে হল ওই মেয়েটি হয়তো বুঝতে পেরেছে যে সে তাকে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে। শুধু একবারের জন্য ওই মেয়েটি সুমনের দিকে তাকাল। এই সুযোগে তার চোখে সুমন গোটা ভবিষ্যৎ কল্পনা করে নিল। মেয়েটি তাকে দেখে একটু মুচকি হাসল।
স্কুল ছুটির পর বিকেলে সুমন বাড়ি ফিরে একটা সুন্দর গান শুনতে শুনতে ওই মেয়েটির কথা ভাবছিল। সন্ধ্যাতে সে পড়তে না বসে পড়ার টেবিলে একটা খাতা খুলে, হাতে একটা কলম ধরে ওই মেয়েটির রূপকে বিষয় করে ছন্দ মেলানোর চেষ্টা করছে--
"কেশে তার সন্ধ্যা নামে
হাসিতে তার ফোটে ফুল..."
লেখা শেষ হলে অবশেষে তার প্রিয় বিষয় ইতিহাস বইটি নিয়ে সে বসে। পড়া শেষ হওয়ার পর খেতে যায়।
রাতে তার স্বপ্নতে আসে এক মেয়ে, তার চুলগুলো বারবার চোখের ওপর পড়ছে আর সে ওটা বারবার সরাচ্ছে। হঠাৎ মেয়েটি সুমনের কাছে এসে বলল,"তুমি আমায় ভালবাসো, তাই না ?"
সুমন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এই কথার উত্তরে কী বলবে সেটা সে জানত না। মেয়েটি আবারও মুচকি হেসে চলে গেল।
হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে উঠল। সুমনের ঘুম ভাঙল। খাবার দাবার খেয়ে সে স্কুল যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আগে সে সপ্তাহে দু-এক দিন স্কুল যেত কিন্তু এখন দু-এক দিন বাদ দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যায়।
ক্রমে সুমন মেয়েটির নাম জানতে পেরেছে, ছন্দা। ধীরে ধীরে সুমন তার বুকের ভয়কে মেরে চোখের দৃষ্টিতে ছন্দাকে সব বলে দিয়েছে এবং অপরপক্ষ থেকেও তার উত্তর এসেছে চোখে চোখেই। তারা শুধু মুখে বলতে বাকি রেখেছে। সুমনের কিছু ক্লাসের বান্ধবীদের সহায়তায় আজ দুদিন সে ছন্দার সাথে কথা বলতে পেরেছে।
এখন তারা একে অপরের বন্ধু এবং তারা সুখ-দুঃখ, কিছু ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা নিজেদের মধ্যে বলা শুরু করেছে। আর সুমন তার চোখের ভাষা মুখে বলার প্রয়াস প্রতিনিয়ত করেই চলেছে। কিন্তু সুমন ভাবত তাকে সরাসরি পরে বলবে, এখন সে তাকে শুধু এটা বুঝিয়ে দেবে যে সে তাকে ভালোবাসে।
গ্রীষ্মের ছুটি। ছন্দার বাড়ির আর্থিক অবস্থা কিছুটা দুর্বল, মানে মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সুমনও মধ্যবিত্ত শ্রেণী হলেও আর্থিক দিক থেকে কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হয়নি।
সুমনের সাথে ছন্দার কথা এখন খুব কম হয়। ছন্দার বাড়িতে বাবার ছাড়া আর দুটো ফোন নেই। মাঝেমাঝে কোনোদিন রাস্তায় দেখা হলে তখন তারা কথা বলার সুযোগ পায়। গরমের ছুটিটা তারা এই আবছা আবছা ভাবেই কারোর কোনো খবর না পেয়েই পার করে দেয়।
সময়ে আবার স্কুল খুলে, ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু ছন্দা সেদিন দেখল যে সুমন স্কুল আসেনি। রাহুলের কাছে জানা যায় যে সুমনের শরীর খারাপ, বাড়িতে বিশ্রাম করছে।
শরীর ঠিক হওয়ার পর সুমন স্কুল আসে প্রায় তিন থেকে চার দিন পর। সেইদিন ছন্দাকে এতদিন না আসার কারণ জানিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে গল্প করতে শুরু করে।
সুমনের একদিন মনে হল, এবার তার মনের কথা সে ছন্দাকে জানাবে। কিন্তু সেইদিনের অপেক্ষায় সে। এই ভাবতে ভাবতে একদিন শীতের দিনে সে সাইকেলে চেপে কোথাও যাচ্ছিল। তার চিন্তা শেষ হতে না হতেই সে ছন্দাকে দেখতে পেল। কিন্তু এ কী! ছন্দার সাথে একটা ছেলে, তার সাথে প্রেমিকের মতো কথা বলছে। সুমন বুঝতে পারল যে ছন্দা তাকে দেখতে পেয়েছে। সুমন সেইদিন ছন্দার সাথে আর কথা বলল না।
পরের দিন সুমনের সাথে ছন্দার দেখা হলে সুমন প্রথমেই জিজ্ঞাসা করে, "ওই ছেলেটা কে ছিল কাল ?"
"বন্ধু।"
"নাম কী ?"
"রাজ।"
"ওহ্। আমাকে তো জানাওনি কোনোদিন এর ব্যাপারে ?"
কোনো কথা না বলেই সেইটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল ছন্দা। কিন্তু সুমনের আরেকবার জিজ্ঞাসা করাতে ছন্দা একটা দীর্ঘশ্বাস ধীরে নিঃশব্দে ছেড়ে এবং আবার এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল--
"কয়েকদিন আগে ও আমাকে প্রপোজ করেছিল।"
তারপর ছন্দা হঠাৎ করে থেমে গেল। এর পরের ছবিটা সুমনের কাছে স্পষ্ট ছিল। কিন্তু সুমনের বিশ্বাস এর সাথে সমর্থ নয়, আবার ছন্দার চোখে ফুটে উঠছে তার মুখের কথার সত্যিটা। কিন্তু যে উত্তর, সে জানত কোনদিন আসবে না, তাও সে ছন্দাকে জিজ্ঞাসা করল--
"তারপর ?"
তারপর বেশি কিছু না বলেই সোজাসুজি ছন্দা বলল, "সে আমার বয়ফ্রেন্ড।"
সুমন জোরদার অবাক হল। তার বুকের মধ্যে দুটো ঢেউ বয়ে গেল। এক ঠান্ডা অনুভূতি। এরপর কী বলবে সে জানত না। কিন্তু তার চোখ এবং তার চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসা সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম জলবিন্দু দ্বারা সুমন যে কথা প্রকাশ করেছে তা মুখে বলা কঠিন। সেই জলবিন্দুর দ্বারা বিশ্লেষিত প্রতিটা শব্দ অক্ষরসহ বুঝতে পেরেছিল শুধু সেই ছন্দা, যাকে সুমন বোঝাতে চেয়েছিল শুধুমাত্র। সুমনের সেই কথা চিরদিনের জন্য অকথিত রয়ে গেল। এক অপ্রকাশিত ভালোবাসা তার চোখের জলে প্রকাশ পেল, কিন্তু তা বোঝার ক্ষমতা আর কারোর রইল না।
