অনন্য শরৎ
অনন্য শরৎ
জেসি তখন সদ্য সদ্য স্নাতক হয়েছে। সময়টা শরৎ কাল যদিও সে সময় কি শরৎ কি বর্ষা আর কি শীত তা বোঝা দায়। বেশ কাটছিল দিন তবে জেসি বুঝতে পারে যে সে তার পড়ার ব্যাচটাকে খুব বেশি করে হারাচ্ছে তারপর একের পর এক ছুতো খুঁজে চলেছে সবার সাথে দেখা করার। পড়ার বাহানা তো আর কাজে লাগবেনা কাজেই অন্য উপায় নতুন কোনো কারণ। এরকমই এক নিদারুণ বৃষ্টির রাতে বাড়ি ফিরে একাকীত্বে ভুগতে ভুগতে তার মনে হতে থাকে সে বাদে বাকি সবাই জীবনে কিছু না কিছু নিয়ে আছে অথচ, যে দুঃসাহসিক অভিযান ভালো বাসে তার জীবনে কোনো রহস্য নেই তার জীবনের কোনো গল্পই নেই। অন্ধকার ঘরে একা বসে জেসির কানে আসতে থাকলো মোবাইল স্পিকারে বাজতে থাকা- "তু যো না অ্যায়া...."
ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করতে করতে তার জীবনের দরজায় কড়া নারে এক নতুন অ্যাপ। নেট দুনিয়ায় খুব পরিচিত ডেটিং অ্যাপ, নানান রকম ভাবতে ভাবতে তার মাথায় খেলে যায় এক রোমাঞ্চকর বুদ্ধি। ঝোকের বসে নেওয়া সিদ্ধান্ত মানুষকে পরে অনুতপ্ত করে ঠিকই কিন্তু শুরুর রুদ্ধশ্বাস অভিযানের লোভ সামলাতে পারেনা অনেকেই, জেসিও পারলোনা।
অ্যাপ ডাউনলোড করার পর বেশ কোটা সোয়াইপ তার পরেই একটা ম্যাচ, এপাশ থেকে জেসি ওপাশ থেকে ইন্দ্রজিত দুজনেই ছবি এবং আত্মপরিচিতি দেখে শুনে সোয়াইপের মাধ্যমে বেছে নিয়েছে একে অপরকে। ডেটিং অ্যাপে সদ্য আসা জেসির মন চেঁচিয়ে ওঠে - ওহ ইটস আ পারফেক্ট ম্যাচ।
শুরু শুরু তে কথা হয়না খুব বেশি জেসি জানত কথা বলাতে হয় কি করে, ইন্দ্রজিত পেশাগত ভাবে অধিবক্তা বা সহজ ভাষায় উকিল হলেও আসলে সমাজ কর্মী, গরীব মানুষদের জন্য কাজ করে। জেসি ছোট থেকেই মানুষের উপকার করতে ভালো বাসে, তার জন্যে এটা যথাযথ ম্যাচই। কথা হতে থাকে নানান জিনিস নিয়ে বেশিরভাগ মামলা সংক্রান্ত কোনো না কোনো বেসরকারি সংস্থার বুজরুকি, টাকা মেরে দেয়া, কোথায় আবার অন্যায় ভাবে কাউকে কাজ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। কথায় কথায় ফোন নম্বর চালা-চালি আর আসতে আসতে মন দেয়া নেওয়ার ঠিক আগে দেখা করার একটা উপায় এবং স্থান ভাবা হলো, জলপাইগুড়ি থেকে আলিপুরদুয়ার অনেকটাই দূর কিন্তু ইন্দ্রজিত একটা ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করতে আসছে জলপাইগুড়ি। ইন্দ্রজিত জানিয়ে রাখে সে আসবে জেস যেনো প্রস্তুত থাকে সে ফেরার পথে তার সাথে দেখা করে তবেই ফিরবে। ইন্দ্রজিতের একটা বড় কোম্পানির সাথে ডিল করতে আসার কথা ছিল মালিক ও কর্মচারীর মধ্যে সন্ধিস্থাপনের জন্য। তারা আসে শহরের একটি বিখ্যাত ক্যাফে - *z cafe and pub* । জেসও পৌঁছায় সেখানে কিন্তু তার অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে। কথা বার্তা সেরে ক্লায়েন্ট রা বেরিয়ে যায়। শুরু হয় তাদের কথা, জেস আর ইন্দ্রজিত দুজনেই বুঝতে পারে তারা দুজনেই কেউ ভিন্ন নয় একে অপরের থেকে, তারা যেনো একই আত্মা আলাদা শরীরে ভাগ করা, তাদের কথা বলার আগেই তারা জানত তারা একে অপরকে কি বলতে চলেছে। কিছু খাওয়া দাওয়া অনেকটা বকবক করে হাত ধুতে তারা যায় ওয়াশ-বেসিনে। দরজা বন্ধ হয়ে যায় তারা একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। জেসি দেখলো চোখের ভাষা বদলে যাচ্ছে ইন্দ্রজিতের। জেসি দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎই ইন্দ্রজিত নিজের দুটো হাত জেসির দুপাশে রেখে মুখটা জেসির মুখের একদম কাছে নিয়ে আসে, যেনো মিশিয়ে দিতে চাইছে নিজের ঠোঁট টা জেসির ঠোঁটে কিন্তু তার একটু আগেই থেমে গিয়ে কিছুটা কৃত্রিম ভাবেই ব্যঙ্গাত্মক শুরে ইন্দ্রজিত গেয়ে উঠল- "হাম তুম এক কামরে মে বান্ধ হো"। কিন্তু জেসি তো চায়নি ইন্দ্রজিত থামুক, সে ইন্দ্রজিতের কলার ধরে টেনে আনে ইন্দ্রজিতকে নিজের কাছে এবার মিশে যায় দুটো ঠোঁট একে ওপরের সাথে। সময়ের হিসেব নেই, কখন যে তাদের ওষ্ঠ ছাড়া পেল একে ওপরের থেকে তা জানা নেই কারোরই। ইন্দ্রজিত জেসি কাঁধ ধরে পিছন ফিরিয়ে, মুখ নামিয়ে আনলো কাঁধে, সেখানে চুম্বন চিন্হ আঁকতে থাকলো এক মনে, আর তার হাত খেলতে থাকলো জেসির বক্ষদ্যয় জুড়ে। হঠাৎই কাধে কামড় বসালো ইন্দ্রজিত, আর তাতেই সম্বিত ফিরে পেল জেসি। ইন্দ্রজিত নিজের মনে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাত ধুচ্ছে, তাকিয়ে আছে জেসির দিকে। তবে কি এতক্ষণ যা হল সবটা কেবলই কল্পনা জেসির? মনের মাঝে এই প্রশ্নই ঘুরতে থাকলো জেসির। তারা আবার ফিরে এলো তাদের রিজার্ভড্ টেবিলে। জেসি নিজের কাছেই লজ্জিত এত কিছু ভাবার জন্য। আবহাওয়ার এক আলাদা আমেজ সেই দিন সূর্য ডুবছে কমলা আকাশ মৃদু বাতাস বইছে বাইরে। আঙ্গুলের ফাকে আঙুল রাখা, চার চোখ এক হচ্ছে আবার আসতে করে সরিয়ে নেওয়া, মিষ্টি হাসি, জেস এর গাল লাল হয়ে যাচ্ছে এই অনুভূতি তার প্রথম। স্কুল জীবনের অনেক ছেলেমানুষি থাকলেও এই অনুভূতির ছোঁয়া তার শরীরের অক্সিটোসিন আর সেরেটোনিন এর মাত্রা বাড়িয়েছে এই প্রথম। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে জেসি শুনতে পেলো ইন্দ্রজিত খুব আস্তে গুনগুন করছে- "হাম তুম এক কামরে মে বান্ধ হো"। তবে কি কোথাও একটা মিশে গেছিল তাদের কল্পনা, নাকি নেহাত নিজের সাথে কোইন্সিডেন্স, সেটা ভেবে পেল না জেসি।
দুজনেই ভেতর থেকে বুঝতে পারে তারা একে অপরকে নিয়ে কি অনুভব করছে। আসতে আসতে ইন্দ্রজিত কথা বলা কমানোর চেষ্টা করে কারণ সে ধীরে ধীরে জেসির নেশায় আক্রান্ত হয়ে পরছে। চক্রব্যূহতে ঢুকতে অভিমন্যু জানলেও তা ভেদ করে বেরিয়ে আসার কৌশল যেমন অভিমন্যু জানত না, তেমন ভাবেই জেস আর ইন্দ্রজিত ঢুকে পড়েছিল মায়ার চক্রব্যূহতে যার জাল কেটে বেরোনোর রাস্তা সেই মুহূর্তে দুজনের কারুর ছিলনা। কথা থামানোর চেষ্টা করলেও ইন্দ্রজিত পুরোপুরি কথা বলা বন্ধ করতে পারেনা তার বারবার মনে হতে থাকে যে তার কথা না বলার কারণে হয়ত জেস এর কষ্ট হচ্ছে বা হতে পারে। তার ভেতরের মানুষটা বার বার তাকে কাটগোড়ায় দাঁড় করাতে থাকে যে সে যা করছে সেটা ভুল তার চেয়ে জেস এর সাথে এই নিয়ে কথা বলে নেওয়া ভালো।
জেসের মনের অবস্থা ভালো নেই, গোপনে ইন্দ্রজিতের প্রতি তার একটা ভালো লাগা তৈরি হয়ে ছিল, তার কেবল মনে হতে থাকে, এই অনুভূতি কি কেবল তার একার? পরক্ষনেই নিজের মনকে বোঝায় সে এতটা ভুল কোনো দিন হতে পারেনা ইন্দ্রজিতের ব্যাপারে। মন মরা হয়ে ঘরে বসে থাকে সে। জেসি ঘরের প্রিয় জানলায় বসে ব্ল্যাক কফি খাচ্ছে, দূরে কোথাও বাজছে- "সবকি বরাতে আই, ডোলি তু ভি লানা" বাইরে ঝির ঝির করে বৃষ্টি পরছে। হঠাৎ ফোনের একটা নোটিফিকশান তার হৃদস্পন্দন দ্রুত করে দেয়।
ইন্দ্রজিতের মেসেজ।
ইন্দ্রজিত - তোমাকে আমি কিছু বলতে চাই
জেস - হ্যাঁ বলো যদিও আমি জানি তুমি কি বলবে। ঘোস্ট করতে চাও আমাকে। এটাই বলবে, কি তাইতো?
হ্যাঁ দেখো আমরা তো বলেই ছিলাম যে আমাদের মধ্যে কোনো অনুভূতি যেনো না আসে তুমি সেটা এনে ফেলেছ, অস্বীকার করনা, আর দেখ আমি কিন্তু আগেই বলেছিলাম আমি এই সবের জন্য প্রস্তুত নই এখনো। তাই আমাদের মনে হয় এবার এখানেই থেমে যাওয়া উচিত।
বেশ অনেক্ষণ নিস্তব্ধতা। জেসি কথা হারিয়েছে। অবশেষে নিস্তব্ধতা ভাঙলো ইন্দ্রজিতের আর একটা মেসেজ- "তুমি চাইলে আমরা বন্ধু হয়ে থাকতে পারি। কিন্তু অবশ্যই যদি তুমি চাও।"
এর পরেও কিছুটা নিস্তব্ধতা, সময় নিলো জেসি নিজেকে সামলানোর।
দেখো কথা যা হয়েছে সেটাই আছে তুমি না চাইলে আমি এগোবোনা। একটা ভালো বন্ধুত্ব নষ্ট করার চেয়ে ভালো নিজের অনুভূতি কে লাগাম দেওয়া।
আমি আর তোমার সাথে আর দেখা করবো না।
একটা সত্যি কথা বলবে, শুধু কি আমি একাই অনুভব করেছি নাকি? কখনো কি এক মুহূর্তের জন্যও তুমি.....
যাক অন্তত এটা শুধু আমার হয়নি। হ্যাঁ লুকিয়ে লাভ নেই, শিকার করছি হয়েছিল। মায়ার বন্ধন বলে কথা।
কিছুটা সময় নিয়ে ইন্দ্রজিত আবার বলে- "শোনো তোমাকে একটা কথা বলি আমার একটা বন্ধু আছে মৃণাল। মৃণাল সকালে আমাকে ফোন করে বলে ওর তোমাকে ভালো লাগে। ও তোমাকে ডেট করতে চায়। আমি তোমার সাথে আর থাকতে চাইনা তোমার নেক্সট কে খুঁজে দিলাম আমাকে ভুলে যাও।
বেশ আমি মৃণালের সাথে কথা বলে নিচ্ছি কিন্তু সত্যি করে বলো তো বন্ধুর জন্য আমাকে ছেড়ে দিচ্ছ না তো??
না রে বাবা, আমি কি বলিউড সিনেমার সাইড হিরো নাকি? এত বোকা নই আমি।
জেস একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। আর কিছু বলার নেই। মৃণাল কে একটা সামাজিক জালের মাধ্যমে বন্ধুত্বের আবেদন পাঠায়। ওপার থেকে বিজ্ঞপ্তি আসে তার বন্ধুত্বের আবেদন গ্রহণ হয়েছে।
মৃণাল ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠলো ইউরেকা! সে যাকে খুঁজছিল সেই মেয়ে নিজে তার ঝুলিতে এসে পড়েছে।
মৃণাল নিজেকে সামলাতে না পেরে একটা হাই পাঠায় জেস তাকে উত্তর দেয়। জেস আর মৃণাল এই করতে করতে এক বেলায় ভালো বন্ধু হয়ে যায়। কথায় কথায় মৃণাল জেনে নেয় জেস এর ইন্দ্রজিতের ওপর কোনো দুর্বলতা আছে কিনা। মৃণাল কথার জাল খুব ভালো করে তৈরি করতে জানত। সে আস্তে আস্তে জেস কে কৌশলে নিজের করে নেয়। প্রায় মিনিট কুড়ি পরে ইন্দ্রজিতের মেসেজ-
তুমি যার সাথে কথা বলছ একটু সাবধানে। ছেলে খুব চৌখস।
মানে?
মৃণালের একাধিক মহিলার সাথে শারীরিক সম্পর্ক ছিল; আছে, ক্রুয়েল হার্টলেস হলেও জেন্টল ম্যানের মতই বিহেভ করে ও। অনেক মেয়ে ওর কারণে আত্যহত্যা করতে যাওয়া থেকে শহর অবদি ছেড়ে দিয়ে নিজের গতকালটাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। সে কথার জালে লোককে টানে তার মিষ্টি মিষ্টি কথায় ভুলে গিয়ে লোক তাকে বিশ্বাস করে আর সেটাই হয় মৃণালের মারণ অস্ত্র।
জেস সব টা শুনে বুঝে ইন্দ্রজিতকে একটা কাতর স্বরে প্রশ্ন করে কোনো ভাবেই কি মৃণাল কে থামানো যায়না ?
ইন্দ্রজিত যদিও মেসেজ করে, কিন্তু জেসি সেই মেসেজের গাম্ভীর্য অনুভব করে- "ওকে থামানোর কোনো উপায় নেই বা থাকলেও জানিনা আমি , তবে ওকে এক্সপোজ করার দরকার আছে অনেক মেয়ের জীবন নষ্ট হয়েছে। দেখো যেহেতু মৃণাল আমার সব চেয়ে কাছের বন্ধু তাই আমি তার ক্ষতি করতে পারবেনা, কিন্তু কারুর সাহস থাকলে তাকে পেছন থেকে হেল্প করতে পারি।
জেস এর মাথায় একটা পৈশাচিক বুদ্ধি খেলে ওঠে, সে জানায় যে সে এটা করতে পারবে । শুধু ইন্দ্রজিতের সাহায্য চাই। জেস মৃণালের গতি বিধিতে লক্ষ করে খুব আস্তে আস্তে চাল দিতে শুরু করে। ইন্দ্রজিত এখানে মিডিল মান সে মৃণালের বেপারে যা জানতে পারে জেস কে বলে জেস যা জ্ঞান অর্জন করে তা বলে ইন্দ্রজিত কে। খেলা বেশ একটু জমছে। পুজোর কেনাকাটির মাঝে একটা চাল চালে ইন্দ্রজিত জানায় যে মৃণাল জেস এর বেপার টা তার বন্ধু মন্ডলির মধ্যে চেপে যায় বলে তাদের যে ও জেস কে চায়না সে ওর সাথে দেখাও করতে যাবেনা। এটা জানতে পেরেই জেস মৃণাল কে টোপ দেয়। জেস বলে যে তার খুব শখ একবার তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে সে যাবে শপিং এ। যদি মৃণালের সময় হয় তাহলে।
মৃণাল জানায় যে সে যেতে চায় তার সাথে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। পরের দিনই সোজা চলে যাওয়া হয় " পি আর এম মার্কেট”। একটা দুটো জামা কিনে সোজা একটা ক্যাফে তে গিয়ে এক কাপ করে ক্যাপাচিনো আর একটা পিৎজা খেতে খেতে অনেক গল্প হলো। হাত ধরা ফাঁকা রাস্তায় হাটা, রাস্তায় একটা জায়গায় হটাৎই দুই ঠোঁটের মিলন হয়। আর মৃণালের ফোনে বেজে ওঠে ..... "দো দিল মিল রাহে .."
ঠোঁটের স্পর্শ হৃদয়ের মাঝে এক আলাদা অনুভূতির সৃষ্টি করে। তার পর একটা ট্যাক্সি নিয়ে মৃণাল তাকে বাড়ির কাছে এগিয়ে দিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে একে অপরকে টেক্সট করে।
ওই দিন টা যেনো দীর্ঘ একটা দম বন্ধ হয়ে আসা ফুসফুসে অক্সিজেনের মাত্রা বারিয়ে নিঃশ্বাস নেওয়ার সাহস বাড়িয়ে দেয়।
ধীরে ধীরে কথা বলা আরো গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে ওঠে। অনেক কথা সারা দিন তাদের কথা ফুরায়না।
ইন্দ্রজিত সব জানত, জেস সব খুঁটিনাটি বিষয় ইন্দ্রজিতকে জানাতো যদি কোনো বিষয় কিছু খুঁজে পাওয়া যায়।
জেস আস্তে আস্তে ভুলতে বসেছিল সে কেন মেসা শুরু করে মৃণালের সাথে। মনের মধ্যে ভালোলাগা তৈরি হতে থাকে জেসির।
এই দিকে মৃণালের অজ্ঞাতে দিন ঠিক হয় জেস আর ইন্দ্রজিতের দেখা করার। তারা জলপাইগুড়ি তে দেখা করতে যায়, অনেক কথা অনেক হাসি ঠাট্টা। হাত ধরে হাটা এক টানে লস্যি খাওয়ার প্রতিযোগিতা। জেসের ইন্দ্রজিতের প্রতি একটা আলাদা জায়গা ছিলই, এখন শুধু সেই গাছ জল পেল। হয়তো ইন্দ্রজিতের মনেও। কাউকে ভালোবাসা চুপ চাপ ভালোবেসে যাওয়াতে কোনো ক্ষতি তো নেই । ইন্দ্রজিত অন্য মেয়ের কথা তুললে জেসির মন ভেঙে যায়। প্রকাশ করা বারণ যদিও। ইয়ারকির মাঝে চোখে চোখে কথা । ফিরতি পথে এক সাথে অনেকটা পথ হাঁটা । খালি রাস্তায় হাত ধরে, একটা স্নিগ্ধ বাতাসের সাথে। সব মুহূর্ত যদিও বা বলতে চায় "দো দিল মিল রাহে" কিন্তু তাও "প্রেমের হলেও প্রেমে পরা বারণ কারণে অকারণ "। একটি সুতো তাদের পেছন থেকে আটকে রেখেছে।
ইন্দ্রজিতকে পরের ট্রেনে কলকাতা যেতে হবে। সে নিজের ট্রেনে উঠে পড়ে। জেসের দু চোখ তাকে খুঁজতে চায় তাকে, পারেনা।
মৃণাল কিছুই জানত না কিন্তু মৃনাল কে সেদিন ইচ্ছা করে একটু কম সময় দেওয়া হয় যাতে সে মানসিক ভাবে জেসিকে কাছে চায়। মৃণাল রাগের অভিনয় করে তাকে বলে তুমি চলে যাও। জেস বাড়ি ফিরলে তাকে মৃণাল ফোন করে বলে যে তোমার সাথে থাকতে পারবনা। তুমি চেষ্টাই করোনা থাকার। জেস অনেক বুঝিয়ে কান্না কাটি করে তার মন গলায়। যদিও আসলে এরম কিছু না, জেস ও জানে মৃণাল ও জানে তারা একে অপরকে এই মুহূর্তে ছাড়বেনা। মৃণালের চাহিদা পূরণ না হওয়া অবদি ত না।
ইন্দ্রজিত জেস কে হয়তো কথার ছলে বোঝানোর চেষ্টা করে মৃণালের দিকে এতটা ঝুঁকতে, জেসের জেদ তখন তুঙ্গে, সে খেলা যখন হাতে নিয়েছে সে এই ময়দান ছেড়ে যাবে না। কোনো উপায় যদি মৃণালের শাস্তি হয় একটু অল্প হলেও সে যদি তার ভুলটা বুঝতে পারে । নিকোটিনের নেশার মত সে এই খেলায় মেতে আছে । একটা দীর্ঘ ঘুমের দেশের সপ্নের মত সে মরিয়া হয়ে খুঁজে চলেছে তার খেলার চাল , যাতে সে বাজি মাত করতে পারে।
পরের দিন জেসকে যেতে হবে কলকাতায়, যাদবপুর বিশ্বিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হওয়ার জন্য। বন্ধুদের সাথে তার এইটা প্রথম ভ্রমণ। অনেক উত্তেজনা তার মনে। সে মৃনাল কে একটা ফোন করে বেরোনোর দিন, কিন্তু আসে পাশে সবাই জেস কে ডাকা ডাকি করায় খুব একটা সময় সে দিতে পারেনা, মৃণাল মনঃক্ষুন্ন হয় সে জেস কে বলে ফোন রেখে কাজের দিকে মন দিতে। একটা সম্পূর্ন দিন তার মৃণালের সাথে কোনো যোগাযোগ হয়না। জেস খানিকটা জেদের বশে খেলা শুরু করলেও সে আস্তে আস্তে বুঝতে পারে জিনিসটা জেদ এর চেয়ে একটু আলাদা, হয়তো ভালোবাসা না তবে জেতার এই প্রতিযোগিতায় সে যেন একটু একটু করে হারাচ্ছে নিজেকেই।
পরের দিন মৃণাল নিজেই যোগাযোগ করে। মৃণাল তাকে আঙ্গুলে নাচাতে চাইলেও জেস যে নাচার মেয়ে নয় তা মৃণাল বুঝতে পারে তাদের কথা স্বাভাবিক হয় ।
ফেরার দিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হওয়ায়, রাতের সব ট্রেন ক্যান্সেল। জেসির সব বন্ধুরা সকালের ট্রেনে ফিরে গেলেও, জেসি চেয়েছিল একা রাতের ট্রেনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার। কিন্তু এখন সে গুড়ে বালি। রাত তখন প্রায় সোয়া এগারটা, জেস একটু ঘাবড়ে যায় । মৃণালকে সে ফোন করলে, মৃণাল জানায় যে সে যেনো টিটি কে জানায় অন্য আর একটা ব্যাবস্থা করে দিতে। মৃণালের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে, কিন্তু মনঃপুত কোনো উপায় বেরোয়না।
হটাৎ জেসির মনে পড়ে, ইন্দ্রজিত এখন কলকাতায়। শেষ দেখা হওয়ার পর ইন্দ্রজিত কলকাতার উদ্দেশ্যেই বেড়িয়ে পরে। জেসি আর কিছু না ভেবে তৎক্ষণাৎ ফোন করে ইন্দ্রজিতকে জানায় সব বিষয়। ইন্দ্রজিত সব শুনে তাকে জানায়- "ওখান থেকে কোথাও নড়বে না। আমি আসছি।"
ইন্দ্রজিত তার দাদার গাড়ি নিয়ে স্টেশনে এসে জেস কে নিয়ে তার বাড়ি চলে যায় । জানলা দিয়ে জেসকে তার ঘরে ঢোকায়। সারা রাত গল্প করতে করতেই জেস কখন ঘুমিয়ে পরে তা নিজেও বুঝতে পারে না। ইন্দ্রজিত তার গায়ে একটা পাতলা চাদর দিয়ে দেয়। বাইরে তখন সাংঘাতিক বৃষ্টি হচ্ছে। সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর জেস দেখে সে ইন্দ্রজিতের বিছানায় শুয়ে আছে, ইন্দ্রজিত গা এলিয়ে ঘুমাচ্ছে ঘরের সোফাটায়।
জেস ইন্দ্রজিতের দিকে বেশ কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তার কানে আসছে পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা-
"দেখু জো তুজকো এক নাজার যায়ে ভার
মুজমে জো মেরা হ্যায় খালা
জিন্দেগি মেয় খুশি তেরে আনে সে হ্যায়
ওয়ার্না জিনে মে গাম হার বাহানে সে হ্যায়
ইয়ে আলাগ বাত হাম মিলে আজ হ্যায়
দিল তুঝে জানতা এক জামানে সে হ্যায়
জানু না ম্যায়
তুজমে মেরা
হিসসা হ্যায় ক্যা
পার আজনাবি
আপনা মুঝে তু লাগা।"
ইন্দ্রজিতের ঘুম ভেঙে যায়। জেস চোখ সরিয়ে নেয়। হয়তো ইন্দ্র বুঝতে পারেনি বা পেরেছে। তাকে চলে যেতে হবে এবার। ব্যাগ উঠিয়ে সে জানলা দিয়ে পা বাড়ালে ইন্দ্রজিত তাকে আটকায়। ঘর খুলে ইন্দ্রজিত তাকে নিজের দাদা বৌদির সাথে আলাপ করায়, গত রাত্রের সব ঘটনা জানায় এবং তাদের ঘুমের ব্যাঘাত না করাতে জেসিকে কেন জানলা দিয়ে ঘরে নিয়ে আসে তাও বলে। সকালের জলখাবারের পর ইন্দ্রজিত জেসি কে শিলিগুড়ির বাসে তুলে দেয়। দু চোখ জেসের কিছু বলছিল,ইন্দ্রজিত শুনতে পায়নি, না পাওয়া টাই ভালো ছিল যদিও। একে অপরকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে গেলো নিজের নিজের রাস্তায়। মৃণাল কে কথা দেওয়া আছে পরের দিন দেখা করার।
কথা মত দেখা হয় তাদের মৃণালের বাড়িতে । তাদের খাওয়া দাওয়ার প্ল্যান ছিল । মৃণাল খাওয়ার অর্ডার করে সিনেমা চালায় সিনেমা দেখতে দেখতে মৃণাল তাকে একটা চুমু খায় কপালে কিন্তু সেটা কেবল উজ্জাপন, একটা আলিঙ্গন তারপর তাদের চাহিদা বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে শরীর অন্য ইঙ্গিত দেয়, এক শারীরিক তেষ্টা, মৃণাল তার সর্বস্য খুলে জেসের সামনে রাখে, জেস নিজেকে সপে দেয় মৃণালের হাতে। এক খেলায় মেতে উঠেছে, ঘরে আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে উঠেছে। পর্দার আড়াল দিয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল তখন। মৃণাল জেসের ওপরে, মিলনের সময় চরম উদ্ধমতা ভর করে আছে তাদের মধ্যে। তেষ্টা যখন মেটে শরীর তখন ক্লান্ত দুজনেই মিলনের পর পাশে শুয়ে পরেছে । জেস মৃণালের পাশে তার হাতের ওপর শুয়ে ভাবছে শুধু একটাই কথা ইন্দ্রজিতের সাথে তার কখন কথা হবে। অনেক গল্প গান বাজনা হলো মৃণালের সাথে, সবই হলো কিন্তু কিছু একটা যেনো অভাব রয়ে গেলো। জেস বাড়ি ফেরে ইন্দ্রজিত কে জানায় সব । মৃণাল যে তার মনের কোণে নেই সেটা জেস জানে। জোর করে বোঝায় নিজেকে থেমে যেতে কারণ সে যাকে ভালো বাসে সে তার হবেনা কোনো দিন। ভালোবাসা বাড়ছে রোজ বাড়ছে, সে আসলে অপেক্ষা করে রোজ ইন্দ্রজিতের। ইন্দ্রজিত কোনো দিন বুঝবেনা এইসব যদিও বোঝে সে থাকবেনা তার হয়ে ।
এরপর একদিন দুপুরে জেস ঘরে বসে পড়াশোনা করছে এক মনে। হটাৎ একটা আওয়াজে হুস ফেরে তার দেখে ইন্দ্রজিতের ফোন থেকে কেউ মেসেজ করে
"আমি সায়নি। তুমি কে হও ইন্দ্রজিতের?
কে তুমি ?
আমি ওর সব। কিন্তু তুমি কে? এদ্দিন ধরে কথা বলছো ওর সাথে।
আমি ইন্দ্রজিতের বন্ধু। বাট হোয়াট ডু ইউ মিন বাই সব?
আমি ইন্দ্রজিতের স্ত্রী, প্রায় ন বছর হল আমরা ম্যারিড।
ইয়ার্কি হচ্ছে ? ১৭ বছর বয়স ছিল ৯ বছর আগে ওর বিয়ে হওয়া সম্ভব না । প্রমাণ দাও।
প্রমাণ তোমাকে কেনো দেবো।
তাহলে কথা বলনা।
আরো অনেক কথা হয় তাদের মাঝে। প্রত্যেক কথাই কেন যেন বারবার দাঁড় করাতে চায় ইন্দ্রজিত কে কাঠগড়ায়, জেসির সামনে।
জেস কথার মাঝেই ফোন করে ইন্দ্রজিতের ফোনে। কিন্তু সেখানে কোন মহিলা কণ্ঠ নয় বরং বেজে ওঠে ইন্দ্রজিতের স্বর। ইন্দ্রজিত জানায় সে নিছকই একটা মজা করেছে জেসির সাথে। জেস শান্ত হয় জেস সন্দেহ করেই ছিল কিছু একটা জিনিস ভুল আছে। সেইদিন অনেকক্ষণ আবার অনেকদিন পরে কথা হয় ইন্দ্রজিতের সাথে জেসির।
জেস বুঝতে পারে সে মৃণালের প্রতি দূর্বল না তবে একটা নেশা হয়ে উঠছে মৃণাল তার । ইন্দ্রজিত জানিয়ে দেয় তাকে একটা নৌকা বেছে নিতে হবে এবার, হয় ইন্দ্রজিতকে নয় তার বন্ধু মৃণাল কে। জেস যদি একবার বলতে পারতো সেই দিন, "ইন্দ্র তুমি একবার বলে দেখো, 'জেস তুমি আমার'। আমি খেলা থামিয়ে ফিরে আসবো। আমি তো নৌকা বেছে রেখেছি আমার তো বরাবর তোমাকেই ভালো লাগতো।" এই কথা বলা সম্ভব হয়নি তার।
মৃণালের সাথে তার কথা হয় দেখা হয়, ইন্দ্রজিতের সাথেও কথা চলতে থাকে। ইন্দ্র আবার একটা মেয়ের সাথে দেখা করতে যাবে। জেস মনে মনে এটা মেনে নিতে পারেনা কিন্তু তাও নিজেকে অতিউৎফুল্লো প্রমাণ করার জন্য কিছু ভালো ভালো পরামর্শ দেয়। জেস কিছু বলতেও পারেনা, তার মনে পরে সে তো নিজেই মৃণালের সঙ্গ নির্বাচন করেছে।
চোখের কোনে জল মুছে নিজেকে শক্ত করলো। অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে সে আর ফেরার রাস্তা নেই। তার আর কোনো অধিকার নেই ইন্দ্রর ওপর, সে তার জেদের বসে অন্য রাস্তায় এসে গেছে তাই তাকে চলতে হবে একই।
দিন এগোয় সম্পর্কের গভীরতা বারে জেসির মৃণালের সাথে, ইন্দ্র নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পরে বা হয়তো সে আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। অনেক দিন কথা হয়না। জেস এটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনা। মৃণালের থেকে এবার খেলা ঘোরানোর সময় কারণ মৃণাল এবার খারাপ চাল চালা শুরু করেছে। সে প্রতি নিয়ত ইন্দ্রকে নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা করে যায়।
এইসবের মাঝে জেসের সাথে মৃনালের আবার একবার দেখা হয়, মৃনালের বাড়িতে জেসি যায়। অনেকদিন পর তাদের আবার দেখা, দুজনেই অনেক আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করেছে এই দিনের।
মৃণাল বাড়ির দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে আসে, জেসি নিজের অভারকোটটা খুলে সদ্য টেবিলে রেখেছে এমন সময় মৃণাল পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘারের চুল সরিয়ে চুম্বন এঁকে তাকে সামনে ঘুরিয়ে নেয়, চোখে চোখ রেখে পরস্পর পরস্পরকে কতটা মিস করেছে সেটা বোঝানোর চেষ্টা চলে। তবে আজ মৃণাল তার সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়না বরং তাকে স্ত্রীর মত মর্যাদা দেওয়া শুরু করে। মৃণাল জেসকে ঘরে বসতে বলে একটা ডেলিবেরী বয় কে তার অ্যাড্রেস বোঝাতে বোঝাতে জেসের মাথায় হাত বোলাতে থাকে জেস তখন মৃণালকে জড়িয়ে ধরে আছে, তারপর ঘরের পর্দা দিয়ে মৃণাল সোজা ঝাপিয়ে পরে জেসের ওপর।
অনেক ভিজে চুম্বনের শেষে, মৃণাল শুয়ে পরে জেস উঠে বসে তার পেটের ওপর, জেস তার নয়ন জোড়ার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, মায়াবী সেই চোখ জোড়া তাকে মায়ার জালে বাঁধছে আবার। মৃণাল জেসের জন্য এক প্লেট বিরিয়ানী আর সাথে এক বোতল হুইস্কি অনিয়েছে। দরজায় কলিং বেল বাজলে মৃণাল তড়িঘড়ি একটা জমা পরে অর্ডার রিসিভ করতে যায়, তার অ্যাপেলের ঘড়ির ডেলিভারী ওটা,
মৃণাল জেসকে দিয়েই ওটা আনবক্সিং করায়। এরপর মৃণাল তাকে অন্য একটা ঘরে বসিয়ে তার বিজনেস আইডিয়া সম্বন্ধে বলতে থাকে, তাকে নিয়ে বিকালে তার কম্পিউটারে বসিয়ে একসাথে তারা গেমও খেলে অনেক মজা হয়, খেলতে খেলতে মৃণাল একটু ঝিমুনি বোধ করে সে জেসকে কোলে নিয়ে চলে যায় ঘরে , বিছানায় নিজের শরীর এলিয়ে দিয়ে জেস কে বলে তার একটু শীত করছে জেস যেন তার ঘুমিয়ে পরা অব্দি তার পিঠে শুয়ে থাকে তাকে জড়িয়ে ধরে। জেস একদিনের জন্য হলেও মৃনালের স্ত্রীর কর্তব্য পালন করে সে মৃনালের ঘুম আশা অব্দি অপেক্ষা করে তার ওপর শুয়ে তার কপালে হাত বুলিয়ে তার গালে দুটো চুম্বন আঁকে এতক্ষণে মৃণাল ঘুমিয়ে গেছে, সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে ঘরে, নিঃশব্দে ঘুমছে মৃণাল। ঘরের জলের বোতল দুটো ভরে সে রেখে দিয়ে মৃনালের ফোনটা দেখতে বসে, অজস্র মেয়ের সাথে তার ঘনিষ্ট কথা বার্তা, কারুর কারুর সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার পরে সেগুলোর আলোচনা এইগুলো জেসি জানত যদিও। সবটা দেখে নিঃশব্দে আবার ফোন টা রেখে দেয় যথা স্থানে।
ইতি মধে মৃনালের ঘুম ভেঙে গেছে, সে জেস কে ঘড়িটা দিতে বলে ,জেস তাকে ঘড়িটা দেবার পর মৃনালের শুরু হয় সেটার বিশেষত্ব বোঝানো ।
জেসি - তুমি বড্ড শো অফ করো জানত।
মৃণাল- মানে? কখনোই সেটা করিনা আমি। আমার যা আছে আমি তা নিয়ে গর্বিত। গর্ব আর শো অফের মধ্যে তফাৎ আছে বেব।
না তাও, এতও গর্ব ঠিক লাগেনা আমার।
তোমার জন্য ইন্দ্র ভালো ছিল, রোজগারও কি যে করে কেউ জানেনা, খরচ কোথায় কি করলো কেউ জানেনা। ওই ঠিক ছিল।
রোজ জেসি ইন্দ্রজিত তার জন্য ঠিক শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছে সে। সে জানে ইন্দ্র তার জন্য কতটা ঠিক। সে জানে সে ইন্দ্র কে কি পরিমাণের ভালোবাসে। এই ছোট্ট বিষয় নিয়ে একটা বড় মাপের ঝামেলার সূচনা হয় রান্না ঘর থেকে একটা ছুরি উঠিয়ে সে মৃণালের গলায় ধরে।
কি ভেবেছিলে আমি তোমার বেপারে কিছু জানিনা?
এই এই নামাও ওটা কি করছো।
মৃণাল আমার কাজ তোমাকে এইটা বোঝানোর ছিল যে মানুষের অনুভূতি নিয়ে খেলা টা ভুল। তোমার জন্য তৃধা আর আনিকা অনেক কষ্ট পেয়েছে কিন্তু অরুন্ধতী, অরুন্ধতী তো নিজেকে শেষ করে ফেলেছে কেউ জানে সেটা? তোমার একটা মজার জন্য নিজের কিছুক্ষনের শারীরিক আনন্দের জন্য অরুন্ধতী নিজের প্রাণ দিয়ে দেয়। সেই রাতে আমি বাড়ি ফিরি মরিশাস থেকে। এসেই জানতে পারি অরুন্ধতী বাথরুমে বসে নিজের হাত কেটে আত্যহত্যা করে সকালেই, দৌড়াতে দৌড়াতে হসপিটালে যাই। ডাক্তার তার দেহ ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলেছে তখন। আমার অরু আমার বড় দিদি ... বুঝতে পারছো বুঝতে পারছ কি করেছ তুমি। হ্যাঁ হ্যাঁ ইন্দ্র আমার জন্য ঠিক ইন্দ্র ঠিক আমার জন্য কিন্তু আমি তোমার অবদি পৌঁছনোর জন্য ইন্দ্র কেও হারিয়ে ফেলি জানো। জানোনা শুধু শুধু বইয়ের পাতার ভাজের জ্ঞান আছে আর কিছু নেই কিছুই নেই। একটা হার্টলেস তুমি। খুনী খুনী নিজের দিদির খুনীর সাথে আমি শুয়েছি উঠেছি খেয়েছি। ছি ছি ইন্দ্র তোমার বন্ধু হয় এত প্রতিযোগীতার মানসিকথা যখন ওর মতো ভালো হয় দেখো ও আমাকে বোঝে ও জানে আমি কোন সময় কি ভাবছ। মৃণাল, তুমি কোনো দিন ইন্দ্রের জায়গা নিতে পারবেন কারণ ইন্দ্রজিত কে আমি ভালো বাসি ।
মৃণালের হাত থেকে কাঁচের কাপটা পরে যায় ,সে ভাবেই নি তার সাথে কি ভাবে খেলা হয়ে গেছে। মৃণাল ঘরে থাকা সোফার ওপর বসে পড়ে তার আত্মবিশ্বাসে খুব জোরেই লেগেছে আঘাতটা। হৃদয় নেই মৃণালের কিন্তু এই প্রথম কেউ তার সাথে তার খেলা খেলেছে। একটু সামলে নিয়ে মৃণাল উঠে দাঁড়ায়। একটা শান্ত নিষ্পাপ দেখতে মেয়ে যাকে সে খরগোশের মত ভেবেছিল সে সেই দিন আর খরগোশ নেই সে হিংস্র হয়ে গেছে।
জেস নিজের অন্তর্বাসটি খুলে ফেলে দিয়ে মৃণালের দিকে যায় তার ঘাড় ধরে দেওয়ালে সজোরে ঠুকে বলে - "মেয়েদের শরীরের নেশা করিস না তুই কর সামনে দাড়িয়ে আছি নে কি করবি" ।নিজের বন্ধুর প্রেমিকার প্রতি আকর্ষণ রাখতে লজ্জা করেনা? তুই আর ইন্দ্র তো বেস্ট ফ্রেন্ড ছি ছি আমি বরাবর চেয়েছি তোমাকে তোমার ভুলটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে। তোমার সামনে তোমার বিছানায় শুয়েই তোমাকে ধ্ংস করার ফন্দি করেছি । অরু তোমাকে ভালো বাসত। বোঝো ভালোবাসা। ওটা তো আবার তোমার ডিকশনারিতে নেই। নিজেকে হিরো ভাবো আসলে তুমি একটা আস্ত গাধা, গিরগিটি কোথাকার নিজের বন্ধু কে বারবার একটা প্যারামিটারের মত আমার সামনে ব্যবহার করোনা। ইন্দ্রকে আমি ভালোবাসি। তোমার কারণে আমি ইন্দ্রকে হারিয়ে ফেলেছি তোমার কারণে আমি অরুন্ধতী আর ইন্দ্রজিত দুজনকেই হারালাম। ইন্দ্রজিতের পর আর আমার বন্ধুত্বে বিশ্বাস করার ক্ষমতা নেই। ইউ আর এ বিগ জিরো আ বিগ জিরো।
আমি ডেটিং অ্যাপ নামিয়ে সোয়াইপ করতে করতে ইন্দ্রজিতের নামটা দেখি। সাথে সাথে ওর সম্পর্কে যতটা জানতাম, সেই অনুযায়ী নিজের প্রোফাইলে বদল আনি। মনে পড়ে দিদিয়া এই ছেলেটার কথা বলেছিল, তোমার বন্ধু। আমি ইন্দ্রজিত কে সোয়াইপ করি আর ওউ করে আমি নিজের পুরো চাল সাজিয়ে ফেলি। কিন্তু মাঝখান থেকে কি হয় জানো আমি ভালোবেসে ফেলি ইন্দ্র কে। আর নিজের উদ্দেশ্যে এতটাই স্থির লক্ষ্য ছিল বুঝতেই পারিনি ও না থাকলে কষ্ট হবে আবার।
সব শেষ মৃণাল সব শেষ আমি খুব ক্লান্ত। অরুন্ধতী নিশ্চয় কখনো না কখনো জাসমিনের কথা বলত, আমি সেই জাসমিন। আমি সেই যে তোমার কারণে সব হারিয়ে ফেলেছি অরু চলে গেছে কিন্তু আমি ,আমি মাঝ পথে আটকে আছি।"
সব বলতে বলতে জাসমিন বসে পরে মেঝেতে, জামাটা গলিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে গেলে একটা চোট খায় সে মাথায়। চোখের সামনে সব অন্ধকার, চোট টা সামলাতে না পেরে সে বসে পরে। কোনরকমে পিছনে ফিরে দেখে মৃণালের হতে একটা ফুলদানি। জেসির চুলের মুঠি ধরে সোফাতে নিয়ে গিয়ে বসায় মৃণাল, তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে শুরু করে-
ওহ মাই ডিয়ার বেব, তোমার মনে হয় না অরুন্ধতী আমায় তোমার বেপারে বলেছে। গুড আজামশান । কিন্তু আমায় তোমার ছবি দেখায়নি? ভেরি ব্যাড। এতটা ভুল কিকরে করো তুমি? ইন্দ্রজিৎ যেদিন তোমার ছবি দেখায়, আমি তখনই বুঝতে পারি যে তুমিই জ্যাসমিন। ফাঁদ তোমার একার নাকি? আই প্লেড দি গেম। আমি বলি ইন্দ্রকে তোমায় ভালোলাগার কথা। যেটার পরেই কিন্তু ও তোমাকে আমার হাতে তুলে দেয়। আই ওয়ান্টেড টু ফাক ইউ, বোথ অফ ইউ। ওহ হ্যাঁ একটা কথা অরু সুইসাইড করেনি। আই ফাকিং কিলড হার। তোমাদের বাড়িতেই ছিলাম সেদিন আমি, তোমার আসার সারপ্রাইজের জন্য, কিন্তু তখনই আমার ফোনে সায়নী ফোন করে। সায়নী চেননা তো, আমার ওয়াইফ, সেটা জেনে যায় অরু। বিশ্বাস করো তোমাদের দুই বোনের সাথে শোয়ার আগে আমি ওকে ছাড়তেই চাইনি, মেরে ফেলা তো দূর কি বাত। কিন্তু মারতেই হলো, আমার রেপুটেশন বাঁচাতে মারতেই হলো। আর আজকে তোকেও মারতে হবে, কারণ তুই বাঁচলে জানতে পারবে সব ইন্দ্র।
ইন্দ্র এমনিও সব জানে।
মৃণাল আর জেসি দুজনেই চমকে ওঠে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির গলা পেয়ে। দুজনেই দরজার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। জেসির চোখের জল বাঁধ মানছে না, চোখের জল একটুও আটকানোর চেষ্টা না করে কান্না ভেজা গলায়- "ইন্দ্র! তুমি?"
ইন্দ্র জেসির দিকে একবারও না তাকিয়ে মৃণালকে বললো, "ভাই, সঞ্চয়িতা কে খুব মিস করছি রে। ভালই আছে বোধহয় নতুন সম্পর্কে তাইনা?"
মৃণাল- সেটা কি আমার জানার কথা? তুই এখানে কেন?
জেসির ফোনে কল করেছিলাম রিসিভ হয়েছে কিন্তু আমার সাথে কথা বলেনি, তোর সাথে বলছিল। ও বোধহয় জানেইনা যে ওর ফোন তোদের ধস্তাধস্তিতে কখন রিসিভ হয়ে গেছে। চিন্তা হচ্ছিল তোদের দুজনের জন্যই তাই তারাতারি চলে এলাম। আজকেই ফিরেছি কলকাতা থেকে। ট্রেনে সঞ্চয়িতা কে দেখলাম জানিস।
তুই এখনও ওই মেয়ের জন্য আমায় দোষারোপ করিস? ইট ওয়াজ আ পাস্ট। তুই ভালোবাসতিস তোদের সম্পর্কও কিন্তু হয়েছিল। তোদের সম্পর্কে আমি কোনোদিন ঢুকিনি ইন্দ্র।
কিন্তু তার আগে? তার আগে তুই ওর সাথে কি করেছিলি মনে আছে? শি ওয়াস ইন অ্যাসাইলাম ফর আ ইয়ার। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম তোকে সবার সামনে এক্সপোজ করবো।
ভাই গ্রো আপ। শি ইজ নো মোর উইথ ইউ। শি লেফট ইউ।
তাতে কি? আমার দেওয়া কথাটা তো রয়েছে।
চোখের জল তখন খরস্রোতা নদীর মত বয়ে চলেছে জেসির দু গাল বেয়ে গলা বেয়ে। ইন্দ্রজিত একটু এগিয়ে এসে দু হাত দিয়ে মুছিয়ে দিলো জেসির দু চোখ। জেস ইন্দ্র কে জড়িয়ে ধরে বললো সব শেষ ইন্দ্র সব। না আমি মৃণালের হতে পারলাম না আমি তোমাকে পেলাম না তুমি আমায় পেলে। কেউ না..কেউ খুশি হলাম না নিজের জেদের বসে আমি দুটো মন ভাঙলাম।
ইন্দ্রজিত যতটা সম্ভব নরম স্বরে বলল, "সালা, আখ্যা লাইফ, সবাই আমায় ইউজ করেই গেল। বাট ইটস ওকে। তোমার প্রতি ফিলিংস আমার ছিল, তোমার ছিল, কিন্তু কেউই কাউকে ভালোবাসিনি জেস। এই ফিলিংসের নাম আমি জানিনা।"
মৃণাল চেঁচিয়ে উঠলো, "স্টপ দিস। এসব এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে মারা। লিভ মাই হাউজ।"
কেন জেসকে মারবি না? জাস্ট লাইক উই কিলড অরু।
উই?
নাহ মেরেছিলি তুইই। কিন্তু তোকে বাঁচাতে নার্সিংহোমকে ভুল রিপোর্ট বানাতে আমিই বলেছিলাম। দ্যাট ওয়াজ কিলিং টু রাইট? অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে ওয়ালা কেস।
জেসির মুখে আর কোনো কথা নেই। সে কি বলবে কাকে বলবে বুঝতে পারছে না। কিন্তু সে জানে তার প্রাণ বেঁচে গেছে এই যাত্রায়। ইতিমধ্যে ইন্দ্রজিত এগিয়ে এসে মৃণালের ল্যাপটপ হাতে নেয়। তারপর বলে- "জেসি, পাসওয়ার্ড টা বলো।"
জেসি- SAYANI_MRINAL@021117
মৃণাল- হাও দি হেল ইউ নো মাই পাসকোড?
ইন্দ্র- ও কি এতদিন তোর কাছে ভালোবাসার টানে আসছিল নাকি? উই হ্যাড আ ডিল মৃণাল। আ ডিল টু ফাক আ ফাকার। সায়নী, তৃধা, অনিকা, মিমি তোর কি মনে হয়, এই ইনফো গুলো ও জানলো কীকরে?
মৃণাল- তুই বিশ্বাসঘাতকতা করলি ভাই? তুইও।
ইন্দ্র- ইয়েস জুলিয়াস, এইবার আমি ব্রুটাস।
ইন্দ্রজিত ল্যাপটপে কিছুক্ষণ কিছু টাইপ করলো। ঘরে নিস্তব্ধতা চূড়ান্ত, কেবল বৃষ্টির আওয়াজ আর কীবোর্ড চাপার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ইন্দ্র ল্যাপটপটা সামনের দিকে ফিরিয়ে দেখালো মৃণালের স্বীকারোক্তি। ঠিক কিছুক্ষণ আগেই যা যা মৃণাল রাগের বশে জেসি কে বলেছে সেই ভিডিও টাই চলছে ল্যাপটপের স্ক্রীনে। জেসি কে দেখা যাচ্ছেনা, কেবল দেখা যাচ্ছে মৃণালের অর্ধনগ্ন দেহ, রাগান্বিত মুখ আর বিকৃত স্বরে বলে যাওয়া অরুন্ধতীর খুনের বিবরণ।
এইবার জেসি উঠে দাঁড়িয়ে সোফার পিছন থেকে ওর ব্যাগটা তুলে নিল।
ইন্দ্র- তোর প্রোফাইল থেকে আপলোড করে দিলাম ভাই, ডিলিট করতেই পারিস, কিন্তু ব্যাকআপ অনেক জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। লাভ হবে না। জেসি, লেটস্ গো।
জেসি বাধ্য মেয়ের মতন বেড়িয়ে এলো ইন্দ্রর সাথে। এসেই ডুবন্ত মানুষ যেমন খড়কুটো পেলেও প্রাণপণে জড়িয়ে ধরে সেরকম ভাবেই জড়িয়ে ধরলো ইন্দ্র কে।
মৃণাল আমার ছিলইনা তাও কষ্ট হচ্ছে। তার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে..
কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলো জেস। ইন্দ্র তার পাশে হাঁটতে থাকলো অনেকটা পথ। তারপর থেমে বলল- "অনেকটা হাঁটা হয়ে গেল। এবার বাড়ি ফিরে যাও, পরশু কলকাতা বেড়তে হবে তোমায়। নিজের নতুন জীবনের পথে পাড়ি দাও। দিদির স্বপ্ন পূরণ করো। আমাদের হয়তো আর কখনো দেখা হবে না। আর যোগাযোগ না রাখাই শ্রেয়।" চোখের কোনে তার ও জল জমেছে । প্রাণপণ লুকিয়ে সে পেছন ফেরে আর ফিরে তাকায় নি সে । কথা হয়নি তার পর আর কোনো দিন তাদের।
জেস একটা চিঠি লিখেছিলো ইন্দ্রকে-
"সেই দিন জানতে চেয়েছিলে না কিছুই কি ছিলনা , হ্যাঁ ছিল যদি একবার বুঝতে পরতে ইন্দ্র এক নজরে ভালোবেসে বসেছিলাম। তোমাকে দেখার পর তো প্রতিশোধ টাই ভুলতে বসেছিলাম , সেই দিন আমাকে দূরে না সরালে আমি ভুলেই যেতাম আমার উদ্দেশ্যটা। আমার কোনো দিনই দুটো নৌকা ছিলনা। আমি কোনো দিন মৃণালের অপেক্ষা করিনি। তোমার অপেক্ষায় আমি রাতের পর রাত কাটিয়েছি, তুমি যতটা আমাকে জানতে পেরেছিলে কেউ কোনো দিন এতো কাছে আমার আসতে পারেনি পারবে ও না। আমি তোমার চোখে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলাম যাকে প্রাণপণে নিজের থেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম তুমি তাকে খুঁজে বার করেছ। চিৎকার করে বলতে চেয়েছিলাম আর চাইনা কাউকে কিন্তু আমার কপাল লাভ লাইফে আমার ফেভার করেনা। এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে এসেছিলাম তুমি ছাতা বের করে নিজের গায়ে বৃষ্টি লাগতে দাওনি। একবার যদি একবার থাকতে বলতে। একবার থেকে যেতে বলতেই পরতে আমাকে । "
সেই চিঠির কোন উত্তর আসেনি।
কোনও এক রেস্তোরাঁ তে বসে এক দম্পতি দেখল সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়া মৃণালের স্বীকারোক্তির ভিডিও আর তার পাশেই সংবাদমাধ্যমের তরফ থেকে জানানো এই স্বীকারোক্তির পরেই আত্মহত্যা করে বিশিষ্ঠ আইনজীবী মৃণালকান্তি সান্যাল। মহিলার চোখ ভিজে যায় খবর টা দেখে সে তার প্রেমিকের হাত চেপে ধরে বলে- "এই সেই মৃণাল, হি ওয়াজ দি রিশন। হি ইজ এক্সপোজড নাউ।"
হাজার বার ফোন করা সত্ত্বেও ইন্দ্রজিতের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না কেউ। সে যেন এই শহর থেকে একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
জেসি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। গত একটা বছর যেন তার জীবনে আসেইনি, সে কখনো কোনো ইন্দ্রজিত বা মৃণালের সাথে পরিচিত হয়নি, এমনটাই নিজেকে বোঝাতে চাইছে। সে তার নিজের শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্যেই যেন মরিয়া। কলকাতার ট্রেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দেবে প্ল্যাটফর্ম। জেসির বারবার মনে হচ্ছে আজ হয়তো ইন্দ্রজিত একবারের জন্য হলেও তার সামনে আসবে, শেষবারের মত। সে যে এই শহর ছেড়ে নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন ভাবে সাজাতে পাড়ি দিচ্ছে এক অজানা অচেনা শহরে সেটা কি ইন্দ্রজিত জানেনা। জানে যখন তখন একবারের জন্যেও কি আসবে না। নাকি সে চায়না জেসি আবার পিছনে ফিরে দেখুক, থমকে যাক, সরে আসুক নিজের লক্ষ্য থেকে। এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে খেয়াল করেনি জেসি। সম্বিৎ ফিরলো ট্রেনের হুইসেলের আওয়াজে। একবার অরুন্ধতীর কথা মনে পড়লো জেসির এক মুহূর্তের জন্যে, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে ভর করলো ইন্দ্রজিত। যতক্ষণ ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে পুরোপুরি বেড়িয়ে না গেল, জেসির চোখ খুঁজে চলেছিল সেই মানুষটাকে একবার চোখের দেখা দেখবার জন্য।
পেরিয়ে গেছে কুড়িটা বছর। জেসি এতদিনে একবারের জন্যেও ফিরে আসেনি জলপাইগুড়িতে। তার জীবন ইতিমধ্যে বদলে গেছে অনেকটা।
সকাল সকাল নিজের বাড়ির বাগানে বসে সবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছে জেসি এমন সময় সে দেখলো ব্রুনো মুখে করে একটা খাম নিয়ে আসছে। ব্রুনো জেসির একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী লন্ডনের। শেষ পাঁচটা বছর জেসি নিজের দেশ ছেড়ে কাজের সূত্রেই বসতি স্থাপন করেছে লন্ডনে। ব্রুনোর মুখ থেকে খামটা ছাড়িয়ে নিতেই ব্রুনো একটু স্বস্তি পেয়ে, জেসির কাপের পাশেই রাখা নিজের জন্য বরাদ্দ ক্যালসিয়াম বোনটা নিয়ে জেসির চেয়ারের পাশেই শুয়ে চিবোতে লাগল।
জেসি খামটা দেখে বুঝল এটা তার দেশ তার নিজের শহরের একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে জেসির পরিবার এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাতে দান করে থাকে, জেসি নিজের ঠাকুমাকে, বাবাকে দেখেছে নিয়মিত প্রত্যেক বছর পুজোর সময় ওখানে কিছু দান করতে। জেসি সেই পরম্পরা ধরে রেখেছে এতগুলো বছর। খামটা খুলে চিঠিটা পড়ল জেসি। জেসিকে অর্থনীতি নিয়ে তার সফল রিসার্চের জন্য অভিনন্দন জানানো হয়েছে চিঠিতে, সাথে বলা হয়েছে তারা ভারতের গর্ব অর্থনীতিবিদ জেসমিন চক্রবর্তী কে সম্বর্ধনা দিতে চায়। জেসির চোখে আনন্দের জল দেখা গেল, এত বছরে অনেক সম্মান প্রাপ্য হয়েছিল জেসির, কিন্তু নিজের দেশ, নিজের শহর থেকে এই সম্মান তাকে অন্য এক মাত্রায় আনন্দ এনে দিল। যদিও এই যুগে ই-মেইল না পাঠিয়ে একটা এতবড় সংস্থা তাকে হঠাৎ চিঠি কেন পাঠালো তাই নিয়ে মনে একটু চিন্তা আসলেও তা মুহূর্তেই ঝেড়ে ফেললো জেসি। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল জেসি-
হ্যাল্লো, গুড মর্নিং জেমস্।
ওপরের মানুষটা আধো ঘুম জড়ানো গলায় উত্তর দিল, "গুড মর্নিং ডিয়ার। এত্ত সকাল সকাল?"
আই নিড টু লিভ ফর ইন্ডিয়া টুমোরো, গেট মাই টিকেটস রেডি।
কালকে? এনিথিং সিরিয়াস।
চিন্তার কারণ নেই সেরকম কিছু না, আসলে একটা এনজিও থেকে ডেকেছে, অ্যাওয়ার্ড সেরেমনি আছে। আই নিড টু বি দেয়ার পরশুর পরশু বিকেলে।
বাংরেজের বাচ্ছা। অ্যাওয়ার্ড নিয়ে এত্ত আগ্রহ আগে দেখেছি বলে তো মনে পড়েনা। আর তাছাড়া কালকে তোমার ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নেওয়ার আছে। তোমার নেক্সট বইটার জন্য পাবলিশারের সাথে মিট আছে। এই উইক ছাড়ো নেক্সট তিন মাসের মধ্যে তোমার কোথাও যাওয়া হবেনা বেব।
আমি আমার স্কেজুল জানি জেমস্। নো নিড টু রিপিট। কিন্তু এই সেরেমনি আমি অ্যাটেন্ড করবো। এখন কলকাতায় পুজোর সময়, জলপাইগুড়ির পুজো কত্ত বছর দেখা হয়না। জেমস্ ইউ আর মাই ম্যানেজার, সো ইটস টাইম ফর ইওর জব, আমার নেক্সট উইক টা রিস্কেজুল করে ফেল। আমার টিকিট কেটে ফেল।
এই এই এই ম্যানাজার বলে গাল দেবেনা আর এই সাত সকালে বকুনি তো দেবেই না একদম। এই সকাল বেলা আমি গুড মর্নিং কিস ছাড়া কাজ করিনা।
কাল ফ্লাইটে দেব কিস। কাল বিকেলের ফ্লাইটে টিকিট চাই, সকালে ইউনিভার্সিটির ক্লাসটা নিয়েই বেড়িয়ে যাব। নিজের টিকিট টাও কেটো, এই বছর তোমায় কলকাতার পুজো দেখাব।
এয়ারপোর্টের গেট দিয়ে বেরিয়েই জেসি এবং জেমস্ দেখলো একজন হাতে জেসমিন চক্রবর্তীর নাম লেখা একটা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আসার আগেই একটা সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে জেসি, এই সংস্থা দুর্গা পূজার সময় ঠাকুর দেখায় কিছু অর্থের বিনিময়ে। আজকের রাত আর পরের দিন সকালটা রেস্ট নিয়ে পরেরদিন সারারাত ঠাকুর দেখার প্ল্যান তাদের।
ঠাকুর দেখার বিষয়ে জেমস্ খুব আগ্রহী ছিল, বিদেশি মাঝ বয়েসী মানুষটার ধারণা ছিল সে নির্বিঘ্নে ঠাকুর দেখবে, সব মণ্ডপে ঢাক বাজবে আর সে নাচবে। বার কতক ধুতি পরে ঠাকুর দেখতে বেরোতে চেয়ে জেসির ধমক খেয়ে শেষে জিন্স পরেই বেরিয়েছে সে। কিন্তু কলকাতার প্যান্ডেলে ভির দেখে বেচারার সমস্ত উৎসাহেই জল পরে গেছে।
এই জেমস্, মুখটা এমন ডিম ভাজা মার্কা করে হাঁটছো কেন?
ওহ বেব, কলকাতার প্যান্ডেল হপিং এভারেস্ট ট্রেকের চেয়েও বেশি কষ্টকর লাগছে আমার। তোমার কারণে আমি বাংলা শিখে ফেলেছি কিন্তু তুমি যদি আগে বলতে এরম ক্রাউড হয় প্যান্ডেলে আমি আসতাম না। নেটে ছবি দেখে যা ভেবেছিলাম এ তার একদম উল্টো।
এতেই তো মজা। তাও তো সবে ষষ্ঠী আজকে, কাল থেকে তো আসল ভিড়।
কাল? কালকেও বেড়োতে হবে? প্লিজ।
নাহ্, কাল সক্কাল সক্কাল আমরা এনজেপি যাব। কাল তোমায় রাতের বেলা ফাঁকা প্যান্ডেল দেখাব। কিন্তু তুমি আপাতত সামনে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির প্যান্ডেল দেখ।
জলপাইগুড়ি তে জেসি জেমসকে নিজের ছোটবেলার সাথে পরিচয় করাতে থাকে, তার সাথে জড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটা স্মৃতি একবার করে ঝালিয়ে নেয় জেসি আর জেমস্, কিন্তু স্বযত্নে জেসি এড়িয়ে যায় মৃণাল বা ইন্দ্রজিতের সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলো। জেসির কতবার কত জায়গা দেখে সেই একটা বছরের কত কথা মনে পড়ে, কিন্তু তা টের পায়না জেমস্।
থ্যাংক ইউ ম্যাডাম, আজকের সকাল টা আমাদের সময় দেওয়ার জন্য। আজকে বিকেলেই আপনাকে আমরা সম্মানিত করব। আপনি যে অতদুর থেকে আসবেন সেটাই আমরা ভাবতে পারিনি।
আরে না না ঠিক আছে, অনেক বছর দেশে ফিরিনা দরকার পরেনা। মন খারাপ করে তো নাকি। এইযে এত্ত বছর পর এই শহরে ফিরলাম সেটাই তো পাওনা। বাই দা ওয়ে, আজকে বিকেলে তো ছিল প্রোগ্রাম। সকাল সকাল ডাকলেন কেন?
ম্যাডাম, আমাদের আন্ডারটেকিংয়ে একটা অনাথ আশ্রম আছে। আজ যদি আপনি একটু সকালটা সেখানে যান ওদের সাথে কিছুটা সময় কাটান। তবে ওরা কিছু শিখবে। ওদের একটু ভালো লাগবে।
ওহ আচ্ছা বেশ। তবে আমি কিন্তু ওই বাচ্চাদের সামনে বক্তৃতা রাখবো না, প্লীজ আই অ্যাম ভেরি ব্যাড অ্যাট ইট। আমি কেবল ওদের সাথে একটু সময় কাটাবো।
বাচ্চাদের সাথে বেশ অনেক্ষণ সময় কাটায় জেসি আর জেমস্। তাদের সাথে গান গল্পে বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। মধ্যাহ্নভোজের পর জেমস্ বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলায় মেতে ওঠে। জেসি এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে, একটা ফাঁকা ঘরে ঢোকে। ঘরটা কেও ব্যবহার করে বলে মনে হলনা জেসির। কিন্তু তাও বেশ সুন্দর করে সাজানো ঘরটা। খাটের পাশেই একটা রিডিং টেবিল, তার ওপরে একটা ডায়েরি।
জেসি ডায়েরিটা তুলে একটু ইতস্তত করল তারপর খুলল প্রথম পাতা, ওপরেই লেখা "ইন্দ্রজিতকে নিজের মনের সব ভাব প্রকাশ করার জন্য….. সঞ্চয়িতা।"
ইন্দ্রজিত আর সঞ্চয়িতা নাম দুটো পড়ে জেসির গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। পরের পাতা উল্টাতেই ইন্দ্রজিতের হাতের লেখা, "আজ তিন বছর পর ডায়েরিটা দরকার পড়ল। এতদিন তাকেই সব জানতাম দিন বৃত্তান্ত, কিন্তু আজ প্রায় দু-মাস তাকে আর কিছু বলা হয়না। খুব সম্ভবত আর বলা হবে না কোনোদিন। তাই এবার এই ডায়েরি টাই সঙ্গী আমার।"
জেসি পাগলের মত অনেকগুলো পাতা ওল্টাতে থাকলো, খুঁজতে থাকলো তাকে নিয়ে কখনো কিছু লিখেছে কিনা ইন্দ্রজিত। অনেকগুলো পাতা পরে সে পেল সেই তারিখ যেদিন জেসি প্রথমবার মৃণালের ফ্ল্যাটে গেছিল। ইন্দ্রজিত লিখে রেখেছে, "আজ বেশ চিন্তিত লাগছে। জেস কি নিজেকে সামলাতে পারবে? মৃণালের ওপর সব জায়গায় ভরসা করা যায়, কিন্তু তাও এত চিন্তা কেন হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি না। এটা কি শুধুই চিন্তা নাকি নিজের কাউকে হারিয়ে যেতে না দেখতে চাওয়া। অনেক প্রশ্ন নিজেকেই করতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ।"
কুড়ি বছর আগের শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত আবার রক্তের ছোঁয়া পাচ্ছে জেসির। চোখে জল তার। সে আরো কিছুটা পাতা ওল্টালো, একদম শেষ পাতা সেই অভিশপ্ত রাতের, যা সারা টা জীবন দিয়ে ভুলতে চেয়েছে জেসি। সেখানে ইন্দ্রজিত লিখেছে, "আজ অবশেষে যবনিকা পতন হল। এতদিনের সাজানো সবার ঘুঁটি, সব কারণ সব অকারণ সব শেষ। খেলা শেষ। জেসিকে এইবার একা চলতে হবে নিজের লক্ষ্যে। বেচারি নিজেকে শেষ করে ফেলতে চাইবে অনেকবার, কিন্তু ও বাঁচবে, বাঁচবেই। কারণ আমি জেসির মধ্যে নিজেকে দেখেছি, আমরা আলাদা নই, আমি যখন বেঁচে আছি ওউ বাঁচবে, আমরা মরিনা, হাজার বাধা বিপত্তির পরেও আমরা বেঁচে যাই। কিন্তু এবার আমায় আমার বন্ধুর কাছে যেতে হবে। মৃণালকে সামলাতে হবে, ওকে নিয়েই ভয় আমার। ও না কিছু করে.."
এই তুমি এই ঘরে কেন?
একটা বাচ্চার কণ্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরল জেসির, ডায়েরিটা সে রেখে দিল যথাস্থানে। পিছন ফিরে দেখে একটা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে দরজায়। সাত আট বছর বয়েস হবে মেয়েটার। জেসির বেশ ভাল লাগলো মেয়েটাকে সে ইশারায় ডাকলো বাচ্চাটাকে, কিন্তু বাচ্চাটা এক পাও না এগিয়ে, জেসিকে ডাকলো একইভাবে ইশারায়। জেসি এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাটার সামনে নিচু হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন? এই ঘরে আসা বারণ?"
হ্যাঁ, এই ঘরে ঢোকা বারণ। এটা ইন্দ্র দাদার ঘর।
দাদা? দেখেছ তুমি তাকে?
হ্যাঁ, একটু বুড়ো হয়ে গেছে কিন্তু সব্বাই দাদা বলে, তাই আমিও বলি।
কোথায় সে এখন কিছু বলতে পারবে ?
নাহ। সব সময় তো আসেনা, খালি আমাদের সব্বার জন্মদিনে আসে।
কবে তোমাদের জন্মদিন?
জেসির প্রশ্ন শুনে বাচ্চাটা হটাৎই নিজের খেয়ালে জেসি কে ভেঙচি কেটে দৌড় দিল। জেসি ঘর থেকে বেড়িয়ে বেশ কয়েকবার ডেকেও থামাতে পারলো না।
“বেব উই শুড লিভ নাও”। জেমসের স্বর শুনে জেসি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো।
ইটস অলরেডি থ্রি, ছ-টার মধ্যে তোমায় সেরেমনি অ্যাটেন্ড করতে হবে। ইউ নিড আ পাওয়ার ন্যাপ।
জেমসের ঘর্মাক্ত অবস্থা দেখে জেসি আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ বেড়িয়ে গেলো ওর সাথে। আর জেসির সাথে ইন্দ্রজিতের ডায়েরিটা।
জেসির যখন ঘুম ভাঙলো তখন সবে সন্ধ্যে নামছে। গায়ের চাদরটা সরিয়ে সে দেখে জেমস তার পাশের চেয়ারটা তে বসে তবে ঘুমন্ত। জেসি উঠে বসে জেমসকে ডাকলো।
এই তুমি চেয়ারে কেন?
ওহ মাই স্লিপিং বিউটি। আই হ্যাভ এ সারপ্রাইজ ফর ইউ।
বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে ক্লোজেট খুলে একটা প্যাকেট বের করে দিয়ে বলল, “এই নাও এটা তোমার.. এইটা আজ সন্ধে বেলা পড়ো কেমন।” জেস হাত পেতে প্যাকেটটা নিল, খুলে দেখল ভিতরে একটা হলুদ পিওর সিল্কের শাড়ী। এই রঙ তার ভীষণ প্রিয় । আয়নার সামনে দাড়িয়ে সে তার গায়ে এই শারীটা ফেলে দেখতে গিয়ে তার মনে পড়ল একটা সময় তার আলমারী জুড়ে কত একই রঙের হের ফের এ ভিন্য জমা ছিল।
তুমি শাড়ী কিনলে আমার জন্য?
ইয়াপ। তোমাকে শাড়ী তে দেখতে ইচ্ছে হল।
তুমি কিনলে কিভাবে? এই রঙটা আমার ফ্যাভ। তুমি জানতে?
জানতাম না? আজকে প্রথম চিনলাম নাকি তোমায়? আর শাড়ী একা কিনিনি, আই গট হেল্প ফ্রম আ নিউ গাই। ওই হোমটায় আলাপ হলো, উই প্লেড সকার…
ফুটবল।
ইটস সেম। মোট কথা খেললাম। হি ইজ ইকোয়ালি গুড, বাট আই মেড দা গোল। তো ওকেই জিজ্ঞেস করলাম শাড়ী কেনার কথা, দেন হি টুক মি।
কখন?
যখন ঘুমাচ্ছিলে। সারপ্রাইজ টা ভাল লেগেছে?
খুব। দাঁড়াও পড়ে আসি শাড়ীটা।
সে যখন এই শাড়ীটা নিজের অঙ্গে চড়ালো, খোলা চুল দুই ভুরুর মাঝে একটা ছোট্ট টিপ চোখের তলায় গাঢ় কাজল, ঠোঁটের রঙ হালকা গোলাপী, কাঁধ থেকে যেন ঝর্ণার মত শারীর আচল নেমেছে। জেমসের সামনে এসে দাঁড়াতেই সে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে থাকে জেসের দিকে। জেমস কোন দিন জেসি কে শাড়ী পরে দেখেনি আজ দেখে সে চোখ ফেরাতে পারছেনা। শাড়ীর মাঝে তার কোমরের ভাজে নিজের হাত রেখে আয়নার দিকে তাকিয়ে—
ইউ আর লুকিং ভেরী ডিফরেন্ট টুডে বেব। আই কান্ট এক্সপ্লেইন কতোটা ভালো লাগছে তোমায়।
বলেই জেসির কাঁধে মুখ ডোবায় জেমস্। জেসি হারিয়ে যেতে চায় এই সুখে কিন্তু সময় নেই।
ধন্যবাদ জেমস। কিন্তু আমার শাড়ী পড়তে অনেকটা সময় লাগে। এখন না খুললেই বোধহয় ভালো।
জেসির আবেগ জড়ানো ধমক খেয়ে জেমস ফিরে এলো সুখের সাগর থেকে।
বাইরে গাড়ি রাখা আছে তারা গাড়িতে উঠে সেমিনারের দিকে রওনা দিল।
আলো ঝলমলে গন্তব্যস্থলে পৌঁছিয়ে জেমস আর জেসি সামনের গেস্ট সিটে বসল। কর্তৃপক্ষের একটা ছোট্ট ভাষণের পর—
এবার আমরা ডক্টর জেসমিন চক্রবর্তী কে মঞ্চে ডেকে নিচ্ছি তাকে আমরা পুষ্প স্তবক দিয়ে বরণ করে নেব।
জেসি হেটে স্টেজে ওঠে পুষ্প স্তবকটি হাতে নিয়ে একটা শান্ত হাসি হেসে মাইক নিয়ে নিজের শহরের ছোটবেলার কিঞ্চিত কিছু স্মৃতি ভাগ করে নেয় সবার সাথে। তার এই সাফল্যের পেছনে থাকা সবাইকে ধন্যবাদ জানায়, তার নতুন কাজের কিছু তথ্যও তুলে ধরে সবার মাঝে। সব শেষে সে নব যৌবনের উদ্দেশ্যে বলে—
জীবনে , ঝোকের বসে নেওয়া সিদ্ধান্ত পরে জীবনে অনেক বড় ক্ষতর কারণ হয়, জীবনে যখন মনে হবে সব শেষ জানবে তখনই আসল জীবন শুরু। তখন হেরে যাওয়াটা কোনো অপশনই নয়, তখন জিতে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেটাই সব।
তার বক্তব্যের পর স্টেজে বসে পরে জেসি। তারপর বেশ কিছুক্ষণ চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তারপর সঞ্চালক বলেন—
আমরা অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায় পৌঁছে গেছি, আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন আমাদের সংস্থার ডিরেক্টর এবং বিশিষ্ঠ আইনজীবী ইন্দ্রজিত সেন।
ইন্দ্রজিতের নাম শুনেই জেস চমকে গেল। সে দেখল স্টেজে উঠছে তার অতিপরিচিত সেই মানুষটা। এই কুড়ি বছরে তার চেহারায় বদল এসেছে বেশ খানিকটা। চুলে পাক ধরেছে, বদলে গেছে চশমার ফ্রেম, হাতের ঘড়িটা জলজল করছে আলোতে। হলুদ একটা পাঞ্জাবি আর কালচে রঙের ধুতি পড়ে স্টেজে উঠল ইন্দ্রজিত। জেসি হাঁ করে তাকিয়ে সেই দিকে, কিন্তু ইন্দ্রর হাবভাব দেখে মনে হল না সে জেসিকে চেনে বলে। ইন্দ্র মঞ্চে উঠে দর্শকদের এবং মঞ্চে উপস্থিত সবার উদ্যেশ্যে প্রণাম জানায়। নিজের অনুষ্ঠানে এত পরে উপস্থিত হওয়ার জন্য ক্ষমা চায়। তারপর সবাইকে শুভ রাত্রি বলে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে স্টেজ ছেড়ে বেড়িয়ে যায়।
জেসি নিজের মনকে দমন করতে পারে না, সে পিছু নেয় ইন্দ্রজিতের। জেসি ব্যাক-স্টেজে দেখে ইন্দ্রজিত দাড়িয়ে ফোনে কথা বলছে, কিন্তু তাকে ডাকতে পারছে না জেসি। তার মনে ভয়, যদি ইন্দ্র তাকে চিনতে না পারে। এইসব ভাবনা থেমে গেল একটা ডাকে—
জেসি, হাঁ করে কি দেখছিস? ভুলে জাসনি হোপফুলি।
তুমি…..
হ্যাঁ কেন?
এতগুলো বছর একবারও মনে হয়নি আমার কথা? একবারের জন্যেও যোগাযোগ করতে ইচ্ছে করেনি তোমার? তোমাকে একটাই চিঠি লিখেছিলাম, ভদ্রতার খাতিরে সেটার উত্তরই নয় দিয়ে দিতে।
পাঠালাম যে চিঠি। এই যুগে মেলের বদলে চিঠি দিয়ে ডাকলাম, বুঝিসনি? এত্ত বড় ইকোনমিস্ট এখনও রিডল প্যারিস না?
তুমি আমায় তুই কেন বলছো? এত্ত বছর কোথায় ছিলে? আই মিসড ইউ অ্যাট এভরি স্টেপ অফ মাই লাইফ। কতবার নিজেকে শেষ করতে গেছি জানো?
জানি। কিন্তু শেষ করিসনি তো নিজেকে। আমি জানতাম তুই এইসব ভুলভাল স্টেপ নিবি না। ভুলে জাসনা আগেও বলেছিলাম তুই আর আমি আলাদা নই, আমাদের মানসিকতা চিন্তাধারা সমান। উই আর বেসিকালি সেম। দেখ সব একাই কাটিয়ে ফেলেছিস দেখলি, তুই একাই যথেষ্ট।
বাট আই নিড ইউ। আই স্টিল…
জেসি, অনেকটা সময় আমাকে ছাড়াই কাটিয়েছিস আমাকে তোর আর প্রয়োজন নেই। পিছন ফিরিসনা আর। যেখান থেকে বেরিয়ে গেছিস সেখানে ফিরতে চাসনা। নতুন ভাবে বাঁচতে শিখে গেছিস, সেভাবেই বাঁচ। আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ আলওয়েজ।
জেসি কিছু একটা বলতে গেল, ঠিক তখনই সব অন্ধকার, কিছু একটা যান্ত্রিক গোলযোগ হয়েছে, জার জন্যে সব আলো নিভে গেল, মাইকের যান্ত্রিক আওয়াজ থেমে গেল।
জেসি অনুভব করল তার কোমরে একটা স্পর্শ। তারপর হঠাৎই তাকে কেউ কাছে টেনে নিয়ে তার ঠোঁটে আঁকতে শুরু করল চুম্বন। জেস প্রতিবাদ করতে পারলো না, করতে চাইলো না। দূর থেকে ভেসে আসা জেমসের আওয়াজ কানে আসছে জেসির। জেমস ডাকছে জেসিকে, কিন্তু জেসি সাড়া দিতে পারছে না, সে চাইছেই না। জেমসের গলার স্বর দূর থেকে ধীরে ধীরে কাছে এসে গেছে, আর ঠিক তখনই আলো জ্বলে উঠলো। জেসি ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখল জেমস পাশেই দাঁড়িয়ে তার। ইন্দ্র বেশ কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে ফোনে কিছু দেখছে।
জেমস- ওহ বেব, ইউ আর আলরাইট। ডাকছিলাম সাড়া দিচ্ছিলে না কেন?
জেসি- জেমস, আমি ঠিক আছি। লেটস লিভ। আমি আসছি ইন্দ্র।
জেমস- ইউ গায়েস নো ইচ আদার?
জেসি- তুমি ইন্দ্রকে চেন নাকি?
ইন্দ্র- হ্যাঁ জেমস, উই জাস্ট মেট।
জেমস- বেব, দিস ইজ দি গাই, আই ওয়াজ টকিং অ্যাবাউট আরলিয়ার।
জেসি- শাড়ীটা ওর পছন্দের?
জেমস- নোওও, রং ডিজাইন সব আমি পছন্দ করেছি, হি জাস্ট হেল্পড্ মি উইথ দা শপ অ্যান্ড মেটেরিয়াল। বাট মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি আমি গোল করেছি খেলার সময়।
ইন্দ্র- নো ডিয়ার, আই লেট ইউ।
জেমস- হেরে গেলে সবাই বলে। ঠিক না?
জেসি- আই এগরি। গোল তুমি নিজেই করেছো। নাও লেট ইউ। গুড বাই ইন্দ্র।
ইন্দ্র- গুড বাই বোথ অফ ইউ। হোপ ইউ গায়েস বি হ্যাপি।
জেসি আর জেমস দুজনেই চলে যেতে থাকে। জেসি এখনও বুঝে উঠতে পারছেনা আজকেও কি সে ইন্দ্রজিতের চুম্বন কল্পনা করল, নাকি আজ সত্যিই ইন্দ্রজিত ঠোঁট ডুবিয়েছিল তার ঠোঁটে। মনে অনেক প্রশ্ন নিয়ে সে একবার শেষবারের জন্য পিছন ফিরল ইন্দ্রজিতের দিকে। ইন্দ্রজিত তাকিয়ে আছে তার দিকেই। জেসিকে ফিরতে দেখে ইন্দ্র ডানহাতের তর্জনী দিয়ে একবার নিজের ঠোঁটটা ছুঁলো, চশমা নামিয়ে একবার চোখ টিপল জেসির উদ্যেশ্যে। তারপর মুখে একটা প্রশান্তির হালকা হাঁসি হেঁসে পিছন ফিরল ইন্দ্রজিত। জেসি একটু লাজুক হেঁসে হাঁটতে থাকলো জেমসের সাথে।
প্লেন ল্যান্ড করবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। জেমস ঘুমাচ্ছে অঘোরে, পাশেই জেসি ইন্দ্রজিতের ডায়রীটা পড়ছে। শুরুর থেকে অনেক কিছু জানতে পারছে সে ইন্দ্রজিতের সম্পর্কে। কখনও কেস জেতার আনন্দ, কখনও বন্ধুদের সাথে কাটানো মুহূর্ত। পড়তে পড়তে জেসি পৌঁছে গেছে অরুন্ধতীর মৃত্যুদিনের পরের দিন, সেখানে ইন্দ্র লিখেছে— “আজ প্রথম হাতে রক্তের দাগ লাগলো। মায়ের মৃত্যুর পর আজ প্রথম কাউকে এত কাছের কাউকে এত কাছ থেকে মারা যেতে দেখলাম। অরুর সাথে হাসপাতালে দেখা করতে গেছিলাম। অরু চাইছিল আমি সবাইকে জানিয়ে দিই আমাদের সম্পর্কের কথা। আমি যে কেবল চাইছিলাম যাতে মৃণালের চেহারাটা সবার সামনে আসুক, এই ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠত আমার চরিত্র নিয়ে। আমাকে তাই আজ শেষ করতে হল অরুকে। অরুর শেষ ইচ্ছে ওর বোনের কোন ক্ষতি যেন না হয়। সেই কথা আমি কিভাবে দেব? সে আমার রাস্তায় না আসলে আমি তার ক্ষতি তো করবই না।”
জেসি বাকরুদ্ধ, কাকে সে নিজের জীবনের সব থেকে উঁচু আসনে বসিয়েছে। তার বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। চোখ ঘৃনা আর রাগে লাল হয়ে উঠেছে তার, চোখের কোনে জল জমেছে যেন আগুন। ঘুমন্ত জেমসকে ধাক্কা মেরে তুললো ঘুম থেকে জেসি।
জেমস, আই নিড টু ভিসিট ইন্ডিয়া এগেন।
এগেইন?
আই লেফট সামথিং হাফ ডান দেয়ার।
অ্যান্ড ইউ নিড টু কমপ্লিট ইট?
অ্যাজ আলওয়েজ।

