STORYMIRROR

Zinia Chatterjee

Horror Romance Thriller

3  

Zinia Chatterjee

Horror Romance Thriller

রাতের রাজপুত্র (প্রথম পর্ব)

রাতের রাজপুত্র (প্রথম পর্ব)

6 mins
327

প্রথম পর্ব~~


রাত মানেই নিস্তব্ধতা, রাত মানেই অন্ধকার, রাত মানেই একটি দিনের অন্তিম সময় নতুন দিনের অপেক্ষা, রাত মানেই ক্লান্ত শরীর, চোখে ঘুম ঘুম ভাব,রাত মানেই দিনের সমস্ত ভাবনা চিন্তা দূরে সরিয়ে রেখে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখা, রাত না জানি কত রহস্যে ভরা, আর এইরকম এক রহস্যময়ী রাতে অনামিকার তার সাথে পরিচয়, এক লহমায় যে ওর মনে ভালোবাসার অনুভূতি জাগিয়ে দিয়ে যায়।


অনামিকা চৌধূরী ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে মুম্বাইয়ের এক বিখ্যাত ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। যার নাম ইন্ডিয়ান হেরিটেজ ইউনিভার্সিটি যা বান্দ্রায় অবস্থিত। ভারতের টপ ইউনিভার্সিটি গুলির মধ্যে অন্যতম এটি। আপাতত পড়া শেষ হওয়া পর্যন্ত ও এই শহরের বাসিন্দা।বরাবরই খুব প্রাণোচ্ছল, শিশুসুলভ এবং সরল মনের মেয়ে অনামিকা, কিন্তু এখানে ও 'অ‍্যানা' নামেই বেশি পরিচিত। ইউনিভার্সিটির অত্যন্ত পপুলার মেয়ে ও। সর্বক্ষণ মাতিয়ে রাখে অ‍্যানা ওর বন্ধুদের মজার মজার গল্প বলে। সেইজন্যই ইউনিভার্সিটির সমস্ত ছাত্রছাত্রীর কাছে ও একটি পরিচিত মুখ।



 অনামিকার বাবা মিস্টার. অমরেশ চৌধূরী একজন নাম করা ব্যবসায়ী। ভারতের দুটি জায়গায় ওনার ব্যবসা আছে।একটি হলো কলকাতায় এবং অপরটি মুম্বাইতে এবং ওর মা মিসেস. মনামী চৌধুরী কলকাতার অন্যতম নামই স্কুলের প্রিন্সিপাল। বলতে গেলে মুখে সোনার চামচ নিয়েই জন্মেছে অনামিকা, ছোটবেলা থেকে যা চেয়েছে তাই পেয়েছে ও কিন্তু,তাই বলে ওর মধ্যে অহংকার বোধ কখনই জন্মায়নি, বা বলা ভালো জন্মাতে দেওয়া হয়নি।



 কলকাতার সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে যেমন নাম ডাক আছে অমরেশ বাবুর তেমনি মানুষের রক্ষাকর্তা হিসাবেও উনি পরিচিত। অন্তত দুটি অনাথাশ্রম এবং একটি বৃদ্ধাশ্রম বানিয়েছেন উনি, সেখানে সবমিলিয়ে ১০০০ এর উপর অনাথ শিশু এবং বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের নিজের বাবা মা এবং ছেলে মেয়েদের মতই দেখাশোনা করেন অমরেশ বাবু এবং মনামী দেবী। জীবনে ব্যস্ততা থাকলেও তাদের সময় দিতে ভোলেননা ওনারা। ওনাদের কাছে মানুষের সেবা করা পরম পুণ্যের, যার কোনো অন্ত নেই। তাই অনামিকানকেও ওনারা সেটাই শিখিয়েছেন, ভগবান যখন ওনাদের অর্থ দিয়েছেন তখন উনি ওনাদের বেছে নিয়েছে মানুষের সাহায্যের জন্য, ওনারা ছোট থেকেই অনামিকা কে শিখিয়েছেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে, সাহায্য করতে এবং প্রতিটি মানুষকে এক সমান মনে করতে। অনামিকা ওনাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে তাই মুম্বাইতে এসেও বাবা মায়ের সেই শিক্ষাকে ধরে রেখেছে। এখানে এক অনাথাশ্রমে বিনা পয়সাতে বাচ্চাদের পড়াশুনো শেখায় অ্যানা এবং যেহেতু অসাধারণ গানও গাইতে পারে তাই মিউজিক ক্লাস নেয় প্রতিদিন। অ্যানার কাছে ওই বাচ্চাগুলোর সাথে সময় কাটানোটাই নিত্যদিনের একটি প্রয়োজনীয় কাজ, আজও তার অন্যাথা হয়নি। ক্লাস শেষ হওয়ার পর তাই ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেছে ওই অনাথাশ্রমটাতে। প্রতিদিন বিকেল ৫ টা থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত বাচ্চাদের সাথে সময় কাটিয়ে অনামিকা ওর অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসে।কিন্তু আজ হঠাৎ একটি বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পরায় সময়ের দিকে কোনো খেয়ালই থাকে না অনামিকার, ডক্টর এসে চেকআপ করে যাওয়ার পর, বাচ্চাটিকে রাতের খাবার খাওয়ানোর পর ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানি এখন ওর প্রধান কাজ। অনামিকা কখনই কারোর কষ্ট সহ্য করতে পারেনা, তাইতো কাউকে কষ্টে দেখলে নওয়া খাওয়া ভুলে মানুষের সেবায় লেগে পরে। অবশেষে রাত ৯ টায় বাচ্চাটিকে ঘুম পাড়িয়ে এবং সকলকে বিদায় জানিয়ে অনামিকা অনাথাশ্রমটির ভেতর থেকে বেরোলো। এতক্ষণ অবশ্য সময়ের চিন্তা ওর মাথায় ছিল না। কিন্তু বাইরে গেট এর সামনে ঘড়িতে সময় দেখে বুঝতে পারল যে যথেষ্ঠ রাত হয়েছে ও মনে মনে বললো "ইশ কত রাত হয়ে গেছে....বুঝতেই পারিনি...।

সত্যি আজ অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে অনামিকার ওখানে থেকে বেরতে বেরতে।সায়নী আর জেনি নিশ্চয়ই চিন্তা করছে ওর জন্য। অনামিকা,সায়নী এবং জেনি তিনজনে বেস্টফ্রেন্ড, ইউনিভার্সিটি থেকে কিছুটা দূরেই ওদের অ্যাপার্টমেন্টে  একসঙ্গে থাকে ওরা, যা অনামিকার বাবাই ওকে গত জন্মদিনের উপহার হিসেবে দিয়েছিল। অ্যাপার্টমেন্ট অত্যন্ত বিলাসবহুল এবং আধুনিক। কুড়িতলা অ্যাপার্টমেন্টের দ্বিতীয় তলায় অনামিকার বন্ধুদের সাথে থাকে। ওদের ফ্ল্যাটটিতে দুটো বেডরুম এবং একটি মাস্টার বেডরুম আছে, এছাড়াও আছে বেশ বড়ো আকারের ড্রয়িং রুম কিচেন, এবং দুটি বাথরুম এবং আরেকটি ওদের বেডরুম সংলগ্ন। সেরা অ্যাপার্টমেন্টে টি আধুনিক বিলাসবহুল এবং দামি মূল্যবান আসবাবপত্র ভরপুর।প্রত্যেকটি ঘরেই রয়েছে আলোর রংবেরঙের আলো অনামিকার খুব পছন্দের। তিনটা বেডরুম থাকলেও ও সায়নি আর জেনি সাথে মাস্টার বেডরুমে থাকে। সেখানে রয়েছে কিং সাইজ বেড, ওয়াল সেটিং ওয়ারড্রব ওয়াল সেটিং টিভি এবং ওদের পড়ার ডেস্ক। আর কিচনেও রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত আধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে। সায়নী আর জেনি সাথে ওর এই শহরে এসেই আলাপ আর বাঙালি বলে ওদের মধ্যে বন্ধুত্বটা অনেক বেশি প্রগাঢ়। 

সায়নী পুরো নাম সায়নী ঘোষ।অনামিকার বাবার মতই একজন নামকরা ব্যবসায়ী। বেশ শান্তশিষ্ট, এবং সমস্ত দিক বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মেয়ে। অনামিকা তাই কোনো বিষয়েসিদ্ধান্ত না নিতে পারলে সায়ানির কাছ থেকে পরামর্শ অবশ্যই নেয়।

আর অন্যদিকে জেনি পুরো নাম জেনি সেন। ওর বাবা একজন নামকরা উকিল। চঞ্চল স্বভাবের একটি মেয়ে। ওর মুখে যা থাকে মনে হতে থাকে, সত্যি কথা বলতে বা প্রতিবাদ বাদ করতে কোনদিন পিছপা হয় না। এবং অন্যান্য মেয়েদের তুলনায় ওর লাজুক ভাব বরাবরই একটু কম।

অনামিকা দুই বন্ধুর ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলোও ওদের মধ্যে একটা জিনিসে প্রচণ্ড মিল আছে। যে ওরা দুজনেই অনামিকাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। আর সব সময় আগলে রাখতে চায়আজ ওদের ফোন করে জানানোর কথা ও ভুলে গেছিলো অনামিকা, তাই জন্য ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখলো অন্তত ২০ টা মিসকল, এতগুলো মিসকল দেখে খানিকটা ভয় পেয়ে গেলো অনামিকা, কারণ ও ভালোভাবেই বুঝতে পারলো যে ওর প্রিয় বান্ধবীরা মারাত্বক রেগে আছে ওর উপর। কি আর করা যাবে, ফোনটা তো ওদের করতেই হবে, তাই ফোন এর লক খুলতে খুলতে বললো "এমা আজ ওদের একদম ফোন করতেই ভুলে গেছি...এতগুলো মিসকল দেখে মনে হচ্ছে কপালে আজ দুঃখ আছে...কিন্তু কি আর করা যাবে...দোষ যখন করেছি... বকা তো শুনতেই হবে..।


অনামিকা ফোন করার পর কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ফোন এর অপর প্রান্ত থেকে সায়নী চেঁচিয়ে বলে উঠল "ফোন করার কি দরকার আছে..তোর জন্য কারোর চিন্তা হলো কিনা...তাতে তোর কি আসে যায়...তুই থাক তোর জগতে.."।

অনামিকা একটু মুচকি হাসলো ওর কথা শুনে, সত্যি অনামিকা ওদের কাছে বন্ধুর থেকে অনেকটাই বেশি, বলতে গেলে নিজের বোনের মতোই ভালোবাসে ওকে সায়নী আর জেনি। অনামিকা ওকে শান্ত করবার জন্য মিষ্টি করে বললো " আসলে হঠাৎ একটা বাচ্চা অসুস্থ হয়ে গেছিল...তাই বুঝতেই পারিনি যে কখন এত রাত হয়ে গেছে...।

 

অনামিকার কথা শেষ হওয়ার আগেই জেনি রাজি গলায় বলে উঠল " হ্যাঁ ওই করে বেড়া তুই... সবার সাহায্য... নিজের টা ভাবতে হবেনা তোকে...যেদিন বিপদে পরবি সেদিন বুঝবি..."।


অনামিকা আবারও মুচকি হাসলো, সত্যি ওরা দুজন পারেও বটে। ওদের শাসন অনামিকাকে ওর বাবা মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয় প্রায় ৬ মাস হলে গেলো ওনাদের ছেড়ে এসেছে অনামিকা, কিন্তু ওকে বকে বকে ওর মা বাবার জায়গা পূরণ করে দিয়েছে ওরা দুজন।


অনামিকা আবারও মিষ্টি করে বললো "এত রাগ করতে নেই বাবু... এই ত, সামনেই আছি...১৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবো...আর যাবার সময় তোদের প্রিয় আইসক্রিমও নিয়ে যাবো কেমন...।" 


অনামিকা জানে ওদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস আইসক্রিম, তাই কিভাবে ওদের রাগ ভাঙাতে হয় তাও ভালোভাবেই জানা আছে ওর। আইসক্রিম এর কথা শুনে মনে মনে খুশি হলেও মুখে কিছু প্রকাশ করলো না ওরা, শুধু ওকে তাড়াতাড়ি আসতে বলে ফোন কাটলো সায়নী।



অনামিকা ফোন ব্যাগে ঢুকিয়ে জোরে জোরে পা ফেলতে শুরু করলো, অনাথাশ্রম থেকে ওর অ্যাপার্টমেন্টের দূরত্ব বড়োজোর ২০ মিনিট হবে। তবে একটি শর্টকাট রাস্তাও আছে, ওই রাস্তাদিয়ে গেলে মাত্র ৭ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যাবে, অন্য দিন অনামিকা রাস্তা এড়িয়ে গেলেও আজ ওই রাস্তাটাই বেছে নিল। 


এদিকে মানুষজন প্রাই নেই বললেই চলে, সেই জন্যই যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি হাটতে চেষ্টা করলো ও , মিনিট দুয়েক হয়েছে সবে হঠাৎই অনামিকা ওর পিছনে কারোর পায়ের শব্দ পেল, প্রথমে সেদিকে মনোযোগ না দিলেও, আস্তে আস্তে ওর মধ্যে ভয় নামক অনুভূতিটি প্রকাশ পেতে শুরু করলো। অনামিকা শুনতে পেল শব্দটি ক্রমশ এগিয়ে আসছে, হঠাৎ ও থমকে দাড়ালো এবং কিছুটা সাহস নিয়ে পিছনে ফিরে দেখল যে কেউ নেই, এদিকে অনেকগুলি গলি আছে তাই ও ভাবলো যে হয়ত কোনো একটার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে, কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে সামনে ফিরে ও দেখতে পেল ২ টি ছেলে ওর সামনে দাড়িয়ে আছে, ওদের মুখ দেখে অনামিকার ওদের উদ্দেশ্য বুঝতে বাকি রইলনা। ও ভয়তে এক পা এক পা করে পেছ ট লাগলো এবং ছেলেগুলিও সাথে সাথে এক পা এক পা করে ওর দিকে এগোতে লাগলো। হঠাৎ বুঝতে পারলো ততক্ষনে ছেলেদুটির সঙ্গীরা ওকে আস্তে আস্তে ঘিরতে শুরু করেছে, ভয় ও আশঙ্কা ওর মুখে ফুটে উঠল, অনামিকা এতটাই শঙ্কিত হলে পরলো যে ও কি করে পালাবে সেটাই বুঝতে পারলো না। ক্রমশ পিছনে যেতে যেতে হঠাতই শক্ত কোনো কিছুতে ধাক্কা লেগে অনামিকা রাস্তার উপর পড়ে যেতে লাগলো, সেই ভয়েই দুচোখ বন্ধ করে নিল ও, কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার ওর শরীর ভূমি স্পর্শ করলো না, ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকালো ও, দেখলো বলিষ্ঠ দুই হাত ধরে রেখেছে ওকে, অনামিকা ধীরে ধীরে তাকালো অনাগত আগন্তুকের দিকে, এবং মনে মনে ভাবতে লাগলো এত সুন্দর কি কেউ হতে পারে? অনামিকা হঠাৎ ই হারিয়ে গেলো সেই অজানা আগন্তুকের চোখে, কিছু মুহূর্ত আগে ও যে ওর সাথে কি হতে চলেছিল সে সব ভুলে ও এখন হারিয়ে গেছে এক স্বপ্নদেশে, হঠাৎ ছেলেটির সমুধুর আওয়াজে এ সম্বিত ফিরল ওর, ছেলেটি গম্ভীর অথচ সমুধুর স্বরে বললো "আর ইউ ওকে?..."



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Horror