STORYMIRROR

Koustav Halder

Horror Fantasy Thriller

4  

Koustav Halder

Horror Fantasy Thriller

রাহু

রাহু

36 mins
386

                     এক

বাতাসে ধুনোর উগ্র গন্ধ। হোমকুন্ডের আগুন নিভে এসেছে প্রায়। গাঢ় ধোঁয়ার কুণ্ডলী অশরীরী রূপ নিয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরের দিকে। কোনো এক রাতজাগা পাখি কর্কশ কন্ঠে ঘোষণা করল রাত্রির শেষ প্রহরের। ঠিক সেই মুহূর্তেই ইয়াং এর কপালের রক্তাভ তিলক দগদগে ঘায়ের মতো জ্বলে উঠলো। দেহের অবশিষ্ট উজ্জ্বলতা চোখের নিমেষে মিশে গেল ঘন থকথকে অন্ধকারে। চারপাশের বৃত্তাকার রেখাগুলো তাকে কেন্দ্র করে বুনে দিয়েছে এক অসীম রহস্যের জাল। তার সামনে কোনো এক বিশেষ উপাচারের উপকরণ হিসাবে রাখা রয়েছে একটা বিভৎস প্রাণীর মাথার খুলি। মাটির পাত্রে রাখা কালচে রক্ত । হোমকুন্ডের পাশে মৃত পাখিটার পালকের ফাঁকে গাঢ় হচ্ছে অন্ধকারের আঙুলের দাগ। আর একটি নারী দেহ, পড়ে আছে অচেতন‌ অবস্থায়

        ইয়াং এর জীর্ণ মুখের কাটা ছেঁড়া দাগগুলো গভীর খাদের মতো দেখাচ্ছে। ধূর্ত শ্বাপদের মতো চোখ দুটো অসম্ভব রকম ধারালো। ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে তার ঠোঁটের কম্পন রেখা। সাথে বাতাস ভরে উঠছে পচা মাংসের গন্ধে। কবর থেকে পচা গলা দেহগুলো যেন একসঙ্গে জেগে উঠেছে। সুরেলা এক আওয়াজে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। মৃত পাখিটাকে আহুতি দিয়ে কিছুটা রক্ত নিজে পান করলেন, বাকিটা ঢেলে দিলেন হোমকুন্ডের গনগনে আঁচে। কিছুক্ষণ আগের মৃদুমন্দ বাতাস ঝড়ের রূপ নিল এইবার। আকাশে শেষ নক্ষত্র বিন্দুটা হারিয়ে গেছে কালো মেঘের অন্তরালে। তার চোখ দুটো কয়লার মতো জ্বলছে। মন্ত্রোচ্চারনের সাথে জোড়াল হচ্ছে সেই দুর্গন্ধ। শরীর বলতে ইয়াং এর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবটুকু অন্ধকারে ঢেকে গেছে।

একসময় সবকিছুই শান্ত হল। এখন চারিদিকে টুকরো টুকরো এলোমেলো ভাবে ছড়ানো শূন্যতা। সেই রাতের নীরবতা ভেদ করে কানে এল একটা চাপা গোঙানির আওয়াজ। অচেতন নারী দেহটা কি একটু নড়ে উঠল। ধূর্ত শ্বাপদের হাসির রেখা চলে গেল ইয়াং এর ঠোঁট ঘেঁষে।

     

              

                                      দুই

সূর্য কিছুক্ষণ হল পাহাড়ের কোলে ঢলে পড়েছে। আকাশে মিহি অন্ধকারের শামিয়ানা। দূরে পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা বরফে জ্যোৎস্নার আলতো আঙুলের ছাপ। পুব আকাশে একটা ঈষৎ নীল নক্ষত্র মিটিমিটি জ্বলছে। বহুবছর পর আবার তার সঠিক আবস্থান থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে কিছুটা । অমঙ্গলের ইঙ্গিত! লামা সামসেং আকাশ থেকে চোখ নামালেন। সমস্ত চরাচর নীরব হয়ে আছে চরম কোনো সর্বনাশের গন্ধে।

        পথটা খুবই সংকীর্ণ। লামা সামসেং তার গতি মন্থর করলেন। অন্ধকারে এই পথ দিয়ে যাওয়া কঠিন। সামান্য হটকারিতায় প্রান নাশের সম্ভাবনা না থাকলেও গভীর আঘাতের কারণ হতে পারে। তাছাড়া বয়স হয়েছে তার। এই বয়সে এতটা পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা সহজ নয়। শরীরে সামর্থ্য ছিল যতদিন হিমালয়ের এই অঞ্চলটাকে পাহাড়ি নদীর মতো কাটাকুটি করেছেন। আজ সে প্রয়োজন ফুড়িয়েছে সাথে হারিয়েছে সামর্থ্য।

               সামসেং পিছনে তাকালেন। দূরে মঠের প্রদীপের আলো এখনও স্পষ্ট। বেড়োনোর আগে তিনিই ওগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছেন। মঠের সামনে পাথরে বাঁধানো জায়গাটা আলো কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে এখন। কিছুক্ষণ আগে ওখানে দাঁড়িয়েই দাচেনের সাথে তার শেষ কথা হয়েছে।

_ "দাচেন, তুমিও তবে যাবে বলেই স্থির করলে?"

দাচেন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। লামা সামসেং একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলেছিল, "তোমাকে আমি আটকাবো না। তোমাকে ধরে রাখাটাই অনুচিত হবে। কোথায় যাবে কিছু ঠিক করেছ?"

_"ভাবছি দক্ষিণেই যাব।"

_"দক্ষিণে! শুনেছি চিনারা সেই পথেই ঘাঁটি করেছে। সাবধানে যেও, তথাগত তোমার সাথে আছে।"

            কথাগুলো পুনরায় মনে পড়তেই সামসেংএর গলা বুজে এল। দাচেনও তার পথ বেছে নিয়েছে। এত বড়ো গুম্ফায় পড়ে রইলো আর মাত্র দুটি প্রানী। প্রধান লামা গোয়াস্তে, তিনি থেকে গিয়েছেন তথাগতের অনুগত্যকে অস্বীকার করতে না পেরে। আর সামসেং, তার তো কোনো টান নেই। তবে তিনি কেন যেতে পারলেন না? এর উত্তর তার কাছে নেই।তিনি মনে মনে বললেন" হায় তথাগত এ কোন পাপের শাস্তি …এত অন্ধকার,এত রক্ত… আর কত সহ্য করতে হবে…?"

                পথের পাশে একটা বিশাল প্রস্তর খন্ড। প্রস্তর খন্ডের পিছনে একটা কালো আবয়ব দাঁড়িয়ে। হাতে ঘোড়ার রাশ। মাঝেমাঝেই পাথরে পা ঠুকছে ঘোড়াটা। লামা সামসেং প্রস্তর খন্ডের কাছাকাছি আসতেই কালো অবয়বটি বেড়িয়ে এল অন্ধকার থেকে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। শরীরের বেশিরভাগ অংশই কালো কাপড়ে মোড়া। শুধুমাত্র এই জ্যোৎস্নালোকে যেটুকু দেখা যাচ্ছে সেটি তার হাতের অস্বাভাবিকতা। দু হাতেই মোট ছয় ছয় বারোটা আঙুল। সামসেংএর হাবভাব সাবলীল। অঞ্জাত ব্যক্তিটির আকস্মিক আগমনে তিনি বিচলিত নন। সামসেং এগিয়ে গেলেন। তাকে সঙ্গে করে পুনরায় প্রস্তর খন্ডের আড়ালে অদৃশ্য হল সেই অদ্ভুত দর্শন ছায়ামূর্তি।

      কয়েক মুহূর্তের আপেক্ষা। লামা সামসেং একা প্রস্তর খন্ডের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এলেন। বেশভূষায় কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে তার। গায়ে কষায় এর বদলে চমড়ি গাই এর চামড়ার তৈরি পোষাক। কোমড়ে গোঁজা একটা ছোট্ট ধারালো ছুরি। হাতে ঘোড়ার রাশ শক্ত করে ধরা। যুদ্ধে যাচ্ছেন! মনে মনে হাসলেন সামসেং। যুদ্ধই বটে। কিন্তু কার সাথে?

      জ্যোতিষ্কদের আলো কিছুটা কমে এসেছে। দূরে শোনা যাচ্ছে কয়েকটা হিংস্র জন্তুর উল্লাস। লামা সামসেং এক লাফে ঘোড়ায় উঠে টান দিলেন লাগামে। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া ছুটল। শামুকের মতো বাড়িঘর, মঠ পড়ে রইলো পিছনে। খট্ খট্ শব্দ করে এগিয়ে চলেছে ঘোড়া। সামসেংএর ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা। যাত্রা শুরু। এর শেষ কোথায় তিনিও জানেন না। অন্ধকার ছাড়া কোথাও কিছু নেই। শুধু জানেন , শুরু যখন হল এর শেষ আছে নিশ্চয়।

                                        ***

         তখনও ভোর হতে কিছুটা সময় বাকি। দীর্ঘ অবসাদের তাড়নায় চরাচর স্বপ্নালোকে তলিয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র জেগে আছে ঠান্ডা হাওয়ার বর্বরতা। লামা সামসেং এর চোখেও নেমেছে ক্লান্তি। ঝিমধরা পায়ে এগিয়ে চলেছে তার ঘোড়া। ধারালো ছুরির মতো হাওয়া কাটাকুটি খেলছে তার মুখে। অন্ধকার কিছুটা পাতলা হলেও দৃষ্টি অস্পষ্ট। দীর্ঘ যাত্রাপথের ক্লান্তিতে তার স্নায়ু অবশ।তাই কিছুটা দূরে একঝাঁক আলোকে সে সহজেই এড়িয়ে যেতে পারল।

                                         তিন

      ঢেউ ভাঙে। কান্নাও ভাঙে। কিন্তু কান্না ভাঙে সবটুকু নিয়ে। কাঁচের মতো। মিশুকে জলরাশির মতো সে ফিরে যেতে পারে না তার আগের অবস্থানে। সে পড়ে থাকে কোনো রহস্যময় নঁথির আড়ালে, অথবা নদীর মতো বয়ে যায়। সমুদ্র পায় কিনা সে, এ বড়ো সহজ প্রশ্ন নয়। তবুও কেউ কেউ আলেকালে এর উত্তর দিয়ে গেছেন। সে উত্তর বড়োই শুষ্ক। সাধারণ পাঠকেরা শুরুতেই অর্বাচীন হয়ে পড়ে। সুতরাং সেই প্রসঙ্গে আলোকপাত করা মুর্খামির মতোই ঘৃন্য কাজ হবে। শুধুমাত্র সমুদ্রের ঢেউকে কান্নার সাথে তুলনা করলে বোঝা যাবে প্রথমটি আকার বা আয়তনে বিশাল, কিন্তু বিশ্লেষনে বড়োই সরল। অপরদিকে দ্বিতীয়টি আকারে ঢেউয়ের তুলনায় নগন্য হলেও বিশ্লেষণ করতে গেলে কঠিন অঙ্কের কাঠিন্যে আগাত লাগে।

                রাজপ্রাসাদের যে ঘরটিকে বিপুল উপাদানের সমন্বয়ে আয়োজন করা হয়েছিল সেখানেই রাত্রির নিভৃতে জড়ো হয়েছেন তিনজন নারী। সকলের হাতেই পানপাত্র। পানীয়ের মাদকতায় ভরে উঠেছে বাতাস। শুধুমাত্র পেমা তার অচলায়তনে এখনও সীমাবদ্ধ। সে তার পরম দুই সখীর সঙ্গে কৌতুক বাক্যালাপে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। কী এক জটিল যন্ত্রনা তার বুকের মাঝে বেড়েই চলেছে ক্রমাগত।

        একজন কিশোরী উঠে এল তার কাছে। নেশা তার শরীরকে আলুথালু করে দিতে চায়। দেহের গোপনীয় কয়েকটি ভাঁজ নেশার আড়ালেই উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। কিছুটা কষ্ট করেই সেই কিশোরী তার লাগামহীন শরীরটা রাখল পেমার গা ঘেঁষে। সে বলল," তোমার আজ কী হয়েছে রাজকুমারী?"

অন্য কিশোরীটি তার পানপাত্রটি নামিয়ে রেখে বলল'" সখী তুমি বোধ হয় ভুলে গিয়েছ কারনটি। রাজকুমারীর বুকে বড়ো ব্যাথা। আজ তার জ্বলন্ত শরীরটা বারোটা ঠান্ডা আঙুলের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত।" তার মুখে কৌতুকের হাসি।

    কিন্তু পেমা, সে কোনো কৌতুক বোধ করল না। তার নাগপাশ রক্তাভ হয়ে উঠল ক্রমে। নাকের পাটা ফুলে উঠল। গলার কাছে কী একটা যেন খোঁচা মেরে যাচ্ছে বারবার। হাতের কাছে রাখা পানপাত্রটি ছুঁড়ে মারল সেই কিশোরীটির দিকে। একটুর জন্য তার বাঁ চোখটা রক্ষা পেল ঠিকই কিন্তু আঘাতের ধাক্কাটা সম্পূর্ণ রূপে এড়ানো গেল না। কপালে এসে লাগল পানপাত্রটি। সঙ্গে সঙ্গে রক্তের ধারা নেমে এল তার চিবুকে। কিশোরী এতক্ষণে পিছিয়ে গিয়েছে কয়েক পা। ঘটনার আকস্মিকতায় চিৎকার করার সময়টুকু সে পায়নি। কপালে হাত দিয়ে এখন সে কেঁদে উঠল। অন্য কিশোরীটি পেমার থেকে অনেকটা তফাতে গিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। বিপদের আশঙ্কায় তার স্নায়ু পাইন চারার মতোই সতেজ। এতটুকু নেশার ভ্রুকুটি সেখানে নেই।

_"কৌতুক হচ্ছে! আমাকে নিয়ে কৌতুক! রাক্ষসী..! জিভ উপড়ে নেব…! বেড়িয়ে যা ঘর থেকে। এক্ষুনি দূর হয়ে যা চোখের সামনে থেকে।" পেমার চোখে শাণিত ছুরির ধার। তাকে উদভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছে।

দুজনে আর একমুহুর্ত না দাঁড়িয়ে বেড়িয়ে গেল।

                         প্রেম বড়োই জটিল। মানুষ তার সাধারণ রূপটি কখনোই নাগালে পাই না। ধরতে গেলেই পিছলে যায় কেমন করে। তাই সে কখনও চোখের জলে সুখ বুঝিয়ে দেয় আবার সেই জলেই কেমন করে যেন এক সমুদ্র দুঃখ ঢেলে দেয়। পেমার অবস্থা কিছুটা এইরূপ। সে প্রেম বুঝতে পারে না। তবে প্রেমের ক্ষীণ অনুভূতিটি কেমন করে যেন তার বুকের কাছে‌ লেগে গিয়াছে। প্রেমও তার জটিল নিয়ম গুলি দ্বারা পেমাকে বশ করেছে। তাই তাহার ক্রোধ কখন বিগলিত হয়ে গাল বেঁয়ে ঝড়ে পড়ছে সে খেয়াল নেই। যেমন করে মাটি ফুঁড়ে জেগে ওঠে চারাগাছ তেমন করেই তার বুকের মধ্যিখানে কী যেন একখানি জেগে উঠেছে। প্রেম! পেমা জানে না। প্রেম হলেও হতে পারে। কিন্তু বিবেচনা করার মতো স্থিরতা সে হারিয়েছে। সে আপনাকে স্রোতস্বিনীর ন্যায় বইতে দিল।

 কোথাও একটি কানের দুল আবার কোথাও গায়ের গোপন আভরণ। এমন যত্রতত্র ছড়ানো ছিটানো কক্ষটিকে পেমার নিজেরই কেমন আচেনা ঠেকল। রাত্রি চলতে চলতে শেষ প্রহরে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মূর্তিখানি প্রভাতে কুঁড়ি থেকে পদ্মফুল প্রস্ফুটনের মতোই শোভনীয়। তার শিথিল চৈতন্যে সবকিছুই স্বপ্ন বলে মনে হয়। এমনকি তার চোখের নীচে জমা জলের গাঢ়ত্বও।

                যত্রতত্র ছড়ানো শরীরের আভরণ জড়ো করে উঠে দাঁড়ালো পেমা। খোলা জানালা থেকে বাইরের হিম শীতল বাতাস বিকশিত যৌবনে খেলা করে গেল। গোলাপী পাতলা দুটো ঠোঁট কেঁপে উঠল হাওয়ায় ছোঁটা পালের মতো। অগোছালো চুল আছড়ে পড়ল তার মুখে। সে ছুটে গেল জানালা গুলো বন্ধ করতে। পিছু নিল তার অগোছালো কাপড়টি লজ্জা নিবারনের অভিপ্রায়ে।

           জীব সংবেদনশীল। জড় প্রয়োজনীয়তা বোঝে। তাই কাপড়ের অংশটুকু অমন করে ছুটে পিছু নিল তার। কিন্তু সে বুঝল না,তার দেহলজ্জা ধুলিসাৎ হয়েছে অনেক আগেই। এখন লজ্জা তার একটিই। অথচ সেই লজ্জাকে অনুভব করার ক্ষমতা তার নেই। মনে মনে তার নিরাভরণ দেহটিকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে সেই লজ্জার কাছে। সমস্ত শিরায় অনুভব করেছে তার ক্লেশ। অথচ সেই গোপন লজ্জা ফালিচাঁদের মতো তার সমস্ত আকাশ জুড়ে দাঁড়ালে পেমা নির্জীব হয়ে পড়ে। জিভ হয়ে আসে অসাঢ়‌। নেত্র পল্লব আনত হয়ে মাটির সাথে মিশে যেতে চাই।

      এবারের ঠিক তেমনই হল‌। জানালা আর তার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে তার লজ্জা। কোথা থেকে? কেমন করে? প্রশ্নগুলো অনিবার্য কারণেই সে করতে ভুলে গেল। শুধু দুচোখ নীচু করে পেমা অনুভব করার চেষ্টা করছে সেই বলিষ্ঠ, কালো কাপড়ে মোড়া লজ্জা। সৌন্দর্যের কাছে মাথা নত করা প্রয়োজন। তার মাঝে হারিয়ে যাওয়া বোকামি। কিন্তু যে সম্মোহিত?

             ছায়ামূর্তি কাছে আসতেই শুকনো পাতার মতোই তার বুকের ওপর ঢলে পড়ল পেমা। বারোটা আঙুলের স্পর্শে তার শরীর মর্ মর্ শব্দ পেল। পাতারা কী এই সামান্য স্পর্শেই ভেঙে যাচ্ছে?

ছায়ামূর্তির কাঠিন্য অবিচল। একটিবার সে পেমার শিয়রে ভেঙে পড়েনি। কঠিনতাকে ভর করেই ছায়ামূর্তি বলল,- রাজকুমারী আমাকে ক্ষমা করুন

-কী অপরাধে? এক কলসি জল ঢেলে দিল যেন কেও।

-অপরাধ! জানা নেই। শুধু বারেবারেই মনে হচ্ছে আমি অপরাধী।

-এর কোনো কারণ

-হয়ত আপনি

-ইয়েশে…! স্বরে কাঠিন্যের স্পর্শ।

-আমার ঔধত্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে এর যথেষ্ট কারণও আছে। আপনিই আমার সংশয় দূর করুন।

কিছুক্ষণ সবকিছুই নীরব। বাইরে বাতাসের শব্দকে ছাপিয়ে বেড়ে উঠেছে দুজনের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ। -তোমাকে ভালোবাসা আমার উচিত কাজ বলে তুমি মনে কর? পেমা বলল।

-আপনি এই মুহূর্তে আবেগ তাড়িত।

-আমার প্রশ্নের উত্তর…পেমার স্বরে তানপুরার দ্রুত ছড়।

-দিতে কী আমি বাধ্য ?

-অবশ্যই। রাজকুমারীর কাছে তার ভৃত্য বাধ্য শাবকের মতোই হবে এটাই তো স্বাভাবিক। অভিমান পেমার গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে।

-ভৃত্য! আশা করি আপনি উত্তর পেয়ে গেছেন। আসি। আর হয়ত দেখা হল না আমাদের।

পেমা কিছু বলার আগেই ইয়েশে নিজেকে মুক্ত করে জানালার বাইরের অন্ধকারে মিশে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পেমার অভিমানে উড়ে এল পুরু ছাইয়ের আস্তরণ। ছুটে গেল জানালার কাছে। কিন্তু কোথায় কে? চারপাশে গাঢ় অন্ধকারে। শুধু দূরে একটা আগুনের বিন্দু ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে। তার চোখ উপচে গড়িয়ে এল জল। কানে একটা শব্দি বারবার শুনতে পেল পেমা "আর হয়ত দেখা হল না আমাদের।"

                                       চার

ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে দাচেনের। সব কিছু মিলিয়ে দেখেছে সে। ভোরের মধ্যে পাহাড়ের এইটুকু অংশ পার করতে পারলেই সে পৌঁছে যাবে দক্ষিণের গ্রাম গুলোর একটিতে। মাঝে কোনো ছোটোখাটো লোকালয়ে খাবারটুকু সেড়ে নিতে পারবে। তাছাড়া সে সম্ভাবনা না হলেও ক্ষতি নেই। এই মূহুর্তে তার কাছে রষদ যা আছে তাতে করে একদিন চলে যাবেই। কিন্তু বাধ সেধেছে এই ঝোড়ো ঠান্ডা বাতাসের ঝলকানি। প্রকৃতি যেন অকারনেই ক্ষেপে উঠেছে।

      ঘোড়াটা নিয়ে প্রায় সমতল একখন্ড জমির ওপর দাঁড়ালো দাচেন। হাতের মশাল কিছুক্ষণ হল সবকিছু অন্ধকার করে দিয়ে গেছে। আকাশ চুঁইয়ে পড়া আলো পৃথিবী পৃষ্ঠ স্পর্শের আগেই ধরা দিচ্ছে অন্ধকারেরে করাল গ্রাসে। পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে বাতাস শুরু করেছে অদ্ভুত এক সুরধ্বনি। তার মাঝেই দূর থেকে ভেসে আসছে ক্ষুধার্ত শ্বাপদের চিৎকার। হঠাৎ আস্তে আস্তে সবকিছু শান্ত হয়ে এল। ঝোড়ো বাতাস বাধ্য‌ শিশুর মতোই অন্তর্হিত হয়েছে। ক্রমে পরিবেশ তৈরি হচ্ছে গা ঘিনঘিনে এক অস্বস্তি। বাতাসে ভর করে উঠে এল পচা মাংসের গন্ধ।

              একটা নারীর কাতর কন্ঠস্বর ভেসে এল‌ দূর থেকে। নারী কন্ঠ! সন্দেহের দৃষ্টিতে দাচেন একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিল চারপাশটা। গাঢ় থকথকে অন্ধকার। একটা ভারী কোনো‌ জীব উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে। আরও একবার ভেসে এল সেই কাতর কন্ঠস্বর। একসময় সেই কন্ঠস্বর পরিনত হল কান বিদীর্ণ চিৎকারে। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে প্রতিধ্বনিত সেই চিৎকারে নীরবতার পত্তনের ভিত টলমল করে উঠল।

       দাচেন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই শব্দের একটা উৎস ঠিক করে ছুটে গেল সেই দিকে। তার শিরায় দাপাদাপি শুরু করেছে একশো ঘোড়ার খুড়। অন্ধকার চোখ কিছুটা সয়ে এসেছে তার। কয়েকবার পড়ে যেতে যেতেও নিজেকে সামলে নিল দাচেন। বেশিদূর তাকে যেতে হল না। একটা ছোটো গুহার কাছে এসেই তাকে থামতে হল। তার ষষ্ঠেন্দ্রীয় দিয়ে অনুভব করল কোনো এক অজানা বিপদের আশঙ্কায় মেতে উঠেছে চারপাশে।

              গুহাটি আকারে ছোটো। গুহার ভেতরে কিছুক্ষণ আগেই আগুন জ্বালানো হয়েছে। সেই আলোতেই দেখা যাচ্ছে গুহার মেঝেতে পড়ে আছে একটা নগ্ন নারীর দেহ। চিৎকার করে চলেছে সে ক্রমাগত। দাচেন গুহার ভেতরটাতে এসে দাঁড়াল। মেয়েটার মুখ যন্ত্রণার আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত। সমস্ত শরীর টকটকে লাল। মাথার চুল যন্ত্রণার তারণায় সাপের মতো নাঁচছে। আস্তে আস্তে দাচেনের চোখ নেমে এল মেয়েটার পেটের কাছে। আর সঙ্গে সঙ্গেই একটা শীতল স্পর্শের রেখা তার শিড়দাঁড়া বেয়ে নেমে গেল।যা দেখছে সে তার সত্যতা যাচাই করার শক্তি তার লুপ্তপ্রায়। চেতলা শিথিল হয়ে আসছে। তবুও কোনো মতে বিস্ফারিত চোখে দেখে চলেছে পরপর ঘটনাগুলো। মেয়েটার পেটের ভেতরে একটা জীবিত বস্তু নড়াচড়া করছে। নরম চামড়া ভেদ করে যতবার সেই জীবিত বস্তুটা উঠে আসতে চাইছে মেয়েটার চিৎকারে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

একসময় মেয়েটার পেটের খানিকটা অংশ ফুলে উঠল। লাল চামড়া ভেদ করে নীলচে শিরা উপশিরা গুলি স্পষ্ট । মেয়েটার শরীরে জমতে শুরু করেছে বিন্দু বিন্দু অন্ধকার।

    দাচেন তথাগত কে স্মরণ করতে গিয়ে অনুভব করল‌ স্নায়ু তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মেয়েটিও ক্লান্ত। তার মুখ বেয়ে নেমে এসেছে কালচে রক্তের স্রোত। পেটের চামড়ার দেখা দিয়েছে ফাটলের দাগ। এক রকমের কালো তরল চুঁইয়ে পড়ছে সেখান থেকে। হঠাৎ মেয়েটি শেষ বারের চিৎকার করল। গলা থেকে বেড়িয়ে এল দলা দলা রক্ত। পেটের ফাটল গুলো আরও চওড়া হয়ে সেখান থেকে বেড়িয়ে এল একটা কালো জীব। যে এতক্ষণ ধরে বেড়ে উঠছে মেয়েটার জরায়ুতে। দলা দলা মাংস পিন্ডগুলো পড়ে রইলো চারপাশে।

                                       পাঁচ   

  দুটো ঘোড়া পাশাপাশি বাঁধা। তার পাশেই একটু উঁচু পাথুরে জমির ওপর জ্বালানো আগুন কিছুক্ষণ হল শেষ নিংশ্বাস পড়ল। চিনা সৈনিক দুটোরও চোখ প্রায় নিভে এসেছে। তীব্র মাদকদ্রব্যের গন্ধ মম্ করছে বাতাসে। প্রথম সৈনিক একটু নড়েচড়ে বসল। তার দেখাদেখি দ্বিতীয় সৈনিক কিছুটা জোর করেই উঠে একটা চামড়ার থলি থেকে কিছুটা মাদকদ্রব্য বার করে চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালালো তাতে। কয়েকটা দীর্ঘ টান দিয়ে উপাদেয় বস্তুটি প্রথম সৈনিক কে দিয়ে বলল, "কী ঠান্ডা! এইভাবে বসে থাকতে ভালো লাগে? কোথায় যুদ্ধ হবে, তিব্বতী ভেড়া গুলোর ধর থেকে মাথা আলাদা করে দেব তলোয়ারের এক কোপে। লুটপাট করব। তা নয় দিনের পর দিন এক জায়গায় বসে আছি।"

প্রথম সৈনিক জমিয়ে কয়েকটা টান দিয়ে বলল, "সে আশা তোমার এ যাত্রায় পূর্ণ হবার নয়।"

_"মানে? যুদ্ধ হবে না? এমনি এমনি রাজ্য জয় হয়ে যাবে! "

_"এমনি এমনি গাছের ফলটিও কি মাটিতে পড়ে ভায়া?"

_"তবে যে বললে আমাদের কিছুই করতে হবে না?"

_"ঠিকই তো বলেছি। আমাদের কিচ্ছুটি করতে হবে না একটা আড়মোড়া ভেঙে বলল খাও দাও আর এই একটু আধটু পাহারা দিলেই রাজ্য জয় হয়ে যাবে।" এই বলে প্রথম সৈনিক বিদ্রুপের হাসি হাসল।

_"ব্যাপারটা কী একটু গুছিয়ে বলতো।" রহস্যের গন্ধে দ্বিতীয় সৈনিক শিড়দাঁড়া সোজা করে বসল।

কিছুক্ষণ সবকিছু চুপ। দুটো মানুষ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে। একজনের মন কোনো এক গভীর রহস্য উদঘাটনের কড়িকাঠে বসে। আর ওপর জন ছোটো ছোটো ঘটনাগুলিকে জুড়ে যে উপন্যাস তৈরি করেছে তাতে আরও কিছুটা রসবোধ সংযোজনে ব্যস্ত।

   নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রথম সৈনিক বলতে শুরু করল, "তুমি তো জান জেনারেল শেরম্যানের কাছে অন্যান্যদের তুলনায় আমার পরিচিতি একটু হলেও বেশি। মাঝেমধ্যেই ছোটোবড়ো গুপ্ত কাজগুলোতে আমাকে তিনি নিয়োগ করেন। তেমনই একটা কাজে আমাকে কিছুদিন আগেই পাঠিয়েছিলেন। মাঝরাত। আমি সেনা ছাউনির বাইরে বসে তলোয়ারের ধার পরীক্ষা করছি। হঠাৎ সিংপো এসে খবর দিল জেনারেল আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আশপাশ নিঝুম অন্ধকারে ডুবে আছে। শব্দের মধ্যে শুধু ঘোড়ার পা ঠোকার শব্দ। মূল শিবিরে যখন পৌঁছলাম ততক্ষণে সেটুকুও নিঃশেষ। শিবিরের বাইরে পাহারায় মাত্র দুটো সৈনিক।

"আমি যাওয়া মাত্র প্রবেশের অনুমতি পেয়ে গেলাম। শিবিরের ভেতরের সাথে বাইরের পার্থক্য খুবই সামান্য।

একটা ক্ষীণ প্রদীপের শিখা জ্বলছে। বাতাসে খেলা করছে একটা মিষ্টি গন্ধ। জেনারেল ঢুলুঢুলু চোখে পানপাত্র হাতে বসে আছেন। চোখদুটো অস্তগামী সূর্যের মতো লাল। একটু পরেই অন্ধকারে নামবে সেখানে।

জেনারেলকে সেলাম করে তফাতে দাঁড়িয়ে রইলাম। জেনারেল শেরম্যান তার আবছায়া চেতনায় ভর করে বললেন," তোমার জন্য একটা কাজ আছে। যদি পরো তাহলে পুরস্কার পাবে নচেৎ গরদান দিতে হবে কিন্তু। কি পারবে?"

এইরকম কাজগুলোতে প্রাণের ঝুঁকি থাকেই। সুতরাং আমিও নিজেকে দ্বিতীয়বার ভাবার অবকাশ না দিয়ে বলে ফেললাম," পারব হুজুর।"

"জেনারেল তার ধূর্ত চোখের চাহনি দিয়ে জরিপ করল আমাকে। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল তার শয়নকক্ষে।তিনি যখন বেড়িয়ে এলেন শয়নকক্ষ থেকে তার পাশে দাঁড়িয়ে এক যুবতী নারী। ঘন কালো চুল শূন্যে দুলছে। হরিনের মাংসের মতো চামড়ায় পিছলে পড়ছে প্রদীপের আলো। যৌবন হিমালয়ের জমাট বরফের মতো থাবা বসিয়েছে । চোখের আঁখিপল্লবে জমেছে শিশির বিন্দু।

    "ঠান্ডাতেও আমার শরীরে ফুটে উঠল‌ বিন্দু বিন্দু ঘাম। সুন্দর মিষ্টি গন্ধটা ক্রমে গাঢ় হচ্ছে। আমার অবস্থা দেখে জেনারেল যে কথাগুলো এরপর বলে গেলেন সেগুলো এক একটা জ্বলন্ত কয়লার টুকরো,

"সংযত করো নিজেকে। একেই পৌঁছে দিতে হবে তোমাকে। যদি একফোঁটা আঁচড়ও লাগে এর গায়ে তোমার চোখ উপড়ে নেব। তার গলা‌ নেকড়ের মতো হিংস্র।চোখ দুটো আগুনের মতো ধক্ ধক্ করে জ্বলছে। আমার সমস্ত স্নায়ুগুলো অজান্তেই গুটিয়ে নিল নিজেদের।" কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললেন ,"উত্তর দিকের পাহাড় গুলো তোমার ভালো‌ করেই চেনা। এই কাজের ভার তাই তোমাকে দিচ্ছি। একে কাং রিনপোচের কাছে রেখে আসবে। ফিরে আসার সময় একদম পিছনে তাকাবে না। আর এই নাও একশো মুদ্রা। কাজ সফল হলে এর দ্বিগুন পাবে।এখনই বেড়িয়ে পড়ো। পথে কোথাও দাঁড়াবে না।"

  এতটা বলার পর হাঁফ ছাড়ল প্রথম সৈনিক । দ্বিতীয় সৈনিকের শিঁড়দাঁড়া তখন সোজা। রহস্যের মাঝপথের এই ক্ষুদ্র বিরতি শ্রোতাকে বড়ই বিচলিত করল। সে একটু উসখুস করে বলল," থামলে কেন? বলো তারপর কী হল?"

প্রথম সৈনিক গলায় বিরক্তি নিয়ে বলল," এত তাড়া কিসের? ধৈর্য ধরো। ভোর হতে এখনো বাকি আছে।"

_"আমি যে আর…."কথাটা শেষ করতে না দিয়েই প্রথম সৈনিক দ্বিতীয় সৈনিকের মুখ চেপে ধরল। তারপর আস্তে আস্তে কানের কাছে মুখ এনে বলল," কিছু শুনতে পেলে?"

দ্বিতীয় সৈনিকটি কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল। ঝড়ের গতিতে হাওয়া বইছে। ঝোড়ো বাতাসের উল্লাসে কান পাতা দুঃসাধ্য। তবুও একটা হালকা পাথুরে শব্দ কানে আসছে। কেউ বা কারা পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে। ততক্ষণে প্রথম সৈনিক উঠে পড়েছে পাশের একটি বড়ো পাথরের ওপর । পিছনে পাহাড়। সামনে প্রশস্ত পাথুরে জমি। ওরা যেখানে আছে জায়গাটা তুলনামূলক একটু উঁচু। বহুদূর পর্যন্ত সেখান থেকে অনায়াসেই সবকিছু লক্ষ্য করা যায়। অন্ধকার পাতলা হলেও দূর থেকে স্পষ্ট কিছুই দেখা যায় না। ঘোলা জলের মতো পাতলা চাদর ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। তবুও এই আবছায়া ঘোলাটে অন্ধকার আড়াল করতে পারল না ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা ক্লান্ত ছায়ামূর্তিটিকে। এবড়ো খেবড়ো পাথরের উপর দিয়ে একটিই মাত্র ঘোড়ায় চলা পথ চলে গিয়েছে বহু দূর পর্যন্ত। ছায়ামূর্তিটি সেই পথ ধরেই এগিয়ে আসছে। পাথর থেকে নেমে এল প্রথম সৈনিকটি, তার বন্ধুটিও আসন্ন বিপদের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত।

      দুজনে ঘোড়া দুটো রেখে দিয়েই নেমে গেল নীচের দিকে। পাহাড়ের উঁচু নীচু ঢাল। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে সবকিছুই ওদের কাছে যেন সমতল। নামতে নামতেই দ্বিতীয় জন চাপা স্বরে প্রশ্ন করল," যদি শত্রু না হয়ে কোনো সাধারণ লোক হয়?"প্রথম সৈনিকের গলায় তাচ্ছিল্যের সুর," এই সময়ে! আর তাই যদি হয় তবে পরে ভাবা যাব এখন পা চলাও।"ওরা দুজনে রাস্তাটার যেখানে এসে দাঁড়াল সেখান থেকে ছায়ামূর্তিটির দূরত্ব এখনও বেশ খানিকটা। প্রস্তুতির সময় পাওয়া যাবে। ঠিক হল একজন ছায়ামূর্তিটির পথ আগলে দাঁড়াবে আর অন্য জন অতর্কিতে আক্রমণ করবে পেছনে থেকে।

           দুজনেরই ঘন ঘন‌ নিঃশ্বাস পড়ছে। উত্তেজনায় হৃৎপিণ্ড গলার কাছে এসে দাপাদাপি শুরু করছে। অপেক্ষাও আর শেষ হতে‌ চায় না। হতে পারে তাদের উপস্থিতি ছায়ামূর্তি টের পেয়েছে। দুজনের মস্তিষ্কে একই সম্ভাবনার কথা মাথায় এল। কিন্তু পরক্ষণেই সব কিছু ধুলিসাৎ হল ঘোড়ার খুড়ের শব্দে। আর কয়েকটা নিঃশ্বাসের অপেক্ষা মাত্র।

***     

মিহি ধোঁয়ার কুন্ডলীর মতো আওয়াজে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। কোথাও এতটুকু প্রাণের স্পন্দন নেই। যত দূর চোখ যায় শুধু মৃত মানুষের স্তুপ আর শ্বাপদের উল্লাস। পচা গলা দেহ গুলোকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়ে গেছে শ্বাপদের দল। পাথরের গায়ে জমাট রক্তের দাগ। একটা পচা গলা দেহের পাশে লামা সামসেং নিজেকে আবিষ্কার করল। শরীর নিয়ন্ত্রণহীন। দুর্গন্ধে বমি হওয়ার জোগাড়। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই সে লক্ষ করল তার পেটের খানিকটা অংশ নেই। কোনো‌ প্রানীর হিংস্র দাঁত খাবলে নিয়েছে সেখানকার মাংস। কাঁচা রক্তের স্রোত ভিজিয়ে দিয়েছে শক্ত পাথুরে জমি। লামা সামসেং এর গলা বুজে এল। ভয় জাপটে ধরল তাকে চারপাশ থেকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই তার চোখ খুলে‌ গেল‌। একঝাঁক আলো বিঁধে গেল তার চোখে।

                                        ***

সূর্য এখন মাথার ওপরে। একটা ছোট পাথরের ওপর বসে আছে সামসেং। কপালে গভীর ক্ষত। যন্ত্রণা এখন কিছুটা কম। স্নায়ু গুলোও সতেজ হতে শুরু করেছে। একবাটি গরম দুধ দিয়ে গিয়েছিল ভৈরব কিছুক্ষণ আগে। সেটাই বসে খাচ্ছে আর ভাবার চেষ্টা করছে গত রাতের ঘটনাগুলো। চিনা সৈনিক দুটো যখন তাকে বেঁধে শিবিরে নিয়ে গিয়েছিল তখন আকাশে সবেমাত্র রঙ ধরেছে। আর কিছুই মনে নেই। তারপর চোখ খুলে সে নিজেকে আবিষ্কার করেছিল একটা গরম বিছানায়। বিশ্রী খেতে একটা তরল নেমে যাচ্ছিল তার গলা দিয়ে। লামা সামসেং আবছা দৃষ্টিতে দেখেছিল এক সৌম্যদর্শন মূর্তি সেই বিশ্রী তরল মুখে ঢেলে দিচ্ছে। "তথাগত! " জড়ানো গলায় সে বলে উঠেছিল।

             দুধটা খেয়ে লামা সামসেং উঠে দাঁড়ালো। শরীরে সে কিছুটা বল ফিরে পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু পূর্ণরূপে সুস্থ সে নয়। উঠে দাঁড়াতেই চোখের আশেপাশের সবকিছু আবছা শুরু করল। একটা বিপুল আয়তন সমতল ভূমির একপাশে গাছের তলায় ভৈরব তার রান্নার আয়োজন শুরু করেছে। ধীর পায়ে সে সেদিকেই এগিয়ে গেল।

   অতল সমুদ্রে পড়ে গিয়েছে সামসেং। গন্তব্য, বহুকাল আগেই শিশুবেলার মতো হারিয়ে গেছে। এখন‌ সে নীল লেলিহান সমুদ্রের গ্রাসে। নিয়তিকে প্রতারণা করতে গিয়ে সেই এখন তার শিকার। গলা বুজে আসে সামসেংএর। এত চেষ্টা সত্ত্বেও কী…

"মহাশয়, আপনি এই‌ তরলটুকু খেয়ে নিন।" চিন্তায় ছেদ পড়ল সামসেংএর। ভৈরব তার দিকে এগিয়ে দিয়েছে লাল তরলে ভর্তি বাটিটা ।

     সমস্ত তরলটুকু গলধঃকরণ করে পুনরায় লামা সামসেং তলিয়ে গেলেন চিন্তার অতল সমুদ্রে। এবারে পথ ভিন্ন। সবটুকু চিন্তায় কেন্দ্রীভূত হয়ে রইলেন ভৈরব। তার আচরণ বাল্যসুলভ‌। আতিশয্য ব্যাপারটি উহ্য সেখানে। তাকে দেখে মনে হয় না তিনি এই অঞ্চলের। আবার গভীর ভাবে ভাবলে দেখা যাবে এই সৌম্যদর্শন মূর্তি সভ্যতার কোনো অংশেই খাপ খায় না। সমস্ত কিছুর উর্ধ্বে তিনি। দেহ থেকে সর্বদা চুঁইয়ে পড়ছে শক্তিশালী এক তেজ। চোখ দুটো জলের মতো স্বচ্ছ। পাহাড়ি ঝরনার মতো গভীর ও বিপদসংকুল। সভ্যতার প্রতিটি গূঢ় প্রতিবিম্ব স্থির হয়ে আছে সেই চোখের স্বচ্ছ পর্দায়। যার সন্ধানে তিনি এসেছেন তবে কি ইনিই সেই ব্যক্তি?

              পুনরায় তার চিন্তায় ছেদ পড়ল। ভৈরব ডাকছে। সে তার পাশটাতে গিয়ে বসল। অপরূপ সৌরভ বাতাসে। দুগ্ধজাত কোনো খাবারের গন্ধ। একটুকরো পনির মুখে দিয়ে ভৈরব বলল,"মহাশয় আপনাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে?" বাল্যসুলভ গলার স্বর। সহজেই কেমন আপন করে নেয়।

কিন্তু লামা সামসেং চুপ। মনের ভেতর ধুলো চাপা কুঠুরির ক্ষতচিহ্ন গুলো জেগে উঠছে আবার। ছিন্ন ভিন্ন দেহ, জমাট রক্তের দাড, বিভৎস মুখমন্ডল…

     ভৈরবের স্পর্শে তার সম্বিৎ ফিরল। তার দিকে তাকাতেই লামা সামসেং লক্ষ্য করল অদ্ভুত এক জ্যোতি চোখের মনি কোঠর থেকে গ্রাস করছে তাকে। নিজেকে হালকা লাগছে অনেকটা। যেন একটা ভারী পাথর বুকের ওপর চেপে বসেছিল এতদিন। সম্মহিতের মতন অজান্তেই সে বলতে শুরু করল।

             

                                          ছয়

রাজপ্রাসাদ নীরবে দন্ডায়মান। কক্ষগুলির চেহারাও করুন। বাগিচার সবুজ ফিকে হয়ে এসেছে। সভাগৃহের আলোচনা গুলির বিষয়বস্তু ফুরিয়ে আসছে ক্রমশ। আলোচনার গুলির উপলক্ষ্যও এক। সেখানে রয়েছে তীব্র বিপদের গন্ধ। মোকাবিলার কেনো আয়োজন নেই। যেটুকু ছিল তার আতিশয্যেও টান‌ পড়েছে কিছুটা। গর্ত থেকে সত্য গুলো বুকে ভর করে বেড়িয়ে আসছে কান পাতলেই তা বোঝা যায়। অথচ সভাষদের মধ্যে একমাত্র বিচক্ষণ ব্যক্তিবর্গ নিষ্ঠার সঙ্গেই লুকিয়ে রেখেছিলেন সত্য গুলি। কিন্তু যা সত্য তা ধূর্তও বটে।

                  এমতাবস্থায় মহারাজের আচরণ উদভ্রান্ত হওয়ায় স্বাভাবিক। খাওয়া দাওয়ার পাঠ প্রায় উঠেই গেছে। অনিদ্রা লোহার কাঠামোটিকে পরিনত করেছে নির্জীব বস্তুতে। দিনের বেশিরভাগ ভাগ সময়টুকুই তার ব্যহত হয় নিজের মৃত্যু কামনায়। রাতগুলো কাটে অন্ধকার সভাগৃহে।

                 আজ রাতেও একই নিয়মের পুনরাবৃত্তি হত যদি না সেই সময় পদ্মিনীর আগমন হত। অপরূপ সুন্দরী সে। প্রণয়ের সমস্ত উপাদান তার মধ্যে বিদ্যমান। চোখে প্রনয়িনীর স্পষ্ট ডাকে এই কয়েকদিনেই মহারাজ তার প্রতি সম্মোহিত। তবুও তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে দেননি। মহারানী ইয়নতেন কিছুটা হলেও দায়ী এর জন্য। না হলে কবেই পদ্মিনীর অধর…। এরই মধ্যে পদ্মিনী কিছুটা এগিয়ে এসেছে । তার স্ফিত বক্ষযুগল ও মহারাজের মধ্যে পার্থক্য সামান্য। মুখে লজ্জার গোলাপী আভা। ঘন্ ঘন্ নিঃশ্বাসে আগুনের উত্তাপ মহারাজের রক্তকনিকায় দাপাদাপি শুরু করেছে। তার সংযম প্রায় ছিন্ন। অজান্তেই হাতদুটো উঠে এসেছে পদ্মিনীর চিবুকে। পাতলা হাঁসির রেখা ঝিলিক খেল সেখানে। এইবার মহারাজ নিজেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করলেন। ভ্রমরের মধু আস্বাদনের সহজ উপায়টি অবলম্বন করলেন তিনি। পদ্মিনী অপেক্ষারত তার সম্পূর্ণরূপে প্রস্ফুটনের সঠিক সময়ের।

      তথাগত মনে মনে হাসলেন। পদ্মিনী প্রণয়ী নয়। সে যে প্রেমের উপযুক্ত মূল্যের বাহক একথা সর্বসমক্ষে বললেও ঠুনকো শোনাবে। তার সমস্ত ক্রিয়ায় আয়োজন মাত্রাতিরিক্ত হলেও স্বাদে বিষের থেকেও বিচ্ছিরি। জিভে তেঁতো স্বাদ লাগতেই ধনুকের ছিলার মতো মহারাজ ছিটকে গেলেন। যে সম্মোহনের বীজ তার মধ্যে প্রথিত করেছিল পদ্মিনী তা বেড়ে ওঠবার আগেই প্রান হারাল।

_"মহারাজ!" পদ্মিনীর দেহখানি অভিমানে দুলে উঠল।

মহারাজের ধাতস্থ হতে তখনও কিছুটা সময় বাকি।

_"আমি কী এমন পাপ করেছি যে আপনার স্পর্শেরও যোগ্য নয় আমি। "একথালা মুক্ত কেও যেন ছড়িয়ে দিল মেঝের ওপর।" ঠিক আছে! যদি আমি পাপিষ্ঠাই হয় তবে তুলে নিন তরবারি বিচ্ছেদ করুন আমার মস্তক।" মহারাজ কিছু একটা বলতে যাবেন এমনসময় শুনতে পেলেন ভারী পায়ের শব্দ। শব্দটা এদিকেই এগিয়ে আসছে। তিনি পদ্মিনীর হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন," পাপিষ্ঠা তুমি নও। পাপী আমি। তাই তোমার স্বচ্ছতাকে স্পর্শ করার অধিকার আমি পেলাম না।" মহারাজ পদ্মিনী চোখের জল মুছিয়ে দিলেন "রাত অনেক হয়েছে।এখন তোমার কক্ষে ফিরে যাও।"

        পদ্মিনী বেড়িয়ে এল রাজার কক্ষ থেকে। আর সেখানেই তার সাথে দেখা হল সেনাপতি লাংপোএর সাথে। দুজনের ঠোঁটেই খেলে গেল কুটিল হাসি। কোনো হাড় হিম্ করা ষড়যন্ত্র জেগে উঠে পরক্ষনেই মিলিয়ে গেল রাজপ্রাসাদের নিস্তব্ধতায়। চোখের ইশারায় পদ্মিনী বলল কাজ হয়ে গেছে। আরও একবার মৃদু হেসে লাংপো পা বাড়াল মন্ত্রনা কক্ষের দিকে।

          মহারাজের সাথে দেখা হতে লাংপোর কিছুকাল দেরি হল। মন্ত্রণা কক্ষে মহারাজ প্রবেশ করলেন। গত ঘটনার কোনো চিহ্নই তার মধ্যে আর অবশিষ্ট নেই। প্রদীপের আলো-আঁধারি আবহাওয়া খেলা করছে মন্ত্রণা কক্ষের দেওয়াল জুড়ে।

মহারাজ। "লাংপো এই সময় তুমি?" মহারাজের স্বর গম্ভীর।

লাংপো। "ক্ষমাপ্রার্থী মহারাজ। তবে একটি সুসংবাদ দেওয়ার জন্যই…"

মহারাজ। "সুসংবাদ! তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন বলো কী সুসংবাদ এনেছ?"

লাংপো। "মহারাজ, চীনাদের ঘাঁটি তছনছ হয়ে গিয়েছে। বিষধর সাপের দংশনে মারা গিয়েছে তাদের বেশিরভাগ সৈন্য। ঘটনাটা খুবই আশ্চর্যের। বিষধর সাপ এই অঞ্চলে খুব একটা দেখা যায় না। তাছাড়া এতগুলো সৈন্য একসাথে সাপের কামড়ে মারা যাবে…"

মহারাজ। "সত্যি বলছ! চকচকে ধারালো হাসির রেখা ফুটে উঠল মহারাজের ঠোঁটে।"

লাংপো। "একথা সত্য মহারাজ।"

মহারাজ। "লাংপো! তথাগত বুদ্ধ কি সত্যিই এইবার মুখ তুলে চাইলেন আমাদের দিকে.."

মহারাজের কথা শেষ করতে না দিয়েই লাংপো বললেন," বহিরাগতদের থেকে বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে। কিন্তু মহারাজ যে বিপদ আমাদের ঘরের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে সেই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হই কী করে। লামা দাচেনের মতো নিষ্ঠাবান ব্যক্তির পরিনতি যদি এমন নৃশংস ভাবে হয…।

_"সে দৃশ্যের বিবরণ আর তুলে ধোরো না চোখের সামনে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমারই কোনো পাপের শাস্তি বোধহয়…" মহারাজের চোখে জল এর কী কোনো প্রতিকার নেই

_"এর প্রতিকার নিশ্চয় আছে। কিন্তু কতটুকু সময় আমাদের হাতে আছে এখন সেটাই দেখার।"

_"কেন? এমন কথা বলছ লাংপো?"

_"যথেষ্ট কারন আছে মহারাজ। দাচেনের পাশে যে মেয়েটির মৃতদেহ পাওয়া গেছে তার শনাক্তকরণ হয়েছে। মেয়েটি মহারানীর সেবিকা। অর্থাৎ রাজ অন্তঃপুরও আর সুরক্ষিত নয়।"

_"তোমার কী মতামত?"

_"পলায়ন। যে শত্রু অদৃশ্য তার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া মুর্খামি।"

মহারাজ ভারাট স্বরে শুধু বললেন," হুম। এখন তুমি আসতে পারো। আর একটা কথা লামা সামসেংএর কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে?"

_"না মহারাজ।", বলেই লাংপো‌ বেড়িয়ে গেলেন মন্ত্রণাকক্ষ থেকে। আর মহারাজ প্রতিদিনের মতো ডুবে গেলেন গভীর চিন্তায়।

                                        সাত

     পাহাড়ের গায়ে দুটো বড়ো পাথরের মাঝখানে কিছুটা খালি জায়গা। পাথরের এবড়ো খেবড়ো দেওয়ালে ভেসে যাচ্ছ মশালের রঙিন আলো।সেই আলোয় ভৈরবের চোখদুটো আরও গভীর দেখাচ্ছে। বাইরে জ্যোৎস্নার মৃদু হাতছানি। লামা সামসেং মন সেইদিকেই পড়ে আছে। কে ভাবতে পারে এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে ঘটে চলেছে একের পর এক পৈশাচিক মৃত্যু। সৃষ্টিকর্তারও বোধহয় সাহসে কুলাবে না। তার মনে পড়ে গেল প্রধান লামা গোয়েস্তার সাবধানবাণী "আলোর বিপরীতেই অন্ধকারে। মনে রেখো ইয়াং তার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করবে আমাদের ক্ষতিসাধন করার‌। বাইরে তিনি যতটা কোমল ভেতরটা তার থেকেও বেশি শক্ত।" আর হলও তাই। নোংরা মানুষটার শক্তির সামনে কার সাধ্য যে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে। লামা সামসেং এখনও ভোলেনি সেই পৈশাচিক দৃষ্টি। প্রধান লামার পদ থেকে যখন ইয়াং বহিস্কৃত হয়ে বেড়িয়ে গেলেন মঠ থেকে তার চোখে চোখ রেখেছিলেন সামসেং। আহ্! সেই পৈশাচিক দৃষ্টি আজও যেন বুকের অতল গভীরে গিয়ে আগাত করে। সেকথা মনে পড়তেই তার কপালে জমে উঠেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। শীতল শিহরণ নেমে গেল শিড়দঁড়া বেয়ে।

_"আপনার কি অসুস্থ বোধ হচ্ছে?" ভৈরব জিঞ্জাসা করলেন

_"না!...না। আমি ঠিক আছি।" লামা সামসেং টের পেলেন তার গলায় কাজ করছে একটা চাপা আতঙ্ক।

_"অনেক রাত হল, আপনি খেয়ে বিশ্রাম নিন।"

_"বিশ্রাম!! না না ! বিশ্রাম নিই কী করে বলুন তো? চোখ বুজলেই সেই বিভৎস মৃতদেহ গুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে। আতঙ্কে শরীরে বল পায় না। কে জানে আরও কতগুলো মৃত্যুলীলা ঘটে গেছে সেখানে? তার গলা উপচে জল‌ এলো। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন "এর প্রতিকারের উপায় আপনার জানা নেই?"

ভৈরব তার স্বভাবসিদ্ধ শান্ত গলায় উত্তর দিল," আমি একজন সাধারণ মানুষ মাত্র…"

_"সাধারণ! সাধারণ শব্দটির আড়ালে আপনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছেন।"

_"তা আপনার ভুল ধারণা।"

_"হতে পারে। তবে বলুন কীভাবে অতগুলো চীনা সৈনিকদের হাত থেকে রক্ষা করলেন।"

_"আপনাকে যে সময় আমি উদ্ধার করি সেই সময় কোনো সৈনিকের উপস্থিতি টের পায়নি।"

_"অসম্ভব…চীনা সৈনিকদের হাতে বন্দী যখন আমার সংঞ্জা হারায়।"

_"সেটা আপনার ভ্রম।"

_"ভ্রম! "লামা সামসেং কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন'" লামা গোয়াস্তের ভবিষ্যদ্বাণী আপনার নিশ্চয় স্মরণে আছে!এই পথেই খুঁজে পাব এমন এক ব্যক্তির যিনি এই বিপদের প্রতিকার…"

_"সে ব্যক্তি নিশ্চয় এই অধম নয়!"

_"তা সময় বলবে। আগামীকাল আমি মঠের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। সাথে আপনিও যাবেন।"

-"আপনাকে কথা দিয়েছি। সুতরাং একমাত্র মৃত্যু না হলে এই কর্তব্যের অবরোধ অসম্ভব।"

পরেরদিন প্রত্যুষে দুটি ঘোড়া সেজে উঠল। যাত্রাপথ দীর্ঘ। লামা সামসেং পুনরায় সেজে উঠেছেন তার যুদ্ধের সাজে। ভৈরবের সাজ সজ্জার কোনো বালায় নেই। শুধু একটা লাঠি তার হাতে। লামা সামসেং লাঠিটার কথা জিজ্ঞাসা করতেই সে একবার শুধু হাসল। দুজনেই উঠে বসলেন ঘোড়ার পিঠে। লাগামে টান লাগতেই ঘোড়া দুটো মিলিয়ে গেল পাহাড়ের আড়ালে।

                                     আট

        বিপদ যে ঠিক কতটা বড়ো তার একটা আবছা ধারণা ইয়েশে আগেই পেয়েছে লামা সামসেংএর কাছে। আর তা যদি সত্য হয়, তবে এই প্রদেশ পরিনত হবে ধ্বংসস্তুপে। এক প্রেতভূমি, যেখানে চিতার ছাই জড়ো করার জন্যও কেও বেঁচে থাকবে না। "তথাগত, এ কোন পাপের ছায়া নেমে এল..?" ইয়েশে বলে উঠল অস্ফুট স্বরে। প্রদীপের হলুদ মৃদু ,শান্ত আলো কক্ষটিকে ঘিরে তৈরি করেছে রহস্যের মায়াজাল। অনুরূপ জাল বিস্তার করছে তার মস্তিষ্কে। অতীতের বুনন‌ শুরু হয়েছে সেখানে।

        ইয়াং বহিষ্কারের দিন ইয়েশে প্রদেশের বাইরে ছিল। যখন সে ফিরে এল ততদিন মৃত্যু তার ছায়া ফেলতে শুরু করেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। একমাত্র লামা গোয়েস্তা ইয়াংএর নীরব হিংস্র প্রতিমূর্তিটিকে অবহেলা করতে পারেননি।

  _"তোমার কী মনে হয় সামসেং, লামা ইয়াং চুপ করে বসে থাকবেন?" একটু থেমে লামা গোয়েস্তা বললেন, "এখন শুধু অপেক্ষা প্রতিদানের…"

-"আপনি কি কোনো বিপদ আশঙ্কা করছেন? "ইয়েশে বলল।

_"বিপদ! সে যে বড়ো সহজ বস্তু ইয়েশে। বিপদের দুটি সম্ভাবনা পরিত্রাণ আথবা ধ্বংস। আমি আশঙ্কা করছি এমন কিছুর যার সম্ভাবনা শুধু মৃত্যু।"

লামা গোয়েস্তার গলায় এমনা কিছু একটা ছিল যা সহজেই ইয়েশের হাত পা ঠাণ্ডা বরফের মতো জমে গেল। "এও কী সম্ভব? "প্রশ্নটা এসেছে লামা সামসেংএর থেকে।

_"সম্ভব! যে দেবদেবীর আরাধনা মঠ নিষিদ্ধ করেছে ইয়াং তাদেরই আরাধনায় রত হয়েছিল। তাদের পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। তাদের তুষ্ট করা মানে নরকের কীটের সাথে…"

             এই সান্ধ্য আলোচনায় দাঁড়ি টানল একটা নয়-দশ বছরের মেয়ে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে বলল" মা!...মা!!..."গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে তার ভয়। চোখে মুখে আতঙ্কের স্পষ্ট ছাপ। আর কিছু বলার আগেই সংজ্ঞা হারাল সে। মেয়েটিকে লামা লামা সামসেং চেনে। মাচু। প্রায় দিনই সে মঠে আসে, অন্যান্য লামাদের সাথে খেলা করে, আবার দ্বিপ্রহরের আগে ফিরে যায় তার মায়ের কোলো। লামা সামসেং মঠের ভিতরে নিয়ে গেলেন মাচুকে। তার শুশ্রূষার দায়িত্ব অপর এক লামার হাতে সমর্পণ করে তিনজনে রওনা দিলেন মাচুর বাড়ির দিকে।

  যখন তারা কুটিরের সামনে এসে উপস্থিত হলেন পশ্চিম আকাশে অন্ধকার কিছুটা ঘন হয়েছে। লামা গোয়েস্তা এবং লামা লামা সামসেং হাঁপাচ্ছেন। যুবক ইয়েশের সাথে তাদের বৃদ্ধ শরীর পেরে উঠবেই বা কেন? কুটিরের দরজা হাট করে খোলা। ভিতরে প্রদীপ জ্বলছে। তারই একফালী আলো এসে পড়েছে উঠোনের টুকরো অংশে। ভেতরে কেও আছে বলে মনে হয় না। চারিদিক ডুবে রয়েছে সীমাহীন স্তব্দ্ধতায়। বাতাসে কটু গন্ধ। ইয়েশে ভেতরে গেল। তার পিছনে লামা লামা সামসেং ও লামা গোয়েস্তা। ভেতরে এসে তার যা দেখলেন তাতে তাদের দম বন্ধ হয়ে এল। স্নায়ু বেয়ে নেমে গেল ঠান্ডা স্রোত। এ দৃশ্য পুনরায় মনে পড়তেই ইয়েশের শরীর ভারী হয়ে গেল। মনে হল এই কক্ষ থেকে বাতাস যেন কেও টেনে নিয়েছে। আবারও সেই বীভৎস রক্ত মাখা দেহটা ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। নগ্ন দেহটাকে কেও যেন ফালা ফালা করে কেটেছে। আশেপাশে ছড়িয়ে রয়েছে দলা দলা মাংসের পিন্ড। তার পাশেই মাচুর বাবার রক্তশূন্য‌ দেহ। দুজনের মুখমন্ডল বলতে এক সমুদ্র আতঙ্ক ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ইয়েশের চোখেও কী লেগে রয়েছে সেই কালচে রক্তের ছিটেফোঁটা? আতঙ্কে তার মুখ দিয়ে আওয়াজ বেড়ল না। চিৎকার করছে সে। কিন্তু কোথায় লামা সামসেং, কোথায় লামা গোয়েস্তা….হায় ঈশ্বর!! বাতাস…একটু বাতাস…সেও কী তবে…? মৃত্যু যন্ত্রণা বুঝি এমনই হয়? এমন করেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে সবাই। মাচুর বাবা, তার পরম বন্ধু দোর্জে, লামা দাচেন সবাই… এবার তার পালা। এক অনন্ত শান্তির ঘুম নেমে আসবে তার চোখ জুড়ে। একটা নিকষ কালো হাত কি তার দিকে এগিয়ে আসছে? হ্যাঁ! ওই তো সে ডাকছে। একটা রিনরিনে নারী কন্ঠ তার কানে আসে। "ইয়েশে…! ইয়েশে…!"আহ…! আতঙ্কে গলা বুজে আসে তার। সে পড়ে এক অনন্ত অন্ধকারমর অন্ধকূপে। শুধু অন্ধকার।

 ইয়েশের চেতনা ফিরে আসে। নিজেকে বিধ্বস্ত অবস্থায় আবিষ্কার করে নিজেরই কক্ষে। তবে এতক্ষন সে কোথায় ছিল? ঘামে ভিজে গেছে তার সমগ্র দেহ। কিন্তু সেই রিন রিনে কন্ঠস্বর এখনও বাজছে তার কানের কাছে। আওয়াজটা আসছে তার পিছন থেকে। আতঙ্কে আবারও তার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। সে পিছনে ফিরল আস্তে আস্তে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে পদ্মিনী। তবে কি ওই পৈশাচিক কন্ঠস্বর পদ্মিনীর? মাথাটা কেমন ঘোলাটে লাগছে ইয়েশের। সমস্ত চিন্তা জটপাকিয়ে এখন সে চিন্তা‌ শক্তিহীন। আমতা আমতা করে সে বলল, "আ…আপনি..?"

_"ক্ষমা করবেন। আপনার সাথে একটু দরকার ছিল। আপনি কি অসুস্থ? তবে আমি না হয় পরে কোনসময় আসছি।"

_"না! না! সে প্রয়োজন বোধ করি হবে না। বলুন কী সাহায্য করতে পারি"?

-"আসলে…"একটু থেমে সে বলে ।" আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে।"

_"ধন্যবাদ!" একটু হাসে ইয়েশে। "এর কোন হেতু আছে কি দেবী?"

_"আপনি আমার প্রাণরক্ষা করেছেন।"

_"সে আমার কর্তব্য। কর্তব্যকে ধন্যবাদ দেওয়া মানে তার ব্যপ্তিকে খর্ব করা। আশা করি আপনি সেই প্রচেষ্টা করবেন না?"

_"আপনি আমার রক্ষাকর্তা, একথা আপনি অস্বীকার করছেন তবে?"

_"দেবী, এতে অস্বীকার করার তো কিছু নেই। যে কোনো মানুষ সেই মুহূর্তে উপস্থিত থাকলে সেও এই একই কার্য করত।"

_"আপনি উদ্ধার না করলে এই বৌদ্ধ ভূমিতে হয়ত বরফে জমে আমার মৃত্যু হত, আর তা না হলে হিংস্র শ্বাপদের দল ছিঁড়ে খেত আমাকে। হিংস্রতার তো আর অভাব নেই পৃথিবীতে।"

_"বিগত ঘটনা আমাদের জীবনে ভূমিকাহীন দেবী। সে প্রসঙ্গ উত্থাপন শুধু ক্লেশের জন্ম দেয়। তাকে ভুলে থাকাই শ্রেয়।"

_"ঠিকই বলেছেন ইয়েশে। কিন্তু ভুলে থাকা কি সহজ? আমার পিতা, আমার মাতা না জানি তারা এখন কোন‌ অবস্থায়। তারা হয়ত ধরেই নিয়েছে আমি মৃত। মৃত্যুশোক বড়ো বিষম বস্তু। সন্তানের জন্মের থেকেও ভয়ংকর।" পদ্মিনী চোখ ভিজে উঠল। টপ টপ করে জল গড়িয়ে এল তার আরক্ত মুখের উপর। ঠোঁট দুটো পাতার মতো কাঁপছে।

_"শান্ত হোন আপনি। এই অবস্থায় বেদনা স্বাভাবিক। কিন্তু নিজেকে তার কবল থেকে মুক্ত করতে হবে।"

রাতের সংকল্প যাই হোক না কেন সে হৃদয়ের সহানুভূতিকে ঢাকতে পারে না। ইয়েশেও সেই প্রচেষ্টাই করলেন।কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইয়েশে বলল," আপনি কাং রিনপোচের কাছে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। সেখান থেকেই আপনাকে উদ্ধার করি। কিন্তু..সেখানে তো কোনো মানুষ যায় না। তবে আপনি সেখানে.."

পদ্মিনী শীঘ্রই প্রসঙ্গ পরিবর্তনের চেষ্টা করলেন। কারন সে জানে একবার যদি সন্দেহের বীজ ইয়েশের মনে গেঁথে যায় তবেই বিপদ। শেরম্যান এই ব্যক্তিটির থেকে দূরে দূরেই থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু কী করবেন তিনি। মেয়েদের মন তো তিনি বোঝেন না। মনে মনের হাসলে পদ্মিনী তারপর বললেন ,"আচ্ছা লামা লামা সামসেং কোথায়? তাকে তো দেখছি না কয়েকদিন থেকে!"

_"আপনি তাকে চেনেন?"

_"সামান্য পরিচয় আছে মাত্র। শুনেছি আপনি তার খুব অনুগত?"

_"সাহসের কাছে মাথানত করা আর যাই হোক আনুগত্য প্রকাশ নয়। তাছাড়া লামা লামা সামসেং এর মতো ধর্মপরায়ণ মানুষ পৃথিবীতে বড়ই অভাব দেবী। তিনি গিয়েছেন এক বিশেষ কাজে। সম্পূর্ণ হলে পুনরায় তার দেখা পাবেন।"

_"রাজকার্য বুঝি?"

_"ভগবানের দূত রাজকার্যে লিপ্ত থাকে না। তাদের জীবন উৎসর্গ একমাত্র মানুষের কল্যাণার্থে।"

_"সেই কল্যান কার্যের বিষয়বস্তু প্রকাশে আপনার নিশ্চয় বাধা আছে?"

_"অবশ্যই নয়। আমার কথায় যদি এমন ভাব প্রকাশ হয়েই থাকে তবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।"

_"তবে বলুন, আমি শুনছি।"

ইয়েশে বলতে‌ শুরু করল , তার গলায় আবারও সূক্ষ্ম ভয়ের কনা মিশেছে যেন, "নিষিদ্ধ দেবদেবীদের আরাধনা করায় প্রধাম লামা ইয়াং বহিষ্কৃত হলেন পশ্চিম গুম্ফা থেকে। লামা সামসেং বলেছিলেন সেদিন তার দৃষ্টিতে ছিল ভয়ানক উত্তাপ, যা সকলকে ছাড়খাড় করে দিতে পারে । লামা গোয়েস্তার এমনই কিছু আঁচ করেছিলেন। বিপদের সম্ভাবনা মানুষকে আরও বেশি সম্মুখীন করে। এর পরেই শুরু হল একের পর মৃত্যলীলা। এত বিভৎস মৃত্যু যন্ত্রনা ঈশ্বরও কল্পনা করতে পারূ না। একসঙ্গে দুটি মৃত্যু। একটি নারী ও একটি পুরুষের। রাতের অন্ধকারে কেউ নারীর জরায়ু ফালা ফালা করে কেটে দেয়, আর পুরুষ দেহের সমস্ত রক্ত শুষে নেয়। কিছুদিনের মধ্যে নগরের আনাচে কানাচে দেখা গেল সেই নারকীয় মৃত্যু। লামা গোয়েস্তার মতে এই সবই ইয়াংএর অপমানের প্রতিশোধের ফল। তিনিই বিশেষ কোন নরকের কীটের সাহায্য নিয়েছেন আমাদের ক্ষতিসাধনের জন্য। কিন্তু লামা গোয়েস্তা সেই পৈশাচিক শক্তির কাছে দুর্বল।

কথার মাঝেই পদ্মিনী বলল," অন্ধকারের কাছে আলো মাথানত করবে?"

_"তা নির্ভর করবে আলোর তেজের ওপর। সেই তেজের খোঁজেই লামা লামা সামসেং এর অন্তর্ধান।"

পদ্মিনীর ঠোঁটে হালকা একটা কুটিল হাসি দাগ কেটে গেল। সে মনে যনে বলল" তেজ! আচ্ছা…।" মুখে বলল," আপনি সাবধানে থাকবেন। এখন আমি আসছি।" পদ্মিনী বেড়িয়ে গেল কক্ষ থেকে। এর কিছুক্ষণ পরে ইয়েশে রওনা দিল মঠের উদ্দেশ্যে। মাথায় অনেক চিন্তা তার জট পাকিয়ে আছে। লামা গোয়েস্তার কাছে এর কোনো উত্তর আছে নিশ্চয়।

                                      নয়

এত আয়োজনের এমন কঠিন পরিনাম? কে ভাবতে পারে সকল নিরবিচ্ছিন্ন ভাব প্রত্যয়ের অনন্ত সীমাহীন সমাধি? মৃত্যু যদি সহজে আসে সে লীলায় বেদনা আছে কিন্তু অনুতাপ সামান্য। কিন্তু সেই মৃত্যু যদি নেমে আসে নরকের কীটের হাত ধরে তার থেকে যন্ত্রনাময় মৃত্যু হয়ত এই জগৎ সংসারে আর নেই।

     ইয়েশের মনে উথাল পাথাল শুরু হয়েছে। প্রাসাদ থেকে মঠে যাওয়ার পায়ে হাঁটা পথটা ডুবে রয়েছে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে। শুধু দূরে মঠের ক্ষীন প্রদীপের আলো চোখে পড়ে। ইয়েশেও ডুবে রয়েছে অতল সমুদ্রে। কোথায় কিনারা ? চারিদিকে শুধু ধ্বংসপ্রাপ্ত ইতিহাস। আর পেমা? সেই শুধু জেগে ঘুম ভাঙা দ্বীপের মতো একা মাতাল সমুদ্রের মাঝখানে। একটুকরো বাঁচার আশা। কিন্তু কোথায় সে? ক্রমে সে দ্বীপ মুছে যাচ্ছে চোখ থেকে। নিজের হাতেই গলা টিপে খুন করছে প্রেমের। হায় প্রেম, এত দুর্বল কেন! একদিক থেকে ভালোই হল। এখন সে মুক্ত। এই অন্ধকারময় পৈশাচিক জগৎ সে এক খাঁচা ভাঙা পাখি। শুধু মুক্তি। লাংপো ঠিকই বলেছিল পথের সারমেয়রাও রাজা হওয়ার অভিলাষ রাখে। তাদের কি রাজা করে দেওয়া যায়? মায় না। তারা শুধুমাত্র পথের দাবীদার।

      হঠাৎ তার বোধশক্তি পুনরায় ফিরে এল। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। কিন্তু তার ইন্দ্রিয় বলছে কোথায় যেন একটু খামতি আছে। তার পা দুটো অকারনেই থেমে গেল। একটা অস্বস্তি শুরু হয়েছে পরিবেশে। বাতাস কমে এসেছে কিছুটা। অদ্ভুত এক সুরেলা ধ্বনিতে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। একটা রিন রিনে কন্ঠস্বর তার কানে এল,"ইয়েশে! এসো।" ঠিক যেমনটা শুনেছিল একটু আগেই স্বপ্নে। তবে কি সে এসেছে? একটা শিহরণ খেলে গেল তার সমস্ত শরীর জুড়ে। কিন্তু এই ডাক তো তার চেনা। পেমার গলা। আবারও সেই ডাকটা ভেসে এল তার কানে" ইয়েশে! এসো?" সে জোড়ে ডাকল "পেমা…!" পাথরের গায়ে ধাক্কা লেগে ফিরে এল সেই আওয়াজ। কিন্তু কোথায় পেমা। আবারও সেই কন্ঠস্বর। যেন মাথা ফাটিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে সেই কন্ঠস্বর তার মাথার মধ্যে। সে উদভ্রান্তের মতো ছুটোছুটি শুরু করল। জোড়ে ডাকতে লাগল "পেমা..! পেমা…! "কিন্তু কোথায় পেমা? অথচ সেই কন্ঠস্বর তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। তার নাকে লাগল মাংস পচা গন্ধ। সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। ভাঁটার মতো একের পর এক পেমা ডাক পাথরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। ইয়েশে যেখানে দাঁড়িয়ে এখন সেখান থেকে প্রাসাদের পিছনটা স্পষ্ট দেখা যায়। সেখানে একটুকরো আলো তার চোখ এড়ালো না। সে দৌড়ে গেল সেই দিকেই সম্মোহিতের মতো।

   সেখানে পৌঁছে ইয়েশে দেখল পেমা বসে রয়েছে। আভরণ বলতে মশালের হলুদ আলো। চোখে মৃত্যু হবে এমন হরিনীর দৃষ্টি। ঠোঁটে আলগা হাঁসির রেখা। ইয়েশে বিস্ময়ে কিছুক্ষণ চোখ ফেরাতে পারল না। তারপর বলল," রাজকুমারী আপনি এখানে?" পেমা কিছু বলল না। শুধু আলতো হাসল তারপর কাছে এগিয়ে এসে ঠোঁট রাখল ইয়েশের ঠোঁটে। আর পরক্ষনেই যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল পেমা। ইয়েশের কাছে থেকে নিজেকে সড়িয়ে আনল নিজেকে। পেমার সুন্দর মুখে ছাপ পড়েছে বীভৎস যন্ত্রণার। ইয়েশে তাকে ধরতে গিয়েও কয়েকপা পিছিয়ে গেল। তার চোখে আতঙ্ক ও বিস্ময় মেশানো অভিব্যক্তি। কী দেখছে সে? পেমার পেটের মধ্যে ওটা কী ওঠানামা করছে? পেমার চোখ ফেটে বেড়িয়ে এসেছে জল। রাতের সংকল্পকে খানখান করে পাথরের গায়ে গায়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পেমার আর্তনাদ। ইয়েশের হাত পা অবশ হয়ে আসছে। সে যা দেখছে সব সত্যি তো? পেমার পেট আরও ফুলে উঠেছে। পাথরের দেওয়ালের মতো চিঁড় ধরেছে সেখানে। হঠাৎ একটা প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে তার সংঞ্জা ফিরে এল। এক অচেনা ব্যক্তি এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে। সাথে উনি কি লামা সামসেং? হ্যাঁ। লামা সামসেং। তারাও চোখে আতঙ্ক। কিন্তু সেই লোকটির চোখে ভয়ের লেশ মাত্র নেই। সেই গভীর দৃষ্টি কি কোনো মানুষের হতে পারে! কাঠিন্য তার দেহের প্রতিটি পেশিতে ঝলমল করছে। আর ওদিকে পেমার আর্তনাদ। তার গলা চিঁড়ে বেড়িয়ে এসেছে বিন্দু বিন্দু রক্ত। ইয়েশে আর থাকতে পারল। ছুটে যেতে চাইল পেমার কাছে। এই কষ্ট সেও সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু তার হাতটা ধরে আছে সেই অচেনা ব্যক্তিটি। সে বলল ,"যদি বাঁচতে চাও, তোমাকে হত্যা করতে হবে পেমাকে।" খাদের অতল গভীর থেকে ভেসে এল সেই কন্ঠস্বর।"এই নাও ছোড়া। একবার যদি সেই জীবের জন্ম হয়ে যায় তবেই বিপদ। তার আগেই তোমাকে আটকাতে হবে।"

ইয়েশে এইবার শক্তি হারাল। বেঁচে থাকার কারনটুকুও সে মুছে দেবে। পেমাকে সে হত্যা করবে‌। আর কোন জীবের কথা বলছেন এই অঞ্জাত ব্যক্তি? না না। এই অচেনা অজানা ব্যক্তিটি সব ভুল বলছে । পেমার কিচ্ছু হয়নি। এক্ষুনি সেড়ে উঠবে সে। পেমা…! তার গলা ভিজে এল। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল পাথরের ওপর। সে বলল, "লামা সামসেং আপনি বলুন পেমার কিছুই হয়নি না। তবে ও এইরকম করছ…! আমি রাজবৈদ্যকে ডেকে আনছি এক্ষুনি" ‌। কিন্তু লামা সামসেং চুপ। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে তফাতে।

_"তাকে বাঁচানো অসম্ভব। তার আত্মার মৃত্যু তুমি আটকাতে পারবে। এইমুহুর্তে সেই জীব যদি জন্ম নেয়, সারাজীবনের মতো তার সুক্ষ্ম দেহ বাঁধা পড়বে নরকের অন্ধকারে। তৈরি হবে এক পিশাচ। তুমি যদি না পারো.." এই বলে সে ব্যক্তিটি ছুড়িটা নিজের হাতে নিল। এগিয়ে গেল পেমার দিকে। ইয়েশে বাধা দিতে গেল কিন্তু তার হাত পা কাজ করছে না। চিৎকার করা ছাড়া তার কোনো উপায়ই আর নেই। সে তাই করল। সে দেখল একটা ধারালা ছোড়া ঢুকে গেল পেমার গলায়। শেষ আর্তনাদ বাইরে আসার আগেই মিলিয়ে গেল। ফিনকি দিয়ে রক্তের ধারা বয়ে গেল পাথরে দেখানো পথ অনুসরণ করে।

                                       দশ

পরেরদিন সকালটা সকলে দেখল সম্পূর্ণ অন্য রূপে। শুধু যেটা দেখল না তা হল কাং রিনপোচের কাছে দুটি দেহ। একটি ইয়াং অপরটি চীনা সেনাপতি শেরম্যান। একটি উঁচু খুঁটির ডগায় মৃত দেহ দুটি ঝোলানো। নীচে হিংস্র কিছু জন্তুর পায়ের ছাপ। সেগুলিকে কোনো আঙ্গিকেই এই পৃথিবীর কোনো পায়ের ছাপ বলে মনে হয়। ইয়াং চোখ দুটো খাবলে তুলে নেওয়া হয়েছে। শেরম্যানের দেহ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে মাংস পিন্ড।

            ‌রাজপ্রাসাদের সভা কক্ষে জমা হয়েছে সকলে। মহারাজ উপস্থিত থাকলেও সেখানকার মধ্যমনি ভৈরব। লামা লামা সামসেং তার নির্দিষ্ট অবস্থানে। দেখা গেল না শুধু ইয়েশেকে। সভা শোকে আচ্ছন্ন। মহারানী ইয়নতেন জল স্পর্শ বন্ধ করেছেন। মহারাজেরও একই অবস্থায়। এক রাতের মধ্যেই তিনি পরিনত হয়েছেন শীর্নকায় এক জীবে। সভার মাঝেই কয়েকবার তার চোখে উপচে এসেছে জল। তারপর নিজেই নিজেকে সামলে নিয়েছেন। এই মূহুর্তে তার পাথরের মতো স্থির দৃষ্টি সকলেরই ভয়ের কারন। তার একমাত্র কন্যা পেমার মৃত্যুর বিচার করতে হবে! কজন পিতা এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন? গলা তার ভিজে‌ এল। রক্তাক্ত পেমার দেহটা চোখের সামনে ভেসে উঠল আবার। আর সঙ্গে সঙ্গেই রাগে তার সাড়া শরীর রি রি করে জ্বলে উঠল। একটা কান ফাটানো চিৎকার করেই নিজের তলোয়ার তুলে নিলেন মহারাজ। ভৈরবের শিরচ্ছেদই তার একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু ভৈরব , তার চোখে ভয় বা অপরাধবোধ কোনো কিছুরই লেশমাত্র নেই। সরল দৃষ্টি নিয়ে বসে রয়েছে সভার মধ্যস্থলে।

লামা সামসেং উঠে মহারাজ শান্ত করতে বললেন, "মহারাজ, দোষীকে সাব্যস্ত করার আগে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা উচিত। এই রাজধর্ম। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে ছোটো ভুলও ভবিষ্যৎএ অনুশোচনার কারন হতে পারে। তাছাড়া আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। সেই পৈশাচিক ঘটনার বিবরণ আমি আগেই দিয়েছি। শেষ‌ পর্যন্ত একটিই প্রশ্ন থাকে এই মৃত্যুর কারন কেন দরকার হয়ে পড়েছিল? রাজকুমারী পেমাকে বাঁচানোর কি অন্য কোনো উপায় ছিল না? তাছাড়া ভৈরব লামা গোয়েস্তার ভবিষ্যৎ বানীকে সঠিক প্রমান করেছেন। তিনিই বিপদের হাত থেকে বাঁচাবেন আমাদের বৌদ্ধ্যভূমিকে।"

মহারাজ রাগে ফুঁসছেন। তিনি বললেন, "কিন্তু এই..এই পাপীকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারব না আমি। ওই পাষন্ড আমার কন্যার হত্যাকারী। লামা সামসেং আপনাকে এবং আপনার বিচারকে আমি শ্রদ্ধা করি। ওকে তাই শেষ সুযোগ দিচ্ছি…"এই বলে তিনি বসে পড়লেন সিংহাসনে।

ভৈরব উঠে দাঁড়ালেন। তার ঠোঁটে লেগে আছে আলগা হাসি। অপূর্ব জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে তার দেহ থেকে। ভৈরব কিছুটা সময় নিল তারপর বলতে শুরু করল," মহারাজ আপনার কন্যার মৃত্যুতে আমি শোকাহত। কিন্তু সত্যই এর ভিন্ন উপায় আর নেই। অন্তত তার আত্মাটুকু…। থাক সে কথা। আপনার কন্যার মৃত্যু আর পাঁচাটা পৈশাচিক মৃত্যুর মতোই অস্বাভাবিক। সেক্ষেত্রেও আমাকে একই উপায় অবলম্বন করতে হত।" একটু থেমে বললেন,"আপনাকে এখন যে কাহিনী শোনাব তা অবিশ্বাসযোগ্য। সত্য অনুসন্ধানে এর উত্তর আপনি নিশ্চয় পাবেন। সেক্ষেত্রে দরকার ভারতীয় শাস্ত্রের গুঢ় জ্ঞান। সকলের দ্বারা এ আয়ত্ত করা অসম্ভব। কিন্তু ইয়াং সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিলেন। আর সেই বিদ্যায় প্রয়োগ করলেন তিনি তার প্রতিশোধের রাস্তায়। ভারতীয় শাস্ত্র অনুযায়ী অমৃতের আশায় এক রাক্ষস ছদ্মবেশে দেবতাদের সাথে মিশে যায়। তার নাম রাহু। অমৃত তার হাতে এসেও যায়। কিন্তু বাধ সাধল চন্দ্র। ছদ্মবেশের আড়ালে থাকা রাক্ষসটিকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন । তখন বিষ্ণু ধারন করলেন এক নারী অবতার, মোহিনী। রাহু অমৃত মুখে ঢালতেই মোহিনী শিরচ্ছেদ করলেন তার। যেহেতু আমৃত তার মুখে পড়েছিল তাই আজও সে অমর। শিরচ্ছেদ অবস্থাতেই সে অমর । কিন্তু তার দেহের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। কথিত আছে তার মুন্ডু বিহীন দেহটাকে নিয়ে নরকের পিশাচেরা মাতেছিল সঙ্গমের খেলায়। সেখান থেকেই জন্ম হয় এমন কিছু জীবের যারা জন্মানোর সাথেই মারা যাবে। জন্মানোর মূহুর্তে কেও যদি উপস্থিত থাকে তবে তার উষ্ণ রক্ত পান করে সেই জীব।‌ তারপরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় পৃথিবী থেকে। কিন্তু এই জীব মাতৃ গর্ভে স্থাপনের জন্য চায় একজন বাহক। যে সবসময় তাকে রোগের মতো ধারন করবে নিজের দেহে। তার নিজের কোনো ক্ষতি ছাড়াই। কোনো নারী যদি সেই বাহকের ভোজ্য খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ গ্রহন করে একমাত্র তবেই সেই জীবের জন্ম সম্ভব। নরকের জঘন্য তম জীবেরা বাহক হয়ে শত শত বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে সেই জীবের ভ্রুন।আমার ধারনা এই সভাগৃহেই সেই বাহক উপস্থিত।"

ভৈরবের কথা শেষ হল। সভাগৃহ নিস্তব্ধ। সকলের মস্তিষ্কেই দীর্ঘদিনের প্রচ্ছন্ন‌ ভাবটা যেন ক্রমে দূর হচ্ছে।

লামা সামসেং বললেন," এর প্রতিকার।"

_"একমাত্র বাহকের নির্মুল দ্বারাই এদের প্রতিরোধ সম্ভব। এর ভিন্ন কোনো পথ নেই। আর মহারাজ, রাজকুমারীকে হত্যা আমিই করেছি একথা আমি স্বীকার করছি। কিন্তু যদি না করতাম তাহলে ইয়েশেও প্রানে বাঁচত না। আমি শুধু চেয়েছি প্রানের বদলে প্রান। সেই জীবকে মাতৃগর্ভেই মেরে ফেলতে বাধ্য হয়েছি আমি।" ভৈরবের মুখে শান্ত অভিব্যক্তি।

মহারাজ এতক্ষন গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন। এবার তিনি বললেন," এর সত্যতা প্রমানের উপায়?"

ভৈরব একটু ভেবে বললেন, "তবে অনুমতি দিন, মহারাজ!"

মহারাজ অনুমতি দিলেন। ভৈরব একটু অপেক্ষা করে পদ্মাসনে বসলেন। তারপরে চোখ বুজলেন আস্তে আস্তে। সকলের দৃষ্টিই স্থির ভৈরবের দিকে। শুধু মাত্র একজনের মধ্যে একটু অস্বস্তির উদ্রেক হলো তা কেও লক্ষ্যই করল না। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল নিঃশব্দে। সকলের চোখে মুখে বিস্ময় দানা বাঁধতে শুরু করেছে। হঠাৎ সভাগৃহে ভিড়ের মাঝেই একটা মৃদু চাপা গোঙানির শব্দ কানে এল। ভৈরবের ঠোঁটে পাতলা হাসির রেখা খেলে গেল। গোঙানির শব্দটাকে আর চাপা রাখা গেল না। সভাগৃহের মাঝখানেই মেঝের ওপর পদ্মিনী আর্তনাদ করে পড়ে গেল।

ভৈরব চোখ খুলে বলল," মহারাজ, প্রমান আপনার সামনে।" পদ্মিনী তখন পেটে হাত দিয়ে ছটফট করছে মেঝের ওপর।

মহারাজ বললেন ,"এসবের মানে কী?" তার চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি।

_"এই সেই বাহক।" এই বলে ভৈরব উঠে গিয়ে সরাসরি পদ্মিনীর চোখে চোখ রাখল। সঙ্গে সঙ্গেই পদ্মিনীর একটা প্রচন্ড মোচড় খেল। মুখে দিয়ে বেড়িয়ে এল পৈশাচিক চিৎকার। পরক্ষনেই আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে ভৈরব বলল," মহারাজ, এইবার আপনি জিঞ্জাসা করতে পারেন যা কিছু প্রশ্ন। অপরাধী প্রস্তুত। " সকলের দৃষ্টি পদ্মিনীর ওপর স্থির। মহারাজ বললেন," পদ্মিনী! সত্যিই তুমি কি সেই বাহক, ভৈরব যার কথা বলছেন?

পদ্মিনী সম্মোহিতের মতো বলে চলল। তার জিভে কোনও আড়ষ্টতা নেই।" হ্যাঁ মহারাজ। আমিই সেই নারী যে রক্তবীজ ধারন করেছে নিজের দেহে। যার প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসে লুকিয়ে আছে বিষাক্ত বায়ু। রাজকুমারী পেমাকেও আমিই হত্যা করেছি। আমারই উচ্ছিষ্টাংশ খাইয়েছি তাকে। বাকি সকলকেই একই সাথে…"

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সেনাপতি লাংপো নিজের তলোয়ারটা ধরলেন পদ্মিনী ঠিক গলার কাছটাতে।

"মহারাজ আপনি আদেশ করুন 'এই পাপীষ্টা এক্ষুনি হত্যা করতে পারি!"

"সে কোনো প্রয়োজন নেই লাংপো" , ভৈরবের গলায় ভরাট কন্ঠস্বর," আপনার বিচার এখনো বাকি আছে।"

_"কী বলতে চাইছেন আপনি?" লাংপো বলল।

_"সর্বসমক্ষে সে কথা বললে আপনার এই দম্ভ বজায় থাকবে তো?"

লাংপো চুপ। ভৈরব বলে চলল, "আপনি একজন‌ বিশ্বাসঘাতক। আপনিই চীনাদের ষড়যন্ত্র বয়ে এনেছেন দূত হয়ে এই বৌদ্ধ ভূমিতে। মহারাজ ইয়াংএর এই দূরভিসন্ধি পিছনে আরও একটি কারণ ছিল। চীনাদের হাতে এই রাজ্য তুলে দেওয়া বিনা যুদ্ধে। একপক্ষের এতটুকু রক্তক্ষয় না করে। তাদের দুই তুরুপের তাস লাংপো এবং এই পদ্মিনী।

_"না মহারাজ! এ সম্পূর্ণ মিথ্যে।"

_"পদ্মিনীই সবথেকে বড়ো সাক্ষী।" এই ভৈরব পদ্মিনীর দিকে তাকালেন। সে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

কিছুক্ষণ সভার প্রতিটি প্রানী চুপ করে গেল। মহারাজ মৌন‌। তার যেন বিশ্বাস করতে অসুবিধা হচ্ছে লাংপো এই কাজ করতে পারে। ক্ষনকাল চুপ করে থেকে মহারাজ বললেন, পদ্মিনী শাস্তি সে নিজেই ভোগ করবে। তাকে কারাগারে বন্ধ করে রাখা হবে। আর দেখবে বিন্দুমাত্র খাবার জলও সে যেন না পায়। এইভাবেই তিলেতিলে মৃত্যু হবে তার‌। আর লাংপো সে বিশ্বাসঘাতক। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি একটিই ।মৃত্যুদন্ড।

                                          ***

সেইদিন সন্ধ্যেবেলা। ভৈরব উঠে বসল তার ঘোড়ার উপর। পাশে দাঁড়িয়ে লামা লামা সামসেং এবং ইয়েশে। লামা সামসেং জিঞ্জাসা করলেন ,"আপনার পরিচয় এখনও যে কিছুই জানতে পারলাম না?"

ভৈরব একটু হেসে বলল, "সাধারন পরিচয়হীন। তার বেঁচে থাকাটাই একমাত্র পরিচয়। আর যদি জানতে চান এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আমি কী করে জানলাম সে উত্তর আমারও আজানা। আমি শুধুমাত্র আদেশের পালন করি মাত্র। তার রহস্যে বৃত্তান্ত জনসমক্ষে প্রচারে বাধা আছে।" তিনি ইয়েশের দিকে তাকালেন,"ইয়েশে, অনেক যন্ত্রনা তোমাকে সহ্য করতে হবে এখনও। কিন্তু সেই বেদনা বুকে করে বেঁচে থাকাটাই জীবন। মৃত্যুর স্বাদ বড়ো তেঁতো। সে স্বাদ তোমার সহ্য হবে। এখন বিদায় দিন আপনারা আমাকে।

_"আবার কবে দেখা পাব আপনার? লামা সামসেংএর চোখে জল।

_"আবারও এক বিপদের সম্ভাবনায়।" এই বলে ডুবন্ত সূর্যের সাথে ভৈরব মিলিয়ে গেল সন্ধ্যের মিহি ধুলোর

অন্ধকারে


Rate this content
Log in

More bengali story from Koustav Halder

Similar bengali story from Horror