Neha Karmakar

Horror Thriller


4  

Neha Karmakar

Horror Thriller


অভিশপ্ত জঙ্গলের সেই রাত

অভিশপ্ত জঙ্গলের সেই রাত

5 mins 166 5 mins 166

তখন আমার আস্তানা জঙ্গলের ভেতর নদীর ধারের এক বাংলো। এক সন্ধ্যেবেলা বারান্দায় বসে আছি সামনে কুয়াশার চাদরে মোড়া অমাবস্যার জঙ্গল। কানে আসছে নদীর জলের আওয়াজ আর তার সাথে ক্রমাগত বয়ে চলা হাওয়ার শো শো শব্দ।এই শহর সংলগ্ন গ্রামে গতকাল এলেও; বাংলোতে এসেছি সবে আজ সকালে। কালকে ভোরের ট্রেনে কলকাতা ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে জায়গাটি। আচ্ছা তার আগে বলি আমার এখানে আসার আসল কারন।আমার নাম অরিত্র গোস্বামী। মাস ছয়েক হলো গ্রাজুয়েশন পাশ করে আর পাঁচটা ছেলের মতনই চাকরির চেষ্টা করে শেষে ঘুরে ফিরে সেই বাবার ব্যবসাতেই যোগ দিয়েছি। লেখালেখির ইচ্ছে থাকলেও তাতে সেরকম নাম-টাম হয়নি। তাই খানিকটা বাবার "লিখে কি আর পেট চলবে"কথার প্রতি তিতিবিরক্ত হয়েই এখন বাবার ব্যবসা সামলাচ্ছি, এই ব্যবসার জন্যই কলকাতা থেকে এখানে আসা। অতনু সিকদার,আমার বাবার বন্ধু অনেকদিনের, তার সাথেই ব্যাবসা সংক্রান্ত কথা বলতে আসা,কিন্তু কখন যে কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা শেষে রাত নেমে গেছে তা টেরই পেলামনা। অতনু বাবু নিজেই বললেন "তা ভায়া এত রাতে আর গাড়িটাড়ি এখান দিয়ে পাবেনা,আজ রাতটা বরং এখানে কাটিয়ে কাল সকালে রওনা দিও"। সত্যিই এই জায়গাটা বড়ই অদ্ভুত, সন্ধ্যে হলেই সব ফাঁকা।তাই অতনু বাবুর কথা শুনে সেই রাতটা থেকেই গেলাম। সেই রাতে খেতে খেতেই অতনু বাবুর কাছ থেকে এই জায়গাটা সম্পর্কে জানলাম।তার বাড়ি থেকে মোটামুটি ৪৫ মিনিটের পথ।জায়গাটা নদীর ধারেই।নদীর পাশেই একটা বাংলো।আবার বাংলো ছেড়ে কিছুটা এগোলেই একটা ছোটোখাটো জঙ্গল।বরাবরই এমন জায়গা আমার খুব পছন্দের বিশেষ করে লেখালেখির জন্য দারুন জায়গা।তাই শুনেই এতটা ভালো লাগলো যে সেখানে যাওয়ার ইচ্ছেটা আর চেপে রাখতে পারলাম না তাই পরদিন ভোর হতেই চলে আসি এখানে। পুরো সকালটা চারপাশ ঘুরে বিকেলে বাংলােয় ফিরে এখন বিশ্রাম নিচ্ছি।আমার সাথে এখানে একজন কেয়ারটেকার হীরালাল ছাড়া আর কেউ নেই।এই জঙ্গলের শেষপ্রান্তে নাকি একটা কবরস্থান ছিল বহু বছর আগে। এখন অবহেলায় সেখানে ঝোপঝাড় আস্তানা গেড়েছে। জায়গাটা নিয়ে নাকি অনেক গল্পকথাও ঘুরে বেড়ায় এখানকার লোকেদের মুখে। খেয়ে নিয়ে হীরালালের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবো বলে ঠিক করলাম। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলো। এখন রাত ৯টা। একটা গলপ লেখার চেষ্টা করছি বেশ খানিকক্ষণ ধরে, কিন্তু পারছি না।অনেকক্ষণ ধরেই খেয়াল করছি কি যেন একটা শব্দ ভেসে আসছে,খানিকটা শিসের মতো আওয়াজ,যেন কেউ ডাকছে কিন্তু খুব মৃদু আওয়াজটা।জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আসছে কিন্তু বুঝলাম না কোন দিক দিয়ে।লেখা ছেড়ে উঠে পড়লাম ঠিক করলাম তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে হীরালাল এর কাছে গল্পটা জেনে ঘুমিয়ে পড়বো, কাল খুব ভোরে ট্রেন। খেয়েদেয়ে যখন নীচে নামলাম তখন রাত প্রায় ১১টা।নীচে এসে দেখি হীরালাল মাটিতেই হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে, সঙ্গে মদের বোতল,বুঝলাম একে আজ আর জাগানো যাবেনা।জঙ্গলের ভিতরে আওয়াজটা আরও যেন বেড়ে উঠেছে।সেই দিকেই আমার মন টানতে লাগল।অমাবস্যার রাত। চারিপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। টর্চটা তাই সঙ্গে করেই নীচে নেমে ছিলাম। টর্চ জ্বালিয়ে আমি চললাম জঙ্গলের ভিতরের পথ দিয়ে। যতই এগোচ্ছি ততই শিসটা আরও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। এত অন্ধকার,তার উপর এইরকম জঙ্গল, একা আমি আর তার সঙ্গে এরকম একটা রহস্যময় আওয়াজ কেমন যেন গা ছমছম করছিল।ভয়ডর আমার নেই বললেই চলে।কিন্তু আজ একটু ভয়ই করছিল।তাও সাহসে ভর করে এগোচ্ছিলাম। একটা সময় দেখলাম জঙ্গলটা কাটিয়ে ফেলেছি।এখন যেখানে দাঁড়িয়ে সেই জায়গাটা অনেকটা ফাঁকা।নীচে ঝোপঝাড়ে ভর্তি।এতক্ষনে খেয়াল করলাম শিসের আওয়াজটাও আর নেই। কিছুটা দূর দিয়ে কয়েকটা শেয়াল ডেকে উঠল।জায়গাটা দেখে হঠাৎ করে মনে পড়লো সেই কবরস্থানের কথা। এবারে আমার মনের মধ‍্যে একটু একটু করে ভয় দানা বাঁধতে শুরু করলো।মন চাইলো ফিরে যেতে। তাই ফিরে যেতে যাব এমন সময় নিজের কাঁধে অনুভব করলাম একটা ভীষণ ঠাণ্ডা স্পর্শ। একটা হাত,কেউ আমার কাঁধে হাত রেখেছে। চমকে গিয়ে এক ঝটকায় হাতটা সরিয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই বুকের রক্ত হীম হয়ে গেল। আমার সামনে দাঁড়িয়ে একটা মানুষ ঠিক মানুষ বললেও ভুল হবে কারণ তার চোখ দুটো নেই,কেউ যেন খুবলে নিয়েছে।তার মুখে ভীষণ ভয়ানক একটা হাসি ফুটে উঠলো।কি বীভৎস সেই হাসি বলে বোঝাতে পারবনা। আমার হাত পা গুলো ধিরে ধিরে যেন অসাড় হয়ে উঠলো। নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। হটাৎ দেখি তার লিকলিকে কঙ্কালসার হাত দুটো আমার গলা লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে । আমি আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে দমবন্ধ করে ছুট দিলাম বাংলোর দিকে। সে যে আমার পিছনে আসছে বুঝতে পারছি।ছুটতে ছুটতে প্রায় যখন বাংলোর কাছাকাছি তখন ধাক্কা লাগলো হীরালাল এর সাথে "বাবু আপ কাহা থে? হাম কাবসে আপকো.." "ওই দিকে ও...ওইদিকে..কে.. কে যেন আসছে..." " কন বাবু" "জা..জানিনা।" আমি আর কিছু বলতে না পেরে হীরালালকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে বাংলোতে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকতে যাব, কিন্তু হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যাই। যখন চোখ খুলি তখন প্রায় ভোর বুঝলাম রাতে এখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম।আগের রাতের কথা মনে পড়তেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আমার জিনিসপত্র নিয়ে স্টেশনে যাব বলে দৌড় লাগালাম, আসার সময় হীরালাল কে দেখতে পাইনি। কোনমতে স্টেশনে এসে ট্রেনের কামরায় নিজের সীট খুঁজে বসে পরলাম। আমার সামনের লোকটি আমাকে অস্বাভাবিক ভাবে হাঁপাতে দেখে একটু জল দিলেন।কিছুটা সুস্থ হবার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে।আমি তাকে সব বলার পর দেখি তিনি বেশ গম্ভীর হয়ে পরলেন।তিনি বললেন "আপনার ভাগ্যটা সত্যিই খব ভালো...নাহলে..." নাহলে কি?" আমি ভয় ভয় তাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন আজ পর্যন্ত যে ওই জঙ্গলের ধারে কাছে গেছে সে কখনও বেঁচে ফেরেনি।তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে পরের দিন জঙ্গলের পাশে চোখ খুবলানো অবস্থায়।" আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করলো। তিনি আরও বললেন "ওই কবরস্থানের পাশে একটা ছোটো কুঁড়ে ঘরে একটা ছেলে আর তার বাপ থাকতো অনেক বছর আগে।লোকেরা বলতো বাপটা নাকি কালাযাদু করতে পারে।বাপের থেকে কালাযাদু শিখলেও বাপের থেকেও ছেলে নাকি ওই কালাযাদুতে বেশি পটু হয়েছিল।ওর বাপটা মারা যাওয়ার পর ছেলেটা একাই থাকতো। তবে কিছুদিনের মধ্যেই এক নতুন উৎপাত শুরু হয়।গ্রামের বাচ্চারা একে একে উধাও হতে শুরু করে।সব গ্রামবাসিদের সন্দেহ গিয়ে পরে ওই ছেলেটার ওপর। তারা বলতো ছেলেটার চোখের দিকে যে তাকাতো তাকেই নাকি সে বশ করে নিতো।তাই ওর হাত থেকে নিস্তার পেতে গ্রামের লোকেরা ওর ওপর হামলা চালায়, খুব অত্যাচার করে আর চোখ দুটো খুবলে নেয়। মারা যাওয়ার আগে সে অভিশাপ দিয়ে যায় যে সে কোনোদিন এই জায়গা ছেড়ে যাবেনা।গ্রামবাসিরা তাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেয়।আর তারপর থেকেই ওইখান থেকে যেসব লোকেদের লাশ পাওয়া যায় যাদের চোখও নাকি খুবলানো ছিল। তবে এতো প্রায় ৫০/৬০ বছর আগের কথা।এত বছর পরেও যে জায়গাটার অভিশাপ রয়ে গেছে শুনেই আমার অবাক লাগছে।আপনার ভাগ্য দেখছি সত্যিই খুব ভালো।"আমি এসব শুনে আর কিছু বললাম না। সেদিন নিজের বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে একটা লম্বা ঘুম দিলাম।আগের দিনের ঘটনাটা প্রায় ভুলেই গেলাম।পরদিন ঘুম থেকে উঠে এককাপ চা আর সকালের খবরের কাগজটা নিয়ে বসলাম।খবরের কাগজটা পড়ছি এমন সময় একটা জায়গায় চোখ আটকে গেল। সেখানে লেখা "জঙ্গল লাগোয়া একটা কবরস্থান থেকে উদ্ধার হীরালাল সিং নামের বছর ৩৫ এর এক জনৈক ব্যাক্তির দেহ।মনে করা হচ্ছে কেউ আক্রোশ মেটাতেই চোখ দুটো খুবলে তুলে নিয়েছে"। শেষ কথাটা পড়তেই আমার শিড়দাড়া বেঁয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। কাগজটা রেখে আমি ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলাম।


Rate this content
Log in