#শুভ স্পর্শ
#শুভ স্পর্শ
ছোটগল্প
বিষয়: প্রেম
কলমে: বুলা বিশ্বাস
শিরোনাম:
#শুভ স্পর্শ
--------------------
'বাবিনদা, তাড়াতাড়ি আমার মাথায় তোমার হাতটা ছুঁয়ে দাও। তারপর মনে মনে আমার হয়ে ঠাকুরের কাছে বলে দিয়ো, আমি যেন একশোয় একশো পেতে পারি।' সেই ছোট্ট তাপ্তী আজ কত বড় হয়ে গেছে। এখনও কোনও পরীক্ষা দিতে গেলেই, বাবিনের কাছে ছুটে আসে। কিন্তু ঠিক সেভাবে এখন আর হুড়মুড়িয়ে ওর গায়ে পড়তে পারে না। এক ছুট্টে ঘরে ঢোকে ঠিকই, ঘরে কেউ থাকলে ও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন বাবিন বোঝে। ও ওর ছোঁয়া নিতে এসেছে। বাবিন ছোঁয়, কিন্তু অন্যভাবে। আর কেউ যদি না থাকে, তাপ্তী এদিক ওদিক দেখে, বাবিনের হাতটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে, আদরের ভঙ্গীতে বলে, 'কাল আমার কমপিটিটিভ পরীক্ষা, একটু আশীর্বাদ করে দাও দেখি। যেন তোমার মত সরকারী অফিসে চাকরী পাই। বাবিন ওর মাথায় হাত দিয়ে কী সব বলে। তাপ্তী বেশ বিশ্বাস করে, ও পরীক্ষায় ঠিক উতরে যাবে। ও ঢিপ করে বাবিনের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে নিলে, বাবিন ওর গালে আদর করে দেয়, যেমনটা ছোটবেলায় করতো। তবে ছোটবেলায় সবার সামনে আদর করতো। কিন্তু বড় হবার পর, বাবিনটা যেন কেমন একটা হয়ে গেছে। লুকিয়ে আদর করতেই ওর বেশি ভাল লাগে। দু'জনের মধ্যে যে প্রেমের চোরাস্রোত বয়ে যাচ্ছে, সেটা অস্বীকার করার কোনোই জায়গা নেই। যাই হোক, তাপ্তীর বাবিনের ছোঁয়ার উপর অগাধ বিশ্বাস। ওর এটাই বিশ্বাস যে, এতদিন ও যে, এত ভালো ফল করে এসেছে, তা বাবিনের জন্য।
বাবিনের বয়স এখন বত্রিশ, তাপ্তির তেইশ। ছোটবেলায়, বাবিন ওর টিউটর ছিল। তাপ্তী যখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে, বাবিন ওকে পড়াতে আসতো। কখনো বা তাপ্তীর মা কোথাও গেলে, তাপ্তীকে ওদের বাড়িতে দিয়ে আসতো। বাড়ি ফেরার সময় ওকে নিয়ে চলে আসতো। ছোট্ট তাপ্তী পড়া শেষে, মামনির মানে বাবিনের মায়ের সাথে সাথে বাবিনদের এঘরে, ওঘরে ঘুরঘুর করতে থাকতো। কখনোবা বাবিনের ঠাম্মির কাছে কত গল্প শুনতো, প্রশ্নের বাক্যবাণে ঠাম্মিকে একেবারে নাজেহাল করে ছাড়তো। ঠাম্মি মাঝে মাঝেই বাবিনের মা'কে বলতেন, 'বৌমা, বুঝেছো, এটাকেই আমি আমাদের নাত বৌ করে আনবো। কেমন মিষ্টিটা হয়েছে দেখো। কেমন সুন্দর টানাদুটো চোখ, ছোট্ট ঠোঁট। আমার বাপু ওকে খুউউব পছন্দ।' বলে ওকে জড়িয়ে নিজের কোলের কাছে বসিয়ে রাখতেন। বাবিনের মা শুধুই হাসতেন আর বলতেন, 'মা আপনি পারেনও বটে।'
দিন গড়িয়েছে। তাপ্তী বাবিন একে অপরকে ভালোবাসে। বাড়ির লোকেরা বোঝেন। কিন্তু কোনো পক্ষই ওদের বিয়ের ব্যাপারে আগে কথা বলতে আসে না। এর একটাই কারণ, তাপ্তীদের অবস্থা বাবিনদের থেকে একটু উঁচুতেই। তাপ্তির বাবার বেশ নাক উঁচু ভাব। তাপ্তির মা তাপ্তির থেকে বিভিন্ন ভাবে জানতে চেয়েছেন, ওর জন্য সম্বন্ধ আনবেন কিনা। তাপ্তী বড় বড় চোখ করে বলে দিয়েছে, ও বিয়ে করবে না।
ওর মা বোঝেন, কিন্তু ওর বাবা বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকেন।
ওনার ইচ্ছে, বাবিনের বাড়ি থেকে আগে ওদের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসুক। তারপর উনি ভেবে দেখবেন। এ ধরণের কথাবার্তা উনি তাপ্তির মায়ের সঙ্গে যখন করেছেন, তাপ্তির কান তাতে এড়িয়ে যায় নি।
বাবিনদের বাড়িতেও একই অবস্থা। বাবিন তাপ্তীকেই বিয়ে করবে। কিন্তু বাবিনের মা বলছেন, তাহলে, তাপ্তীদের বাড়ি থেকে প্রস্তাব আসুক। ওনারা মেনে নেবেন। দু'পক্ষই একরোখা। তাই ওদের চারহাত এক হতে বেশ সময় লাগে।
অগত্যা তাপ্তী আর বাবিন ঠিক করলো, বাড়ির লোককে লুকিয়ে, ওরা ওদের ক'জন বন্ধু নিয়ে রেজিস্ট্রিটা করে রাখবে।
বাবিন একমাস আগে সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। তারপর যথাসময়ে তাপ্তী ওর বান্ধবীদের নিয়ে আর বাবিন ওর বন্ধুদের নিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে পৌঁছে গেল। দুজনে পাশাপাশি বসেছে। তাপ্তীর কাছে এটা যেন ওর জীবনের আর এক বড় পরীক্ষা। তাই সবসময়ের মত এবারেও বাবিনের কাছে গিয়ে ওর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, ওর আশীর্বাদ নিল। সারাটা সময় ও বাবিনের হাতটা ধরে রইলো। কোথাও ওর মনে হয় বাবিনের স্পর্শ ওর কাছে বড় শুভ। এরপর রেজিস্ট্রি সম্পূর্ণ করে ওরা হাসিমুখে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। বাবিন বললো, 'আজ থেকে, তুমি আমার লিগ্যাল ওয়াইফ। তোমাকে আর তুই বলবো না, তুমি আমার আদরের তপি।'
বাড়ির কাছাকাছি আসতে তাপ্তী ওর হাতটা ছাড়তে ছাড়তে বললো, 'এভাবেই তুমি আমার পাশে থেকো। তোমার স্পর্শ আমার সব কাজে যেন সাফল্য পায়। আমি শুধু এটাই চাই।'
শুরু হল পথচলা। ছোঁয়াছুঁয়ি ওদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এখনতো প্রতিটা পদক্ষেপে শুধুই জড়িয়ে থাকা।
--------------
কলমে: বুলা বিশ্বাস
ফোন নাম্বার: 7980205916
মেল আইডি:
bulabiswas60@gmail.com

