Surajit Poddar

Abstract Others


4.0  

Surajit Poddar

Abstract Others


শান্তিনিকেতন

শান্তিনিকেতন

3 mins 210 3 mins 210

তখনও রাত কাটেনি ঠিক মতো আমার চোখে, ট্রেনটা যে চলতে শুরু করল তা বুঝলাম বাকিদের আলোচনায়, পাশের ট্রেনটা জানলা দিয়ে এমন বিভ্রম সৃষ্টি করেছিল যে স্থির না গতিশীল সেইসব অনুভূতি নষ্ট হয়ে গেছিল। আমরা ১৬ জন মিলে এই কার্তিকের জ্যোৎস্নার সকালে চলেছি শান্তিনিকেতন। কোনো রবীন্দ্র অনুরাগে নয়, শান্তির খোঁজে, বুদ্ধের মতো নয়, সাধারণ দীপুদা যাওয়ার মতো, আঁশটে। উইকেন্ডটুকু কাটলেই আবার অশান্তি ঈশ্বরের থেকেও স্পষ্ট আমাদের কাছে। দলে আমার এক বছরের ভাগ্নি যেমন আছে, আছে সত্তর ছুঁইছুঁই মামা। আমাদের রিজার্ভড সিটের পাশেই নজর পড়ল একযুগলের দিকে। আমার বয়সীই হবে। চোখ পড়ল দুজনের বেমানান বহিরঙ্গের বৈপরীত্যের জন্যেই। আমরা তখন সবে শেওড়াফুলি ঢুকেছি, আমি ওদের উল্টোদিকের জানলার ধারটা দখল করলাম, জামাইবাবুকে ভাগ্নির দায়িত্ব দিয়ে। চা এল, আমরা খেলাম, ওরা খেলো না। আসলে চা টা ভালো ছিল না, আমাদের আলোচনা শুনে ওরা আর রিস্ক নেয়নি। পরে কফি এলো ওরা খেলো, খেয়ে আলোচনা করল কফি টা ভালো। শুনে আমরা খেলাম। এইভাবে আমাদের অচেনা ক্রমশ ইশারায় চেনা হয়ে উঠছে। বাইরে ঝিরিঝিরি হাওয়া দিচ্ছে, ট্রেন ছুটছে। আমাদের হাসাহাসির স্রোত লাগছে ওদের মুখেও, কিন্তু কথা হয়নি এখনও। কি দরকার! সবসময় কথা দিয়েই স্মৃতি থাকবে? দৃশ্য দিয়ে থাকবে না? নাকি স্মৃতি এইসব জানে, বোঝে? কোন ঘটনা স্মরণ হয় আর কোন ঘটনা হয়না? কে জানে... বাইরে দূর আর দূর অবধি হলুদ, হলদে-সবুজ প্রান্তর, পরিনতির ঋতু তার রং লাগিয়েছে সর্বত্র। ইয়া বড় মাঠের মাঝে নিঃসঙ্গ একটা ঘর, কোথাও একজন কি দুজন কাজ করছে মাঠে, দূরে দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহারাদার একা - তার নিচে সমুদ্রের মতো ছায়া, সেই ছায়ায় কি এই ছেলে মেয়ে দুটি যাবে কোনো দিন? বা ওই ঘরটায় মাঠের মধ্যে পাতবে নিজের সংসার? যেভাবে আলো পেতেছে, যেভাবে হাওয়া পেতেছে, যেভাবে কেউ পাতেনি কোনোদিন, অনাহূত সমাজের আদম ইভ হবে ওরা? ছেলেটির হরলিক্সের কাঁচের মতো চশমার সাথে গোলগলা গেঞ্জি আর ফর্ম্যাল প্যান্ট কিছুতেই মেয়েটির বেগুনি-নীল কায়দা করা টিপ, ঝুমকো দুল, পরিপাটি করা লিপষ্টিক, টিপের সাথে ম্যাচিং শাড়ি আর উজ্জ্বল মুখের সাথে এক সিটে বসে না। কিন্তু বসে যখন আছে, নিশ্চয়ই দৃশ্য নয়, শব্দ অথবা শব্দও নয় স্পর্শ কিংবা অন্যকিছু এদের টেনেছে। সকালের আলো যেমন ইতস্তত করে নিজেকে এলিয়ে দিতে পৃথিবীর গায়ে, তেমনি ওরা এখনও ইতস্তত, এখনও দৃশ্যের বৈপরীত্য ওদের স্পর্শের জড়তাকে অতিক্রম করতে দেয়নি। কিন্তু হাওয়া বেপরোয়া জীবনের মতোই, বেপরোয়া এই রেলগাড়িও, দুরন্ত পথিক যেন প্রকৃতির যাবতীয় আবেদনকে অস্বীকার করে এগিয়ে চলেছে। ছেলেটি যেন নিখাদ একতাল মাটি, মেয়েটি সেই মাটির প্রতিমা, ছেলেটি যেন স্রোতহীন মাঠ, মেয়েটি এই রেলগাড়ির মতো বেপরোয়া, ছেলেটি যেন শান্ত প্রাণ, মেয়েটি অনুষ্ঠান। গতি তোলপাড় করতে থাকে, তাল ঠোকে বাউল, তাঁর একতারায় এক হয় প্রাণ আর অনুষ্ঠান, আদ্যন্ত জীবন গেয়ে ওঠে, "কে বলে মানুষ মরে, আমি বুঝিনা ব্যাপার..."। আমিও কিছু বুঝতে পারিনা অনেকক্ষণ, মা ডাকে "কি রে ব্যাগগুলো নামা..."। আমি হতবাক হয়ে দেখি, আমার বাড়ির সামনের ঘাটে, একদলা মাটি মেখে বসে আছে এক নিথর ঈশ্বর মূর্তি। প্রাণহীন, অনুষ্ঠান অতিক্রান্ত, নিষ্পলক জীবন। তাকে আলো দিচ্ছে বিকেলের রোদ। একদল মূর্খ চেল্লাচ্ছে তখনও, " মন্দির ওয়াহি বানেগা", আমি ব্যাগ বইতে বইতে মিশে যাচ্ছি ভিড়ে। কিছুতেই কিছু বুঝতে পারছি না।


Rate this content
Log in